সাবেক ভূমিমন্ত্রীর ১৮৫ মিলিয়ন পাউন্ডের সম্পত্তি সাম্রাজ্য যুক্তরাজ্যে দেউলিয়া মামলার মুখে
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীকে দেউলিয়া ঘোষণার জন্য লন্ডনের হাইকোর্টে আবেদন করেছে এসবিএসি ব্যাংক, যা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠদের বিদেশে গড়া সম্পদ ফিরিয়ে আনার লড়াইয়ে একটা নতুন অধ্যায় খুলে দিল। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি ইতিমধ্যে চৌধুরী ও তার পরিবারের সঙ্গে যুক্ত ৩৪২টি সম্পত্তি জব্দ করেছে, যার মূল্য প্রায় ১৮৫ মিলিয়ন পাউন্ড, যার একটা বড় অংশের অর্থায়ন হয়েছিল এখন দেউলিয়া হয়ে যাওয়া একটা ব্রিজিং ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এই মামলা দেখিয়ে দেয়, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশ থেকে চলে যাওয়া টাকার হদিস পাওয়া যতটা সহজ, সেটা দেশে ফিরিয়ে আনা ততটাই কঠিন, কারণ জব্দ হওয়া সম্পদ আর দেশে ফেরত আসা সম্পদের মাঝে সাধারণত বছরের পর বছর ধরে চলা সমান্তরাল আইনি প্রক্রিয়া থাকে।
লন্ডনের আদালতে নতুন এক লড়াই
শেখ হাসিনার সরকারের পতন আর ভারতে পালিয়ে যাওয়ার দুই বছরেরও বেশি সময় পর, তার ঘনিষ্ঠদের বিদেশে গড়া সম্পদ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা এবার নতুন এবং অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটা ধাপে পৌঁছেছে। ঢাকাভিত্তিক ব্যাংক এসবিএসি ব্যাংক পিএলসি লন্ডনের হাইকোর্টে একটা আবেদন করেছে, যাতে সাইফুজ্জামান চৌধুরীকে, যিনি ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ বছর ভূমিমন্ত্রী ছিলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে জমা দেওয়া এই আবেদনের লক্ষ্য এমন একজন ব্যক্তি, যিনি মন্ত্রী থাকাকালীন যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিদের মালিকানাধীন অন্যতম বৃহৎ সম্পত্তির সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন, আর যার আর্থিক অবস্থা এখন একইসঙ্গে একাধিক দিক থেকে ভেঙে পড়ছে।
এই ঘটনায় জড়িত অর্থের পরিমাণ ২০২৪ পরবর্তী বাংলাদেশের সম্পদ উদ্ধার অভিযানের মানদণ্ডেও অনেক বড়। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি সাইফুজ্জামান আর তার পরিবারের সঙ্গে যুক্ত ৩৪২টি সম্পত্তি জব্দ করেছে, যার মূল্য প্রায় ১৮৫ মিলিয়ন পাউন্ড বা প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ১৭৫টির বেশি সম্পত্তি কেনার লেনদেন করা হয়েছিল মার্কেট ফাইন্যান্সিয়াল সলিউশনস নামের একটা ব্রিজিং ফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানের ঋণের মাধ্যমে, যে প্রতিষ্ঠানটি নিজেই এখন দেউলিয়া হয়ে গেছে। এই সম্পত্তিগুলোর হোল্ডিং কোম্পানি জেডটিএস প্রপার্টিজ লিমিটেড এখন প্রশাসকের অধীনে চলে গেছে, অর্থাৎ কোম্পানিটি নিজের দায় মেটাতে না পারায় বাইরের একজন প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণে গুটিয়ে ফেলার প্রক্রিয়ায় আছে।
কীভাবে একজন ভূমিমন্ত্রী যুক্তরাজ্যে সম্পত্তির সাম্রাজ্য গড়লেন
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী দুর্নীতির বয়ানে সাইফুজ্জামানের নাম এভাবে কেন্দ্রে চলে আসাটা হঠাৎ ঘটেনি। আওয়ামী লীগ সরকারের ভূমিমন্ত্রী হিসেবে তিনি এমন একটা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন, যার হাতে সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তের ক্ষমতা থাকে, জমির নামজারি, নিবন্ধন আর মূল্য নির্ধারণ, বাংলাদেশে দুর্নীতিবিরোধী গবেষকরা বহুদিন ধরেই এসব ক্ষেত্রকে অপব্যবহারের ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করে আসছেন। ব্রিটিশ গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাকে শেখ হাসিনার এক সময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, আর বাংলাদেশের তদন্তকারী সংস্থাগুলোও আলাদাভাবে খতিয়ে দেখছে কীভাবে একজন সরকারি কর্মকর্তার পরিবার বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল আবাসন বাজারে শত শত মিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পত্তির সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ পেল।
এই ভাঙন শুরু হয়েছিল এই মাসের দেউলিয়া আবেদনের অনেক আগেই। ৩৪২টি সম্পত্তি জব্দ করার এই আদেশ প্রথম সামনে আসে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে, যা ২০২৪ সালের আগস্টে হাসিনার বিদায়ের পর ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সদস্য ও তাদের ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের বিস্তৃত পদক্ষেপেরই একটা অংশ। তবে সেই আগের জব্দ করার আদেশ সম্পত্তিগুলোকে কার্যত আটকে রেখেছিল, কোনো সমাধানে না পৌঁছেই। এসবিএসি ব্যাংকের দেউলিয়া আবেদন এই সমীকরণটা পাল্টে দিচ্ছে, কারণ যুক্তরাজ্যের আদালত থেকে দেউলিয়া ঘোষণা এলে পাওনাদার এবং সম্ভবত নিজেদের দাবি নিয়ে এগোনো বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষও একটা আনুষ্ঠানিক আইনি পথ পাবে, যার মাধ্যমে তারা টাকা ফেরত পাওয়া বা সম্পদ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারবে, শুধু জব্দ হয়ে পড়ে থাকা সম্পদের দিকে তাকিয়ে থাকার বদলে।
কেন একটা ব্যাংকই এই মামলাটা এগিয়ে নিচ্ছে
লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই মামলায় আসল আইনি চাপটা রাষ্ট্র সরাসরি নয়, বরং একটা দেশীয় বাংলাদেশি ব্যাংকের পক্ষ থেকে আসছে। এসবিএসি ব্যাংকের বিদেশি আদালতে দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন করার সিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যায়, ব্যাংকটি এমন কিছু টাকা পাওনা রয়েছে যা স্বাভাবিক পথে আদায় করতে পারেনি, আর এখন যুক্তরাজ্যের দেউলিয়া আইনকে এমন একটা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, যা শুধু বাংলাদেশি আদালতের রায় হয়তো দিতে পারত না, কারণ যুক্তরাজ্যে থাকা সম্পত্তির বিরুদ্ধে দেশীয় রায় কার্যকর করতে হলেও সাধারণত ব্রিটেনে আলাদা স্বীকৃতি প্রক্রিয়ার দরকার হতো। এসবিএসি ব্যাংক বা চৌধুরী, কেউই এই আবেদন নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি, আর তার সঙ্গে আগে যুক্ত থাকা একটা ফোন নম্বরেও সাংবাদিকদের যোগাযোগের চেষ্টার কোনো সাড়া মেলেনি।
বাংলাদেশের বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থার জন্য এই মামলাটা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে পরিচিত হয়ে ওঠা একটা প্যাটার্নই তুলে ধরে, আগের সরকারের আমলে দেশ থেকে চলে যাওয়া বড় অঙ্কের টাকার হদিস পাওয়া যতটা সহজ, সেটা আসলে দেশে ফিরিয়ে আনা ঠিক ততটাই কঠিন প্রমাণিত হচ্ছে। হাসিনা আমলের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য সাবেক কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের একই ধরনের মামলা নিয়ে কাজ করা আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্পদ জব্দ হয়ে গেলে বা দেউলিয়া আদেশ পাওয়া গেলেও, সেই সম্পদের প্রকৃত মূল্য বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে সাধারণত দুই দেশেই বছরের পর বছর ধরে চলা সমান্তরাল ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা, সরকারগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আইনি সহায়তার অনুরোধ, আর প্রায়ই নগদ বা সম্পত্তি সরাসরি হস্তান্তরের বদলে আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসার দরকার হয়।
বৃহত্তর হিসাব-নিকাশের একটা অংশ
এমন তদন্তের মুখে পড়া একমাত্র সাবেক কর্মকর্তা সাইফুজ্জামান নন। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে বাংলাদেশের তদন্তকারী সংস্থা আর যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিপক্ষ সংস্থাগুলো আগের প্রশাসনের সদস্য ও তাদের ব্যবসায়িক সহযোগীরা কীভাবে বিদেশে সম্পদ গড়ে তুলেছিলেন তা নিয়ে একের পর এক তদন্ত শুরু করেছে, আর লন্ডনের রিয়েল এস্টেট বারবারই সেই টাকার একটা প্রধান গন্তব্য হিসেবে উঠে এসেছে বলে তদন্তকারীরা বলছেন। এই কথিত মূলধন পাচারের ব্যাপ্তি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময়কালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক গল্প হয়ে উঠেছে, যা ঢাকায় দুর্বল নিয়ন্ত্রক তদারকি নিয়ে চলা বড় বিতর্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, একই ধরনের সমস্যা এখন আলাদাভাবে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ সংকটে এবং সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে জামানত জালিয়াতি ও অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভিযানেও দেখা যাচ্ছে।
লন্ডনে এরপর যা ঘটবে তার প্রভাব শুধু একজন সাবেক মন্ত্রীর আর্থিক অবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। যুক্তরাজ্যের আদালত থেকে দেউলিয়া আদেশ পাওয়া গেলে, যুক্তরাজ্যে আটকে থাকা টাকা আদায়ের চেষ্টায় থাকা অন্য বাংলাদেশি ব্যাংক ও পাওনাদারদের জন্য এটা একটা মডেল হয়ে দাঁড়াতে পারে। এটা এটাও যাচাই করবে, বাণিজ্যিক দেউলিয়া আইনের ওপর গড়ে ওঠা একটা আইনি ব্যবস্থাকে কতটা দ্রুত, বা কতটা ধীরে, মূলত একটা সীমান্ত পেরোনো দুর্নীতি ও সম্পদ উদ্ধারের মামলায় কাজে লাগানো যায়। আপাতত ১৮৫ মিলিয়ন পাউন্ডের সম্পত্তি জব্দ অবস্থায় পড়ে আছে, এর পেছনের অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান গুটিয়ে ফেলার প্রক্রিয়ায় আছে, আর এই পুরো বিষয় নিয়ে আদালতের লড়াই সবে শুরু হয়েছে।
যে ব্যাংক টাকা আদায় করতে চাইছে, তার জন্য এর মানে কী
এসবিএসি ব্যাংকের নিজের জন্যও এই মামলাটা মনে করিয়ে দেয়, ঋণ আদায় দেশের বৃহত্তর ব্যাংকিং সংকটের সঙ্গে কতটা গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। এসবিএসি ব্যাংকের মতো মাঝারি আকারের বেসরকারি ব্যাংকগুলো নিজেরাই এমন একটা খাতে কাজ করছে যেখানে খেলাপি ঋণের হার পৌঁছেছে ৩২.৭৮ শতাংশে, আর দেশে আদায় করতে না পারা প্রতিটা বড় ঋণ এমন একটা ব্যালান্স শিটের ওপর চাপ বাড়ায় যা এমনিতেই অন্য জায়গায় ক্ষতি সামলাচ্ছে। বিদেশি আদালতে দেউলিয়া মামলা চালানো না দ্রুত, না সস্তা, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী একজন সাবেক মন্ত্রীর সঙ্গে যুক্ত একটা আটকে থাকা দাবি নিয়ে বসে থাকা একটা ঋণদাতার জন্য, এটাই হয়তো অবশিষ্ট কয়েকটা পথের একটা, যার মাধ্যমে অন্যথায় পুরোপুরি বাতিল করে দিতে হতো এমন মূল্য উদ্ধার করা সম্ভব। ২০২৪ সালের আগে বিদেশে সম্পদ সরিয়ে নেওয়া অন্য সাবেক কর্মকর্তা আর রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত ঋণগ্রহীতাদের কাছে আরও কতগুলো ব্যাংক চুপচাপ টাকা পাওনা আছে তা যোগ করলে বোঝা যায়, বাংলাদেশের আদালত আর তাদের বিদেশি প্রতিপক্ষদের সামনে এখনও কতটা সম্পদ উদ্ধারের মামলা বাকি থাকতে পারে।