সংবাদ

রেকর্ড রেমিট্যান্স, বাড়ছে রিজার্ভ, পড়ছে শেয়ারবাজার: বাংলাদেশের অর্থনীতির হালচাল

৩০ আগস্ট, ২০২৬4 মিনিটের পড়া

এই আগস্টে বাংলাদেশ একটা অদ্ভুত দ্বিমুখী অর্থনীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে রেমিট্যান্স গত বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে আর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ক্রমাগত বাড়ছে, অথচ গ্যাস সংকটের আশঙ্কা আর মার্জিন নিয়ম নিয়ে গুজবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ নিম্নমুখী। এই মাসের তিনটা বড় অর্থনৈতিক খবর কীভাবে একসাথে জড়িয়ে আছে, আর দ্রব্যমূল্য, চাকরি ও আপনার বিনিয়োগের জন্য এর মানে কী, তা জেনে নিন।

শুরু করা যাক ভালো খবর দিয়ে। শুধু আগস্ট ২০২৬-এর প্রথম ২২ দিনেই প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে পাঠিয়েছেন ২.১৪৮ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের ১.৭১১ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে ২৫.৫২ শতাংশ বেশি, অর্থাৎ ৪৩৭ মিলিয়ন ডলার বেশি এসেছে। পুরো চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়টা দেখলেও একই চিত্র ২২ আগস্ট পর্যন্ত দুই মাসে এসেছে ৫.০০৬ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের ৪.১৮৮ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে ১৯.৫ শতাংশ বেশি।

যারা সরাসরি এই টাকা পান তাদের বাইরেও এর গুরুত্ব অনেক বেশি। রেমিট্যান্স হলো তৈরি পোশাক রপ্তানির পাশাপাশি বাংলাদেশের বৈদেশিক হিসাব ধরে রাখা দুটো প্রধান স্তম্ভের একটা, আর এ বছরের এই উল্লম্ফন নিচে বর্ণিত রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সরাসরি অবদান রাখছে। অর্থনীতিবিদরা সাধারণত এর পেছনে কয়েকটা কারণ দেখেন আরও স্থিতিশীল, বাজারমুখী বিনিময় হার যা অনানুষ্ঠানিক হুন্ডি বাজারের সাথে ফারাক কমিয়েছে, উপসাগরীয় ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের চাহিদা অব্যাহত থাকা, আর ডিজিটাল রেমিট্যান্স চ্যানেল উন্নত হওয়ায় আনুষ্ঠানিক মাধ্যমে টাকা পাঠানো আগের চেয়ে দ্রুত ও সস্তা হয়ে ওঠা।

রিজার্ভ ধীরে হলেও স্থিরভাবে বাড়ছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসজুড়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, ২ আগস্ট ৩৬.৪৭ বিলিয়ন ডলার (মোট) থেকে ১২ আগস্ট ৩৭.০৭ বিলিয়ন ডলার হয়ে ২০ আগস্টের মধ্যে দাঁড়িয়েছে ৩৭.৩৫ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করলে, যেখানে লেনদেনের ভারসাম্যের জন্য সহজে ব্যবহারযোগ্য নয় এমন কিছু সম্পদ বাদ দেওয়া হয়, একই তারিখগুলোতে রিজার্ভ ছিল যথাক্রমে ৩১.৬৫, ৩২.২৬ ও ৩২.৫৩ বিলিয়ন ডলার।


বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মোট বনাম আইএমএফ বিপিএম৬ পদ্ধতি, আগস্ট ২০২৬। সূত্র: বিএসএসের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব কৌশল বদলও এতে সাহায্য করেছে, ২০২২-২৪ সালের সবচেয়ে খারাপ সময়ে যেভাবে বিনিময় হার ধরে রাখতে ডলার বিক্রি করা হচ্ছিল, তার বদলে চলতি অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বচ্ছ নিলামের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নিট ডলার কিনছে, এ পর্যন্ত প্রায় ৪.৩ বিলিয়ন ডলার কেনা হয়েছে। কমে আসা আমদানি চাহিদা আর রেমিট্যান্সের উল্লম্ফনের সাথে মিলিয়ে এটা রিজার্ভকে মহামারী-পরবর্তী সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি নিয়ে গেছে, ফলে ২০২৩ সালের মতো জরুরি ডলার বিক্রি ছাড়াই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকা সামলানোর জায়গা অনেক বেড়েছে।

শেয়ারবাজার বলছে ভিন্ন কথা

এই সুখবরের ভাগ পায়নি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। ২২ আগস্ট শেষ হওয়া সপ্তাহে বেঞ্চমার্ক ডিএসইএক্স সূচক দাঁড়িয়েছে ৫,৭৮৬ পয়েন্টে, সাপ্তাহিক হিসেবে ৯৭ পয়েন্ট বা ১.৬৫ শতাংশ কমে, আর ব্লু-চিপ ডিএস৩০ সূচক ৩০ পয়েন্ট হারিয়ে থেমেছে ২,১৬২ পয়েন্টে। সাপ্তাহিক হিসেবে দৈনিক গড় লেনদেন ৯.২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৯০৫ কোটি টাকায়, আর এই দরপতনে বাজার মূলধন হারিয়েছে প্রায় ৩,৮০০ কোটি টাকা, ৩১৪টি শেয়ারের দর কমেছে আর মাত্র ৫২টির বেড়েছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে দুটো উদ্বেগ এই ক্ষতির পেছনে কাজ করছে। প্রথমত, নতুন করে গ্যাস সরবরাহ সংকট, যা নিয়ে বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন আগামী মাসগুলোতে জ্বালানি-নির্ভর তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মুনাফায় চাপ পড়বে। দ্বিতীয়ত, মার্জিন ঋণের নিয়ম কঠোর হওয়া নিয়ে গুজবের ঢেউ, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্পষ্টীকরণের পরও ঋণনির্ভর খুচরা বিনিয়োগকারীদের ভড়কে দিয়েছে। এই দরপতনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাট আর কাগজ ও মুদ্রণ খাত, যথাক্রমে ৪.৬ ও ৪.৫ শতাংশ কমে, আর সেবা ও আবাসন খাত ছিল বিরল লাভবানদের মধ্যে, সামান্য ০.২ শতাংশ বেড়ে।

এই তিনটা খবর একসাথে কীভাবে জড়িয়ে আছে

রেমিট্যান্সের শক্তি, বাড়তে থাকা রিজার্ভ আর পড়তে থাকা শেয়ারবাজারকে পরস্পরবিরোধী সংকেত মনে হতে পারে, কিন্তু আসলে এগুলো অর্থনীতির ভিন্ন ভিন্ন অংশের ভিন্ন গতিতে চলার প্রতিফলন। রেমিট্যান্স আর রিজার্ভ হলো এমন এক বৈদেশিক খাতের পেছনে তাকানো নিশ্চয়তা, যা কয়েক বছরের কঠিন সময়ের পর সত্যিই স্থিতিশীল হয়েছে। অন্যদিকে শেয়ারবাজার হলো কোম্পানির ভবিষ্যৎ মুনাফার ওপর সামনে তাকানো বাজি, আর এখন এতে বৃহত্তর সার্বিক অর্থনীতি নিয়ে কোনো সন্দেহ নয়, বরং জ্বালানি সরবরাহ থেকে আসা স্বল্পমেয়াদি পরিচালন ঝুঁকিই বেশি প্রতিফলিত হচ্ছে।

  • নিয়মিত রেমিট্যান্স পান এমন কারো জন্য, বর্তমান বিনিময় হারের স্থিতিশীলতার কারণে অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমের বদলে ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মতো আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে টাকা পাঠানোই এখন যুক্তিসঙ্গত, কারণ হারের ফারাক কমে এসেছে।

  • শেয়ার বিনিয়োগকারীদের বিশেষভাবে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির দিকে নজর রাখা উচিত, কারণ এটাই দরপতনের পেছনে থাকা কোম্পানি-নির্দিষ্ট ও স্বল্পমেয়াদি ঝুঁকি, পুরো সার্বিক অর্থনীতির চিত্র খারাপ হয়ে গেছে ভাবার দরকার নেই।

  • রিজার্ভের অবস্থান শক্তিশালী হলে সাধারণত টাকাকে অস্থিতিশীল না করে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরও নীতি সহজ করার সুযোগ বাড়ে, এ কারণেই এই মাসের সুদহার কমানো আর শেয়ারবাজারের দরপতন সরাসরি সাংঘর্ষিক নয়।

  • আগামী কয়েক সপ্তাহে বাজারের মনোভাব বোঝার জন্য ডিএসইর লেনদেনের পরিমাণের দিকে নজর রাখুন—জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল হওয়ার সাথে সাথে দৈনিক লেনদেন বাড়লে বোঝা যাবে বর্তমান দরপতন একটা সংশোধন, প্রবণতা নয়।

সামনে যা নজরে রাখতে হবে

সামনে নজর রাখার মতো বড় তথ্য হলো আগস্টের পূর্ণ মাসের রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের হিসাব, যা সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আসার কথা, আর শেয়ারবাজারকে চাপে রাখা গ্যাস সরবরাহ সংকট সমাধানে সরকারের কোনো ঘোষণা। রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি পুরো একটা মাস ২০ শতাংশের ওপরে থাকলে আর রিজার্ভ মোট ৩৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়ালে, অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে আরও মুদ্রানীতি সহজ করার আলোচনা নতুন করে শুরু হবে বলে আশা করা যায়।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ২.১৪ বিলিয়ন ছাড়াল, ডলার সংকটে বড় স্বস্তি

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে ২৫.৬ শতাংশের বড় প্রবৃদ্ধি, ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রা আসার কারণ এবং রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়ার সহজ বিশ্লেষণ।