স্বর্ণ ও রৌপ্য

সোনার দামে রোলারকোস্টার: এক মাসে ভরিতে ২৫ হাজার টাকার উত্থান-পতন কেন?

৩০ আগস্ট, ২০২৬3 মিনিটের পড়া

চার সপ্তাহেরও কম সময়ে বাংলাদেশে ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরিতে ২ লাখ ২৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ২ লাখ ৪৮ হাজার টাকা ছুঁয়ে আবার নেমে এসেছে ২ লাখ ৪১ হাজার টাকায়। বিয়ের গয়না কিনতে চান, নাকি সঞ্চয় হিসেবে সোনা রাখছেন, অথবা শুধু বুঝতে চান দোকানের রেট কেন বারবার বদলায় তাহলে জেনে নিন আসলে কী এই দাম ওঠানামার পেছনে, আর আপনার পরের কেনাকাটার জন্য এর মানে কী।

এই সপ্তাহে ঢাকার তাঁতীবাজার বা চট্টগ্রামের জুবিলী রোডের যেকোনো গয়নার দোকানে গেলে তিন দিন আগে যা শুনেছিলেন তার চেয়ে ভিন্ন ২২ ক্যারেট রেট শুনতে পাবেন। এটা কোনো বিক্রির কৌশল না। বাংলাদেশে সোনা এখন দেশের সবচেয়ে ঘনঘন দাম বদলানো ভোগ্যপণ্যগুলোর একটা, বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) প্রায় প্রতিদিনই বিশ্ববাজারের দাম ও টাকার বিনিময় হারের সাথে মিলিয়ে সরকারি রেট হালনাগাদ করছে।

সংখ্যাগুলোই আসল গল্প বলে দেয়। ৪ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে ২২ ক্যারেট সোনার দাম ছিল ভরিপ্রতি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২,২৩,০৭৪ টাকা। ২৫ আগস্টের মধ্যে তা লাফিয়ে হয় ২,৪৬,১১০ টাকা, আর ২৭ আগস্ট আরও বেড়ে নতুন সর্বোচ্চ ২,৪৭,৭৪৩ টাকায় পৌঁছায় একদিনেই বেড়েছিল ১,৬৩৩ টাকা। এর মাত্র দুই-তিন দিন পর, ২৯-৩০ আগস্টের মধ্যে দাম আবার নেমে আসে ২,৪০,৬২৮ টাকায় কয়েক দিনের মধ্যেই ৭ হাজার টাকার বেশি কমে যাওয়া।

আগস্ট ২০২৬-এ বাংলাদেশে ২২ ক্যারেট সোনার দামের ওঠানামা (টাকা/ভরি)। সূত্র: বাজুস, আল-আমিন জুয়েলার্স ও প্রবাসী দিগন্তের মাধ্যমে।

আসলে দাম বাড়া-কমার পেছনে কী কাজ করছে

মূলত তিনটা কারণ এখানে কাজ করছে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম, যা বাজুস তাদের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে, যুক্তরাষ্ট্রের সুদহার নিয়ে ধারণা আর বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদার সাথে ওঠানামা করছে বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে বাংলাদেশেও এক-দুই দিনের মধ্যে তার প্রভাব পড়ে। দ্বিতীয়ত, টাকা-ডলার বিনিময় হার সরাসরি প্রভাব ফেলে, কারণ সোনা আমদানি করা হয় আর আন্তর্জাতিকভাবে ডলারে দাম নির্ধারিত হয় ডলারের দাম স্থির থাকলেও টাকার মান একটু কমলে স্থানীয় দাম বেড়ে যায়। তৃতীয়ত, বিয়ের মৌসুম ও উৎসবকেন্দ্রিক দেশীয় চাহিদা স্বল্পমেয়াদে জুয়েলার্সদের মুনাফা ও প্রিমিয়ামের ওপর চাপ তৈরি করে।

মনে রাখা দরকার, বাজুসের ঘোষিত রেট শুধু ধাতুর দাম। দোকানে গিয়ে আপনি যা বিল দেন তাতে যোগ হয় ডিজাইন অনুযায়ী মজুরি (মেকিং চার্জ), আর তার সাথে চূড়ান্ত বিলের ওপর ৫ শতাংশ সরকারি ভ্যাট। একই ভরির রেট বলা দুটো দোকান শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ আলাদা বিল ধরিয়ে দিতে পারে, ডিজাইনের জটিলতা ও মেকিং চার্জ নীতির ওপর নির্ভর করে তাই কেনার আগে মেকিং চার্জ আলাদা লাইনে স্পষ্ট করে জিজ্ঞেস করে নেওয়াই ভালো।

আজকের রেফারেন্স রেট (৩০ আগস্ট, ২০২৬)

মান

সোনা (টাকা/ভরি)

রূপা (টাকা/ভরি)

২২ ক্যারেট

২,৪০,৬২৮

৫,৩০৭

২১ ক্যারেট

২,২৯,৭৮১

৫,০৭৪

১৮ ক্যারেট

১,৯৭,৩৫৫

৪,৩৭৪

সনাতন

১,৬১,১৯৬

৩,৩২৪

এক ভরি সমান ১১.৬৬৪ গ্রাম। সোনার তুলনায় দাম অনেক কম হলেও রূপাও এ বছর প্রায় একই ধরনের ধরন অনুসরণ করেছে, আর তরুণ ক্রেতা ও ছোট উপহারের জন্য এটা এখনো জনপ্রিয় কম খরচের বিকল্প।

সোনা শুধু গয়না নয়, একটা বিনিয়োগও

অনেক বাংলাদেশি পরিবারের কাছে সোনা শুধু সাজসজ্জার জিনিস না এটা একই সাথে সঞ্চয়ের মাধ্যম আর একটা অলিখিত জরুরি তহবিল, যা দরকারে দ্রুত বন্ধক রাখা বা বিক্রি করা যায়। এই হিসেবে দেখলে, গত এক বছরে সোনা ব্যাংকের সঞ্চয় হিসাবের চেয়ে ভালো করেছে আর মূল্যস্ফীতির চেয়ে এগিয়ে থেকেছে, যদিও পুনর্বিক্রয়ে মেকিং চার্জের খরচ কিছুটা লাভ কমিয়ে দেয়। সমস্যা হলো লিকুইড ফ্রিকুয়েন্সি : জুয়েলার্সরা সাধারণত পুরনো সোনা প্রচলিত রেটের চেয়ে কম দামে কেনে, আর এই ছাড় এবং কেনার সময় দেওয়া মেকিং চার্জই আসলে সোনাকে বিশুদ্ধ বুলিয়ন বিনিয়োগের বদলে সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের প্রকৃত খরচ।

  • গয়নার জন্য না কিনে বিনিয়োগের জন্য কিনতে চাইলে সাধারণ সোনার বার বা কয়েনের কথা জিজ্ঞেস করুন, জটিল গয়নার চেয়ে এগুলোতে মেকিং চার্জ সাধারণত কম থাকে।

  • বড় কোনো কেনাকাটার আগে বাজুসের দৈনিক রেট (প্রতিদিন সকালে প্রকাশিত হয়) দেখে নিন এই রকম ওঠানামার সময় এক-দুই দিন অপেক্ষা করলেও ভারী গয়নায় ভালো অঙ্কের টাকা বাঁচতে পারে।

  • আসল ক্রয় রশিদ ও হলমার্ক সনদ যত্নে রাখুন পুনর্বিক্রয়ের দাম আর ছাড়ের পরিমাণ অনেকটাই নির্ভর করে বিশুদ্ধতা ও উৎস প্রমাণ করতে পারার ওপর।

  • বিয়ের মৌসুমে কেনাকাটার সময় ধাতুর রেট নিয়ে দরকষাকষি না করে মেকিং চার্জ নিয়ে করুন ধাতুর রেট বাজুস নির্ধারণ করে, কিন্তু মেকিং চার্জেই জুয়েলার্সদের প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকে।

সামনে কী হতে পারে

যুক্তরাষ্ট্রের সুদহার নিয়ে প্রতিটা ইঙ্গিতে বিশ্ববাজারে সোনার দাম এখনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, আর টাকা নিজের মতো করে চাপে আছে তাই বছরের বাকি সময়েও বাংলাদেশে সোনার দামে দিন-প্রতিদিন ওঠানামা চলতেই থাকবে বলে মনে হচ্ছে। যাদের সময় নিয়ে নমনীয়তা আছে, তারা দোকানে গিয়ে প্রথম দিনেই না কিনে কয়েকদিন রেট দেখে নিতে পারেন, আর যাদের কাছাকাছি কোনো অনুষ্ঠানের জন্য কিনতে হবে, তাদের বাজেটে রাখা উচিত যে কেনার তারিখ পর্যন্ত ভরিপ্রতি কয়েক হাজার টাকা যেকোনো দিকে বদলে যেতে পারে।



মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন