আর্থিক অপরাধ ও সম্পদ উদ্ধার

বাংলাদেশের সব ব্রোকারেজ ও মার্চেন্ট ব্যাংককে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ইউনিট গঠনের নির্দেশ বিএফআইইউর

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬4 মিনিটের পড়া
বাংলাদেশের সব ব্রোকারেজ ও মার্চেন্ট ব্যাংককে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ইউনিট গঠনের নির্দেশ বিএফআইইউর

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট দেশের প্রতিটি ব্রোকারেজ হাউজ, মার্চেন্ট ব্যাংক, পোর্টফোলিও ম্যানেজার, সিকিউরিটিজ কাস্টোডিয়ান আর অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকে নির্দেশ দিয়েছে একটা পূর্ণাঙ্গ মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কমপ্লায়েন্স ইউনিট গঠনের, যার নেতৃত্বে থাকবেন প্রধান কার্যালয়ে একজন চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার আর শাখা পর্যায়ে অন্য কর্মকর্তারা। ১৫ সেপ্টেম্বরের এই নির্দেশে কঠোর গ্রাহক যাচাই, গোএএমএল সিস্টেমের মাধ্যমে লেনদেন নজরদারি, পাঁচ বছরের রেকর্ড সংরক্ষণ আর বছরে দুইবার স্বাধীন স্ব মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে। এটা এমন এক সময়ে এলো যখন বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা আগের রাজনৈতিক আমলের কারসাজি মামলায় প্রায় ১৪৯৭ কোটি টাকার জরিমানার কাজ এখনও শেষ করছে, যার মধ্যে আছে সালমান এফ রহমান আর বেক্সিমকো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জরিমানা। যেসব ছোট ব্রোকারেজের আগে থেকে কমপ্লায়েন্স কাঠামো নেই তাদের জন্য এই নির্দেশ মানা বড় একটা কার্যক্রমগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট দেশের প্রতিটি ব্রোকারেজ হাউজ, মার্চেন্ট ব্যাংক, পোর্টফোলিও ম্যানেজার, সিকিউরিটিজ কাস্টোডিয়ান আর অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকে নির্দেশ দিয়েছে একটা পূর্ণাঙ্গ মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কাঠামো গড়ে তোলার জন্য। ১৫ সেপ্টেম্বর জারি করা এই নির্দেশনা এ পর্যন্ত ঢাকার পুঁজিবাজারে টাকার প্রবাহ নজরদারিতে নেওয়া সবচেয়ে বিস্তারিত পদক্ষেপগুলোর একটি। এমন এক সময়ে এই নির্দেশ এলো যখন শেয়ারবাজার এখনও আগের রাজনৈতিক আমলের কারসাজি মামলাগুলোর রেশ কাটিয়ে উঠছে, আর এটা স্পষ্ট বার্তা দেয় যে ব্যাংক খাতে যতটা গুরুত্ব দিয়ে নিয়ন্ত্রকরা এ বছর কাজ করেছে, পুঁজিবাজারেও কমপ্লায়েন্স ব্যর্থতা নিয়ে ঠিক ততটাই কঠোর হতে চাইছেন তারা।

নতুন নির্দেশনায় আসলে কী চাওয়া হয়েছে

বিএফআইইউর নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে তাদের প্রধান কার্যালয়ে একটা কেন্দ্রীয় কমপ্লায়েন্স ইউনিট গড়তে হবে, যার নেতৃত্বে থাকবেন একজন চিফ অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কমপ্লায়েন্স অফিসার, আর শাখা পর্যায়ে থাকবেন ব্রাঞ্চ অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কমপ্লায়েন্স অফিসার। শুধু সাধারণ নির্দেশনার ওপর ভরসা না করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব মানি লন্ডারিং আর সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ নীতিমালা তৈরি করে বাস্তবায়ন করতে হবে। গ্রাহকের ক্ষেত্রে, হিসাব খোলার সময় প্রকৃত মালিক যাচাই করতে হবে আর জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট বা জন্মনিবন্ধন সনদের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ পরিচয় সংগ্রহ করতে হবে, তবে প্রয়োজনে ইলেকট্রনিক নো ইওর কাস্টমার পদ্ধতি ব্যবহার করা যাবে।

নজরদারির শর্তগুলোও বেশ ব্যাপক। প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত গ্রাহকদের জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের তালিকাভুক্ত ব্যক্তি আর সরকার নিষিদ্ধ ব্যক্তিদের তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে, জটিল বা অস্বাভাবিক লেনদেনের ওপর নজর রাখতে হবে, আর সন্দেহজনক কার্যক্রম ব্রাঞ্চ কমপ্লায়েন্স অফিসারের মাধ্যমে গোএএমএল সিস্টেমে বিএফআইইউকে জানাতে হবে। হিসাব বন্ধ হওয়ার পরও অন্তত পাঁচ বছর রেকর্ড রাখতে হবে। বছরে দুইবার নির্ধারিত চেকলিস্ট দিয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা স্ব মূল্যায়ন চালাতে হবে, সেই সঙ্গে নতুন কর্মী নিয়োগের আগে ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই আর মানি লন্ডারিং ঝুঁকি নিয়ে চলমান প্রশিক্ষণও দিতে হবে।

নিয়ন্ত্রকরা কেন এখনই এই পদক্ষেপ নিচ্ছেন

এই সময়টা কাকতালীয় নয়। বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা গত এক বছরের বেশিরভাগ সময় খরচ করেছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে জড়িত কারসাজি মামলার জের টানতে, যার মধ্যে আছে শেয়ারবাজারের অনিয়ম, দুর্নীতি আর কারসাজির জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের দেওয়া প্রায় ১৪৯৭ কোটি টাকার জরিমানা।

মামলাজরিমানার পরিমাণ
বেক্সিমকো সংশ্লিষ্ট শেয়ার কারসাজি৪২৮ কোটি টাকা
সালমান এফ রহমান, সাবেক আইএফআইসি ব্যাংক চেয়ারম্যান১০০ কোটি টাকা
আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান, সাবেক আইএফআইসি ভাইস চেয়ারম্যান৫০ কোটি টাকা

এই বড় অঙ্কের জরিমানার বাইরেও বিএসইসি একই তদন্তে জড়িত আরও অনেক বাজার অংশগ্রহণকারীর বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিল, আজীবন বা নির্দিষ্ট মেয়াদের নিষেধাজ্ঞা আর ফৌজদারি মামলা করেছে।

এই মামলাগুলো ঠিক সেই ফাঁকটাই সামনে এনেছে যা বিএফআইইউর নতুন নির্দেশনা বন্ধ করতে চাইছে, ব্রোকারেজ হিসাব আর মার্চেন্ট ব্যাংকের সুবিধা ব্যবহার করে বড় অঙ্কের টাকা সরানো হয়েছে অথচ প্রতিষ্ঠানিক নজরদারি ছিল খুবই সীমিত, টাকাটা আসলে কোথা থেকে এলো বা শেষ পর্যন্ত কোথায় গেল তার হিসাব রাখা হয়নি। এই বছর ব্যাংক খাতেও একই রকম চিত্র দেখা গেছে, যেখানে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে ৪ কোটি টাকার ঘুষ কেলেঙ্কারি আর ৩২.৭৮ শতাংশে পৌঁছানো রেকর্ড খেলাপি ঋণের হার দুটোই দেখিয়ে দেয় দুর্বল অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ কীভাবে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার হচ্ছে। বিএফআইইউর এই সার্কুলারের মূল বার্তা হলো, শুধু একটা ব্রোকারেজ হিসাবে সরানো টাকার অঙ্ক ব্যাংক ঋণের চেয়ে ছোট বলেই পুঁজিবাজারকে কম ঝুঁকিপূর্ণ ভাবার সুযোগ নেই।

সামনে যে কমপ্লায়েন্স চাপ অপেক্ষা করছে

বাংলাদেশের ব্রোকারেজ শিল্পের জন্য, যার বড় অংশই ছোট আর মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠান যাদের আলাদা কমপ্লায়েন্স বিভাগ নেই, এই নির্দেশনা একটা বড় কার্যক্রমগত চাপ তৈরি করবে। একটা কেন্দ্রীয় কমপ্লায়েন্স ইউনিট দাঁড় করানো, শাখা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, গোএএমএল রিপোর্টিং সক্ষমতা তৈরি করা আর বছরে দুইবার স্বাধীন স্ব মূল্যায়ন চালানো, সবকিছুতেই টাকা আর জনবল লাগবে যা অনেক ছোট প্রতিষ্ঠানের বাজেটে আগে ছিল না। বড় মার্চেন্ট ব্যাংক আর অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলোর জন্য এটা তুলনামূলক সহজ হতে পারে, কারণ ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় তাদের অনেকেরই আগে থেকে একই ধরনের ইউনিট আছে, তবে ছোট পোর্টফোলিও ম্যানেজার আর কাস্টোডিয়ানদের এই মান পূরণ করতে সময় লাগবে, হয়তো একীভূতকরণের পথেও যেতে হতে পারে।

এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যে নির্দেশনায় কোনো নির্দিষ্ট বাস্তবায়ন সময়সীমা বা মেনে না চললে জরিমানার কথা বলা হয়নি, যা একটা প্রশ্ন রেখে যায়, বিএফআইইউ কত দ্রুত বাজারকে এই নিয়মের মধ্যে আনতে চায় আর শুরুর দিকের লঙ্ঘনগুলো কতটা কঠোরভাবে দমন করা হবে। ঢাকার পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরানোর বড় প্রচেষ্টায় কমপ্লায়েন্স যেভাবে কেন্দ্রীয় হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে সেপ্টেম্বরে ডিএসই আর ব্রোকারেজদের মধ্যে নজরদারি আর বাজার আচরণ নিয়ে হওয়া বৈঠকের পর, বিএফআইইউ যদি এটাকে শুধু কাগজে কলমে সারার মতো একটা কাজ হিসেবে না দেখে সক্রিয় নজরদারির শুরু হিসেবে ধরে, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

বিনিয়োগকারীদের জন্য এর মানে কী

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য আপাতত এর প্রভাব হবে ব্রোকারেজ হিসাব খোলা বা চালু রাখার সময় বাড়তি কাগজপত্র, অতিরিক্ত পরিচয় যাচাইয়ের শর্ত, আর হয়তো বড় বা অস্বাভাবিক লেনদেনের ওপর বাড়তি নজরদারি। দীর্ঘমেয়াদে, যদি এই নির্দেশনা ধারাবাহিকভাবে কার্যকর করা হয়, লক্ষ্য হলো এমন একটা পুঁজিবাজার তৈরি করা যেখানে বিএসইসির আগের তদন্তে ধরা পড়া ধরনের রাজনৈতিক যোগসাজশে লুকানো শেয়ার কারসাজি একাধিক মধ্যস্থতাকারীর আড়ালে লুকানো কঠিন হয়ে যাবে। এই লক্ষ্য পূরণ হবে কিনা তা নির্ভর করবে সার্কুলারের লেখা কথার চেয়ে বেশি এর ওপর যে, প্রথম কমপ্লায়েন্স সময়সীমা যখনই আসুক না কেন, তারপর বিএফআইইউ আর বিএসইসি সত্যিই পরিদর্শন আর প্রয়োগে এগিয়ে যায় কিনা।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

সাবেক ভূমিমন্ত্রীর ১৮৫ মিলিয়ন পাউন্ডের সম্পত্তি সাম্রাজ্য যুক্তরাজ্যে দেউলিয়া মামলার মুখে

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীকে দেউলিয়া ঘোষণার জন্য লন্ডনের হাইকোর্টে আবেদন করেছে এসবিএসি ব্যাংক, যা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠদের বিদেশে গড়া সম্পদ ফিরিয়ে আনার লড়াইয়ে একটা নতুন অধ্যায় খুলে দিল। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি ইতিমধ্যে চৌধুরী ও তার পরিবারের সঙ্গে যুক্ত ৩৪২টি সম্পত্তি জব্দ করেছে, যার মূল্য প্রায় ১৮৫ মিলিয়ন পাউন্ড, যার একটা বড় অংশের অর্থায়ন হয়েছিল এখন দেউলিয়া হয়ে যাওয়া একটা ব্রিজিং ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এই মামলা দেখিয়ে দেয়, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশ থেকে চলে যাওয়া টাকার হদিস পাওয়া যতটা সহজ, সেটা দেশে ফিরিয়ে আনা ততটাই কঠিন, কারণ জব্দ হওয়া সম্পদ আর দেশে ফেরত আসা সম্পদের মাঝে সাধারণত বছরের পর বছর ধরে চলা সমান্তরাল আইনি প্রক্রিয়া থাকে।