স্বর্ণ ও রৌপ্য

সপ্তাহে তৃতীয় দফা কমলো সোনার দাম, ২২ ক্যারেট নামলো ২,৩১,৮৮০ টাকায়

৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬4 মিনিটের পড়া
সপ্তাহে তৃতীয় দফা কমলো সোনার দাম, ২২ ক্যারেট নামলো ২,৩১,৮৮০ টাকায়

৫ দিনের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো সোনার দাম কমালো বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন। ২ সেপ্টেম্বর থেকে ২২ ক্যারেট সোনার ভরি নেমে এসেছে ২,৩১,৮৮০ টাকায়। বাজুস বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে খাঁটি সোনার দাম কমার কারণেই এই সমন্বয়। ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই দামই বহাল আছে। সঙ্গে সামান্য কমেছে রুপার দামও।

এই সপ্তাহে ঢাকার যে কোনো জুয়েলারি দোকানের সামনে দিয়ে হেঁটে গেলে বোঝা যাবে, সামনের দামের বোর্ডটা টানা দুইদিনও এক থাকছে না। বাংলাদেশে সোনা কেনার মানুষজন এখন এমন একটা দৃশ্য দেখছেন, যা অনেকদিন দেখা যায়নি, দাম কমছে। ২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন, সংক্ষেপে বাজুস, ২২ ক্যারেট সোনার ভরিতে ৪,৩৭৪ টাকা কমিয়ে দাম দাঁড় করায় ২,৩১,৮৮০ টাকায়। এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে এটাই তৃতীয় দফা কমানো, এর আগে ২৯ ও ৩১ আগস্ট মিলিয়ে কমেছিল ১১,৪৮৯ টাকা। সব মিলিয়ে হিসাব করলে গত পাঁচ কার্যদিবসে ভরিতে প্রায় ১৬,০০০ টাকা কমে গেছে সোনার দাম।

নতুন দাম সব ক্যারেটেই কার্যকর। ২২ ক্যারেট ২,৩১,৮৮০ টাকার পাশাপাশি ২১ ক্যারেট সোনা এখন প্রতি ভরি ২,২১,৪৪১ টাকা, ১৮ ক্যারেট ১,৯০,১২৩ টাকা, আর ঐতিহ্যবাহী বা সনাতন সোনা, যেটা সাধারণত পুরনো ও গ্রামীণ ডিজাইনের গয়নায় ব্যবহার হয়, তার দাম ১,৫৫,৩০৬ টাকা। ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীর দোকানগুলোতে একই দাম বহাল থাকতে দেখা গেছে, অর্থাৎ বাজার আপাতত একটা জায়গায় স্থির হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।

দাম কমানোর নোটিশে বাজুস খুব সংক্ষিপ্তভাবেই কারণ জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে খাঁটি সোনার দাম কমে যাওয়াকেই দায়ী করা হয়েছে। আর স্থানীয় এই দাম মূলত অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক বুলিয়ন বাজারকে, যেখানে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সোনার দাম আগের মতো টানা বাড়ছে না, বরং কিছুটা উঠানামা করছে। লন্ডন বা নিউইয়র্কের বাজারে ডলারে সোনার দাম কমলে বাংলাদেশি জুয়েলাররা সাধারণত এক-দুই দিনের মধ্যেই সেটা অনুসরণ করে, কারণ এখানে বিক্রি হওয়া প্রায় সব সোনাই আমদানি করা।

কীভাবে এই পর্যায়ে এসে পৌঁছালাম, সেটাও মনে রাখা দরকার। গত এক বছরের বেশিরভাগ সময় বাংলাদেশের ক্রেতারা সোনার দাম একটানা বাড়তে দেখেছেন, ২২ ক্যারেটের দাম ২,৪০,০০০ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল, বিশ্ববাজারে অস্থিরতা আর টাকার দুর্বলতার সময়গুলোতে আরও বেড়েছিল। বিয়ের মৌসুমে গয়না কেনা পরিবার আর মেয়ের গয়নার জন্য সঞ্চয় করা মানুষজন চুপচাপ এই ধাক্কা সহ্য করেছেন, কারণ বাংলাদেশে সোনা শুধু বিনিয়োগ নয়, প্রায় প্রতিটা বিয়ে, জন্ম আর পারিবারিক অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটা সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ। এমন কয়েক দফা দাম কমা, তা যত সামান্যই হোক না কেন, মাসের পর মাস হিসাব কষতে থাকা পরিবারগুলোকে একটু স্বস্তি দেয়।

বাজুস আরেকটা বিষয়ও পরিষ্কার করে দিয়েছে, যা নিয়ে অনেক ক্রেতা বিভ্রান্ত হন, ভ্যাট ইতিমধ্যেই গয়নার ঘোষিত দামের ভেতরে যুক্ত থাকে, তাই দোকানিরা আলাদা করে সেটা আবার চার্জ করতে পারবে না। তবে দোকান ভেদে যেটা এখনও অনেকটাই পাল্টাতে পারে, তা হলো মজুরি বা তৈরির খরচ, যা নির্ভর করে ডিজাইনের জটিলতার উপর এবং সোনার দামের সঙ্গে আলাদাভাবে যোগ হয়। সাধারণ একটা চুড়ির মজুরি অনেক কম হবে, কিন্তু জটিল কারুকাজের নেকলেস সেটের মজুরি অনেক বেশি, ফলে একই ক্যারেট আর ওজনের দুটো গয়নার শেষ দামে বেশ পার্থক্য থাকতে পারে।

টাকার অঙ্কের বদলে শতাংশের হিসাবে দেখলে গত এক সপ্তাহের এই পতন আরও তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়। তিন দফা মিলিয়ে মোট প্রায় ১৫,৮৬৩ টাকা কমাটা পাঁচ কার্যদিবসে দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশের কিছু কম, যে বাজারে সাধারণত এক দফায় কয়েকশ টাকা করে পরিবর্তন হয়, সেখানে এটা একটা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। পাঁচ ভরির একটা সাধারণ বিয়ের গয়নার সেট কিনতে চাওয়া পরিবারের জন্য এই শতাংশের ফারাক কার্যত কয়েক হাজার টাকার প্রকৃত সাশ্রয়ে পরিণত হতে পারে, যে হিসাবটাই মূলত অপেক্ষায় থাকা ক্রেতাদের আবার দোকানমুখী করে। ঢাকার ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো এখনও পরামর্শ দিচ্ছে ক্রেতারা যেন সবসময় হলমার্ক সনদ আর এমন একটা রসিদ চান যেখানে বিশুদ্ধতা, ওজন আর মজুরি আলাদা আলাদা লাইনে উল্লেখ থাকে, কারণ সোনার বিশুদ্ধতা আর গোপন মজুরি চার্জ নিয়ে অভিযোগ দেশের ভোক্তা অধিকার সংস্থাগুলোর কাছে জমা পড়া সবচেয়ে সাধারণ অভিযোগগুলোর একটা।

সোনার তুলনায় কম আলোচিত রুপার দামও একই দিকে গেছে, তবে অনেক কম পরিমাণে। ২২ ক্যারেট রুপার ভরিতে ১১৬ টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ৫,০১৬ টাকায়। সোনার মতো একই ধাপ অনুসরণ করে ২১ ক্যারেট রুপা এখন ৪,৭৮২ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৪,০৮২ টাকা, আর সনাতন রুপা ভরিতে ৩,০৯১ টাকা। রুপার দাম সাধারণত সোনার মতো এত বড় পরিবর্তন দেখায় না, কারণ এর দামের ভিত্তি অনেক কম হওয়ায় সামান্য টাকার পরিবর্তনও শতাংশের হিসাবে বড় হয়ে যায়, তাই বাজুস সোনার বড় পরিবর্তনের সময়েও রুপায় ছোট ছোট সমন্বয় করে থাকে।

সাধারণ ক্রেতাদের কাছে বাস্তব প্রশ্ন হলো, এখন কি সোনা কেনার ভালো সময়? ঢাকার যেসব আর্থিক পরামর্শক বুলিয়ন বাজার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করেন, তারা সাধারণত স্বল্পমেয়াদী খবর দেখে সোনা কেনার সিদ্ধান্ত নিতে নিরুৎসাহিত করেন, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারের উপর নির্ভর করে জুয়েলাররা কয়েকদিনের মধ্যেই আবার দিক পাল্টাতে পারেন। বিয়ের কেনাকাটার পরিকল্পনা করা পরিবার বা বিনিয়োগ হিসেবে সোনা রাখতে চাওয়া মানুষের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ কয়েক সপ্তাহের ওঠানামা নয়, বরং মাসের পর মাসের প্রবণতা। তবে যাদের কেনাকাটার পরিকল্পনা আগে থেকেই ছিল, তাদের জন্য টানা তৃতীয় দফা দাম কমা নিঃসন্দেহে ভালো খবর, বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন টাকার উপর চাপ আর প্রায় দুই অঙ্কের কাছাকাছি মূল্যস্ফীতির মধ্যে সংসার চালাতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে, তাই বড় কোনো পারিবারিক খরচে একটু স্বস্তি পেলে কেউ আপত্তি করেন না।

সামনের দিনগুলোতে অনেক কিছুই নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক বুলিয়ন বাজার কেমন আচরণ করে তার উপর। মুদ্রার দুর্বলতা আর ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সময় সোনা ঐতিহাসিকভাবে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে কাজ করে এসেছে, আর এই দুটো ঝুঁকিই এখনও পুরোপুরি কেটে যায়নি, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম আবার বাড়া, এবং তার প্রভাবে স্থানীয় দামও বাড়া, একেবারে অসম্ভব নয়। ঢাকার তাঁতিবাজারসহ ঐতিহ্যবাহী সোনার বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা প্রতিদিনের দামের হিসাব খুব কাছ থেকে দেখছেন এবং আগামী সপ্তাহে অন্তত আরেকবার দাম এদিক ওদিক হতে পারে বলে ধারণা করছেন, কারণ সাম্প্রতিক সময়ে বাজার বেশ অস্থির। তবে আপাতত, দেশের সবচেয়ে আবেগ আর অর্থনৈতিক গুরুত্বের একটা কেনাকাটায় দাম কমার এই বিরল সময়টা উপভোগ করছে বাংলাদেশের পরিবারগুলো। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে কেনাকাটার পরিকল্পনা থাকলে দোকানে যাওয়ার আগে একবার ফোন করে বা দোকানের বোর্ডে টাঙানো দাম দেখে নেওয়াই ভালো, কারণ বাজুস সাধারণত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরপরই দাম প্রকাশ করে, কিন্তু আলাদা আলাদা দোকানে সেই দাম নিজেদের বোর্ডে তুলতে মাঝেমধ্যে কয়েক ঘণ্টা দেরি হতে পারে।

২২ ক্যারেট সোনার ভরি প্রতি দাম, ২৮ আগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

বাংলাদেশে সোনার দাম আবার উল্টো দিকে, বাজুস ২২ ক্যারেটের দাম কমিয়ে ২,২৮,০৩১ টাকা করল, বাড়ানোর চার দিনের মাথায়

বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন ১৩ অক্টোবর ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরিতে ৩,২৬৬ টাকা কমিয়ে ২,২৮,০৩১ টাকা করেছে, যা মাত্র চার দিন আগে একই দাম ২,২১৬ টাকা বাড়ানোর পরের ঘটনা। সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে দাম দুই দিকেই ঘুরেছে, ২৬ সেপ্টেম্বরের ২,৩২,৯৩০ টাকা থেকে ৯ অক্টোবরের ২,৩১,২৯৭ টাকা হয়ে এখন ২,২৮,০৩১ টাকায়। একই সঙ্গে রূপার দামও কমেছে, ২২ ক্যারেট রূপা ভরিতে ১১৭ টাকা কমে হয়েছে ৪,১৯৯ টাকা।

বাজুসের দামে এক সপ্তাহে দুই দফা পরিবর্তন, আগে কমল পরে বাড়ল সোনার দাম

বাজুস ৫ অক্টোবর প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট সোনার দাম ১,৬৯১ টাকা কমিয়েছিল, কিন্তু চার দিন পরই ৯ অক্টোবর সেই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি উল্টে দিয়ে ২,২১৬ টাকা বাড়িয়ে দেয়, ফলে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত দাম দাঁড়ায় ২,৩১,২৯৭ টাকায়। এই ওঠানামা এ বছর নতুন কিছু নয়, জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত স্বর্ণের দাম অন্তত ৯০ বারের বেশি বদলেছে, মানে প্রায় দুই দিনে একবার। সর্বশেষ বাড়তি দামেও এটি এ বছরের সর্বোচ্চ ২,৮৬,০০১ টাকার চেয়ে অনেক কম, তবে গত বছরের অক্টোবরের তুলনায় এখনও প্রায় ১০.৬ শতাংশ বেশি।

তিন দিনে দুইবার ওঠানামা করল বাংলাদেশে সোনার দাম, জানুয়ারির রেকর্ড থেকে এখনও অনেক দূরে

এই সপ্তাহে বাংলাদেশে সোনার দাম তিন দিনের মধ্যে দুইবার ওঠানামা করেছে, বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন ২৮ সেপ্টেম্বর ২২ ক্যারেট সোনার দাম ২,১৫৮ টাকা কমিয়েছে, পরদিন আরও ২,২১৬ টাকা কমিয়েছে, তারপর ৩০ সেপ্টেম্বর সেই দ্বিতীয় কমাটাই পুরোপুরি উল্টে দিয়ে ঠিক আগের ২,৩০,৭৭২ টাকায় ফিরিয়ে এনেছে। এই উথালপাথাল এমন একটা বছরের জন্য স্বাভাবিক, যেখানে ইতিমধ্যে ১১৯ বার দাম সংশোধন হয়েছে, ৫৮ বার বৃদ্ধি আর ৬০ বার হ্রাস, কারণ দেশীয় দাম ফেডারেল রিজার্ভের প্রত্যাশা আর মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় গড়া অস্থির আন্তর্জাতিক বুলিয়ন বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে চলে। এই সপ্তাহের ঊর্ধ্বমুখী সমন্বয়ের পরও দাম জানুয়ারির রেকর্ড সর্বোচ্চ ২,৮৬,০০১ টাকার চেয়ে ৫৫,০০০ টাকারও বেশি নিচে রয়ে গেছে। বিয়ের মৌসুম চলার মধ্যে ভ্যাট আর মজুরি খরচ প্রকৃত দামকে ঘোষিত দামের চেয়ে অনেক ওপরে ঠেলে দেওয়ায়, ক্রেতাদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে কোনো একদিনের দাম স্থায়ী হবে ধরে না নিয়ে জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের দৈনিক বিজ্ঞপ্তি দেখে চলার জন্য।