রেমিট্যান্স

সেপ্টেম্বরের প্রথম ছয় দিনেই রেকর্ড গতিতে এলো ৬৩৭ মিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয়

৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬5 মিনিটের পড়া

সেপ্টেম্বরের প্রথম ছয় কর্মদিবসে বাংলাদেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৬৩৭ মিলিয়ন ডলার, গত বছরের একই সময়ের চেয়ে যা ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি, এর মধ্যে ৬ সেপ্টেম্বর একদিনেই এসেছে রেকর্ড ২০১ মিলিয়ন ডলার। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের এই সময়ে মোট প্রবাসী আয় দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৪৬২ বিলিয়ন ডলারে, বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ। আমদানি খরচ বাড়তে থাকা এই সময়ে এই জোয়ার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে আর টাকাকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে।

সেপ্টেম্বরের শুরুটা প্রবাসী আয়ের জন্য বেশ ভালোই গেছে। মাসের প্রথম ছয় কর্মদিবসেই প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৬৩৭ মিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ে আসা ৫১৬ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। এই হিসাবের মধ্যে আরও একটা চমকপ্রদ সংখ্যা লুকিয়ে আছে, শুধু ৬ সেপ্টেম্বর একদিনেই দেশের ব্যাংকিং চ্যানেলে এসেছে ২০১ মিলিয়ন ডলার, যা এখন পর্যন্ত একদিনের সর্বোচ্চ রেকর্ড।

সেপ্টেম্বরের এই ছয় দিনের সঙ্গে আগের দুই মাস যোগ করলে ছবিটা আরও উজ্জ্বল দেখায়। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট প্রবাসী আয় দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৪৬২ বিলিয়ন ডলারে, গত বছরের একই সময়ে যা ছিল ৫ দশমিক ৪১৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বছরওয়ারি ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ, যা কয়েক বছর আগেও অনেকটা উচ্চাভিলাষী মনে হতো, বিশেষ করে যখন সরকারি বিনিময় হার আর খোলাবাজারের হারের মধ্যে ব্যবধান বড় হয়ে প্রবাসী আয়ে টান ধরিয়েছিল।

টাকা এত দ্রুত দেশে ফিরছে কেন

যারা এই পরিসংখ্যান নিয়মিত দেখেন তারা বলছেন, এটা হঠাৎ একটা উল্লম্ফন নয়, বরং গত অর্থবছর ধরে তৈরি হওয়া গতির ধারাবাহিকতা। ২০২৫-২৬ অর্থবছর বাংলাদেশ শেষ করেছিল ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় নিয়ে, যা তখনকার হিসেবে ছিল একটা রেকর্ড, আর অর্থ মন্ত্রণালয় এর কৃতিত্ব দিয়েছিল বিশেষ করে সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্য থেকে আসা আয়ের বড় বৃদ্ধিকে। সেপ্টেম্বরের শুরুর এই সংখ্যা বলছে, সেই গতি ফিকে হয়ে যাওয়ার বদলে নতুন অর্থবছরেও সোজা চলে এসেছে।

এর একটা কাঠামোগত কারণও আছে। গত কয়েক বছরে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেল হুন্ডির অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ক্রমশ এগিয়ে গেছে, ফলে প্রবাসী শ্রমিকদের কাছে অনানুষ্ঠানিক পথে টাকা পাঠানোর আকর্ষণ কমেছে। আগে হুন্ডিতে কার্যকর রেট একটু ভালো পাওয়া যেত ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে ছিল আইনি ঝুঁকি আর কিছু ভুল হলে কোনো সুরক্ষা না থাকার শঙ্কা। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস আর ব্যাংক অ্যাপের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে টাকা পাঠানো যত দ্রুত আর সহজ হয়ে উঠেছে, প্রবাসীদের আয়ের তত বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক বাজারে হারিয়ে না গিয়ে সরকারি হিসাবে উঠে আসছে বলে মনে হচ্ছে।

সময়টাও একটা কারণ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এবং মালয়েশিয়ায় থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকদের একটা বড় অংশ ধর্মীয় বা পারিবারিক উপলক্ষ ঘিরে দেশে বাড়তি টাকা পাঠিয়ে থাকেন, আর মধ্যপ্রাচ্যে নির্মাণ ও সেবা খাতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের চাহিদাও এখনো ভালো। এগুলো নতুন কোনো বিষয় নয়, কিন্তু হুন্ডি থেকে সরে আসার প্রবণতার সঙ্গে মিলে এমনিতেই ভালো একটা প্রবৃদ্ধির হারকে সত্যিকারের রেকর্ডের কাছাকাছি নিয়ে গেছে।

বিনিময় হার আর রিজার্ভের জন্য এর মানে কী

গত কয়েক বছরে যে দেশ বেশিরভাগ সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সামলাতে ব্যস্ত ছিল, তাদের জন্য টানা প্রবাসী আয়ের এই জোয়ার বাইরের খাত থেকে আসা সবচেয়ে স্বস্তির খবরগুলোর একটি। বিদেশি ঋণের মতো প্রবাসী আয় দেশে ঢুকলেও তার সঙ্গে কোনো দায় জমা হয় না, আর রপ্তানি আয়ের মতো এটা বিদেশি ক্রেতাদের হাত গুটিয়ে নেওয়ার ঝুঁকিতেও পড়ে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও অর্থনীতিবিদরা লেনদেনের ভারসাম্য পর্যালোচনা করতে গিয়ে বারবার বলেছেন, স্থিতিশীল রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি প্রবাসী আয়ই মূলত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে ধরে রাখছে এবং আমদানি খরচ বাড়তে থাকা এই সময়েও টাকাকে ডলারের বিপরীতে তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখছে।

এই স্থিতিশীলতার প্রভাব শুধু বিনিময় হারের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের প্রবাহ যত স্থির থাকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার সামলাতে রিজার্ভ থেকে অতটা টাকা তুলে ব্যবহার করার প্রয়োজন তত কমে, আর সময়মতো আমদানি বিল মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত ডলার জোগাড় করতে হিমশিম খাওয়া ব্যাংকগুলোর ওপর চাপও কিছুটা কমে। বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে যাওয়া আর তেল আমদানির খরচ বাড়ার মধ্যে গত এক বছরে যে বাইরের খাতকে অনেক কিছু সামলাতে হয়েছে, তার মধ্যে প্রবাসী আয় হয়ে উঠেছে অল্প যে কয়েকটা ধারাবাহিক ইতিবাচক জায়গা টিকে আছে তার একটি।

ছয় দিনের সংখ্যা নিয়ে সতর্কতার একটা কথা

ছয় দিনের তথ্য খুবই ছোট একটা সময়সীমা, আর প্রবাসী আয় মাসজুড়ে সমানভাবে না এসে নির্দিষ্ট কিছু তারিখের আশপাশে জমাটবদ্ধভাবে আসতে পারে, তাই ৬ সেপ্টেম্বরের ২০১ মিলিয়ন ডলারের একদিনের সংখ্যাটাকে নতুন কোনো দৈনিক গড় হিসেবে না দেখে একটা শক্তিশালী তথ্যবিন্দু হিসেবেই দেখা উচিত। তারপরও জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় দশ সপ্তাহ ধরে ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাটা এতটাই দীর্ঘ সময় যে এই শক্তিকে নিছক পরিসংখ্যানের খেয়াল বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সেপ্টেম্বরের শুরুর দিনগুলোর গতি বাকি মাস জুড়েও ধরে রাখা গেলে, সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম শক্তিশালী মাস হিসেবে প্রবাসী আয় রেকর্ড গড়তে পারে, যা সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য, চলতি অর্থবছর শেষে রিজার্ভ ৫১ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার পথে বাড়তি সহায়তা জোগাবে।

দেশের লাখো পরিবারের জন্য যারা দৈনন্দিন খরচ থেকে শুরু করে সন্তানের স্কুলের বেতন পর্যন্ত সবকিছুর জন্য প্রবাসে থাকা স্বজনদের পাঠানো টাকার ওপর নির্ভরশীল, এই পরিসংখ্যান আসলে লেনদেনের ভারসাম্যের একটা সংখ্যার চেয়েও বেশি কিছু বোঝায়, একটা স্থির এবং ক্রমবর্ধমান সহায়তার প্রবাহ, যা এখন আগের চেয়ে দ্রুত, নিরাপদ এবং অনানুষ্ঠানিক বিকল্পের বদলে ক্রমেই স্বাভাবিক পছন্দ হয়ে উঠছে।

টাকা আসছে কোন কোন দেশ থেকে

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের উৎস অনেকটাই বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠেছে, যদিও সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে এখনো অনেকটা ব্যবধানে এগিয়ে আছে উপসাগরীয় দেশগুলো। নির্মাণ, খুচরা বিক্রয় ও গৃহকর্মী খাতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিকের কারণে সৌদি আরব ধারাবাহিকভাবে শীর্ষ প্রেরণকারী দেশের তালিকায় থাকছে, আর সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান ও কাতার মিলে বাকি অংশের একটা বড় ভাগ পাঠাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রেকর্ড প্রবাসী আয়ের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় নির্দিষ্টভাবে সৌদি আরব এবং যুক্তরাজ্যের কথা উল্লেখ করেছিল, যা বোঝায় এই প্রবৃদ্ধি শুধু চিরাচরিত উপসাগরীয় করিডোরের মধ্যেই আটকে নেই, বরং দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটা বড় জনগোষ্ঠী থাকা বাজারগুলোতেও গতি পেয়েছে।

এই বৈচিত্র্য শুধু প্রবৃদ্ধির সংখ্যার জন্যই নয়, স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী আয়ের উৎস এক বা দুইটা শ্রমবাজারে কেন্দ্রীভূত থাকলে সেই নির্দিষ্ট দেশের অর্থনীতি ধীর হয়ে গেলে বা অভিবাসী শ্রমিকদের প্রতি নীতি কঠোর হলে দেশ ঝুঁকিতে পড়ে যায়, অন্যদিকে উপসাগরীয় অঞ্চল, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে ছড়িয়ে থাকলে কোনো একটা নির্দিষ্ট করিডোরে ধাক্কা লাগলেও সামগ্রিক প্রবাহ তুলনামূলক সুরক্ষিত থাকে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রেকর্ড প্রবাসী আয় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় যেভাবে একটা চিরাচরিত উপসাগরীয় বাজার আর যুক্তরাজ্যের মতো দীর্ঘদিনের প্রবাসী জনগোষ্ঠী থাকা বাজার দুটোকেই আলাদাভাবে তুলে ধরেছে, তাতে বোঝা যায় নীতিনির্ধারকরা নিজেরাও মনে করেন এই বিস্তৃতিই প্রবৃদ্ধিকে টেকসই রাখতে সাহায্য করেছে, কোনো একটা নির্দিষ্ট দেশের ওপর নির্ভরশীল না থেকে।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন