কর ও এনবিআর

ত্রৈমাসিক ভ্যাট পদ্ধতিতে ঘাটতি ১৭,৬৬৩ কোটি টাকা, মাসিক পদ্ধতিতে ফেরার কথা ভাবছে এনবিআর

৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬5 মিনিটের পড়া

মাত্র কয়েক মাস আগে ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে প্রতি মাসের বদলে তিন মাস পরপর ভ্যাট রিটার্ন ও পরিশোধের সুযোগ দিয়েছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এখন সেই সিদ্ধান্তই আবার পাল্টানোর কথা ভাবছে সংস্থাটি। জুলাই ও আগস্টে ভ্যাট আদায় আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ কমে গেছে, ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৭,৬৬৩ কোটি টাকায়, যা কর্মকর্তা আর আট লাখেরও বেশি ভ্যাট নিবন্ধিত ব্যবসায়ীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

কর নীতি সাধারণত এত দ্রুত উল্টে যায় না, কিন্তু জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এখন ঠিক এই পরিস্থিতিতেই দাঁড়িয়ে আছে, বছরের অন্যতম প্রশংসিত সংস্কারের একটা মাত্র কয়েক মাস পরেই। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে এনবিআর ভ্যাট নিবন্ধিত ব্যবসায়ীদের প্রতি মাসের বদলে তিন মাস পরপর রিটার্ন জমা ও পরিশোধের সুযোগ দিয়েছিল, যে সিদ্ধান্তকে ব্যবসায়ী মহল বেশ প্রশংসা করেছিল কাগজপত্রের ঝামেলা প্রকৃত অর্থেই কমানোর জন্য। এখন আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে থাকায় সেই একই কর্তৃপক্ষ খোলাখুলিভাবে সিদ্ধান্তটা উল্টে দেওয়ার কথা ভাবছে।

এই পুনর্বিবেচনার পেছনে থাকা সংখ্যাগুলো বেশ চিন্তার। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৯,৩০১ কোটি টাকা, গত বছরের একই মাসের ১১,৫৪৭ কোটি টাকা থেকে যা ১৯.৪ শতাংশ কম। আগস্টের অবস্থা আরও খারাপ, ৮,৩৬২ কোটি টাকা আদায় হয়েছে, যেখানে গত বছরের আগস্টে ছিল ১১,০৮১ কোটি টাকা, অর্থাৎ কমেছে ২৪.৫ শতাংশ। দুই মাস মিলিয়ে হিসাব করলে আদায় হয়েছে ১৭,৬৬৩ কোটি টাকা, আগের অর্থবছরের একই সময়ের ২২,৬২৮ কোটি টাকার তুলনায় যা ২১.৯ শতাংশ কম, ঠিক সেই সময়ে যখন সরকারের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিয়মিত রাজস্ব প্রবাহের।

এনবিআরের অভ্যন্তরীণ আলোচনা নিয়ে কথা বলা একজন কর্মকর্তা সরাসরিই বলেছেন, তিন মাস পর বোঝা যাবে প্রতি মাসের বদলে তিন মাস পরপর রিটার্ন ও ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটা সরকারের নিজের জন্যই আত্মঘাতী হয়েছিল কিনা। কর কর্তৃপক্ষের ভেতর থেকে এমন স্বীকারোক্তি বেশ গুরুত্বপূর্ণ, কার্যত এটা মেনে নেওয়া যে ব্যবসায়ীদের জীবন সহজ করার জন্য তৈরি একটা নীতি হয়তো অনিচ্ছাকৃতভাবেই ভ্যাটের টাকা দেরিতে আসা, কম কিস্তিতে আসা, বা সবচেয়ে খারাপ ক্ষেত্রে যারা রিটার্নই জমা দেন না তাদের ধরার আগ পর্যন্ত একেবারেই না আসার পথ খুলে দিয়েছে।

ত্রৈমাসিক রিটার্নের সঙ্গে রাজস্ব কমে যাওয়ার সম্পর্কটা বুঝতে বেশি কষ্ট হয় না, যদি একটু চিন্তা করা যায় ভ্যাটের টাকা আসলে কীভাবে সরকারের কোষাগারে পৌঁছায়। মাসিক পদ্ধতিতে একটা ব্যবসাকে বছরে বারো বার হিসাব মিলিয়ে কত টাকা দিতে হবে তা বের করে এনবিআরের হাতে তুলে দিতে হয়, যা সরকারের জন্য একটা স্থির ও অনুমানযোগ্য নগদ প্রবাহ তৈরি করে আর ব্যবসার জন্যও একটা নিয়মিত অভ্যাস গড়ে তোলে। একই বাধ্যবাধকতা তিন মাস পরপর করে দিলে ব্যবসা কার্যত তিন মাসের একটা ফাঁকা সময় পেয়ে যায়, যে সময়ে ভ্যাটের জন্য রাখা টাকা ব্যবসার নিজের হিসাবে থেকে যেতে পারে, অন্য কোনো তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে খরচ হয়ে যেতে পারে, বা রিটার্ন জমার সময় কাছে আসার আগ পর্যন্ত গুরুত্বই না পেতে পারে। যেসব কোম্পানি কম নগদ টাকা নিয়ে চলে, আর বাংলাদেশে অনেক ব্যবসাই খুব সরু তারল্যের উপর নির্ভর করে চলে, তাদের জন্য এই তিন মাসের ফাঁক দেরি করার একটা বাস্তব প্রলোভন।

স্বাভাবিকভাবেই ত্রৈমাসিক পদ্ধতিতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হওয়া ব্যবসায়ীরা এটা উল্টে যেতে দেখতে চাইছেন না। নেসলে বাংলাদেশের সাবেক পরিচালক এবং করনীতি নিয়ে বেসরকারি খাতে সরব কণ্ঠস্বর দেবব্রত রায় চৌধুরী সতর্ক করে বলেছেন, এখন সিদ্ধান্ত উল্টে দিলে সরকারের নিজেরই ব্যবসায়ীদের জন্য প্রক্রিয়া সহজ করার ঘোষিত প্রচেষ্টার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক হবে। তার এই যুক্তি ব্যবসায়ী মহলের একটা বড় অস্বস্তির প্রতিফলন, নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তে বারবার উল্টাপাল্টা, এমনকি সদুদ্দেশ্যেই হলেও, কোম্পানিগুলোর পরিকল্পনা করার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমানযোগ্যতা নষ্ট করে দেয়, আর প্রতিটা পাল্টানো পরের সংস্কার নিয়ে ব্যবসায়ীদের সন্দিহান করে তোলে, সেটা যে দিকেই যাক না কেন।

এই সন্দেহ শুধু বড় কোম্পানিতেই সীমাবদ্ধ নয়। মাসিক পদ্ধতিতে ফিরে গেলে যিনি সরাসরি প্রভাবিত হবেন, সেই ছোট ব্যবসায়ী আমির হোসেন নূরানী আরও স্পষ্ট ভাষায় হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, সরকার একটা সুবিধা দিয়ে আবার সেটা তুলে নিলে, তা ব্যবসা সহজ করার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না। আলাদা হিসাবরক্ষক না থাকা ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ত্রৈমাসিক থেকে মাসিক পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া কোনো সামান্য প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, এর মানে হলো বছরে চারবারের বদলে বারো বার সময় বের করা, আর অনেক ক্ষেত্রে হিসাবরক্ষককে টাকা দেওয়া।

রিটার্ন জমার নিয়মিততা নিয়ে বাংলাদেশের কর প্রশাসনের হিমশিম খাওয়া এই প্রথম নয়। ব্যবসায়ী আর কর পরামর্শক উভয়েই বলছেন, গত কয়েক বছরে ভ্যাটের নিয়ম, সময়সীমা আর জমাদানের প্রক্রিয়া বারবার পরিবর্তিত হয়েছে, অনলাইন রিটার্ন জমার নিয়মে পরিবর্তন থেকে শুরু করে ব্যক্তি ও কর্পোরেট করদাতাদের জন্য নিয়মিত সময়সীমা বাড়ানো, প্রতিটা পরিবর্তনের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সফটওয়্যার হালনাগাদ করতে হয়েছে, হিসাবরক্ষণ কর্মীদের নতুন করে প্রশিক্ষণ দিতে হয়েছে, আর শাখা ও বিক্রেতা পর্যায় পর্যন্ত পরিবর্তনের খবর পৌঁছাতে হয়েছে। একটা প্রকৃত রাজস্ব সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যেই হোক না কেন, প্রতিটা বাড়তি পরিবর্তন অর্থনীতিবিদরা যাকে বলেন কমপ্লায়েন্স ক্লান্তি তা বাড়িয়ে দেয়, অর্থাৎ করদাতাদের এমন একটা নিয়মের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ায় বিনিয়োগ করতে ক্রমশ অনীহা, যে নিয়মটা হয়তো এক বা দুই বছরের মধ্যেই আবার উল্টে যেতে পারে।

যা ঝুঁকিতে আছে তার পরিধি বেশ বড়। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে আট লাখেরও বেশি ব্যবসা ভ্যাটের জন্য নিবন্ধিত, অর্থাৎ রিটার্ন জমার চক্রে যে কোনো পরিবর্তনের প্রভাব পড়ে অর্থনীতির বিশাল একটা অংশে, বড় উৎপাদক ও আমদানিকারক থেকে শুরু করে পাড়ার খুচরা বিক্রেতা আর সেবাদাতাদের পর্যন্ত, যারা মাত্রই তাদের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া ত্রৈমাসিক ছন্দের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিলেন। এখন নীতিটা উল্টে দেওয়া মানে একই অর্থবছরে তাদের সবাইকে দ্বিতীয়বার আবার মানিয়ে নিতে বলা, নীতি নিয়ে এমন দোদুল্যমানতা কর পরামর্শকদের মতে অন্তত স্বল্পমেয়াদে সম্মতির হার আরও কমিয়ে দিতে পারে, কারণ ব্যবসাগুলো আবারও সিস্টেম ও অভ্যাস বদলাতে হিমশিম খাবে।

এনবিআরের এই দ্বিধা সরকারের এই অর্থবছরের এক অনেক বড় রাজস্ব সমস্যার ভেতরেই অবস্থান করছে। কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে ২০২৬ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আনুমানিক ৮৮,০০০ কোটি টাকার ঘাটতির কথা জানিয়েছেন, নতুন সরকারি বেতন কাঠামো যা বছরে প্রায় ১.০৬ লাখ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ যোগ করছে তার সঙ্গে এই ঘাটতি আরও বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছে, তার উপর ২০২৭ অর্থবছরের আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বর্তমানে বাস্তবে যা আদায় হচ্ছে তার চেয়ে ৪৬ শতাংশ বেশি ধরা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ভ্যাট ঘাটতির এমনকি একটা অংশও ফিরিয়ে আনতে পারে এমন যে কোনো সমাধান ঢাকার বাজেট পরিকল্পনায় বেশ গুরুত্ব বহন করে, যা ব্যাখ্যা করে কেন কর্মকর্তারা একটা জনপ্রিয় সংস্কার প্রবর্তনের এত অল্প সময়ের মধ্যেই তা আবার পুনর্বিবেচনা করতে রাজি হচ্ছেন।

আপাতত এনবিআর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি, উদ্ধৃত কর্মকর্তার কথায় বোঝা যায় আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু উল্টে দেওয়ার আগে আগামী তিন মাস অপেক্ষা করে পরিস্থিতি দেখার একটা প্রকৃত পন্থাই নেওয়া হচ্ছে। এদিকে ব্যবসায়ীরা রয়েছেন একটা অস্বস্তিকর অবস্থানে, বর্তমান ত্রৈমাসিক পদ্ধতি অনুযায়ী পরিকল্পনা করবেন নাকি সামান্য আগাম সতর্কতা নিয়েই হয়তো মাসিক বাধ্যবাধকতায় ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকবেন তা নিয়ে অনিশ্চিত। সম্মতি সহজ করা আর রাজস্ব রক্ষা করার মধ্যে এই টানাপোড়েন এনবিআর কীভাবে সমাধান করে, তার উপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে পরবর্তী করনীতি সংস্কারগুলোতে ব্যবসায়ী মহল কতটা আস্থা রাখবে, সেই সংস্কার যে দিকেই যাক না কেন। হঠাৎ কোনো পরিবর্তনে বিপাকে পড়তে না চাইলে ব্যবসায়ীদের উচিত কোনো পরিবর্তনকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়ার আগে এনবিআরের আনুষ্ঠানিক পরিপত্র বা গেজেট বিজ্ঞপ্তির জন্য অপেক্ষা করা, কারণ অতীতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত পাল্টানোর ক্ষেত্রে সাধারণত হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা হালনাগাদ করার জন্য কয়েক সপ্তাহের আগাম সময় দেওয়া হয়েছে।


ভ্যাট আদায়, জুলাই-আগস্ট, বছরওয়ারি তুলনা (কোটি টাকা)

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

এনবিআরকে এখন নতুন বেতনস্কেলও যোগাতে হবে , অথচ রাজস্ব আদায় বাড়ছে না, কমছে

কয়েক দিন আগেই bdfinancialreview.com জানিয়েছিল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের ঘাটতি প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা এবং সামনের বছরের জন্য তাদের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রার কথা। এবার নতুন জটিলতা সামনে এসেছে , সরকার প্রায় ২৪ লাখ কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য বার্ষিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার নতুন বেতনস্কেলের অর্থও এনবিআরকে জোগাড় করতে বলা হচ্ছে। সমস্যা হলো, জুলাই ও আগস্ট দুই মাসেই ভ্যাট আদায় আগের বছরের তুলনায় কমেছে, ফলে ৪৬ শতাংশ বেশি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

এনবিআরের ৮৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি আর সামনের বছরের সাহসী ৬.০৪ লাখ কোটি টাকার লক্ষ্য

১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তাদের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে আছে, আর সংস্থাটির সাবেক চেয়ারম্যানকে সবেমাত্র ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকে বাংলাদেশের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক হিসেবে পাঠানো হয়েছে। এদিকে এনবিআর এই বছর ২০ শতাংশ বেশি লক্ষ্যমাত্রা তাড়া করছে। করদাতাদের জন্য এই সংখ্যাগুলোর মানে কী, আর কেন এই ফারাক ক্রমাগত বাড়ছে, তা জেনে নিন।

অনলাইনে ই-রিটার্ন জমা দেওয়া এবং ৫% কর ছাড় পাওয়ার সহজ নিয়ম

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যতামূলক নিয়ম, ই-ট্যাক্স ওয়েবসাইট ব্যবহারের নিয়মাবলি এবং ৫% কর ছাড়ের শর্তাবলী।