নতুন সরকারি তহবিল সত্ত্বেও বাংলাদেশে স্টার্টআপ বিনিয়োগ পাঁচ বছরের সর্বনিম্নে, কমেছে ৯৫ শতাংশ
২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলো মাত্র ৬০ লাখ ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে, গত বছরের ১২ কোটি ডলারের তুলনায় ৯৫ শতাংশ কম, গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ প্রথমার্ধ। একই সময়ে বিশ্বজুড়ে স্টার্টআপ বিনিয়োগ হয়েছে ৫১০ বিলিয়ন ডলার, অথচ বাংলাদেশে দেশীয় বিনিয়োগকারীরা একটি টাকাও ঢালেননি কোনো চুক্তিতে। শিল্প নেতারা দুষছেন ডলার সংকট, একাধিক সংস্থার নিয়ন্ত্রক জটিলতা, আর সফল এক্সিটের অভাবকে। সরকারের নতুন ৪০০ কোটি টাকার ফান্ড অব ফান্ডস এই দেশীয় পুঁজির ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে চালু হলেও এখনো একটি স্টার্টআপেও তার টাকা পৌঁছায়নি।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলো মাত্র ৬০ লাখ ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে, যেখানে গত বছর একই সময়ে এই অঙ্কটা ছিল ১২ কোটি ডলার। মানে প্রায় ৯৫ শতাংশ কমে গেছে বিনিয়োগ, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সংগ্রহ করা তথ্য বলছে এমনটাই। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এটাই সবচেয়ে খারাপ প্রথমার্ধ এই খাতের জন্য, আর এটা এমন এক বছরে ঘটল যখন সারা বিশ্বে স্টার্টআপ বিনিয়োগ আসলে বেড়েছে, একই সময়ে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগ হয়েছে ৫১০ বিলিয়ন ডলার। এই দুই সংখ্যার মধ্যেকার ফারাকটাই আসল গল্প, বাংলাদেশ শুধু বৈশ্বিক মন্দার প্রভাব টের পাচ্ছে না, বরং পেছনে পড়ে যাচ্ছে।
বছরের প্রথমার্ধে মাত্র ছয়টি চুক্তি হয়েছে চারটি প্রতিষ্ঠানের সাথে, ফলে গড় চুক্তির আকার নেমে এসেছে প্রায় ১০ লাখ ডলারে। দশ বছরের হিসাব ধরলে বোঝা যায় ব্যাপারটা, ২০১৩ সাল থেকে বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলো মোট ১০০ কোটি ডলার তুলেছে ৪৮৫টি চুক্তির মাধ্যমে, আর তার ৯২ শতাংশই এসেছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। এবারের সংখ্যা বলছে, বিদেশি টাকার উপর নির্ভরতা এখন প্রায় সম্পূর্ণ। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে দেশীয় বিনিয়োগকারীরা একটি টাকাও ঢালেননি, শূন্য, আর অনেকেই মনে করছেন এটাই আসল সংকট, লক্ষণ না, রোগ নিজেই।
টাকা গেল কোথায়
মোট বিনিয়োগের ৪০ লাখ ডলার এসেছে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল থেকে, প্রায় ৬৬ শতাংশ, আর আর্লি স্টেজ রাউন্ডে গেছে প্রায় ৫৫ লাখ ডলার, মোটের ৯০ শতাংশ। পুরো ছয় মাসে মাত্র একটা সিরিজ এ রাউন্ড হয়েছে, যার আকার ৬ লাখ ২৫ হাজার ডলার, বোঝাই যাচ্ছে যেসব স্টার্টআপ আগের বছরগুলোতে এই ধাপে পৌঁছেছিল তারাও এখন বড় অঙ্কের বিনিয়োগ পেতে হিমশিম খাচ্ছে। খাত ভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি পেয়েছে সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি খাত, ২১ লাখ ডলার বা ৩৫ শতাংশ, এরপর আর্থিক সেবা খাত ১৭ লাখ ডলার বা ২৯ শতাংশ, স্বাস্থ্যসেবা ১৬ লাখ ডলার বা ২৬ শতাংশ, আর লজিস্টিকস ও মোবিলিটি খাত সবার পেছনে মাত্র ৬০ হাজার ডলার নিয়ে।
চালডালের প্রধান নির্বাহী ওয়াসিম আলিম একদম সরাসরি বলে দিয়েছেন সমস্যাটা কোথায়, ডলার সংকট আর টাকা দেশে আনা নেওয়ার ঝামেলাই পুরো বিনিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতিটা ধাপে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিডিজবসের ফাহিম মাশরুর আর বাংলাদেশ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী শওকত হোসেন দুজনেই আঙুল তুলেছেন নিয়ন্ত্রক জটিলতার দিকে, একটা রাউন্ড শেষ করতে গেলে প্রতিষ্ঠাতাদের একাধিক সরকারি সংস্থার সাথে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়, তার সাথে যোগ হয়েছে সফল এক্সিটের অভাব যা বিনিয়োগকারীদের প্রমাণ দিতে পারত যে বাংলাদেশি স্টার্টআপে টাকা খাটালে লাভ হয়। মাথাপিছু হিসাবে বাংলাদেশি স্টার্টআপে বিনিয়োগ এখন দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩০ সেন্টে, যা একই ধরনের ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে।
নতুন তহবিল এসেছে, তবে শর্ত আছে
সরকার হাত গুটিয়ে বসে নেই। আগস্টের মাঝামাঝি সরকারের ভেঞ্চার শাখা স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড চালু করেছে ৪০০ কোটি টাকার একটা ফান্ড অব ফান্ডস, প্রায় ৩৩ লাখ ডলার সমমূল্যের, যেটা বানানোই হয়েছে ওয়াসিম আলিমরা যে দেশীয় পুঁজির ঘাটতির কথা বলছেন সেটা পূরণ করতে। স্টার্টআপে সরাসরি বিনিয়োগ না করে এই তহবিল টাকা পাঠাবে পেশাদার ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ম্যানেজারদের হাত ধরে, দেশি, আঞ্চলিক আর আন্তর্জাতিক, যারা সরকারের কাছ থেকে প্রতি টাকার বিপরীতে অন্তত এক টাকা নিজেদের পুঁজি মেলাতে রাজি হবেন। তহবিলটা চলবে ৩০ বছর ধরে, আর স্টার্টআপ বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ফান্ড ম্যানেজার খুঁজতে একটা আনুষ্ঠানিক আবেদন প্রক্রিয়া খুলে দিয়েছে, তাদের ভাষায় শক্তিশালী সুশাসন আর বিশ্বাসযোগ্য বিনিয়োগ কৌশল থাকা ম্যানেজারদের জন্য।
স্টার্টআপ বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী নূরুল হাই এই উদ্যোগকে দেখছেন একবারের অনুদান নয়, বরং একটা টেকসই ব্যবস্থা গড়ার চেষ্টা হিসেবে, তার কথায় লক্ষ্য হলো এমন একটা পরিবেশ তৈরি করা যেখানে ভালো আইডিয়া শুধু টাকার অভাবে আটকে থাকবে না। এখানে একটা তুলনা করা দরকার, স্টার্টআপ বাংলাদেশ নিজে এখন পর্যন্ত নিজস্ব তহবিল থেকে বিনিয়োগ করেছে প্রায় ১১১ কোটি টাকা, ৩৬টি প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপে, যেটা পুরো খাতের ২০১৩ সাল থেকে তোলা ১০০ কোটি ডলারের তুলনায় খুবই সামান্য, আর তার মধ্যে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের অংশ মাত্র ৭ শতাংশ।
| সূচক | ২০২৫ প্রথমার্ধ | ২০২৬ প্রথমার্ধ |
|---|---|---|
| মোট বিনিয়োগ | ১২ কোটি ডলার | ৬০ লাখ ডলার |
| চুক্তির সংখ্যা | প্রকাশিত হয়নি | ৬টি চুক্তি, ৪টি প্রতিষ্ঠান |
| গড় চুক্তির আকার | প্রকাশিত হয়নি | প্রায় ১০ লাখ ডলার |
| দেশীয় বিনিয়োগকারীর অংশ | সীমিত | ০ শতাংশ |
| বৈশ্বিক স্টার্টআপ বিনিয়োগ (একই সময়ে) | তুলনামূলক আগের বছরের অঙ্ক | ৫১০ বিলিয়ন ডলার |
যে উত্থান আবার ঘটানো কঠিন মনে হচ্ছে
খাতের নিজের ইতিহাসের সাথে তুলনা করলে পতনটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দশকের শুরুর দিকে বাংলাদেশের স্টার্টআপ দুনিয়ায় একটা সত্যিকারের উত্থান দেখা গিয়েছিল, যখন হাতেগোনা কয়েকটা ই-কমার্স আর রাইড শেয়ারিং কোম্পানি বড় বড় রাউন্ড বন্ধ করে ঢাকাকে আন্তর্জাতিক মহলে নজরে আনতে পেরেছিল। সেই বছরগুলোর কারণেই দশ বছরের সামগ্রিক হিসাবে মোট অঙ্কটা এখনো ১০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়ে আছে। এবারের সংখ্যাগুলো বলছে সেই উত্থান ছিল একটা সংক্ষিপ্ত সময়ের ঘটনা, যা মূলত গড়ে উঠেছিল বিদেশি পুঁজি হাতেগোনা কিছু নাম তাড়া করার উপর, বিস্তৃত কোনো দেশীয় বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর উপর না। বিদেশি আগ্রহ এখন কমে যাওয়ায় আর দেশীয় পুঁজি প্রায় শূন্য থাকায়, সেই প্রথম দিকের সফল কোম্পানিগুলোর পথ ধরে গ্রোথ স্টেজে যাওয়ার কথা ছিল যেসব কোম্পানির, তাদের সেই পাইপলাইনটাই এখন মোটামুটি শুকিয়ে গেছে, আর সেটাই বাইরে থেকে দেখলে ছয় মাসে একটা মাত্র সিরিজ এ চুক্তির চেহারা।
এই ইতিহাসের কারণেই শিল্প সংশ্লিষ্টরা বারবার একবারের কোনো ত্রাণ প্যাকেজ না চেয়ে কাঠামোগত সমাধানের কথা বলছেন। যে বাজার মাত্র এক বছর আগেই একটা প্রথমার্ধে ১২ কোটি ডলার টেনে আনতে পেরেছিল, তার মানে এখানে চাহিদা আর মেধা দুটোই আছে, পরিস্থিতি অনুকূল হলে পুঁজি টানার সামর্থ্যও আছে। বিনিয়োগকারী আর প্রতিষ্ঠাতা দুই পক্ষই এখন যে প্রশ্নটা করছেন তা হলো, এবারের ধস কি ডলার সংকট আর সামষ্টিক অনিশ্চয়তার সাময়িক প্রতিক্রিয়া, যা মুদ্রার পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে কেটে যাবে, নাকি এটা বোঝায় যে আগের উত্থানটা মূলত নির্ভর করেছিল হাতেগোনা কিছু বিদেশি তহবিলের উপর, যারা এখন মনোযোগ সরিয়ে নিয়েছে আর বাংলাদেশ দেশীয়ভাবে যাই করুক না কেন তারা আর ফিরবে না।
সময়টা কেন গুরুত্বপূর্ণ
নতুন তহবিলটা এমন একটা সময়ে এসেছে যখন বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের হাতে থাকা প্রায় সব রকম সুযোগই একসাথে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ডলারের বাজারে অস্থিরতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পক্ষে টাকা ঢালা যেমন কঠিন হয়ে গেছে, তেমনি স্টার্টআপগুলোর পক্ষেও সেই টাকা দেশে ফেরত আনা বা আবার বিনিয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। দুর্বল এক্সিটের সুযোগ, মানে অধিগ্রহণ বা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির মতো ঘটনা যেখানে প্রথম দিকের বিনিয়োগকারীরা টাকা তুলে নিতে পারেন, সেটার অভাবে বড় তহবিলগুলো বাংলাদেশের দিকে তাকাতে চাইছে না। আর দেশীয় পুঁজির প্রায় কোনো অস্তিত্ব না থাকায় উদ্যোক্তাদের প্রায় পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে হাজার হাজার মাইল দূরের বিনিয়োগকারীদের ওপর, যাদের সামনে একই ডলারের জন্য প্রতিযোগিতা করছে আরও অনেক দেশের বাজার।
ফান্ড অব ফান্ডস আদৌ এই পতন ঠেকাতে পারবে কিনা তা নির্ভর করছে এখনো চূড়ান্ত না হওয়া অনেকগুলো বাস্তবায়ন খুঁটিনাটির উপর, কোন ফান্ড ম্যানেজাররা নির্বাচিত হবেন আর তারা কত দ্রুত টাকা মাঠে নামাতে পারবেন সেসব প্রশ্নের উপর। আপাতত ৪০০ কোটি টাকার এই প্রতিশ্রুতি একটা স্বীকৃতি যে সরকার বুঝেছে বিনিয়োগ ধসটা একটা নীতিগত সমস্যা যা সমাধান করা দরকার, যদিও এবারের সংখ্যাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে দশকের শুরুর তুলনায় এই খাত ঠিক কতটা পিছিয়ে গেছে।
তথ্যসূত্র
এরপর পড়ুন
তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন উদ্যোগ কর্মসূচি, জামানত ছাড়াই মিলবে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত
বাংলাদেশ ব্যাংক দেশজুড়ে চালু করেছে উদ্যোগ নামের একটা জামানতমুক্ত অর্থায়ন কর্মসূচি, যেখানে উপজেলা পর্যায়ে ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণের জন্য তরুণ উদ্যোক্তারা পাবেন সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা, সমান ভাগে ব্যাংক ঋণ ও সরাসরি অনুদান হিসেবে। আবেদনকারীর বয়স হতে হবে ২৮ বা তার কম, ঋণখেলাপির কোনো রেকর্ড থাকা যাবে না, আর সরকারি খাতে চাকরিরত হওয়া যাবে না, আর নির্বাচনী প্যানেল ব্যবসা পরিকল্পনার সম্ভাব্যতা ও কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা বিচার করবে। প্রায় ৬৪০ জন উদ্যোক্তা নিয়ে একটা প্রাথমিক পাইলটের পর এই কর্মসূচি এমন এক সময়ে এলো যখন ব্যাংকিং খাতে ঋণযোগ্য গ্রাহকের অভাবে রেকর্ড পরিমাণ উদ্বৃত্ত তারল্য অলস পড়ে আছে।
বাংলাদেশের ই-বর্জ্য থেকে বছরে আয় হতে পারে ২০ কোটি ডলার, অথচ রিসাইকেল হচ্ছে সামান্যই
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ টন ইলেকট্রনিক বর্জ্য জমা হয়, আর গবেষকরা বলছেন এর ভেতরে থাকা পুনরুদ্ধারযোগ্য ধাতুর মূল্য বছরে ২০ থেকে ২২.১ কোটি মার্কিন ডলার। এর দশ শতাংশেরও কম আনুষ্ঠানিকভাবে রিসাইকেল হয়, আর সরকারি হিসাব বলছে গত অর্থবছরে নিবন্ধিত রিসাইক্লারদের সংগ্রহ করা ই-বর্জ্যের পরিমাণ ছিল শূন্য টন। এই ফাঁকটাই এখন হাতেগোনা কয়েকটি ছোট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্টার্টআপের কাছে হয় সংকট, নয়তো এখনও কেউ দখল করেনি এমন সবচেয়ে বড় সুযোগ।
