রেমিট্যান্স

১৩ দিনেই ১৪২ কোটি ডলার রেমিট্যান্স, সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে নতুন একদিনের রেকর্ড

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬4 মিনিটের পড়া

সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৩ দিনেই বাংলাদেশে এসেছে ১৪২ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স, গত বছরের তুলনায় ৯.৩ শতাংশ বেশি, যার মধ্যে রয়েছে ১৩ সেপ্টেম্বরের ১৯.৩ কোটি ডলারের নতুন একদিনের রেকর্ড। চলতি অর্থবছর ইতিমধ্যে গত বছরের চেয়ে ১৬.৯ শতাংশ এগিয়ে থাকার মধ্যেই যুক্তরাজ্য দ্রুত সৌদি আরবের কাছাকাছি চলে আসছে রেমিট্যান্সের উৎস হিসেবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এই প্রবাহকে রিজার্ভ আর বিনিময় হারের জন্য স্বস্তি হিসেবে স্বাগত জানালেও সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাড়লে উপসাগরীয় দেশ থেকে আসা বার্ষিক প্রায় ১০০০ কোটি ডলারের প্রবাহ ব্যাহত হতে পারে।

বাংলাদেশে রেমিট্যান্স আসছে গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে জোরালো গতিতে। সেপ্টেম্বরের প্রথম তেরো দিনেই প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১৪২ কোটি ডলার, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৯.৩ শতাংশ বেশি। এই হিসাবের ভেতরেই লুকিয়ে আছে একটি নতুন একদিনের রেকর্ড, শুধু ১৩ সেপ্টেম্বরেই এসেছে ১৯৩ কোটি ডলার, ব্যাংকিং চ্যানেলে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ একদিনের আয়। দুই বছর ধরে বৈদেশিক লেনদেনের হিসাব নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকা একটি মুদ্রার জন্য এই সংখ্যাগুলো নিঃসন্দেহে সুখবর, যদিও অর্থনীতিবিদরা সঙ্গে সঙ্গেই মনে করিয়ে দিচ্ছেন, যে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এই উল্লম্ফনকে ইন্ধন জোগাচ্ছে, সেটাই আবার যেকোনো মুহূর্তে এই প্রবাহ বন্ধ করে দিতে পারে।

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি এই সংখ্যাগুলো আসলে চলতি অর্থবছরের ইতিমধ্যে থাকা শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ১ জুলাই থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে এসেছে ৭২৫ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স, আগের অর্থবছরের একই সময়ে আসা ৬২০ কোটি ডলারের তুলনায় ১৬.৯ শতাংশ বেশি। আরেকটু কাছ থেকে দেখলে এই গতি আরও স্পষ্ট হয়, সেপ্টেম্বরের প্রথম ছয় দিনেই এসেছে ৬৩৭ কোটি ডলার, ২০২৫ সালের একই ছয় দিনে আসা ৫১.৬ কোটি ডলারের তুলনায় ২৩.৪ শতাংশ বেশি, আর শুধু ৬ সেপ্টেম্বরেই এসেছিল তখনকার হিসাবে উল্লেখযোগ্য ২০.১ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে এই তথ্য বলছে, এবারের সেপ্টেম্বর মাস রেমিট্যান্সের ইতিহাসে সবচেয়ে ভালো মাসগুলোর একটির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে, এমনকি ছাড়িয়েও যেতে পারে।

টাকা কেন আসছেই যাচ্ছে

এর একটা বড় কারণ কাঠামোগত। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব গবেষণা বলছে, গত অর্থবছরের প্রাপ্ত এগারো মাসের হিসাবে মোট রেমিট্যান্সের ৬২ শতাংশ এসেছে মাত্র পাঁচটি দেশ থেকে, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া আর যুক্তরাষ্ট্র, যার পরিমাণ মোট ৩২৭৭ কোটি ডলারের মধ্যে ২০২৫ কোটি ডলার। ওই এগারো মাসের দশ মাসেই সৌদি আরব ছিল একক বৃহত্তম উৎস, মোট ৫২৮ কোটি ডলার নিয়ে, তবে এই শীর্ষস্থানের নিচে চিত্রটা বদলাচ্ছে ধীরে ধীরে। ওই সময়ের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত যুক্তরাজ্য থেকে মাসিক প্রবাহ বেড়েছে ১৩০ শতাংশ, ২৮ কোটি ২৫ লাখ ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫ কোটি ডলারে, আর মে মাসে তো সাময়িকভাবে যুক্তরাজ্যই ছাড়িয়ে যায় সৌদি আরবকে, সেই মাসের সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে। গত ১১ সেপ্টেম্বর এই প্রকাশনা জানিয়েছিল, সদ্য শেষ হওয়া পুরো অর্থবছর জুড়েই এই ধারা বজায় ছিল, বার্ষিক রেমিট্যান্স রেকর্ড ৩৫৫৯ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যুক্তরাজ্য থেকে প্রবাহ বেড়েছে ৬০ শতাংশ, অথচ যুক্তরাষ্ট্রের করিডোর কমেছে প্রায় ৩৬ শতাংশ, আর শীর্ষ দশ উৎস দেশের ছয়টিরই প্রবাহ জুলাই-আগস্টের মধ্যে আসলে কমেছে, যদিও যুক্তরাজ্য, ইতালি, মালয়েশিয়া আর সিঙ্গাপুর সেই ঘাটতি পুষিয়ে দিয়েছে।

এই পরিবর্তনটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটা বদলে দিচ্ছে বাংলাদেশ আসলে কার ওপর ভরসা করছে। বিশ্লেষকরা বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন, হাতেগোনা কয়েকটি দেশের ওপর, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের স্বল্প-দক্ষ শ্রমবাজার নির্ভর দেশগুলোর ওপর, বেশি নির্ভরতা রেমিট্যান্সের এই পাইপলাইনকে হেডলাইন সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি ভঙ্গুর করে তুলতে পারে। যুক্তরাজ্যের দিকে এই ঝোঁক, আর কিছুটা কম মাত্রায় ইতালি, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের দিকে, আসলে বোঝাচ্ছে শ্রমবাজার ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরে বৈচিত্র্যময় হচ্ছে, যদিও ডলারের অঙ্কে সৌদি আরব আর আমিরাতের প্রবাহ এখনও বড়ই থেকে যাচ্ছে। আগের প্রতিবেদনগুলোতে উদ্ধৃত বিশেষজ্ঞরা নীতিনির্ধারকদের অনুরোধ করেছেন এই ধরনের উদীয়মান বাজারগুলোতে দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর গতি বাড়ানোর জন্য, কারণ সেখান থেকে রেমিট্যান্সের প্রবাহ তুলনামূলক স্থিতিশীল, আর মধ্যপ্রাচ্যে এখন যে ধরনের ভূরাজনৈতিক ধাক্কা লাগছে, তার ঝুঁকিও সেখানে কম।

রেকর্ডের সঙ্গে জুড়ে থাকা সতর্কবার্তা

এই ভূরাজনৈতিক ধাক্কাটাই সেপ্টেম্বরের এই সংখ্যাগুলোকে দ্বিমুখী তলোয়ারের মতো করে তুলেছে। এখনও প্রতি বছর প্রায় ১০০০ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স আসছে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে, আর বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্টভাবেই সতর্ক করেছে যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বাড়লে এই প্রবাহ ব্যাহত হতে পারে, তা অভিবাসন বিঘ্নিত হওয়ার মাধ্যমেই হোক, গন্তব্য দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল হওয়ার মাধ্যমেই হোক, বা বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর চাহিদা সার্বিকভাবে কমে যাওয়ার মাধ্যমেই হোক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই আগে স্বীকার করেছে, এই ধাক্কার আকার পুরোপুরি নির্ভর করবে সংঘাত কতদিন চলে আর কতটা ভৌগোলিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে তার ওপর, একইসঙ্গে এটাও বলেছে যে উপসাগরীয় শ্রমবাজারে বাংলাদেশি শ্রমিকরা এখনও তুলনামূলক সাশ্রয়ী, যা উত্তেজনা কমার পর নতুন করে চাহিদা তৈরি হতে সাহায্য করবে।

আপাতত এই রেকর্ড প্রবাহ দেশের ঠিক যে ধরনের সহায়তা দরকার ছিল, সেটাই দিচ্ছে। ধারাবাহিক রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি সেপ্টেম্বরের শুরুতে মোট রিজার্ভ ৩৬৩৮ কোটি ডলারে নেমে আসার পরও তা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করছে, আর এই মাসের পুঁজিবাজারের অস্থিরতা আর জ্বালানি সংকট থেকে তৈরি হওয়া খরচের চাপ কিছুটা হলেও পুষিয়ে দিচ্ছে। ব্যাংকাররা বলছেন, এই টাকা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আসছে আনুষ্ঠানিক চ্যানেল দিয়ে, হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার বদলে, আর নিয়ন্ত্রকরা এর কারণ হিসেবে দেখছেন আরও বাজারভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হারকে, যা সরকারি আর বেসরকারি হার, দুইয়ের মধ্যকার ফারাক কমিয়ে এনেছে। এই আনুষ্ঠানিকীকরণের ধারা আর বর্তমান প্রবৃদ্ধির গতি মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলেও টিকে থাকবে কি না, আপাতত এটাই এই ইতিবাচক পরিসংখ্যানের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত প্রশ্ন।

এরপর নজর রাখতে হবে যেখানে

প্রকৃত পরীক্ষা হবে যখন সেপ্টেম্বরের পুরো মাসের হিসাব আগস্ট আর গত বছরের সেপ্টেম্বরের সঙ্গে মেলানো হবে, কারণ মাসের মাঝামাঝি সময়ের গতি মাসের শেষ ভাগে গিয়ে থেমে যেতেই পারে। বিশ্লেষকরা এটাও লক্ষ রাখবেন, যুক্তরাজ্যের দ্রুত উত্থান সৌদি আরব আর আমিরাতের মিলিত অংশে আর কতটা ভাগ বসায়, আর মধ্যপ্রাচ্য সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কবার্তা আগামী সপ্তাহগুলোতে ঢাকা, চট্টগ্রাম আর অন্যান্য বড় বড় গ্রহণ কেন্দ্রের দৈনিক তথ্যে আদৌ প্রতিফলিত হয় কি না।

সময়কালপরিমাণবার্ষিক পরিবর্তন
সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রথম ১৩ দিন১৪২ কোটি ডলার+৯.৩%
সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রথম ৬ দিন৬৩.৭ কোটি ডলার+২৩.৪%
একদিনের রেকর্ড, ১৩ সেপ্টেম্বর১৯.৩ কোটি ডলার-
চলতি অর্থবছরে এ পর্যন্ত (১ জুলাই-১৩ সেপ্টেম্বর)৭২৫ কোটি ডলার+১৬.৯%
শীর্ষ ৫ উৎস দেশ (আগের অর্থবছর, ১১ মাস)৩২৭৭ কোটি ডলারের মধ্যে ২০২৫ কোটি ডলারমোটের ৬২%

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

রেমিট্যান্সের উত্থানের আড়ালে, যুক্তরাজ্যের লাফ, যুক্তরাষ্ট্রের পতন আর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ঝুঁকি

২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স রেকর্ড ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যুক্তরাজ্য থেকে আসা টাকা ৬০ শতাংশ বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্রের করিডোর কমেছে প্রায় ৩৬ শতাংশ। সাম্প্রতিক মাসিক তথ্য বলছে জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে শীর্ষ দশ উৎস দেশের ছয়টি থেকেই রেমিট্যান্স কমেছে, প্রবৃদ্ধি ক্রমেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে যুক্তরাজ্য, ইতালি, মালয়েশিয়া আর সিঙ্গাপুরে। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন সতর্ক করছে, মধ্যপ্রাচ্যের বাড়তে থাকা সংঘাত সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আসা বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের প্রবাহকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

সেপ্টেম্বরের প্রথম ছয় দিনেই রেকর্ড গতিতে এলো ৬৩৭ মিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয়

সেপ্টেম্বরের প্রথম ছয় কর্মদিবসে বাংলাদেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৬৩৭ মিলিয়ন ডলার, গত বছরের একই সময়ের চেয়ে যা ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি, এর মধ্যে ৬ সেপ্টেম্বর একদিনেই এসেছে রেকর্ড ২০১ মিলিয়ন ডলার। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের এই সময়ে মোট প্রবাসী আয় দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৪৬২ বিলিয়ন ডলারে, বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ। আমদানি খরচ বাড়তে থাকা এই সময়ে এই জোয়ার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে আর টাকাকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে।