টানা ১৩ কার্যদিবস দরপতনের পর দুই মাসের সর্বনিম্নে ডিএসইএক্স

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স টানা ১৩ কার্যদিবস ধরে পড়ছে, প্রায় ৫ শতাংশ হারিয়ে ৩১ আগস্ট ৫,৫৯৮ পয়েন্টে নেমে এসেছে,গত প্রায় দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। লেনদেনের পরিমাণ কমে যাওয়া আর বাজারের হতাশাজনক পরিবেশ বলে দিচ্ছে, বিনিয়োগকারীরা দেশের জ্বালানি সংকট নিয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনার অপেক্ষায় আছেন,যদিও অর্থনীতির অন্য দিকে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিন্তু ভালো খবরই দিচ্ছে।
আগস্ট মাস দুঃখজনকভাবেই শেষ করল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৩১ আগস্ট টানা ১৩তম কার্যদিবসের মতো পড়ে ৫,৫৯৮ পয়েন্টে থিতু হয়েছে। এই দরপতনের ধারা শুরু হওয়ার পর থেকে সূচকটি হারিয়েছে ৩০৬ পয়েন্ট, প্রায় ৫ শতাংশ,যা বাজারকে টেনে নামিয়েছে গত প্রায় দুই মাসের সর্বনিম্ন স্তরে, আর জুনের শেষ বা জুলাইয়ের শুরুর পর এই প্রথম সূচক ৫,৬০০ পয়েন্টের নিচে নেমে গেছে।
বছরের শুরুর দিকে যে বাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছিল, সেখানে এই টানা দরপতন একদিনের বড় ক্ষতির চেয়েও বেশি বিনিয়োগকারীদের অস্থির করে তুলেছে। টানা ১৩ কার্যদিবস লোকসানের ধারা,এমনকি অস্থির চালচলনে অভ্যস্ত এই বাজারের হিসেবেও এটা অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ, আর এতে মতিঝিলের ট্রেডিং ফ্লোরে আস্থা ফেরাতে কী দরকার, সেই পুরনো প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে।
একটি খারাপ সপ্তাহের দুর্বল সমাপ্তি
আগস্টের শেষ কার্যদিবসটি এমন এক সপ্তাহের শেষ প্রান্ত, যেটি এমনিতেই ছিল নিম্নমুখী। ২৪ থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ কার্যদিবসে ডিএসইএক্স কমেছে ১৩০ পয়েন্ট বা ২.২৫ শতাংশ, সপ্তাহ শেষ হয়েছে ৫,৬৫৬ পয়েন্টে,আগের সপ্তাহের ৫,৭৮৬ পয়েন্ট থেকে যা কম। এক্সচেঞ্জের সবচেয়ে বেশি লেনদেন হওয়া ও বড় মূলধনী কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএস৩০-ও একই পথে হেঁটেছে, সপ্তাহ শেষে যা দাঁড়িয়েছে ২,১১৩ পয়েন্টে, আগের সপ্তাহের ২,১৬২ পয়েন্টের বিপরীতে।
বাজারের সার্বিক চিত্রেও একই গল্প আরও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। শুধু ২৯ আগস্টেই ঢাকা এক্সচেঞ্জে ৩৪২টি শেয়ারের দর কমেছে, বিপরীতে বেড়েছে মাত্র ৩৫টির,এই অনুপাত বাজারের মনোভাব সম্পর্কে কোনো সংশয়ের অবকাশ রাখে না। বড় মূলধনী কোম্পানিগুলোর দায় এখানে অনেকখানি। ইসলামী ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক ও শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের মতো ভারী ওজনের শেয়ারগুলো ছিল দরপতনের অন্যতম কারণ, যেগুলোর মিলিত প্রভাবেই সূচক আরও নিচে নেমেছে।
লেনদেনের হিসেবেই আসল চিত্র
সূচকের চেয়েও হয়তো বেশি কিছু বলছে লেনদেনের পরিমাণ। আগস্টের শুরু থেকে ডিএসইতে দৈনিক লেনদেন কমেছে ৬১ শতাংশ,৪ আগস্ট যেখানে ছিল ১,২১১ কোটি টাকা, ৩১ আগস্ট তা নেমে এসেছে মাত্র ৪৭৭ কোটি টাকায়। যে বাজারে লেনদেন কমে যায়, সেখানে বিনিয়োগকারীরা নতুন করে টাকা ঢালার বদলে দূরে সরে থাকাই বেছে নিচ্ছেন,এমন প্রবণতা সাধারণত দরপতন থামানোর বদলে বরং আরও গভীর করে, কারণ পাতলা লেনদেনের বাজারে তুলনামূলক ছোট লেনদেনেই সূচক বড় ধরনের ওঠানামার শিকার হয়।

দরপতনের পেছনে কী কী কারণ
ব্রোকারেজ বিশ্লেষকরা বাজারে চাপ সৃষ্টিকারী কয়েকটি কারণের কথা বলছেন। ইবিএল সিকিউরিটিজ বলছে, নতুন তহবিলের প্রবাহ দুর্বল থাকাটাই একটি বড় সমস্যা,বিক্রির চাপ শুষে নেওয়ার মতো নতুন বিনিয়োগকারী বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ খুব একটা আসছে না। বাজার কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কড়া নজরদারিও কিছু বিনিয়োগকারীকে সতর্ক করে তুলেছে, যদিও বাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে এই তদারকিকে অনেকেই প্রয়োজনীয় বলে মনে করেন।
একটি কারিগরি কারণও এখানে ভূমিকা রেখেছে। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ৭৭৫ কোটি টাকার রাইট শেয়ার ইস্যু বাজারের একটি বড় অংশের তারল্য টেনে নিয়েছে, যা অন্যথায় সেকেন্ডারি মার্কেটের লেনদেনে যুক্ত হতে পারত। এত বড় অঙ্কের রাইট ইস্যু ডিএসইতে নতুন কিছু নয়, কিন্তু এবারের সময়টা এমন এক বাজারের সঙ্গে মিলে গেছে, যেখানে তারল্যের সংকট আগে থেকেই ছিল,ফলে লেনদেনের ঘাটতি আরও বেড়েছে।
সবচেয়ে বড় শঙ্কা জ্বালানি সংকট
তবে এসব কারণের কোনোটিই মূল চালিকাশক্তি বলে মনে হচ্ছে না। বাজার সংশ্লিষ্টরা এবং বিশ্লেষকরা বারবার একই মূল উদ্বেগের কথায় ফিরে আসছেন,বাংলাদেশের অমীমাংসিত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, যা কারখানার উৎপাদন ব্যাহত করছে, উৎপাদন খরচ বাড়াচ্ছে, আর তালিকাভুক্ত শিল্প ও উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর আয়ের সম্ভাবনাকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
এই উদ্বেগকে সরকার নিজেই একেবারে স্পষ্ট ভাষায় সমর্থন করেছে। ১৬ আগস্ট অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট “ছয় মাসের মধ্যে সমাধান সম্ভব নয়। এক বছরেও সমাধান সম্ভব নয়। এতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে।” এরপর তিনি এমন একটি সতর্কবার্তা দেন, যা বাজার-সংক্রান্ত আলোচনায় বারবার উদ্ধৃত হচ্ছে,“গ্যাস ও বিদ্যুৎ ছাড়া অর্থনীতি এগিয়ে যেতে পারে না।”
যে শেয়ারবাজারের বড় খাতগুলোর মধ্যে আছে টেক্সটাইল, ওষুধ, সিমেন্ট আর জ্বালানিনির্ভর অন্যান্য উৎপাদন খাত, সেখানে একজন মন্ত্রীর প্রকাশ্যে স্বীকার করা যে সমাধান আসতে অন্তত দুই বছর লাগবে,এটা কোনো সাধারণ তথ্য নয়। এটা এক ধরনের ইঙ্গিত যে, শিল্প খাতের কোম্পানিগুলোর ওপর স্বল্পমেয়াদি আয়ের চাপ ২০২৭ সাল বা তারও পরে পর্যন্ত থেকে যেতে পারে। এই সময়সীমাই ব্যাখ্যা করে কেন দরপতন কয়েকটি নির্দিষ্ট শেয়ারে সীমাবদ্ধ না থেকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, এবং কেন কিছু শেয়ারের মূল্যায়ন কাগজে-কলমে আকর্ষণীয় মনে হলেও নতুন বিনিয়োগ ফিরতে দেরি হচ্ছে।
অন্যদিকে উজ্জ্বল এক চিত্র: রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ বাড়ছে
শেয়ারবাজারের এই বিষণ্ণ চিত্রের বিপরীতে অর্থনীতির অন্য একটি অংশে বেশ উজ্জ্বল প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের আগস্টের প্রথম ২৪ দিনে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছে ২.৩৪ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের ১.৮৬১ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ২৫.৭ শতাংশ বেশি। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স দাঁড়িয়েছে ৫.১৯৮ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৯.৮ শতাংশ বেশি।
প্রবাসী আয়ের এই ধারাবাহিক প্রবাহ সরাসরি প্রভাব ফেলেছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ আগস্ট, ২০২৬ পর্যন্ত মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭.৪৭ বিলিয়ন ডলারে, জুলাইয়ের ৩৬.৪২ বিলিয়ন ডলার থেকে যা বেশি। আইএমএফের কড়াকড়ি বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করলে,যেখানে বৈদেশিক লেনদেনের জন্য সহজে ব্যবহারযোগ্য নয় এমন কিছু সম্পদ বাদ দেওয়া হয়,রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩২.৬২ বিলিয়ন ডলারে, যা বছরের শুরুর তুলনায় এখনো অনেকটাই ভালো অবস্থানে।
এটা স্পষ্ট করে বলা দরকার,এটি শেয়ারবাজারের দরপতনের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো ঘটনা নয়, বরং সম্পূর্ণ আলাদা একটি খবর, আর শেয়ারবাজার শিগগিরই ঘুরে দাঁড়াবে তারও কোনো ইঙ্গিত এতে নেই। রেমিট্যান্সের প্রবাহ ও রিজার্ভ বৃদ্ধি মূলত প্রতিফলিত করে বহিঃখাত আর প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থকে; এগুলো নিজে থেকে শিল্প উৎপাদনের ওপর চেপে বসা গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান করে না, আবার ডিএসইর পাতলা লেনদেন কিংবা সতর্ক বিনিয়োগ মনোভাবকেও সরাসরি প্রভাবিত করে না। তবে এই দুটি প্রবণতা একসঙ্গে দেখলে বিনিয়োগকারীরা অর্থনীতির একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পান,যেখানে একদিকে চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে কিছু জায়গায় অগ্রগতিও হচ্ছে।
সামনে কী দেখছেন বিশ্লেষকরা
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি সংকট নিরসনে বিশ্বাসযোগ্য কোনো স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা না আসা পর্যন্ত, অথবা কোম্পানিগুলোর আয় বৃদ্ধি, নতুন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কিংবা বিএসইসির স্পষ্টতর দিকনির্দেশনার মতো কোনো নতুন অনুঘটক না এলে, ডিএসইএক্স আপাতত চাপের মধ্যেই থাকবে। যেহেতু অর্থমন্ত্রী নিজেই দ্রুত সমাধানের বদলে বছরের পর বছর সময় লাগার কথা বলেছেন, ব্রোকাররা বলছেন,নিকট ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঘুরে দাঁড়ানোর চেয়ে বাজার স্থিতিশীল হওয়াটাই বেশি বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা: কম দরপতনের দিন, স্থিতিশীল লেনদেন, আর আগস্টের শুরু থেকে হারানো জায়গা তাৎক্ষণিকভাবে ফিরে না পেলেও অন্তত নতুন করে তলানিতে না নামা।
সেপ্টেম্বরে এই স্থিতিশীলতা আসবে কিনা, তা অনেকখানি নির্ভর করবে আগামী সপ্তাহগুলোতে ঢাকার নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে আসা বার্তার ওপর। পাশাপাশি এটাও গুরুত্বপূর্ণ,অর্থনীতির বৃহত্তর ইতিবাচক দিকগুলো, যেমন শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ ও উন্নত রিজার্ভ পরিস্থিতি, শেষ পর্যন্ত ট্রেডিং ফ্লোরের আস্থায় রূপান্তরিত হয় কিনা।
তথ্যসূত্র
- 1Investors' confidence melts down as DSEX loses 306 points in 13 sessions | The Business Standard
- 2. DSEX sinks below 5,700 as energy crisis weighs on market sentiment | The Financial Express
- 3DSE starts week on bearish note as indices slide | The Business Standard
- 4Power, gas crisis may take at least 2 years to resolve: Khosru | The Business Standard
- 5Remittance inflow surges 25.7pc by August 24 | BSS
- 6Bangladesh's gross forex reserves rise to $37.47bn | BSS
এরপর পড়ুন
রেকর্ড রেমিট্যান্স, বাড়ছে রিজার্ভ, পড়ছে শেয়ারবাজার: বাংলাদেশের অর্থনীতির হালচাল
এই আগস্টে বাংলাদেশ একটা অদ্ভুত দ্বিমুখী অর্থনীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে রেমিট্যান্স গত বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে আর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ক্রমাগত বাড়ছে, অথচ গ্যাস সংকটের আশঙ্কা আর মার্জিন নিয়ম নিয়ে গুজবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ নিম্নমুখী। এই মাসের তিনটা বড় অর্থনৈতিক খবর কীভাবে একসাথে জড়িয়ে আছে, আর দ্রব্যমূল্য, চাকরি ও আপনার বিনিয়োগের জন্য এর মানে কী, তা জেনে নিন।
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ২.১৪ বিলিয়ন ছাড়াল, ডলার সংকটে বড় স্বস্তি
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে ২৫.৬ শতাংশের বড় প্রবৃদ্ধি, ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রা আসার কারণ এবং রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়ার সহজ বিশ্লেষণ।
শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহে স্বস্তিতে বৈদেশিক মুদ্রা ও রিজার্ভের স্থিতি
বাংলাদেশের প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আয়ে বড় প্রবৃদ্ধি, ডলার বাজারের স্থিতিশীলতা এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ইতিবাচক চিত্র।


