বিশ্ববাজারে সোনার রেকর্ড ঊর্ধ্বগতির প্রভাবে বাংলাদেশে ফের বাড়ল সোনার দাম
বাংলাদেশের জুয়েলার্স সমিতি বাজুস ১৯ সেপ্টেম্বর সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো সোনার দাম বাড়িয়েছে, ভরিতে ১,৬৯১ টাকা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ মানের ২২ ক্যারেট সোনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৬২১ টাকা। এই পদক্ষেপ বিশ্ববাজারের এক নজরকাড়া উত্থানের প্রতিফলন, যেখানে ক্রমাগত মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ডলার আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ব্যাপক সোনা কেনার কারণে এই মাসে দাম আউন্সপ্রতি ৪,৩০০ ডলারের বেশি উঠেছে। চলতি বছর বাজুস এ পর্যন্ত ১১৬ বার দাম সমন্বয় করেছে, যা থেকে বোঝা যায় বিয়ের মৌসুমের মুখে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বাজারটা কতটা অস্থির হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের জুয়েলার্স সমিতি বাজুস শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো সোনার দাম বাড়িয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ মানের ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরিতে ১,৬৯১ টাকা বাড়িয়ে করা হয়েছে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৬২১ টাকা। নতুন দাম ওই দিন সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হয়েছে। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার সোনার বাজারে ব্যবহৃত ১১.৬৬৪ গ্রামের একটি ভরির দাম এখন ঢাকায় একটি মাঝারি মানের মোটরসাইকেলের এক চতুর্থাংশ দামের চেয়েও বেশি।
সমিতি সারা বছর ধরে যে কারণটা বলে আসছে, এবারও সেটাই বলেছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনা বা খাঁটি বুলিয়নের দাম বেড়ে যাওয়া। বাজুস জানিয়েছে, সার্বিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করেই তারা দাম সমন্বয় করেছে। সহজ কথায়, বাংলাদেশের জুয়েলাররা মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে মাসের পর মাস ধরে চলা এক উত্থানের প্রতিফলন নিজেদের দামে বসিয়ে দিচ্ছেন, যে উত্থান অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদেরও হিমশিম খাইয়ে দিচ্ছে।
এক সপ্তাহে দ্বিতীয় লাফ
এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগে ১২ সেপ্টেম্বর বাজুস ভরিতে ১,০৫০ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেট সোনার দাম করেছিল ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৩০ টাকা। দুটো সমন্বয় মিলিয়ে মাত্র আট দিনে সর্বোচ্চ মানের সোনার ভরিতে প্রায় ২,৭৪১ টাকা যোগ হয়েছে, যে গতি কয়েক বছর আগে হলে অস্বাভাবিক মনে হতো, কিন্তু ২০২৬ সালে এসে প্রায় নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে ২১ ক্যারেট সোনার দাম ভরিপ্রতি ২ লাখ ২৪ হাজার ৬৫ টাকা এবং ১৮ ক্যারেট ১ লাখ ৯২ হাজার ৩৯৭ টাকা। পুরনো ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে তৈরি সোনা, যা এখনো পুরনো গয়না ও কিছু গ্রামীণ বাজারে চলে, তার দাম ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ১৭২ টাকা। রুপার দামও বেড়েছে, ২২ ক্যারেট রুপার ভরি ১১৬ টাকা বেড়ে হয়েছে ৫,১৩২ টাকা।
২০২৬ সালের আসল বিশেষত্ব শুধু দামের ওঠানামার দিক নয়, বরং কতবার এই পরিবর্তন হচ্ছে সেটাই। চলতি বছর এখন পর্যন্ত বাজুস মোট ১১৬ বার সোনার দাম সমন্বয় করেছে, যার মধ্যে ৫৮ বার বেড়েছে আর ৫৭ বার কমেছে, প্রায় সমান সমান। এত ঘন ঘন পরিবর্তনের মানে হলো, বাংলাদেশের ক্রেতারা, বিশেষ করে যেসব পরিবার মাসের পর মাস আগে থেকে বিয়ের জন্য সোনার গয়না কেনার পরিকল্পনা করেন, তারা কার্যত এমন এক বাজারের সময় ধরার চেষ্টা করছেন যা মাসে একাধিকবার বদলায়, কখনো কখনো মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে।
ক্রেতাকে আসলে কত দিতে হয়
বাজুসের ঘোষিত দামটা দোকানে গিয়ে হিসাবের শুরু মাত্র। বাংলাদেশে সোনার গয়না কেনায় ৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট দিতে হয়, আর জুয়েলাররা এর ওপর ভরিপ্রতি ন্যূনতম ৩,৫০০ টাকা মজুরি চার্জ যোগ করেন কারিগরি খরচ বাবদ, তার সঙ্গে আবার নকশা বা ব্র্যান্ডের জন্য দোকানভেদে বাড়তি অঙ্ক যোগ হতে পারে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বহুবার বলেছে, এই সব মিলিয়ে ক্রেতাকে কাউন্টারে গিয়ে বাজুসের সকালে ঘোষিত মূল দামের চেয়ে বেশ খানিকটা বেশি দাম গুনতে হয়, আর জটিল নকশার গয়নায় মজুরি বেশি নেওয়া দোকানগুলোতে এই ফারাক আরও বড় হয়।
| মান | ১২ সেপ্টেম্বরের আগের দাম | ১২ সেপ্টেম্বর থেকে | ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে |
|---|---|---|---|
| ২২ ক্যারেট (প্রতি ভরি) | প্রায় ২,৩১,৮৮০ টাকা | ২,৩২,৯৩০ টাকা | ২,৩৪,৬২১ টাকা |
| ২১ ক্যারেট (প্রতি ভরি) | প্রায় ২,২১,৪৪১ টাকা | ২,২২,৪৯১ টাকা | ২,২৪,০৬৫ টাকা |
| ১৮ ক্যারেট (প্রতি ভরি) | প্রায় ১,৮৯,৯৯৭ টাকা | ১,৯১,০৫৬ টাকা | ১,৯২,৩৯৭ টাকা |
| রুপা, ২২ ক্যারেট (প্রতি ভরি) | প্রায় ৫,০১৬ টাকা | ৫,০১৬ টাকা | ৫,১৩২ টাকা |
বিশ্ববাজারের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের জুয়েলাররা যে সোনা নিয়ে কাজ করেন তার সিংহভাগই আমদানি করা, তাই টাকার বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার সমন্বয় করে স্থানীয় দাম মোটামুটি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। আর আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য এ বছরটা ছিল একেবারে অসাধারণ। ফোর্বস অ্যাডভাইজারের সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৭ সেপ্টেম্বর সোনার দাম ছিল আউন্সপ্রতি প্রায় ৪,৩৭৩ ডলার, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় বেড়েছে ২.৫ শতাংশের বেশি। এটা এখনো ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ সালে ওঠা সর্বকালের সর্বোচ্চ দাম আউন্সপ্রতি ৫,৫৯৭.২৩ ডলারের চেয়ে কম, কিন্তু জেপি মরগানের কমোডিটিজ বিভাগ বছরের মাঝামাঝির জন্য যে ৪,০০০ ডলারের লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছিল, তার অনেক ওপরে, যে লক্ষ্যমাত্রা বাজার মাস কয়েক আগেই ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্লেষকরা এই উত্থানের পেছনে চেনা কয়েকটি কারণের কথা বলছেন, বেশিরভাগ বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে ২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ঠিক করেছে তার চেয়ে লাগাতার বেশি থাকা মূল্যস্ফীতি, একগুচ্ছ মুদ্রার বিপরীতে দুর্বল হয়ে পড়া ডলার, আর যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তে থাকা ঋণ ও জিডিপির অনুপাত, যা মুদ্রাটির দীর্ঘমেয়াদি মূল্য নিয়ে পুরনো উদ্বেগ নতুন করে উসকে দিয়েছে। তবে সবচেয়ে কাঠামোগত কারণ সম্ভবত কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নিজেদের ধারাবাহিক সোনা কেনা, যাদের অনেকেই মার্কিন ট্রেজারি বন্ড থেকে সরে এসে রিজার্ভ বৈচিত্র্যময় করছে সোনায়। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজে সম্প্রতি বড় কোনো সোনা কেনার তথ্য প্রকাশ করেনি, তবে অন্যান্য বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কেনাকাটাই দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ ধরে রাখতে যথেষ্ট হয়েছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত এসে পড়ে ঢাকার তাঁতিবাজারের একটি গয়নার দোকানে।
ক্রেতাদের জন্য অস্থির একটি বছর
সাধারণ ক্রেতাদের জন্য নয় মাসেরও কম সময়ে ১১৬ বার দাম পরিবর্তনের বাস্তব অর্থ হলো, খুচরা পর্যায়ে সোনা এখন আর স্থিতিশীল সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসেবে আচরণ করছে না, বরং দ্রুত ওঠানামা করা একটি পণ্যের মতো আচরণ করছে। বিয়ের জন্য সঞ্চয় করা পরিবারগুলো, যা বাংলাদেশে সোনার চাহিদার একটা বড় কারণ, এখন দুই বিকল্পের মধ্যে পড়ছে, আগেভাগে কিনে দাম পরে কমে যাওয়ার ঝুঁকি নেওয়া, নাকি অপেক্ষা করে ঠিক এই ধরনের পরপর দুই দফা দাম বাড়ার ঝুঁকি নেওয়া। জুয়েলারদেরও একই রকম সমস্যায় পড়তে হচ্ছে, কারণ তাদের মজুদ পণ্যের দাম বারবার নতুন করে ঠিক করতে হচ্ছে এমন একটি বাজারে, যেখানে কাঁচামালের পাইকারি দাম একই সপ্তাহে উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে যেতে পারে।
বাজুস এখনো এমন কোনো ইঙ্গিত দেয়নি যে এই অস্থিরতা শিগগিরই কমবে। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনা এখনো রেকর্ডের কাছাকাছি অবস্থানে থাকায় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কেনাকাটা কমার কোনো লক্ষণ না থাকায়, বেশিরভাগ বাজার পর্যবেক্ষক মনে করছেন বছরের বাকি সময়েও বাংলাদেশে একই গতিতে দাম পরিবর্তন হতে থাকবে।
তথ্যসূত্র
এরপর পড়ুন
টানা তিন দফা কমার পর বাংলাদেশে সোনার দাম ভরিতে বাড়ল ১,০৫০ টাকা
বাংলাদেশের সোনার বাজারে টানা তিন দিনের দরপতনের ধারা থেমে গেছে, বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরিতে ১,০৫০ টাকা বাড়িয়ে ২,৩২,৯৩০ টাকা করেছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনার দাম বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে। ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত এটি বাজুসের ১১৫তম দাম সমন্বয়, প্রায় সমান সংখ্যক বৃদ্ধি আর হ্রাসে ভাগ হওয়া এই গতি ক্রেতা আর জুয়েলার্স উভয়কেই পরিকল্পনা করতে হিমশিম খাওয়াচ্ছে। বিশ্ববাজারে সোনা আগস্টের প্রবল উত্থান আর সেপ্টেম্বরের অস্থিরতার মধ্যে দোল খাচ্ছে, কারণ বিনিয়োগকারীরা ফেডারেল রিজার্ভের সম্ভাব্য সুদহার সিদ্ধান্তকে মূল্যস্ফীতি আর মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার বিপরীতে মিলিয়ে দেখছেন। সাধারণ পরিবারের জন্য এর মানে হলো, সোনা এখন প্রায় মুদ্রার মতোই অননুমেয় হয়ে উঠেছে, যে মুদ্রার ঝুঁকি ঠেকাতেই মানুষ সোনা কেনে।
আবারও কমল সোনার দাম, ২২ ক্যারেট ভরি এখন ২,৩৪,০৩৮ টাকা
মঙ্গলবার বাজুস ২২ ক্যারেট হলমার্ক সোনার দাম ভরিতে ১,১০৮ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করেছে ২,৩৪,০৩৮ টাকা, তিন কার্যদিবসের মধ্যে এটা দ্বিতীয় দাম কমানো, এমন এক সপ্তাহের পর যেখানে দাম হাজার হাজার টাকা ওঠানামা করেছে। আন্তর্জাতিক বুলিয়ন বাজারের অস্থিরতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এ বছর এখন পর্যন্ত সোনার দাম ১১১ বার সমন্বয় হয়েছে। একই সময়ে রূপার দামও সোনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলেছে।
সপ্তাহে তৃতীয় দফা কমলো সোনার দাম, ২২ ক্যারেট নামলো ২,৩১,৮৮০ টাকায়
৫ দিনের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো সোনার দাম কমালো বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন। ২ সেপ্টেম্বর থেকে ২২ ক্যারেট সোনার ভরি নেমে এসেছে ২,৩১,৮৮০ টাকায়। বাজুস বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে খাঁটি সোনার দাম কমার কারণেই এই সমন্বয়। ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই দামই বহাল আছে। সঙ্গে সামান্য কমেছে রুপার দামও।
