বৈদেশিক মুদ্রা

সেপ্টেম্বরের শুরুর সর্বোচ্চ থেকে কমে বাংলাদেশের রিজার্ভ ৩৬.৩৮ বিলিয়ন ডলারে, রিজার্ভ চাঙা রাখছে রেমিট্যান্সের ঢল

১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬3 মিনিটের পড়া

বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৭ সেপ্টেম্বর নাগাদ কমে দাঁড়িয়েছে ৩৬.৩৮ বিলিয়ন ডলারে, মাত্র এক সপ্তাহ আগে ছোঁয়া ৩৭.৪১ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড থেকে যা কিছুটা নিচে। আমদানি ব্যয় মেটাতে গিয়ে রিজার্ভের এই পতন হলেও রেমিট্যান্সের নতুন ঢেউ তা অনেকটাই সামলে দিয়েছে। আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩১.৪৭ বিলিয়ন ডলারে, যা নিয়ন্ত্রকদের নজরে থাকা তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর নিরাপত্তা সীমার চেয়ে ঢের বেশি। ৬ সেপ্টেম্বর একদিনে রেকর্ড ২০১ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্সসহ সাম্প্রতিক রেকর্ড প্রবাহ রিজার্ভকে শক্ত ভিতে রাখতে সাহায্য করছে, যদিও বৈশ্বিক পণ্যমূল্য ও ঋণ পরিশোধের চাপ এখনো অর্থনীতির জন্য পরীক্ষা হয়ে আছে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চলতি মাসের শুরুতে নতুন উচ্চতা ছোঁয়ার পর কিছুটা নিচে নেমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৬.৩৮ বিলিয়ন ডলার, যা ১ সেপ্টেম্বরের ৩৭.৪১ বিলিয়ন ডলার থেকে কম। গত এক বছরে গড়ে তোলা রিজার্ভের তুলনায় এই কমতি খুব বড় কিছু নয়, আর যারা নিয়মিত এই সংখ্যাগুলো দেখেন তারা বলছেন এটা মূলত মাস শেষের আমদানি দায় মেটানোর স্বাভাবিক প্রতিফলন, কোনো গভীর দুর্বলতার লক্ষণ নয়।

দেশের বাহ্যিক স্থিতিশীলতার জন্য এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভ, যেখানে প্রতিশ্রুত ও আটকে থাকা তহবিল বাদ দিয়ে প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য অর্থ দেখানো হয়। সেই হিসাবে রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩১.৪৭ বিলিয়ন ডলারে, যা দিয়ে প্রায় ৪.৮ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব, আইএমএফ যে তিন মাসকে ন্যূনতম নিরাপদ সীমা ধরে তার চেয়ে অনেকটাই বেশি।

টানা কয়েক মাসের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি

সেপ্টেম্বরের এই সামান্য পতন আসলে দুই মাসের একটানা উত্থানের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে জুলাইয়ের শুরুতে ৩৬.৫ বিলিয়ন ডলারের সামান্য বেশি থেকে রিজার্ভ উঠে আসে ১ সেপ্টেম্বরের ৩৭.৪১ বিলিয়ন ডলারের সর্বোচ্চে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাপ্তাহিক তথ্য বলছে, এই সময়ে রিজার্ভ মোটামুটি সংকীর্ণ একটা সীমার মধ্যেই ওঠানামা করেছে, একবারে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার কমা বাড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে, বড় কোনো ঝাঁকুনি ছাড়াই। অর্থনীতিবিদদের মতে এটি ২০২২ ও ২০২৩ সালে দেখা তীব্র রিজার্ভ ক্ষয়ের তুলনায় অনেক বেশি স্থিতিশীল একটা বাজারের ইঙ্গিত দেয়।

তারিখমোট রিজার্ভ (বিলিয়ন ডলার)বিপিএম৬ ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ (বিলিয়ন ডলার)
৭ জুলাই, ২০২৬৩৬.৫২প্রকাশ করা হয়নি
১৬ জুলাই, ২০২৬৩৬.৬৬৩১.৯৭
২ আগস্ট, ২০২৬৩৬.৪৭৩১.৬৫
১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬৩৭.৪১৩২.৫০
৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬৩৬.৩৮৩১.৪৭

সাম্প্রতিক এই রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনে মূলত দুটি শক্তি কাজ করছে, প্রবাসী আয় আর রপ্তানি আয়ের ব্যাংকিং চ্যানেলে ফিরে আসা। দুটোই গত বছরের তুলনায় বেশ এগিয়ে আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে সেপ্টেম্বরের প্রথম ছয় কার্যদিবসেই রেমিট্যান্স এসেছে ৬৩৭ মিলিয়ন ডলার, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৩.৪ শতাংশ বেশি, আর ৬ সেপ্টেম্বর একদিনেই এসেছে রেকর্ড ২০১ মিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স পৌঁছেছে ৬.৪৬২ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৯.৩ শতাংশ বেশি, এই গতি ধরে রাখতে পারলে এটি হতে পারে দেশের সবচেয়ে বড় রেমিট্যান্স বছরগুলোর একটি।

যেসব কারণে রিজার্ভে টান পড়ছে

এই প্রবাহের বিপরীতে চাপ তৈরি করছে ভারী আমদানি ব্যয়, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাণিজ্য তথ্য বলছে, শুধু জুলাইয়েই পেট্রোলিয়াম আমদানি ৮৩.৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.৩৭ বিলিয়ন ডলারে, বৈশ্বিক তেলের দাম বাড়া আর দেশীয় গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতকে আমদানি করা জ্বালানি তেল ও এলএনজির ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়েছে। এতে জুলাইয়ে সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতি এক তৃতীয়াংশের বেশি বেড়ে গেছে, যা রিজার্ভের রেখাকে উঁচু থাকলেও সোজা ওপরের দিকে না উঠতে দেওয়ার একটা কারণ। গত এক দশকে নেওয়া বড় অবকাঠামো প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত সরকারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধও একটা স্থায়ী চাপ তৈরি করছে, যা প্রান্তিক ও অর্ধবার্ষিক পরিশোধের সময় সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

যারা নিয়মিত রিজার্ভের সংখ্যা পর্যালোচনা করেন তারা বর্তমান অবস্থাকে সংকটের গল্প হিসেবে না দেখে বরং একটা বাড়তি সুরক্ষার গল্প হিসেবেই দেখছেন। ৩৬ থেকে ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ঘোরাফেরা করা মোট রিজার্ভ, আর ৩১ বিলিয়ন ডলারের ওপরে স্থিরভাবে থাকা বিপিএম৬ ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মুদ্রার অস্থিরতা সামলানোর জন্য যথেষ্ট জায়গা দেয়, ২০২২ থেকে ২০২৩ সালের মতো একাধিক দফা টাকার অবমূল্যায়ন কিংবা আমদানি নিয়ন্ত্রণের মতো জরুরি পদক্ষেপ ছাড়াই। নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যয়, সম্ভাব্য নতুন বেতন কাঠামো আর জ্বালানি আমদানির চাহিদা যখন একসঙ্গে বৈদেশিক হিসাবের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে, তখন এই বাড়তি জায়গাটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বড় প্রেক্ষাপট

২০২৩ সালের সবচেয়ে খারাপ সময়ে আইএমএফের কঠোর হিসাব পদ্ধতিতে বাংলাদেশের রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল, তারপর মুদ্রার বিনিময় হারে বেশি নমনীয়তা, কড়া আমদানি নিয়ন্ত্রণ আর স্থিতিশীল রেমিট্যান্স চ্যানেলের মিশ্রণে সেই বাফার আবার গড়ে তোলা সম্ভব হয়। চলতি বছরের শুরুতে বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ানোকে নীতিনির্ধারকরা একটা মাইলফলক হিসেবে দেখেছিলেন, আর এখন টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে সেই মাত্রার ওপরে থাকা, এমনকি ৭ সেপ্টেম্বরের মতো সামান্য পতনের মধ্যেও, বোঝাচ্ছে এবারের ঘুরে দাঁড়ানোটা আগের ক্ষণস্থায়ী উত্থানগুলোর চেয়ে বেশি টেকসই।

আপাতত এই রিজার্ভের গতিপথ বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে সত্যিকারের একটা সুরক্ষা বলয় দিয়েছে, খুবই সরু কোনো মার্জিন নয়। তবে ব্যাংকাররা সতর্ক করছেন, চলতি অর্থবছরের বাকি সময়ে জ্বালানি আমদানি ব্যয়, ঋণ পরিশোধ আর জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি একসঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার জন্য প্রতিযোগিতা করবে, ঠিক যে সময় রেমিট্যান্স আর রপ্তানিকে সেই ঘাটতি পূরণের ভার বইতে হবে।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন