আগস্টে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি কমে ৮.২৬ শতাংশ, তবু বাজারের চিত্র ভিন্ন
আগস্টে বাংলাদেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮.২৬ শতাংশে, টানা দ্বিতীয় মাসের মতো এই হার কমল, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের অর্থনীতিবিদরা এই প্রবণতাকে ইতিবাচক বললেও সতর্ক করেছেন যে বাজারে মানুষ এখনও স্বস্তি টের পাচ্ছে না, কারণ সেপ্টেম্বরে আটা, চিনিগুঁড়া চাল আর ভোজ্যতেলের দাম উল্টো বেড়েছে। খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বরং বেড়ে হয়েছে ৯.৩২ শতাংশ, যা বোঝায় দামের চাপ মুদি বাজারের বাইরেও রয়ে গেছে। এই মিশ্র চিত্র দেখিয়ে দেয় বাংলাদেশ এখনও এমন দীর্ঘমেয়াদী নিম্নমুখী প্রবণতা থেকে অনেক দূরে, যা সাধারণ পরিবারকে সত্যিকারের স্বস্তি দিতে পারে।
আগস্ট মাসে বাংলাদেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮.২৬ শতাংশে, টানা দ্বিতীয় মাসের মতো এই হার নিম্নমুখী, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সবশেষ তথ্য অনুযায়ী। খাতা কলমে এটা সুখবর, জুলাইয়ের তুলনায় একটু কমেছে, টানা দুই মাস ধরে দাম বাড়ার গতি কিছুটা শ্লথ হয়েছে। কিন্তু ঢাকার যেকোনো বাজারে ঢুকলেই ছবিটা একদম উল্টো, আটা, চিনিগুঁড়া চাল আর ভোজ্যতেলের দাম সেপ্টেম্বরে বরং বেড়েছে, যেখানে সরকারি হিসাব বলছে স্বস্তি আসছে।
সংখ্যার আড়ালে যা ঘটছে
আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.২৬ শতাংশে, জুলাইয়ের ৮.৩২ শতাংশ থেকে কিছুটা কম, এবং গত বছরের আগস্টের ৮.২৯ শতাংশের চেয়েও সামান্য কম। খাদ্য মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি কমেছে, ৭.১৬ শতাংশ থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে ৭.০২ শতাংশে। তবে খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি উল্টো পথে হেঁটেছে, ৯.২৮ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৯.৩২ শতাংশ, অর্থাৎ যেসব খাতে দাম বাড়ছে সেগুলো মুদি বাজারের বাইরে, বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা আর শিক্ষার মতো খাতে।
| সূচক | জুলাই ২০২৬ | আগস্ট ২০২৬ |
|---|---|---|
| সার্বিক মূল্যস্ফীতি | ৮.৩২% | ৮.২৬% |
| খাদ্য মূল্যস্ফীতি | ৭.১৬% | ৭.০২% |
| খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি | ৯.২৮% | ৯.৩২% |
এই হিসাবটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ বাংলাদেশে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর খরচের সবচেয়ে বড় অংশটাই যায় খাবারের পেছনে, তাই খাদ্য মূল্যস্ফীতি একটু কমলেই মানুষ সেটা সবার আগে টের পায়। কিন্তু এবারের কমাটা খুবই সামান্য, দুই মাসের হিসাবে মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ পয়েন্ট, তাই অর্থনীতিবিদরা এখনই উচ্ছ্বসিত হতে নারাজ।
বাজারে গিয়ে দেখুন আসল অবস্থা
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ঢাকার খুচরা বাজারে দেখা গেছে খোলা আটার কেজি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৫০ টাকায়, যা আগে ছিল ৪৫ টাকা, মানে কয়েক সপ্তাহেই প্রায় ১১ শতাংশ বেড়েছে। ময়দার দাম ৭০ থেকে ৭৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৮০ থেকে ৮৫ টাকা, আর বেকারি মালিকরা তাদের সদস্যদের ময়দাভিত্তিক পণ্যের দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে বলে জানা গেছে। একজন বেকারি ম্যানেজার বলেছেন, আগে যে চিকেন পোলাওর প্যাকেট ১২০ টাকায় বিক্রি হতো, এখন সেটাই বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়।
চিনিগুঁড়া চালের দাম আরও বেশি বেড়েছে। এক মাস আগেও যে খোলা চাল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যেত, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি তার দাম উঠেছে প্রায় ২০০ টাকায়, শুধু সাম্প্রতিক সময়েই প্রায় ১১ শতাংশ বৃদ্ধি, আর এক মাসের হিসাবে আরও বেশি। প্যাকেটজাত চিনিগুঁড়া চাল বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৪০ টাকায়। এদিকে বোতলজাত সয়াবিন তেলের এক লিটারের বোতল অনেক দোকানেই খুঁজে পাওয়া কঠিন, ব্যবসায়ীরা বলছেন এই সংকট সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে চলছে। এক ক্রেতা সরাসরি বলেছেন, সরকারি হিসাবে যাই বলুক না কেন, প্রতি মাসেই তার মুদি বাজারের খরচ বেড়েই চলেছে।
অর্থনীতিবিদরা কেন এখনই স্বস্তির কথা বলছেন না
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশিষ্ট ফেলো ফাহমিদা খাতুন টানা দুই মাসের এই নিম্নমুখী প্রবণতাকে ইতিবাচক বলেছেন, তবে খুব বেশি আশাবাদী হতে চাননি। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ এখনও দৈনন্দিন জীবনে কোনো স্বস্তি টের পাচ্ছে না, কারণ বাজারে দাম এখনও চড়া, ভালো বৃদ্ধির হার কমলেও দাম কিন্তু কমেনি। তার এই কথাটাই আসলে মূল্যস্ফীতির হিসাব বুঝতে সবচেয়ে জরুরি, হার কমা মানেই দাম কমা নয়, এর মানে শুধু দাম আগের চেয়ে একটু ধীরে বাড়ছে। যে পরিবার প্রতিদিন চাল, তেল আর আটার হিসাব কষে সংসার চালায়, তাদের কাছে এই পার্থক্যটা তেমন কোনো অর্থ বহন করে না।
খাতুনের মতে, প্রকৃত স্বস্তি পেতে হলে মূল্যস্ফীতি অন্তত টানা ছয় মাস কমতে হবে, তার সঙ্গে সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল হতে হবে আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, মানুষের আয় বাড়তে হবে সেই সঙ্গে তাল মিলিয়ে। দুই মাসের এই সামান্য উন্নতি যতই স্বাগত জানানো হোক না কেন, এটা এখনও এমন কোনো প্রবণতা নয় যার ওপর ভরসা করে পরিবারগুলো তাদের বাজেট সাজাতে পারে, বিশেষ করে যখন খাদ্য বহির্ভূত খরচ বাড়ছেই আর চাল, আটার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উল্টো দিকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিচিত চিত্র
সিপিআইয়ের হিসাব আর বাজারের বাস্তবতার মধ্যে এই ফারাক বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়, তবে ২০২৬ সাল জুড়ে এটা বারবার সামনে এসেছে, বিশেষ করে আগের বছরগুলোর দুই অঙ্কের মূল্যস্ফীতির পর দাম স্থিতিশীল করার চেষ্টার মধ্যে। এই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশিরভাগ সময় কঠোর মুদ্রানীতির ওপর ভরসা করেছে, আর ছয় বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো সম্প্রতি নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্তই বলে দেয় যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে। এই ধারণা ঠিক থাকবে কিনা, তা অনেকটাই নির্ভর করছে ঢাকার বাজারে এখন যেসব নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে ঠিক সেগুলোর ওপর, কারণ চাল, আটা বা ভোজ্যতেলের দামে নতুন করে কোনো ঝাঁকুনি লাগলে আগস্টের সামান্য উন্নতিও সহজেই উল্টে যেতে পারে।
আপাতত বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য বার্তাটা সতর্কতার। টানা দ্বিতীয় মাসের মতো সার্বিক সংখ্যাটা সঠিক দিকেই যাচ্ছে, এটা অবশ্যই খেয়াল করার মতো বিষয়। কিন্তু খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকা আর সপ্তাহে সপ্তাহে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার মধ্যে, বিবিএসের পরের প্রতিবেদন যাই বলুক না কেন, বেশিরভাগ পরিবারকে আরও কিছুদিন চাপের মধ্যেই থাকতে হবে।
তথ্যসূত্র
এরপর পড়ুন
আগস্টে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি কমে ৮.২৬ শতাংশে, টানা দ্বিতীয় মাসে পতন, তবে স্বস্তি এখনো পৌঁছায়নি সাধারণ মানুষের কাছে
বাংলাদেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি আগস্টে কমে দাঁড়িয়েছে ৮.২৬ শতাংশে, জুলাইয়ের ৮.৩২ শতাংশ থেকে কম, টানা দ্বিতীয় মাসের মতো এই পতন ঘটেছে খাদ্যপণ্যের দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসায়। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে হয়েছে ৭.০২ শতাংশ, আগের ৭.১৬ শতাংশ থেকে কম, তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি সামান্য বেড়ে হয়েছে ৯.৩২ শতাংশ, আগের ৯.২৮ শতাংশ থেকে বেশি, যা দেখাচ্ছে এই স্বস্তি সংসারের সব খাতে সমানভাবে পৌঁছায়নি। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন এই প্রবণতাকে ইতিবাচক বললেও সতর্ক করেছেন যে সাধারণ মানুষ এখনো প্রকৃত স্বস্তি অনুভব করছেন না, কারণ কয়েক বছরের টানা বৃদ্ধির পর দামের স্তর এখনো উঁচুতেই রয়ে গেছে।
আগস্টে প্রবাসী আয় তিন মাসের সর্বোচ্চ ২.৯৭ বিলিয়ন ডলার, পরিবারের জন্য এর মানে কী
আগস্টে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে পাঠিয়েছেন ২.৯৭ বিলিয়ন ডলার, যা গত তিন মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং গত বছরের একই মাসের তুলনায় ১০.৮২ শতাংশ বেশি। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে তুলনামূলক ভালো বিনিময় হার আর সরকারের আড়াই শতাংশ নগদ প্রণোদনা বেশি টাকা বৈধ পথে আনতে সাহায্য করছে, যা প্রতি মাসে এই টাকার উপর নির্ভরশীল লাখ লাখ পরিবারের জন্য সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ একটা পরিবর্তন
এখন শুধু মোবাইল ব্যালেন্স দিয়েই কেনা যাবে স্মার্টফোন , জেনে নিন কী বদলেছে
বাংলাদেশ ব্যাংক ও টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি মোবাইল ব্যালেন্স থেকে খরচ করার সীমা একলাফে ১৫০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে গ্রাহকরা এখন মোবাইল ব্যালেন্স দিয়েই ফোন, রাউটার আর অন্যান্য সেবা কিনতে পারবেন। মাসিক সীমা ২,০০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৫,০০০ টাকা, আর বার্ষিক সীমা ২০,০০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৫০,০০০ টাকা , ২০১৮ সালে এই সেবা চালুর পর এত বড় বৃদ্ধি এই প্রথম। যাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা ক্রেডিট কার্ড নেই, এমন লাখো মানুষের জন্য এটি স্মার্টফোন কেনার একেবারে নতুন, সহজ একটা রাস্তা খুলে দিল।

