ব্যক্তিগত অর্থব্যবস্থা

আগস্টে প্রবাসী আয় তিন মাসের সর্বোচ্চ ২.৯৭ বিলিয়ন ডলার, পরিবারের জন্য এর মানে কী

৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬5 মিনিটের পড়া

আগস্টে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে পাঠিয়েছেন ২.৯৭ বিলিয়ন ডলার, যা গত তিন মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং গত বছরের একই মাসের তুলনায় ১০.৮২ শতাংশ বেশি। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে তুলনামূলক ভালো বিনিময় হার আর সরকারের আড়াই শতাংশ নগদ প্রণোদনা বেশি টাকা বৈধ পথে আনতে সাহায্য করছে, যা প্রতি মাসে এই টাকার উপর নির্ভরশীল লাখ লাখ পরিবারের জন্য সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ একটা পরিবর্তন

বাংলাদেশের প্রায় প্রতি তিনটা পরিবারের একটা যাদের অন্তত কিছুটা হলেও নির্ভরতা প্রবাসে থাকা কোনো আত্মীয়ের পাঠানো টাকার উপর, তাদের জন্য সাম্প্রতিক প্রবাসী আয়ের সংখ্যাগুলো নিছক অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের চেয়ে বেশি কিছু বহন করে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ২.৯৭ বিলিয়ন ডলার, যা গত তিন মাসের মধ্যে একক মাসে সবচেয়ে বেশি এবং গত বছরের আগস্টের ২.৬৮ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১০.৮২ শতাংশ বেশি। যেসব পরিবার স্কুলের বেতন, চিকিৎসা খরচ বা সংসার চালানোর জন্য এই টাকার উপর নির্ভর করে, তাদের জন্য এমন বৃদ্ধি সরাসরি একটু বাড়তি স্বস্তি নিয়ে আসে।

আগস্টের এই সংখ্যা গ্রীষ্মজুড়ে ধীরে ধীরে চলা একটা ঊর্ধ্বমুখী ধারার সমাপ্তি টানছে। জুনে প্রবাসী আয় ছিল ২.৮২ বিলিয়ন ডলার, জুলাইয়ে বেড়ে হয় ২.৮৬ বিলিয়ন ডলার, আর আগস্টে পৌঁছায় ২.৯৭ বিলিয়ন ডলারে, মাসে মাসে একটা স্থির উন্নতি, যদিও এই তিন মাসের প্রতিটাই প্রযুক্তিগতভাবে বছরের শুরুর দিকে যা নতুন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল সেই ৩ বিলিয়ন ডলারের নিচেই ছিল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত মাসিক প্রবাসী আয় ধারাবাহিকভাবে ৩ বিলিয়ন ডলার পার করেছিল, তাই জুন, জুলাই আর আগস্ট সেই ছয় মাসের ধারার তুলনায় কিছুটা নরম একটা সময়, যদিও আগস্টের সংখ্যা দেখাচ্ছে এই নরম হওয়ার ধারা হয়তো এবার উল্টে যেতে শুরু করেছে।

এই প্রবাহ যারা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করেন সেই ব্যাংকাররা সাম্প্রতিক এই শক্তির পেছনে মূলত দুইটা কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমটা হলো বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে তুলনামূলক ভালো বিনিময় হার, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে ডলারের দাম ছিল প্রায় ১২২ থেকে ১২৩ টাকা। একজন প্রবাসী যখন ঠিক করেন তিনি ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা, নাকি অনানুষ্ঠানিক হুন্ডি চ্যানেলে টাকা পাঠাবেন, তখন বিনিময় হারই প্রায়ই সবচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, আর প্রতিযোগিতামূলক বৈধ হার সেই ফারাক কমিয়ে দেয় যা আগে টাকাকে অবৈধ ও অনানুষ্ঠানিক পথে ঠেলে দিত। দ্বিতীয় কারণটা হলো সরকারের দীর্ঘদিনের আড়াই শতাংশ নগদ প্রণোদনা, যা বৈধ চ্যানেলে পাঠানো প্রতিটা প্রবাসী আয়ের উপর প্রযোজ্য এবং প্রতি ডলারে পরিবার যে পরিমাণ টাকা পায় তা কার্যত বাড়িয়ে দেয়, প্রচলিত বিনিময় হারের উপরেই এটা বাড়তি সুবিধা।

আরেকটা কম আলোচিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও কাজ করছে। ব্যাংকাররা বলছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ডলারের চাহিদা তুলনামূলক কম রয়েছে, যার পেছনে রয়েছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির দুর্বলতা আর মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়া, অর্থাৎ কারখানা সম্প্রসারণ বা উৎপাদন লাইন উন্নত করার সময় ব্যবসাগুলো যে ভারী যন্ত্রপাতি কেনে তার আমদানি কমেছে। কম ব্যবসা যখন বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণের জন্য ঋণ নিচ্ছে, তখন কম ব্যবসাই আমদানি যন্ত্রপাতির দাম মেটাতে টাকাকে ডলারে রূপান্তরিত করছে, ফলে ব্যাংকগুলোর হাতে থাকছে বেশি ডলারের সহজলভ্যতা। এর ফলে ব্যাংকগুলো নিজেদের ডলার রিজার্ভের উপর চাপ না ফেলেই প্রবাসী আয় পাঠানো মানুষদের তুলনামূলক ভালো বিনিময় হার দিতে পারছে, যা টাকা পাঠানো মানুষদের জন্য এক ধরনের ইতিবাচক চক্র তৈরি করছে, যদিও এর পেছনের কারণ, অর্থাৎ বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতা, সার্বিক অর্থনীতির জন্য খুব একটা আশাব্যঞ্জক লক্ষণ নয়।

যে পরিবার এই টাকা গ্রহণ করছে, তাদের জন্য বাস্তব প্রভাবটা বেশ সরাসরি। ধরা যাক একটা পরিবার নিয়মিত মধ্যপ্রাচ্য বা মালয়েশিয়ায় কর্মরত কোনো আত্মীয়ের কাছ থেকে মাসে ৫০০ ডলারের মতো পায়, তারা এখন এক বছর আগের বিনিময় হার আর প্রণোদনা কাঠামোর তুলনায় প্রতি মাসে বেশ কয়েক হাজার টাকা বেশি পাচ্ছেন, শুধু ভালো বৈধ হার আর নগদ প্রণোদনার মিলিত প্রভাবে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর জন্য এই ফারাক অনেক বড় ব্যাপার হতে পারে, যেখানে প্রবাসী আয় মাসিক খরচের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ মেটায়, সেটা সন্তানের টিউশন ফি হোক, বাবা মায়ের ওষুধ হোক, বা ছোট কোনো ঋণের কিস্তি হোক।

উৎস দেশও এই প্রবাহের ধরন নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যদিও আগস্টের মোট অঙ্কের সঙ্গে দেশভিত্তিক মাসিক বিভাজন প্রকাশ করা হয়নি। ঐতিহাসিকভাবে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত আর কাতারের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো, সঙ্গে মালয়েশিয়া আর যুক্তরাষ্ট্র মিলিয়ে বাংলাদেশে আসা প্রবাসী আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ আসে, যা প্রতিফলিত করে দেশের প্রায় এক কোটি প্রবাসী শ্রমিকদের বেশিরভাগ কোথায় কর্মরত তার চিত্র। উপসাগরীয় অঞ্চলের শ্রমিকরা সাধারণত মাসিক বেতনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অপেক্ষাকৃত ছোট অঙ্কের টাকা বেশি ঘন ঘন পাঠান, আর উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে থাকা প্রবাসীরা প্রায়ই কম ঘন ঘন কিন্তু বড় অঙ্কের টাকা পাঠান, এই দুই ধরনের প্যাটার্ন মিলেই তৈরি হয় মাসে মাসে কিছুটা অসম, একেবারে মসৃণ ঊর্ধ্বমুখী রেখা নয় এমন মোট হিসাব।

বৈধ চ্যানেল কেন তাৎক্ষণিক বিনিময় হারের সুবিধার বাইরেও এত গুরুত্বপূর্ণ, তাও বোঝা দরকার। ব্যাংক বা বিকাশ, নগদের মতো লাইসেন্সপ্রাপ্ত মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে পাঠানো টাকার হিসাব রাখা হয়, তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে যোগ হয়, আর প্রেরক ও প্রাপক উভয়ের জন্যই একটা নথিভুক্ত আর্থিক ইতিহাস তৈরি করে যা পরে ঋণের আবেদন বা ভিসা প্রক্রিয়ার মতো বিষয়ে কাজে লাগতে পারে। অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক হুন্ডি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পাঠানো টাকা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামান্য ভালো হার দিতে পারে, কিন্তু দেশের রিজার্ভে এর কোনো অবদান নেই, প্রতারণা বা টাকা না পৌঁছানোর প্রকৃত ঝুঁকি থাকে, আর কোনো নথি থাকে না যা পরিবারের ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে। গত এক বছরে বৈধ আর অবৈধ চ্যানেলের মধ্যে হারের ফারাক ক্রমাগত কমে আসাই মূলত ব্যাখ্যা করে কেন এখন বেশি টাকা ব্যাংক আর লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আসছে, তাদের পাশ কাটিয়ে নয়।

এই প্রবাসী আয়ের শক্তির সময়টা ব্যাংকিং খাতের আরেকটা বড় ঘটনার সঙ্গেও জড়িত। বৈধ চ্যানেলে বেশি ডলার আসতে থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি তিন মাসের বিরতির পর ব্যাংকগুলো থেকে সরাসরি ডলার কেনা আবার শুরু করেছে, সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রতি ডলার ১২২.৭৫ টাকা দরে ৫০ মিলিয়ন ডলার কিনেছে, যা ২০ মে এর পর তাদের প্রথম এমন কেনাকাটা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপ নিজেই একটা আস্থার সংকেত যে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব রিজার্ভ গড়ে তোলার প্রয়োজন, দুটোকেই সমর্থন করার মতো যথেষ্ট সরবরাহ আছে, আর এই গতিধারা সরাসরি ফিরে যায় সেই পরিবার আর প্রবাসী শ্রমিকদের কাছে, যারা ক্রমবর্ধমান হারে অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের বদলে বৈধ চ্যানেল বেছে নিচ্ছেন।

সামনের দিকে তাকালে, প্রবাসী আয়ের উপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর আগস্টের এই গতি সরল রেখায় চলবে বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়, কারণ প্রবাসী আয় সাধারণত মৌসুমি ধরনের হয়, ঈদের মতো ধর্মীয় উৎসবের আশেপাশে লক্ষণীয়ভাবে বেড়ে যায় যখন প্রবাসীরা উৎসব উদযাপনের জন্য বাড়তি টাকা পাঠান, আর মাঝের সময়গুলো তুলনামূলক শান্ত থাকে। ব্যাংকারদের মতে, বেশি স্থায়ী যে প্রবণতা তা হলো প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হার আর নগদ প্রণোদনার মাধ্যমে বৈধ চ্যানেলের দিকে ঝোঁকা, আর এই প্রবণতা যদি টিকে থাকে, তাহলে মৌসুমি নরম সময়গুলোতেও গ্রহীতা পরিবারগুলো উপকৃত হতে থাকবে, আর অর্থনীতিতে যেখানে অনেক কিছুই ভুল দিকে যাচ্ছে, সেখানে সাধারণ পরিবারগুলোর জন্য এটা এমন একটা বিষয় যা নিয়ে অন্তত কম দুশ্চিন্তা করতে হবে। বিদেশ থেকে টাকা পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলো সাধারণত কিছুটা ভালো হার আর প্রায় তাৎক্ষণিক টাকা জমার সুবিধা পেতে পারে, যদি প্রেরক অনানুষ্ঠানিক কোনো এজেন্টের বদলে ব্যাংকের অফিসিয়াল অ্যাপ বা লাইসেন্সপ্রাপ্ত মোবাইল আর্থিক সেবা ব্যবহার করেন, ছোট এই অভ্যাসের পরিবর্তন সারা বছরের মাসিক লেনদেনের হিসাবে যোগ করলে একটা উল্লেখযোগ্য অঙ্কে দাঁড়াতে পারে।

মাসিক প্রবাসী আয়, ২০২৬ (বিলিয়ন মার্কিন ডলার)



মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

এখন শুধু মোবাইল ব্যালেন্স দিয়েই কেনা যাবে স্মার্টফোন , জেনে নিন কী বদলেছে

বাংলাদেশ ব্যাংক ও টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি মোবাইল ব্যালেন্স থেকে খরচ করার সীমা একলাফে ১৫০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে গ্রাহকরা এখন মোবাইল ব্যালেন্স দিয়েই ফোন, রাউটার আর অন্যান্য সেবা কিনতে পারবেন। মাসিক সীমা ২,০০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৫,০০০ টাকা, আর বার্ষিক সীমা ২০,০০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৫০,০০০ টাকা , ২০১৮ সালে এই সেবা চালুর পর এত বড় বৃদ্ধি এই প্রথম। যাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা ক্রেডিট কার্ড নেই, এমন লাখো মানুষের জন্য এটি স্মার্টফোন কেনার একেবারে নতুন, সহজ একটা রাস্তা খুলে দিল।

মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৩২%, কিন্তু আপনার টাকা কি সত্যিই বাড়ছে? বাংলাদেশি সঞ্চয়কারীদের জন্য সহজ গাইড

জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে আট মাসের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন ৮.৩২ শতাংশে, আর বাংলাদেশ ব্যাংক এইমাত্র নীতি সুদহারও কমিয়েছে। কাগজে-কলমে ভালো খবর, কিন্তু একটা সাধারণ পরিবার যখন সঞ্চয় হিসাব, এফডিআর, সোনা নাকি মোবাইল মানির মধ্যে বেছে নেওয়ার কথা ভাবে, তখন আসল প্রশ্নটা সহজ—কোথায় রাখলে টাকার আসল মূল্য ধরে থাকে? এখানে আছে বাস্তবসম্মত একটা বিশ্লেষণ, সাথে বেশিরভাগ মানুষ যে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের ফাঁদ খেয়াল করেন না, তাও।

পার্সোনাল ফাইন্যান্স: সাধারণ পরিবারের সঞ্চয় ও জমানো টাকা বাড়ানোর সহজ উপায়

পরিবর্তিত সুদের বাজারে বাংলাদেশের সাধারণ পরিবারের আর্থিক সুরক্ষা, পারিবারিক বাজেট, জরুরি তহবিল গঠন এবং ফিক্সড ডিপোজিট থেকে সর্বোচ্চ লাভের সহজ নির্দেশিকা।