জ্বালানি সংকট বাড়ার মধ্যেই এনবিআর সোলার সরঞ্জামের আমদানি কর ১৭% থেকে কমিয়ে ১% করল
বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আগামী ১৮০ দিনের জন্য অধিকাংশ সোলার বিদ্যুৎ সরঞ্জামের আমদানি কর কমিয়ে মাত্র ১ শতাংশ করেছে, যা আগে কার্যকরভাবে ছিল ১৭ শতাংশ, আর এর আওতায় পড়ছে প্যানেল ও ইনভার্টার থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ সংরক্ষণের লিথিয়াম ব্যাটারি পর্যন্ত সবকিছু। এই আদেশ নতুন কোনো প্রণোদনার চেয়ে বেশি একটা দেরি করে হলেও প্রয়োজনীয় সংশোধনী, কারণ জুনের জাতীয় বাজেটে ঘোষিত আরও বিস্তৃত শূন্য শতাংশ কর প্যাকেজের কয়েক মাস পরও কাস্টমস অফিসগুলো কিছু আমদানিকারকের কাছ থেকে ২৩ থেকে ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আদায় করছিল, কোন সরঞ্জাম আসলে যোগ্য তা নিয়ে অমীমাংসিত বিভ্রান্তির কারণে। এই কর ছাড়টা এমন এক গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের মাঝখানে এলো যা পোশাক কারখানাগুলোকে জোনভিত্তিক গ্যাস রেশনিং দাবি করতে বাধ্য করেছে আর এই মাসে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি বড় অর্থনৈতিক খবরের পেছনের প্রেক্ষাপট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সোলার সস্তা করার দ্বিতীয় চেষ্টা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড অধিকাংশ সোলার বিদ্যুৎ সরঞ্জামের আমদানি কর কমিয়ে করেছে মাত্র ১ শতাংশ, যা আগে কার্যকরভাবে ছিল ১৭ শতাংশ। ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে জারি হওয়া এই আদেশ ১৮০ দিনের জন্য কার্যকর থাকবে। এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে মাউন্টিং স্ট্রাকচার, সোলার প্যানেল, ফোটোভোলটাইক সিস্টেমের জন্য তৈরি লিথিয়াম ব্যাটারি, ইনভার্টার, ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম আর তার সঙ্গে থাকা মনিটরিং ও কন্ট্রোল সরঞ্জাম। যেসব আমদানিকারক মাসের পর মাস ধরে কোন সরঞ্জাম আসলে কর ছাড়ের যোগ্য তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী নিয়মের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন, তাদের জন্য অন্তর্বর্তী সম্পদ বিভাগের এই নতুন আদেশ, যাতে ভারপ্রাপ্ত সচিব আহসান হাবিব স্বাক্ষর করেছেন, এই প্রশ্নের একটা চূড়ান্ত সমাধান দিতে চাইছে।
এ বছর বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রচেষ্টা
এটা আসলে এ বছর সরকারের সোলার আমদানি সস্তা করার প্রথম চেষ্টা না। জুন মাসে জাতীয় বাজেটের অংশ হিসেবে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও বড় একটা প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছিলেন, পুরো সোলার বিদ্যুৎ খাতের জন্য ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শূন্য শতাংশ কর্পোরেট কর, গ্রাহকদের সোলার বিদ্যুৎ বিলে ৫ শতাংশ রিবেট, আর ইনভার্টার, লিথিয়াম সেল, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম আর ইউভি প্রতিরোধী ডিসি ক্যাবলসহ দীর্ঘ এক তালিকার সোলার যন্ত্রাংশের শুল্ক শূন্যে নামিয়ে আনা। ঘোষিত লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ পরিষ্কার বিদ্যুৎ আর ২০৫০ সালের মধ্যে অর্ধেক পর্যন্ত পৌঁছাতে সাহায্য করা, যেখানে শুরুর পয়েন্ট ছিল মোট ১৭৯৭ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য সক্ষমতা, যার মধ্যে ১৫০৪ মেগাওয়াটই সোলার থেকে।
তিন মাস পরে, ব্যবসায়িক সূত্রের বরাতে জানা যায়, কিছু কিছু সোলার আমদানিকারককে তখনও নির্দিষ্ট কিছু সরঞ্জামের ক্যাটাগরিতে ২৩ থেকে ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হচ্ছিল, আর অন্যদের পড়তে হচ্ছিল পুরনো ১৭ শতাংশের কাঠামোয়, যা ১৫ শতাংশ ভ্যাট আর ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর মিলিয়ে গঠিত, কারণ তাদের পণ্যের নির্দিষ্ট এইচএস কোডগুলো জুনের বাজেট ভাষার সঙ্গে কখনো স্পষ্টভাবে মিলিয়ে দেখা হয়নি। এই সপ্তাহের আদেশটা তাই পুরোপুরি নতুন কোনো প্রণোদনা নয়, বরং একটা সংশোধনী, বাজেটে পাঁচ মাস আগে কাগজে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তা বাস্তবে আসলেই কার্যকর করার একটা চেষ্টা।
সহজ সংখ্যায় কী বদলাল
| আমদানির পরিস্থিতি | আগের কর বোঝা | এখনকার কর বোঝা |
|---|---|---|
| স্পষ্টীকৃত কাঠামোর আওতায় শিল্প-ব্যবহারের সোলার আমদানি | ১৫% ভ্যাট + ২% অগ্রিম আয়কর (মোট ১৭%) | ১% শুল্ক, ভ্যাট ও অগ্রিম কর মওকুফ |
| পুরনো কাস্টমস কাঠামোয় আটকে থাকা বাণিজ্যিক আমদানি | কিছু সরঞ্জাম ক্যাটাগরিতে ২৩% থেকে ৬৪% শুল্ক | নতুন আদেশ অনুযায়ী অধিকাংশ সরঞ্জামে ১% শুল্ক |
এই দুই সারির মধ্যকার ফারাকটাই আসলে গোটা গল্পের সংক্ষিপ্ত রূপ, কাস্টমস কর্মকর্তারা কীভাবে শ্রেণিবিন্যাস করছেন তার ওপর নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন সোলার সরঞ্জাম ভিন্ন ভিন্ন কর কাঠামোর আওতায় পড়ে আসছিল, আর নতুন আদেশ সেই অসামঞ্জস্যতাকে অন্তত আগামী ছয় মাসের জন্য একটা সহজ সংখ্যায় সমান করে দেওয়ার চেষ্টা।
আমদানিকারকদের যে শর্তগুলো পার হতে হবে
এই সুবিধা এমনি এমনি পাওয়া যাবে না। উৎপাদকদের প্রমাণ করতে হবে লিথিয়াম ব্যাটারি নতুন আর আইইসি ৬২৬১৯:২০২২ আন্তর্জাতিক সুরক্ষা মান পূরণ করে, একটা শর্ত যার লক্ষ্য স্পষ্টতই নিম্নমানের বা পুরনো ব্যাটারি সেল বাজারে ঢুকতে না দেওয়া, যে সমস্যা এই খাতে আগে কখনো কখনো দেখা গেছে। আমদানিকারকদের বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের একটা নিশ্চিতকরণও লাগবে, সঙ্গে একটা লিখিত অঙ্গীকার যে সরঞ্জাম শুধু সোলার বিদ্যুৎ উন্নয়নের জন্যই আনা হচ্ছে, অসম্পর্কিত কোনো ব্যবহারে পুনর্বিক্রয়ের জন্য না। কাস্টমস ছাড়করণে এখন উপ বা সহকারী কমিশনার পর্যায়ের অনুমোদন লাগবে, সাধারণ ডেস্ক ছাড়করণের বদলে, যা একটা বাড়তি প্রক্রিয়াগত ধাপ যোগ করছে, আর আমদানিকারকরা বলছেন এটা করশূন্যতার সুবিধা কমিয়ে দিলেও চালান পাঠাতে দেরি করিয়ে দিতে পারে।
সময়টা কেন গুরুত্বপূর্ণ
এই আদেশ এমন এক জ্বালানি সংকটের মধ্যে এলো যা এই মাসে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি অর্থনৈতিক খবরের পেছনের পটভূমি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পোশাক কারখানার মালিকরা উৎপাদন বন্ধ এড়াতে জোনভিত্তিক গ্যাস রেশনিংয়ের দাবি জানাচ্ছেন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের এই সপ্তাহের তিন দিনের টানা উত্থানকেও আংশিকভাবে শিল্প এলাকায় উন্নত গ্যাস সরবরাহের আশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, আর বিজিএমইএ প্রকাশ্যেই নিশ্চিত করেছে যে গ্যাস আর বিদ্যুৎ সংকট কারখানার কার্যক্রমের জন্য এখনো একটা বাস্তব ঝুঁকি, যদিও এখনো কোনো কারখানা বন্ধ হতে হয়নি। এই পটভূমিতে সোলার সরঞ্জামের খরচ প্রায় ষোল শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে দেওয়াটা কোনো পরিবেশবান্ধব প্রতীকী পদক্ষেপ নয়, বরং শিল্প ব্যবহারকারীদের, আর শেষমেশ সাধারণ পরিবারগুলোকেও, এমন একটা বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপায় দেওয়ার সরাসরি চেষ্টা যা বারবার ঘাটতিতে পড়া গ্যাস পাইপলাইন নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করে না।
আসলে লাভবান হচ্ছে কারা
যেসব বড় উৎপাদক ছাদে সোলার স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন আগেভাগে জোগাড় করতে পারেন, তারাই সবচেয়ে তাড়াতাড়ি লাভবান হবেন, কারণ কম আমদানি কর মানেই এখনও যথেষ্ট বড় অগ্রিম বিনিয়োগের ওপর রিটার্ন ফিরে আসার সময়টা কমে যাওয়া। ওয়ালটনের মতো বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান, যাদের সম্পর্কে বিডি ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ আগেও জানিয়েছিল যে তারাই অর্থনীতির অন্য জায়গায় নতুন কমপ্লায়েন্স খরচ সামলাতে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে, সরঞ্জামের দাম কমলে ছাদে বা নিজস্ব সোলার উৎপাদনে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার আর্থিক সামর্থ্যও তাদেরই বেশি। ছোট কারখানা মালিক আর সাধারণ পরিবারগুলোর জন্য হিসাবটা অনেক কঠিন, কারণ ডলারে সরঞ্জামের দামের ওপর মাত্র ১ শতাংশ শুল্কও, যখন টাকা নিজেই চাপের মধ্যে আছে, তখনও একটা বড় একবারের খরচ থেকে যায় যা সবাই বহন করতে পারবে না, কর সুবিধা যত অনুকূলই হোক।
যে প্রশ্নটা কেউ খোলাখুলি তুলছে না
এই আদেশ আর এনবিআরের নিজের আর্থিক পরিস্থিতির মধ্যে একটা স্পষ্ট টানাপোড়েন আছে। বিডি ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ আগেই জানিয়েছিল জুলাই আর আগস্টে ভ্যাট আদায় গত বছরের তুলনায় প্রায় ২১ শতাংশ কম হয়েছে, প্রায় ৪ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকার ঘাটতি, যা রাজস্ব বোর্ডকে তাদের নিজের ত্রৈমাসিক রিটার্ন পদ্ধতি নিয়েই পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করছে। সোলার আমদানিতে মওকুফ করা প্রতিটি শুল্ক আর কর মানেই এমন এক সময়ে এনবিআর সচেতনভাবে রাজস্ব ছেড়ে দিচ্ছে যখন তারা এমনিতেই অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে আদায়ের ঘাটতি ব্যাখ্যা করতে হিমশিম খাচ্ছে। কর্মকর্তারা সম্ভবত এই বাজি ধরছেন যে একটা শক্তিশালী, বেশি নির্ভরযোগ্য দেশীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃহত্তর অর্থনীতির জন্য, আর পরোক্ষভাবে ভবিষ্যতের কর আদায়ের জন্যও, এই মওকুফের কারণে হারানো সাময়িক রাজস্বের চেয়ে বেশি মূল্যবান, এই বাজি সঠিক প্রমাণিত হবে তখনই যখন সোলার গ্রহণের হার আসলেই বেড়ে যাবে, তার আগে যে ১৮০ দিনের জানালা লেখা আছে তার মধ্যেই, যার পরে এই সুবিধার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে।
তথ্যসূত্র
এরপর পড়ুন
দুই মাসের মাথায় ভ্যাট ব্যবস্থা পাল্টানোর চিন্তায় এনবিআর, রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা
বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড মাত্র দুই মাস আগে চালু করা ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন পদ্ধতি থেকে সরে আসার কথা ভাবছে, কারণ জুলাই ও আগস্টে ভ্যাট আদায় গত বছরের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ কম হয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ৪,৯৬৫ কোটি টাকা। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, তিন মাসের এই সময়সীমার কারণে আগের মতো সার্কেল ও ইউনিট ধরে রাজস্ব আদায় পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে না, আবার কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন বড় প্রতিষ্ঠানগুলো আদায় করা ভ্যাট জমা না দিয়ে সেই টাকায় সুদ আয় করছে। মাসিক ঝামেলা কমার স্বস্তি পাওয়া ব্যবসায়ীরা এখন এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জোরালো আপত্তি জানাচ্ছেন, আর শেষ পর্যন্ত হয়তো একটা মাঝামাঝি পথ বের হবে, রিটার্ন জমা থাকবে ত্রৈমাসিক কিন্তু টাকা জমা দিতে হবে মাসে মাসে।
ত্রৈমাসিক ভ্যাট পদ্ধতিতে ঘাটতি ১৭,৬৬৩ কোটি টাকা, মাসিক পদ্ধতিতে ফেরার কথা ভাবছে এনবিআর
মাত্র কয়েক মাস আগে ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে প্রতি মাসের বদলে তিন মাস পরপর ভ্যাট রিটার্ন ও পরিশোধের সুযোগ দিয়েছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এখন সেই সিদ্ধান্তই আবার পাল্টানোর কথা ভাবছে সংস্থাটি। জুলাই ও আগস্টে ভ্যাট আদায় আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ কমে গেছে, ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৭,৬৬৩ কোটি টাকায়, যা কর্মকর্তা আর আট লাখেরও বেশি ভ্যাট নিবন্ধিত ব্যবসায়ীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এনবিআরকে এখন নতুন বেতনস্কেলও যোগাতে হবে , অথচ রাজস্ব আদায় বাড়ছে না, কমছে
কয়েক দিন আগেই bdfinancialreview.com জানিয়েছিল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের ঘাটতি প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা এবং সামনের বছরের জন্য তাদের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রার কথা। এবার নতুন জটিলতা সামনে এসেছে , সরকার প্রায় ২৪ লাখ কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য বার্ষিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার নতুন বেতনস্কেলের অর্থও এনবিআরকে জোগাড় করতে বলা হচ্ছে। সমস্যা হলো, জুলাই ও আগস্ট দুই মাসেই ভ্যাট আদায় আগের বছরের তুলনায় কমেছে, ফলে ৪৬ শতাংশ বেশি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

