ষোলো বছর পর ডিরেক্ট লিস্টিং ফেরাচ্ছে বিএসইসি, ধুঁকতে থাকা বাজারে বড় কোম্পানি টানার চেষ্টা
বাংলাদেশের শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক ষোলো বছর ধরে বন্ধ থাকা ডিরেক্ট লিস্টিং পদ্ধতি ফেরানোর খসড়া বিধিমালা অনুমোদন করেছে, লক্ষ্য বহুজাতিক আর বড় পারিবারিক কোম্পানিগুলোকে এমন এক শেয়ারবাজারে টেনে আনা যা সবেমাত্র আড়াই মাসের সর্বনিম্নে নেমেছে। ইউনিলিভার, নেসলে বাংলাদেশ আর বিকাশসহ ষোলোটি বড় প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে বিএসইসির সঙ্গে বৈঠক করেছে, আর নিয়ন্ত্রক সংস্থা এর সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছে এআই নজরদারি আর একই দিনে নিষ্পত্তির উদ্যোগ। কর্মকর্তারা বলছেন, স্বেচ্ছায় তালিকাভুক্ত না হলে ভবিষ্যতে বাধ্যও করা হতে পারে।
বাংলাদেশের শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক ষোলো বছর আগে বন্ধ করে দেওয়া একটি তালিকাভুক্তির পথ আবার চালু করতে যাচ্ছে, আর তাদের হিসাব হলো, দ্রুত তালিকাভুক্তির এই সুযোগ শেষ পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে বড় বহুজাতিক আর পারিবারিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজারে টেনে আনতে পারবে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ১ সেপ্টেম্বর ডিরেক্ট লিস্টিং ফিরিয়ে আনার খসড়া বিধিমালা অনুমোদন করেছে, এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি প্রচলিত আইপিও ছাড়াই সরাসরি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে শেয়ার নিয়ে আসতে পারবে। আর সময়টাও নেহাত কাকতালীয় নয়। এর মাত্র সপ্তাহখানেক আগেই ডিএসইএক্স বেঞ্চমার্ক নেমে গিয়েছিল আড়াই মাসের সর্বনিম্নে, আর নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর চাপ বাড়ছে বাজার যে এখনো ভালো কোম্পানি টানতে পারে, শুধু খারাপ খবর হজম করছে না, সেটা প্রমাণের।
ডিরেক্ট লিস্টিং কীভাবে কাজ করবে
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে সিকিউরিটিজের ডিরেক্ট লিস্টিং) বিধিমালা, ২০২৬-এর খসড়া অনুযায়ী, যোগ্য কোনো কোম্পানি আইপিওর মতো নতুন শেয়ার ইস্যু করে টাকা তুলবে না। বরং বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডাররা তাদের হাতে থাকা শেয়ারের ১০ থেকে ২০ শতাংশ সরাসরি এক্সচেঞ্জে ছেড়ে দেবেন, অর্থাৎ বিক্রির টাকা যাবে বিক্রেতাদের পকেটে, কোম্পানির তহবিলে নয়। যোগ্যতার শর্তগুলো ইচ্ছাকৃতভাবেই সংকীর্ণ রাখা হয়েছে, এর আওতায় পড়বে সরকারি বা সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাধীন কোম্পানি, যেসব কোম্পানিতে সরকারের অন্তত ১০ শতাংশ পরিশোধিত মূলধন আছে, বিদেশি সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন পাওয়া অন্তত ৩০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের টেলিকম ও আইসিটি কোম্পানি, একই মাপের উৎপাদন ও আইসিটি অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান, অন্তত তিন বছরের পরিচালন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানি, এবং যেকোনো কোম্পানি যার বার্ষিক টার্নওভার বা মোট সম্পদ ৫০০ কোটি টাকা বা তার বেশি।
এই পদ্ধতি বাংলাদেশের জন্য নতুন কিছু নয়, শুধু দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় ছিল। কাগজে কলমে ডিরেক্ট লিস্টিং ২০০৬ সাল থেকেই ছিল, আর ডেসকো, পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ আর যমুনা অয়েলের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এই পথে সফলভাবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল। কিন্তু দুটি বেসরকারি তালিকাভুক্তি, ২০০৯ সালে নাভানা সিএনজি আর ২০২০ সালে বেস্ট হোল্ডিংস, বাড়িয়ে দেখানো মূল্যায়ন নিয়ে বিতর্ক তৈরি করে, যেখানে প্রথম দিকের শেয়ারহোল্ডাররা বিশাল কাগুজে মুনাফা পকেটে পুরেছিলেন আর পরে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাই লোকসান বহন করেছিলেন, ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কার্যত এই পথ বন্ধ করে দেয়। নতুন খসড়া বিধিমালায় বিএসইসি চেষ্টা করছে ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের গতি আর কম খরচের সুবিধা ফিরিয়ে আনতে, একই সঙ্গে পরিশোধিত মূলধন, টার্নওভার সীমা আর পরিচালন অভিজ্ঞতার শর্ত জুড়ে দিয়ে যেন আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
ঘুরে দাঁড়ানোর কারণ খুঁজছে বাজার
এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে এসেছে যখন ঢাকার শেয়ারবাজার বেশ চাপে আছে। বিডি ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ এই সপ্তাহে জানিয়েছে, ৯ সেপ্টেম্বর ডিএসইএক্স সূচক ১০৩ পয়েন্ট বা ১.৮৩ শতাংশ কমে ৫,৫৫৮ পয়েন্টে বন্ধ হয়েছে, যা গত প্রায় আড়াই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় একইসঙ্গে কারখানার উৎপাদন আর বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুটোই চাপে পড়েছে। ওই দিন লেনদেন কমেছে ২৪ শতাংশ, আর মোট ৩৮৯টি লেনদেন হওয়া শেয়ারের মধ্যে ৩৪৮টিরই দাম কমেছে, বিরোধী দলের লংমার্চ ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এই উদ্বেগে আরও ইন্ধন জুগিয়েছে। এমন গতিমুখী বাজারের একটা সহজ সমস্যা হলো, শুরু থেকেই বড় আর ভালো পরিচালিত কোম্পানির সংখ্যা যথেষ্ট নয়, আর বিএসইসির নেতৃত্ব নিজেই স্পষ্ট করে বলছে সমাধান আসতে হবে সরবরাহের দিক থেকে।
বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান ৪ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের বলেছেন, কমিশন চায় ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে বহুজাতিক আর বড় দেশীয় কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হোক, আর স্পষ্ট করে দিয়েছেন নিয়ন্ত্রক সংস্থা জোর করে এটা করাতে চায় না। তিনি বলেন, স্বেচ্ছায় আসুন। কিন্তু স্বেচ্ছায় না এলে, আমাদের হাতে সেটা করানোর অস্ত্রও আছে। তার যুক্তি, ভালো কোম্পানিগুলোকে দ্রুত বাজারে না আনলে বাজার প্রত্যাশামতো বিকশিত হবে না, আর তিনি একটা সংশ্লিষ্ট সুবাতাসের কথাও উল্লেখ করেন, ফ্লোর প্রাইস ব্যবস্থা তুলে নেওয়ার পর সূচক প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এমএসসিআই নভেম্বর ২০২৬ থেকে বাংলাদেশের বাজারের নিয়মিত পর্যালোচনা আবার শুরু করবে, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা বাজারের বিশ্বাসযোগ্যতার একটা সংকেত হিসেবে দেখছে।
এক ঘরে ষোলোটি পরিচিত নাম
বিধিমালা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই বিএসইসি সম্ভাব্য তালিকাভুক্তি প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে দিয়েছে। ৩ সেপ্টেম্বর কমিশন তার আগারগাঁও কার্যালয়ে ষোলোটি বড় কোম্পানি ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের ডেকে বৈঠক করেছে, যাদের মধ্যে ছিল ইউনিলিভার, নেসলে বাংলাদেশ, মেটলাইফ, বিকাশ, বাংলালিংক, কাফকো, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস, নগদ, মেঘনা গ্রুপ, প্রাণ আরএফএল, ডিবিএল গ্রুপ, আবুল খায়ের গ্রুপ, এসিআই, ওয়ালটন, আকিজ রিসোর্সেস আর কনফিডেন্স গ্রুপ। খান সেখানে বলেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে শক্তিশালী কোম্পানির সংখ্যা এখনো অপর্যাপ্ত, আর ডিরেক্ট লিস্টিং বাজারকে গভীর ও প্রশস্ত করতে সাহায্য করবে, তিনি আরও যোগ করেন তালিকাভুক্তি একটা কোম্পানির সুনাম আর গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দেয়। লক্ষণীয়ভাবে, বেশ কয়েকজন উপস্থিত প্রতিনিধি একটা হাইব্রিড কাঠামোর প্রস্তাব দিয়েছেন, যেখানে বিদ্যমান শেয়ার ছাড়ার পাশাপাশি নতুন মূলধনও তোলা যাবে, অর্থাৎ ডিরেক্ট লিস্টিং আর প্রচলিত আইপিওর মিশ্রণ, আর শোনা যাচ্ছে বিএসইসি এই ধারণায় ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে ফ্রেমওয়ার্ক চূড়ান্ত করার সময়।
বৃহত্তর সংস্কার পরিকল্পনার একটা অংশ
আগস্টের শেষ দিক থেকে খান যে বড় সংস্কার কর্মসূচি চালু করেছেন, ডিরেক্ট লিস্টিং তার একটা অংশ মাত্র। বিএসইসি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে এক বছর সময় দিয়েছে একটা এআই ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে, যেখানে খানের ভাষায় স্বয়ংক্রিয় ট্রিগার ব্যবহার করে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত ও থামানো হবে, মানুষের হস্তক্ষেপ আর সম্ভাব্য পক্ষপাত কমিয়ে। বছরের পর বছর ধরে অভিযোগ উঠেছে এক্সচেঞ্জে কারসাজি চললেও তার শাস্তি হয় না, এই ব্যবস্থা সেই অভিযোগেরই জবাব। কমিশন বাজারকে টি প্লাস ওয়ান নিষ্পত্তির দিকেও ঠেলে দিচ্ছে, শেষ লক্ষ্য একই দিনে বা টি প্লাস জিরো নিষ্পত্তি, যার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে তাদের রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্টের সময় বাড়াতে হবে। আলাদাভাবে বিএসইসি পাবলিক ইন্টারেস্ট এনটিটি নামে নতুন একটা শ্রেণি সংজ্ঞায়িত করার পরিকল্পনা করছে, যেখানে যেসব কোম্পানি ইকুইটি বা ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে ৩০০ কোটি টাকা বা তার বেশি জনসাধারণের অর্থ ব্যবহার করে, তাদের এক পর্যায়ে চাইলেও পুঁজিবাজারে আসতে হবে। ডিরেক্ট লিস্টিং ফেরানোর সঙ্গে এসব মিলিয়ে দেখলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার বার্তাটা স্পষ্ট, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে বর্তমানে তালিকাভুক্ত কয়েকশ কোম্পানি, যার মধ্যে ৯ সেপ্টেম্বর মাত্র ৩৮৯টিতে কোনো লেনদেনই হয়েছে, তা যথেষ্ট ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে না, আর নতুন মূলধন সংগ্রহের পথ ও নতুন প্রকাশনার শর্ত দুটোই সরাসরি লক্ষ্য করছে দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি আর বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে।
যেখানে ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে
এই পথ একবার বন্ধ করে দেওয়ার পেছনের ঝুঁকিগুলো এখনো পুরোপুরি টেবিলে রয়ে গেছে। আইপিওতে ব্যবহৃত বুকবিল্ডিং প্রক্রিয়ার বদলে ডিরেক্ট লিস্টিং বাজারনির্ভর মূল্য নির্ধারণের ওপর চলে বলে লেনদেনের প্রথম দিকে শেয়ারের দাম হঠাৎ ওঠানামা করতে পারে, আর সর্বনিম্ন মাত্র ১০ শতাংশ ফ্রি ফ্লোট থাকা কোম্পানির পক্ষে শুরুর উত্তেজনা কমে গেলে লেনদেন সচল রাখা কঠিন হতে পারে। বিশ্লেষকরা এটাও বলছেন, ডিরেক্ট লিস্টিংয়ে কোম্পানি নিজে কোনো নতুন মূলধন পায় না, তাই এটা ব্যবসা সম্প্রসারণের চেয়ে বরং সুশাসন উন্নত করা আর বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবেই বেশি কার্যকর। আন্তর্জাতিকভাবে এই মডেলের অভিজ্ঞতা মিশ্র হলেও ক্রমবর্ধমান, ২০১৮ সালে স্পটিফাইয়ের অভিষেক যুক্তরাষ্ট্রে ডিরেক্ট লিস্টিং জনপ্রিয় করে তোলে, এরপর স্ল্যাক, কয়েনবেস আর রোবলক্স একই পথ ধরে, পাকিস্তানে দেশীয়ভাবে এই কাঠামো আগে থেকেই অনুমোদিত, আর ভারতের ২০২৪ সালের প্রকল্প মূলত দেশীয় কোম্পানিগুলোকে দেশে নয়, বরং আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়ার লক্ষ্যে করা হয়েছিল।
বিএসইসি বলছে চূড়ান্ত হওয়ার আগে খসড়া বিধিমালা জাতীয় সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তিসহ গণশুনানির মধ্য দিয়ে যাবে, যাতে সম্ভাব্য ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান আর বাজার পর্যবেক্ষক উভয়েই ফ্রি ফ্লোট সীমা আর প্রকাশনার শর্তাবলি নিয়ে মতামত দিতে পারেন, যা শেষ পর্যন্ত ঠিক করে দেবে ডিরেক্ট লিস্টিংয়ে এবারের দ্বিতীয় প্রচেষ্টা আগেরবারের ভুলগুলো এড়াতে পারবে কিনা।
তথ্যসূত্র
এরপর পড়ুন
জ্বালানি সংকটের প্রভাবে আড়াই মাসের সর্বনিম্নে ঢাকার শেয়ারবাজার
প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১০৩ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমে ৫,৫৫৮ পয়েন্টে নেমে এসেছে, যা প্রায় আড়াই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হয়ে কারখানার উৎপাদন আর মুনাফায় চাপ পড়েছে। বিনিয়োগকারীরা সতর্ক হয়ে ওঠায় লেনদেন কমেছে ২৪ শতাংশ, লেনদেন হওয়া ৩৮৯টির মধ্যে ৩৪৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম কমেছে। বিরোধী জোটের লংমার্চ ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও এই চাপ আরও বাড়িয়েছে।