বীমা

আস্থা ফেরাতে আরও ২৩ কোটি টাকার বকেয়া বীমা দাবি মেটাচ্ছে আইডিআরএ

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬5 মিনিটের পড়া

বাংলাদেশের ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি ১৪ সেপ্টেম্বর ৫,৮৬৮ জন পলিসিধারীকে ২৩.০৩ কোটি টাকার বকেয়া দাবি পরিশোধ করছে, দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে এটি দ্বিতীয় এমন নিষ্পত্তি ধাপ, আর এর পেছনে লুকিয়ে থাকা অনেক বড় সংকটের সর্বশেষ প্রমাণ। শিল্প খাতের তথ্য অনুযায়ী দেশজুড়ে প্রায় ৪৪,০৩০ কোটি টাকার অপরিশোধিত জীবন বীমা দাবি জমে আছে, যা প্রায় ১২ লাখ পলিসিধারীকে প্রভাবিত করছে, আর নিষ্পত্তির হার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অনেক নিচে নেমে গেছে। আইডিআরএ কোম্পানিগুলো টাকা জোগাড় করার জন্য অপেক্ষা না করে সংকটে থাকা বীমা কোম্পানিগুলোর নিজস্ব সম্পদ আর জামানত বন্ড বিক্রি করে এই অর্থ পরিশোধ করছে, পাশাপাশি আরও ধারালো প্রয়োগ ক্ষমতা দেওয়ার মতো একটা নতুন অধ্যাদেশের জন্য চাপ দিচ্ছে। এই ঘটনা এ বছর বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে উন্মোচিত সুশাসনের ব্যর্থতারই প্রতিধ্বনি করে।

বছরের পর বছর অপেক্ষা করা পলিসিধারীদের জন্য দ্বিতীয় দফা চেক

ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি, সংক্ষেপে আইডিআরএ, ১৪ সেপ্টেম্বর ৫,৮৬৮ জন পলিসিধারীকে ২৩.০৩ কোটি টাকার বকেয়া বীমা দাবি পরিশোধ করতে যাচ্ছে, মাত্র এগারো দিন আগে শুরু হওয়া একটা নিষ্পত্তি অভিযানের দ্বিতীয় ধাপ। এবার পাঁচটি বীমা কোম্পানি জড়িত। পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স সবচেয়ে বড় অংশ নিয়ে এগিয়ে, প্রায় ১২ কোটি টাকা যাচ্ছে ৩,৬০০ জন পলিসিধারীর কাছে, এরপর হোমল্যান্ড লাইফ ইনস্যুরেন্সের ৪.৯৮ কোটি টাকা ১,১৪৫ জনের জন্য, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের ৫ কোটি টাকা ৫৮০ জন পলিসিধারীর জন্য, আর তুলনামূলক ছোট অঙ্কের ৫৫.৩০ লাখ ও ৫০.১৮ লাখ টাকা যথাক্রমে সানফ্লাওয়ার লাইফ ইনস্যুরেন্স আর সানলাইফ ইনস্যুরেন্স থেকে, যা কভার করছে ৩০০ ও ২৪৩ জন পলিসিধারীকে।

এই মাসে এটাই আইডিআরএর প্রথম এমন পদক্ষেপ নয়। ৩ সেপ্টেম্বর নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি সাতটি জীবন বীমা কোম্পানির ২,৫৪৯ জন পলিসিধারীকে ১৪,৫১,০৩,১৪৬.৫৮ টাকা, অর্থাৎ ঠিক ১৪.৫১ কোটি টাকার সামান্য বেশি দাবি পরিশোধ করতে সহায়তা করেছিল। দুই দফা মিলিয়ে দেখলে, দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে আইডিআরএ প্রায় ৩৭.৫ কোটি টাকা ৮,৪০০-এর বেশি পলিসিধারীর কাছে পৌঁছে দিয়েছে, যার অর্থায়ন এসেছে সংশ্লিষ্ট বীমা কোম্পানিগুলোর সম্পদ আর জামানত বন্ড বিক্রি করে, কোম্পানিগুলো নিজেরা টাকা জোগাড় করার জন্য অপেক্ষা না করেই।

নিষ্পত্তি ধাপতারিখপরিমাণপলিসিধারীবীমা কোম্পানি
প্রথম ধাপ৩ সেপ্টেম্বর১৪.৫১ কোটি টাকা২,৫৪৯৭টি
দ্বিতীয় ধাপ১৪ সেপ্টেম্বর২৩.০৩ কোটি টাকা৫,৮৬৮৫টি

চেকের পেছনে যে বিশাল সমস্যা লুকিয়ে আছে

আইডিআরএ এখন যে অর্থ বিতরণ করছে তা আসলে অনেক বড় একটা জমে থাকা বকেয়ার খুবই ছোট একটা অংশ। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে বকেয়া, অপরিশোধিত জীবন বীমা দাবির পরিমাণ প্রায় ৪৪,০৩০ কোটি টাকা, যা আনুমানিক ১২ লাখ পলিসিধারীকে প্রভাবিত করছে। জীবন বীমা দাবি নিষ্পত্তির হার, অর্থাৎ কোম্পানিগুলো প্রকৃতপক্ষে যে অংশ পরিশোধ করে, তা ২০২০ সালের ৮৫ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫ সালে প্রায় ৬৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আন্তর্জাতিক পরিণত বীমা বাজারে স্বাভাবিক বলে বিবেচিত ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশ নিষ্পত্তির হারের চেয়ে অনেক পেছনে। জীবন বীমা ছাড়া অন্যান্য বীমার অবস্থা আরও খারাপ, ২০২৫ সালের শেষদিকে মাত্র প্রায় ৯.৩৭ শতাংশ দাবি নিষ্পত্তি হয়েছে।

সমস্যার একটা অংশ আসলে ব্যক্তিগত বীমা কোম্পানিগুলোরও আগের ধাপে আটকে আছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বীমা করপোরেশন, যা শিল্পের একটা বড় অংশের নন-লাইফ ঝুঁকি পুনঃবীমা করে, সাম্প্রতিক এক প্রান্তিকে মাত্র ৩.৪১ শতাংশ দাবি নিষ্পত্তি করেছে, যার ফলে মূল বীমা কোম্পানি বৈধ দাবি পরিশোধ করতে চাইলেও অর্থ প্রবাহের শৃঙ্খলে তা কার্যত আটকে যায়। নিয়ম অনুযায়ী বীমা কোম্পানিগুলোকে ৯০ দিনের মধ্যে বৈধ দাবি নিষ্পত্তি করতে হয়, কিন্তু খাত পর্যবেক্ষকরা বলছেন এই সময়সীমা ব্যতিক্রম নয়, বরং নিয়মিতভাবেই লঙ্ঘিত হয়। এর পেছনে মূল কারণ হলো সরাসরি দেউলিয়াত্ব, বাংলাদেশের ৩৬টি জীবন বীমা কোম্পানির মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৬টিকে আর্থিকভাবে সুস্থ বলে গণ্য করা হয়, আর বৃহত্তর খাতের ৩২টি কোম্পানি কোনো না কোনো মাত্রার আর্থিক সংকটে আছে বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

প্রথমে কেন টাকা আটকে ছিল

আইডিআরএ এখন যে জট খোলার চেষ্টা করছে তার শিকড় লুকিয়ে আছে বছরের পর বছরের দুর্বল সুশাসন আর অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায়, যা আলাদা আলাদা বীমা কোম্পানির ভেতরেই তৈরি হয়েছে। প্রিমিয়াম নেওয়ার সময় যথেষ্ট রিজার্ভ বা সম্পদ ভিত্তি তৈরি না করেই কিছু কোম্পানি চলতে থাকে, ফলে পলিসি পরিপক্ব হলে বা সুবিধাভোগীরা দাবি জানালে তারা নিজেদের দায় মেটাতে অক্ষম হয়ে পড়ে, আর দুর্বল নিয়ন্ত্রক প্রয়োগের কারণে ঐতিহাসিকভাবে দেরি করার জন্য তেমন কোনো শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি। আইডিআরএর বর্তমান পদ্ধতি বীমা কোম্পানিগুলোকে প্রায় পাশ কাটিয়েই এগোচ্ছে, সংকটে থাকা কোম্পানিগুলোকে কোনোভাবে টাকা জোগাড় করতে চাপ না দিয়ে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা সরাসরি তাদের জমা রাখা সম্পদ, আমানত আর জামানত বন্ড বিক্রি করে সেই অর্থ সরাসরি পলিসিধারীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে, যে কারণে পরিশোধ আসছে ঢেউয়ের মতো, যে কোম্পানির সম্পদ আগে নগদে রূপান্তর করা সম্ভব সেই অনুযায়ী।

এই পদ্ধতির দৃশ্যমান অগ্রগতি আছে, তবে দৃশ্যমান সীমাবদ্ধতাও আছে। আইডিআরএর প্রয়োগ ক্ষমতা এখনও মূলত কোম্পানি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ, আর কর্মকর্তারা প্রস্তাবিত ইনস্যুরার রেজোলিউশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫ পাসের জন্য চাপ দিয়ে আসছেন, যা বড় আর্থিক জরিমানা আরোপ আর সুশাসনের ব্যর্থতার জন্য পরিচালকদের ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করার ক্ষমতা দেবে, এমন ক্ষমতা যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে এখনও পুরোপুরি নেই। সেই অধ্যাদেশ পাস না হওয়া পর্যন্ত, প্রতিটি নিষ্পত্তি ধাপ মূলত একটা কোম্পানির আটকে থাকা সম্পদ ছাড়ানোর প্রক্রিয়া মাত্র, পুরো খাতের দাবি নিষ্পত্তি সংস্কৃতির জন্য কোনো ব্যবস্থাগত সমাধান নয়।

বাংলাদেশের বৃহত্তর আর্থিক সংশোধনের সঙ্গে এর সম্পর্ক

আইডিআরএর এই চেক বিতরণ চলছে বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্বল সুশাসনের বিরুদ্ধে অনেক বড় একটা হিসাব-নিকাশের প্রেক্ষাপটে, যা ইতিমধ্যে ব্যাংকিং খাতকেও স্পর্শ করেছে, জুনে প্রকাশিত রেকর্ড ৩২.৭৮ শতাংশ খেলাপি ঋণের হার আর বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ঘুষ কেলেঙ্কারি যার জেরে ১৩ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হয়েছে, তার মধ্য দিয়ে। বীমা খাতও ব্যাংকিং খাতের এই সমস্যাগুলোর সঙ্গে একই ধরনের মূল কারণ ভাগাভাগি করে, কেন্দ্রীভূত মালিকানা, বছরের পর বছর তেমন কোনো বাহ্যিক তদারকির মুখোমুখি না হওয়া পরিচালনা পর্ষদ, আর নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো তার পরিণতির মুখোমুখি হতে বাধ্য না হওয়া পর্যন্ত স্বাধীনভাবে কখনো পরীক্ষা না করা সম্পদের মান। ইনস্যুরার রেজোলিউশন অর্ডিন্যান্সের জন্য চাপ দেওয়া কর্মকর্তারা এই সমান্তরালতার কথা ভালোই জানেন, তারা ব্যাংকিং খাতের ধীরগতির ঋণ শ্রেণিবিন্যাস আর জামানত যাচাইয়ের সংস্কারকে প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন যে বীমা তদারকির জন্য অন্য ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য তৈরি প্রয়োগ ক্ষমতা ধার না করে নিজস্ব একটা আইনি হাতিয়ার প্রয়োজন।

পলিসিধারী আর খাতের জন্য এরপর কী

এই সপ্তাহে টাকা পেতে যাওয়া হাজার হাজার পলিসিধারীর জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তিটা স্পষ্ট, কিছু ক্ষেত্রে বছরের পর বছর বকেয়া থাকা টাকা অবশেষে এসে পৌঁছাচ্ছে। ৪৪,০৩০ কোটি টাকার জমে থাকা বকেয়ার মধ্যে এখনও অপেক্ষায় থাকা বাকি প্রায় ১২ লাখ মানুষের জন্য, এই নিষ্পত্তি ধাপগুলোর গতি, প্রতি এক থেকে দুই সপ্তাহে কয়েক হাজার পলিসিধারী আর কয়েক দশ কোটি টাকা, কিছুটা ধারণা দেয় যে বর্তমান কোম্পানি ধরে ধরে সম্পদ ছাড়ানোর পদ্ধতিই যদি মূল হাতিয়ার থেকে যায়, তাহলে পুরোপুরি সমাধান হতে কতটা সময় লাগতে পারে। আইডিআরএ কর্মকর্তারা প্রকাশ্যেই দাবি নিষ্পত্তিকে বাংলাদেশের বৃহত্তর বীমা খাত সংস্কারের মূল পরীক্ষা হিসেবে তুলে ধরেছেন, আর এই মাসের প্রতিটি সফল চেক বিতরণ সম্ভবত যতটা না কোনো একজন পলিসিধারীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য, তার চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রক সংস্থা যে সত্যিই ফল দিতে পারে তা প্রমাণ করার জন্যই করা হচ্ছে। এই দৃশ্যমান অগ্রগতি শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক নিষ্পত্তির হার দ্রুততর করতে পারে কিনা, অথবা ইনস্যুরার রেজোলিউশন অর্ডিন্যান্স শেষ পর্যন্ত আইডিআরএকে তাদের প্রয়োজনীয় ধারালো প্রয়োগ ক্ষমতা দেয় কিনা, তার ওপরই নির্ভর করবে সেপ্টেম্বরের এই অর্থ পরিশোধগুলো একটা প্রকৃত মোড়ফেরানোর শুরু হয়ে থাকবে, নাকি অনেক বড় একটা অমীমাংসিত সংকটের ভেতরে বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্ধার অভিযান হয়েই থেকে যাবে।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন