রেমিট্যান্সের উত্থানের আড়ালে, যুক্তরাজ্যের লাফ, যুক্তরাষ্ট্রের পতন আর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ঝুঁকি
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স রেকর্ড ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যুক্তরাজ্য থেকে আসা টাকা ৬০ শতাংশ বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্রের করিডোর কমেছে প্রায় ৩৬ শতাংশ। সাম্প্রতিক মাসিক তথ্য বলছে জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে শীর্ষ দশ উৎস দেশের ছয়টি থেকেই রেমিট্যান্স কমেছে, প্রবৃদ্ধি ক্রমেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে যুক্তরাজ্য, ইতালি, মালয়েশিয়া আর সিঙ্গাপুরে। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন সতর্ক করছে, মধ্যপ্রাচ্যের বাড়তে থাকা সংঘাত সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আসা বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের প্রবাহকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
এই বছর বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের গল্পটা এতদিন বলা হয়েছে মূলত রেকর্ড ভাঙা বড় বড় সংখ্যা দিয়ে, সর্বশেষ যার মধ্যে আছে ৬ সেপ্টেম্বর এক দিনেই ২০১ মিলিয়ন ডলার আসা, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবার ৩৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে সাহায্য করেছে। কিন্তু এই টাকাটা আসলে কোথা থেকে আসছে সেটা ভালোভাবে খতিয়ে দেখলে, আর বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন এক সতর্কবার্তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে, রেকর্ড গতির নিচে লুকিয়ে থাকা ছবিটা আসলে অনেক বেশি জটিল।
দেশভেদে বড় ওঠানামার এক বছর
২০২৬ সালের জুনে শেষ হওয়া অর্থবছরে বাংলাদেশ ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছে, আগের বছরের ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলার থেকে যা ৫.২৬ বিলিয়ন ডলার বেশি। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সংসদে এমপি নিলুফার চৌধুরী মনির এক প্রশ্নের জবাবে এই তথ্য জানান। একক উৎস হিসেবে সৌদি আরব শীর্ষে রয়েছে ৫.৮৪ বিলিয়ন ডলার নিয়ে, যা আগের ৪.২৬ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩৭ শতাংশ বেশি, কিন্তু সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো লাফ দিয়েছে যুক্তরাজ্য, যেখান থেকে আসা রেমিট্যান্স ৩.১৭ বিলিয়ন ডলার থেকে ৬০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫.৭২ বিলিয়ন ডলারে, যা সৌদি আরবকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের শীর্ষ রেমিট্যান্স উৎস হয়ে ওঠার একদম কাছাকাছি চলে এসেছে।
| উৎস দেশ | ২০২৫-২৬ অর্থবছর | ২০২৪-২৫ অর্থবছর | পরিবর্তন |
|---|---|---|---|
| সৌদি আরব | ৫.৮৪ বিলিয়ন ডলার | ৪.২৬ বিলিয়ন ডলার | +৩৭% |
| যুক্তরাজ্য | ৫.৭২ বিলিয়ন ডলার | ৩.১৭ বিলিয়ন ডলার | +৬০% |
| সংযুক্ত আরব আমিরাত | ৪.৫৮ বিলিয়ন ডলার | ৪.১৭ বিলিয়ন ডলার | +১০% |
| যুক্তরাষ্ট্র | ৩.৩৩ বিলিয়ন ডলার | ৪.৭৩ বিলিয়ন ডলার | -৩৬% |
| মালয়েশিয়া | ৩.৪০ বিলিয়ন ডলার | ২.৮০ বিলিয়ন ডলার | +২১% |
| ইতালি | ২.৫১ বিলিয়ন ডলার | ১.৬৫ বিলিয়ন ডলার | +৫২% |
| ওমান | ২.৪৮ বিলিয়ন ডলার | ১.৬৬ বিলিয়ন ডলার | +৪৯% |
| কুয়েত | ১.৭৬ বিলিয়ন ডলার | ১.৬২ বিলিয়ন ডলার | +৯% |
| কাতার | ১.৫৫ বিলিয়ন ডলার | ১.২০ বিলিয়ন ডলার | +২৯% |
| সিঙ্গাপুর | ১.৪৯ বিলিয়ন ডলার | ০.৯৯ বিলিয়ন ডলার | +৫১% |
সব দেশ থেকেই যে রেমিট্যান্স বেড়েছে তা নয়। বাংলাদেশের শীর্ষ পাঁচ উৎসের মধ্যে দীর্ঘদিন থাকা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা টাকা প্রায় ৩৬ শতাংশ কমে ৪.৭৩ বিলিয়ন ডলার থেকে নেমে এসেছে ৩.৩৩ বিলিয়ন ডলারে, যা বড় উৎসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন। শতাংশের হিসাবে কানাডার পতন আরও তীব্র, যদিও অঙ্কটা অনেক ছোট, ২২১ মিলিয়ন ডলার থেকে প্রায় ৫০ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১১০ মিলিয়ন ডলারে। মন্ত্রী চৌধুরী সংসদে বলেছেন সৌদি আরব এখনো একক বৃহত্তম উৎস, তবে প্রবৃদ্ধি স্পষ্টতই ইউরোপের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে, একাধিক এশীয়, ইউরোপীয় আর মধ্যপ্রাচ্যের দেশ থেকে অবদান বাড়ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সাম্প্রতিক ছবিটা কিছুটা নড়বড়ে
নতুন অর্থবছরের শুরুর মাসিক তথ্য, যা ঢাকা ট্রিবিউন ৮ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদনে জানিয়েছে, প্রবৃদ্ধির এই গল্পকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২০২৭ অর্থবছরের জুলাই আর আগস্ট মাস তুলনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের শীর্ষ দশ উৎস দেশের মধ্যে ছয়টি থেকেই রেমিট্যান্স কমেছে, যদিও মোট অংক সামান্য বেড়েছে। সৌদি আরব থেকে আসা টাকা ৫৮৭.২৯ মিলিয়ন ডলার থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে ৫৫৮.৫৩ মিলিয়ন ডলারে, অর্থাৎ ২৮.৭৬ মিলিয়ন ডলার কম, আর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৭৩.১৮ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে হয়েছে ২৬৬.৪১ মিলিয়ন ডলার। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান আর কাতার থেকেও মাসওয়ারি হিসাবে ছোটখাটো পতন দেখা গেছে। এর বিপরীতে যুক্তরাজ্য থেকে আসা টাকা দ্রুত বাড়তেই থেকেছে, মাত্র এক মাসেই ৩৯৬.৭৪ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫৮.০৯ মিলিয়ন ডলারে, অর্থাৎ ৬১ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি লাফ, আর মালয়েশিয়া, ইতালি ও সিঙ্গাপুর থেকেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি এসেছে। সব মিলিয়ে মাসিক মোট রেমিট্যান্স জুলাইয়ের ২.৮৫৮৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে আগস্টে দাঁড়িয়েছে ২.৯৬৬৬ বিলিয়ন ডলারে, যা এখনো এই বছরের শক্তিশালী মাসগুলোতে একরকম মানদণ্ড হয়ে ওঠা ৩ বিলিয়ন ডলারের নিচেই রয়ে গেছে।
এই ধরনটা মিলে যায় বিডি ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ এই মাসের শুরুতে যে রেকর্ড গড়া দৈনিক হিসাব জানিয়েছিল তার সঙ্গে, যখন সেপ্টেম্বরের প্রথম ছয় কার্যদিবসে বাংলাদেশে এসেছিল ৬৩৭ মিলিয়ন ডলার, গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৩.৪ শতাংশ বেশি, আর এই সময়েই এক দিনে ২০১ মিলিয়ন ডলারের রেকর্ডও তৈরি হয়েছিল। বার্ষিক, মাসিক আর দৈনিক, তিন ধরনের তথ্যই ওপরে ওপরে একই দিকে ইঙ্গিত করছে, রেমিট্যান্স বাড়ছে আর ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৬.৩৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ানো রিজার্ভকে চাঙা রাখতে সাহায্য করছে। কিন্তু দেশভিত্তিক খুঁটিনাটি দেখলে বোঝা যায়, প্রবৃদ্ধিটা ক্রমেই সংকীর্ণ কিছু করিডোরে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, মূলত যুক্তরাজ্য আর কয়েকটি ইউরোপীয় ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় গন্তব্যে, অথচ চিরাচরিত মধ্যপ্রাচ্য আর উত্তর আমেরিকার প্রধান উৎসগুলোর কয়েকটি হয় স্থবির নয়তো নিম্নমুখী।
সরকার কেন বারবার আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের পেছনে ছোটে
দেশভিত্তিক এই খুঁটিনাটি এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার একটা কারণ হলো, বাংলাদেশ বছরের পর বছর ধরে চেষ্টা করছে রেমিট্যান্সকে অনানুষ্ঠানিক হুন্ডি নেটওয়ার্ক থেকে সরিয়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থার দিকে টেনে আনতে, আর এর মূল হাতিয়ার হলো আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে টাকা পাঠালে সরকারের দেওয়া আড়াই শতাংশ নগদ প্রণোদনা। বার্ষিক আর মাসিক মোট সংখ্যা যে বেড়েই চলেছে, বিভিন্ন করিডোরে ওঠানামা সত্ত্বেও, তার একটা বড় কারণ এই ভর্তুকি, প্রবাসী শ্রমিক আর তাদের পরিবারের হাতে অনানুষ্ঠানিক দালালের বদলে ব্যাংক বা অনুমোদিত মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করার একটা সরাসরি আর্থিক কারণ থাকে। কিন্তু এই প্রণোদনা কাজ করে শুধু তখনই যখন টাকাটা আসলেই আনুষ্ঠানিক পথে বাংলাদেশে পৌঁছায়, বিদেশে থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকরা যে দেশে বেশি সংখ্যায় কাজ করেন সেখানে কোনো অর্থনৈতিক ধাক্কা লাগলে তাদের আয় কমে যাওয়াটা এই প্রণোদনা দিয়ে ঠেকানো সম্ভব নয়, আর বাংলাদেশ ব্যাংক মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ঠিক এই আশঙ্কারই কথা বলছে।
দিগন্তে নতুন ঝুঁকি
এই কেন্দ্রীভবনটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক এখন খোলাখুলিই একটা ঝুঁকির কথা বলছে। বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের বড় অংশ এখনো আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, আর সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বাড়তে থাকা উত্তেজনায় সেই অঞ্চল রীতিমতো কাঁপছে, যার প্রভাবে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম উঠে গেছে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান ঢাকা ট্রিবিউনকে সরাসরি বলেছেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রবাসী আয়ের ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা আছে। এই সতর্কবার্তা সরাসরি প্রযোজ্য সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান আর কাতার থেকে মিলিয়ে বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্সের ওপর। এই অর্থনীতিগুলোর যেকোনো একটিতে তেল রপ্তানি, জাহাজীকরণের পথ বা শ্রমবাজারে কোনো বিঘ্ন ঘটলে সেটা দ্রুতই গিয়ে পড়বে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের বাড়িতে টাকা পাঠানোর সক্ষমতার ওপর, ঠিক এমন এক সময়ে যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল উৎস হিসেবে রেমিট্যান্সের ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে।
আপাতত সংখ্যাগুলো বাংলাদেশের অনুকূলেই এগোচ্ছে, আর যুক্তরাজ্য, ইতালি, মালয়েশিয়া আর সিঙ্গাপুরের দিকে বৈচিত্র্য আসায় দেশটির হাতে এখন কয়েক বছর আগের চেয়ে বেশি উৎস আছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আর যুক্তরাষ্ট্র প্রায় একচেটিয়াভাবে প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের করিডোর ধীর হয়ে আসা, কানাডার সংকুচিত হওয়া, আর মধ্যপ্রাচ্যের এমন এক সংঘাত যার দ্রুত সমাধানের কোনো লক্ষণ নেই, এই তিনটে মিলিয়ে বলে দিচ্ছে বাংলাদেশকে কঠিন এক সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থান সামলাতে সাহায্য করা রেমিট্যান্স ইঞ্জিনটা বার্ষিক মোট সংখ্যা যতটা মনে করায় ততটা সমানভাবে শক্তিশালী নয়।
তথ্যসূত্র
এরপর পড়ুন
সেপ্টেম্বরের প্রথম ছয় দিনেই রেকর্ড গতিতে এলো ৬৩৭ মিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয়
সেপ্টেম্বরের প্রথম ছয় কর্মদিবসে বাংলাদেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৬৩৭ মিলিয়ন ডলার, গত বছরের একই সময়ের চেয়ে যা ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি, এর মধ্যে ৬ সেপ্টেম্বর একদিনেই এসেছে রেকর্ড ২০১ মিলিয়ন ডলার। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের এই সময়ে মোট প্রবাসী আয় দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৪৬২ বিলিয়ন ডলারে, বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ। আমদানি খরচ বাড়তে থাকা এই সময়ে এই জোয়ার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে আর টাকাকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে।