স্বর্ণ ও রৌপ্য

টানা তিন দফা কমার পর বাংলাদেশে সোনার দাম ভরিতে বাড়ল ১,০৫০ টাকা

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬5 মিনিটের পড়া

বাংলাদেশের সোনার বাজারে টানা তিন দিনের দরপতনের ধারা থেমে গেছে, বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরিতে ১,০৫০ টাকা বাড়িয়ে ২,৩২,৯৩০ টাকা করেছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনার দাম বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে। ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত এটি বাজুসের ১১৫তম দাম সমন্বয়, প্রায় সমান সংখ্যক বৃদ্ধি আর হ্রাসে ভাগ হওয়া এই গতি ক্রেতা আর জুয়েলার্স উভয়কেই পরিকল্পনা করতে হিমশিম খাওয়াচ্ছে। বিশ্ববাজারে সোনা আগস্টের প্রবল উত্থান আর সেপ্টেম্বরের অস্থিরতার মধ্যে দোল খাচ্ছে, কারণ বিনিয়োগকারীরা ফেডারেল রিজার্ভের সম্ভাব্য সুদহার সিদ্ধান্তকে মূল্যস্ফীতি আর মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার বিপরীতে মিলিয়ে দেখছেন। সাধারণ পরিবারের জন্য এর মানে হলো, সোনা এখন প্রায় মুদ্রার মতোই অননুমেয় হয়ে উঠেছে, যে মুদ্রার ঝুঁকি ঠেকাতেই মানুষ সোনা কেনে।

টানা কমার পর সোনার দামে উল্টো স্রোত

১২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের সোনার বাজারে টানা তিন দিনের দরপতনের ধারা থেমে গেল। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন, সংক্ষেপে বাজুস, ২২ ক্যারেট হলমার্ক সোনার দাম ভরিতে ১,০৫০ টাকা বাড়িয়ে ২,৩২,৯৩০ টাকা নির্ধারণ করেছে। সেদিন সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হওয়া এই বাড়তি দাম এসেছে ঠিক আগের দিনের একটি বড় দরপতনের পর, যেদিন ভরিতে ২,১৫৮ টাকা কমে দাম নেমেছিল ২,৩১,৮৮০ টাকায়। বাজুস এই উল্টো যাত্রার কারণ হিসেবে বলছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনার দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, একটা বাক্য যা বাজুস প্রায় সবসময় ব্যবহার করে যখন তারা বাজারের নেতৃত্ব না দিয়ে শুধু অনুসরণ করে।

অন্য মানের সোনার দামও একই সঙ্গে বদলেছে। ২১ ক্যারেট সোনা এখন ভরিতে ২,২২,৪৯১ টাকা, ১৮ ক্যারেট ১,৯১,০৫৬ টাকা, আর তুলনামূলক সস্তা সনাতন মানের সোনা ১,৫৬,০৬৪ টাকা, সবগুলো দামেই ভ্যাট যুক্ত। রুপার দাম অবশ্য এই পরিবর্তনের মধ্যেও অপরিবর্তিত ছিল, ২২ ক্যারেট রুপা ভরিতে ৫,০১৬ টাকা, ২১ ক্যারেট ৪,৭৮২ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৪,০৮২ টাকা আর সনাতন মান ৩,০৯১ টাকাতেই থেমে আছে।

প্রায় প্রতিদিনই দাম বদলানোর একটা বছর

এই ১,০৫০ টাকা বাড়ার ব্যাপারটা আসলে আকারে খুব বড় কিছু নয়, বরং একটা লম্বা সময়ের প্রবণতার অংশ হিসেবেই এটা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত বাজুস সোনার দাম ১১৫ বার সমন্বয় করেছে, যার মধ্যে ৫৭ বার বেড়েছে, ৫৭ বার কমেছে, আর একবার ভ্যাট সংক্রান্ত সমন্বয় হয়েছে। একই সময়ে রুপার দাম বদলেছে ৬৯ বার, ৩৫ বার বেড়ে আর ৩৪ বার কমে। যে বাজারে আগে মাসে হাতে গোনা কয়েকবার দাম বদলাত, সেখানে এখন প্রায় প্রতি দুই দিনে একবার দাম বদলাচ্ছে, একটা গতি যা জুয়েলার্স আর ক্রেতা উভয়কেই এই ধাতুর দাম নিয়ে পরিকল্পনা করতে হিমশিম খাওয়াচ্ছে, যা বাংলাদেশি পরিবারগুলো এতদিন নির্ভরযোগ্য সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসেবে দেখে এসেছে।

বিডি ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউর নিজস্ব পর্যবেক্ষণে গত দুই সপ্তাহের বাজার কতটা অস্থির ছিল তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ৯ সেপ্টেম্বর সোনার দাম ছিল ভরিতে ২,৩৪,০৩৮ টাকা, যা মাসের শুরুর তুলনায় আগেই কমে এসেছিল। এরপর ১১ সেপ্টেম্বর তা আরও কমে দাঁড়ায় ২,৩১,৮৮০ টাকায়, আর পরদিনই আবার বেড়ে হয় ২,৩২,৯৩০ টাকা। আরও পেছনে তাকালে দোলাচল আরও নাটকীয় দেখায়, শুধু আগস্ট মাসেই ২২ ক্যারেট সোনার দাম প্রায় ২,২৩,০০০ টাকা থেকে বেড়ে ২,৪৮,০০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল, এক মাসেই প্রায় ২৫,০০০ টাকার রোলারকোস্টার, তারপর সেপ্টেম্বরের শুরুতে আবার নেমে আসে ২,৩০,০০০ টাকার ঘরে। ঢাকার বেইলি রোডের সোনার বাজারের এক ব্যবসায়ী কিছুদিন আগে এই সময়টা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ক্রেতারা এখন কেনা বা বেচার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই প্রতিদিনের দামের তালিকা চাইছেন, যা এ বছরের আগে খুব একটা প্রয়োজন হতো না।

তারিখ২২ ক্যারেট দাম (টাকা/ভরি)পরিবর্তন
৯ সেপ্টেম্বর২,৩৪,০৩৮-১,১০৮
১১ সেপ্টেম্বর২,৩১,৮৮০-২,১৫৮
১২ সেপ্টেম্বর২,৩২,৯৩০+১,০৫০

বিশ্ববাজারের কারণেই কেন দেশের বাজারে এত দোলাচল

বাংলাদেশে সোনার দাম নির্ধারিত হয় আন্তর্জাতিক বাজারদর, আমদানি খরচ আর শুল্কের ওপর ভিত্তি করে, তাই দেশের ভেতরে এই ঘন ঘন দাম বদলানো আসলে বিশ্ববাজারের অস্থিরতারই প্রতিচ্ছবি। ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার স্পট দাম ছিল প্রতি আউন্স প্রায় ৪,৩৫৮ ডলার, সেদিনই এক শতাংশের বেশি কমেছিল, তারপরও পুরো আগস্ট মাস মিলিয়ে সোনার দাম বেড়েছিল প্রায় ১৩ শতাংশ, গত ২৫ বছরের মধ্যে এক মাসে সবচেয়ে বড় উত্থানগুলোর একটি। এই রকম বড় উত্থানের পর একটা টালমাটাল অবস্থা, ঠিক এই প্যাটার্নটাই বাজুসের দামের তালিকাতেও দেখা যাচ্ছে।

সোনার দামকে বিভিন্ন দিকে টানার শক্তিগুলো এখন প্রায় সমান সমান। একদিকে, জাহাজ চলাচল আর জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম উঠেছে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৫ ডলারে, আর মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংঘাত নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদা বাড়িয়ে রেখেছে। এর প্রভাবে বিনিয়োগকারীরা সোনাভিত্তিক এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডে হুড়মুড়িয়ে টাকা ঢালছেন, শুধু আগস্টেই প্রায় ১,৮০০ কোটি ডলারের নতুন বিনিয়োগ এসেছে, যা বিশ্বব্যাপী ইটিএফের মজুত রেকর্ড ৪,১৮৯ টনে নিয়ে গেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতির তথ্য, যেমন উৎপাদক মূল্যসূচকে মাসিক ০.৪ শতাংশ বৃদ্ধি, বিনিয়োগকারীদের ধারণা তৈরি করেছে যে ফেডারেল রিজার্ভ ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে সুদহার নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, এই সম্ভাবনা আগের ৬২ শতাংশ থেকে বেড়ে এখন প্রায় ৭০ শতাংশ। সুদহার বাড়লে আর ডলার শক্তিশালী হলে সুদবিহীন সোনার আকর্ষণ কমে যায়, বিশ্লেষকরা যখনই ব্যাখ্যা করেন কেন আগস্টের মতো একটা উল্লম্ফন সরলরেখায় চলতে থাকে না, তখন এই কারণটাই সামনে আনেন। একজন বাজার বিশ্লেষক এই টানাপোড়েনের সারমর্ম বলতে গিয়ে বলেছেন, বাস্তব সুদহার বেশি থাকা আর ডলার শক্তিশালী হওয়া আপাতত সোনার জন্য বাধা হয়ে থাকবে, যদিও পোর্টফোলিও বৈচিত্র্যকরণের হাতিয়ার হিসেবে সোনার চাহিদা পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না।

বাজুস আসলে কীভাবে দাম নির্ধারণ করে

শেয়ারবাজারের মতো ধারাবাহিক লেনদেনের বদলে বাংলাদেশের সোনার বাজার চলে একটা কমিটি পদ্ধতিতে। বাজুস ঢাকার পাইকারি বুলিয়ন বাজারে অপরিশোধিত সোনার, স্থানীয়ভাবে যাকে তেজাবি সোনা বলা হয়, দাম নজরে রাখে, যা নিজেই আন্তঃব্যাংক ডলার বিনিময় হারে রূপান্তরিত আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে আমদানি শুল্ক আর পরিশোধন-যাচাইয়ের সামান্য মার্জিন যোগ করে চলে। তেজাবি সোনার দাম কোনো দিকে উল্লেখযোগ্যভাবে বদলালে, সাধারণত ভরিতে কয়েকশো টাকার বেশি, তখন বাজুস বৈঠকে বসে আর হলমার্ক খুচরা সোনার জন্য নতুন নোটিশ জারি করে, যা একই দিন বা পরদিন একটা নির্দিষ্ট সময় থেকে কার্যকর হয়। এই কাঠামোর কারণেই স্থানীয় দাম প্রায়ই বিশ্ববাজারের চেয়ে এক-দুই দিন পিছিয়ে থাকে, তারপর একবারে বড় লাফ দিয়ে ধরে ফেলে, একটা ধারাবাহিক লেনদেনের সম্পদের মতো ধীরে ধীরে না বদলে।

এই ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের সোনার দামের ওঠানামা প্রতিবেশী বাজারগুলোর তুলনায় কিছুটা বেশি তীব্র হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতে হাজার হাজার আলাদা জুয়েলার্স সরাসরি বুলিয়ন দর দেখে অনেক বেশি সূক্ষ্ম দৈনিক এমনকি দিনের মধ্যেই দাম বদলানোর সুযোগ পায়, যার ফলে ছোট ছোট পরিবর্তন একটামাত্র বড় লাফে জমা না হয়ে ছড়িয়ে যায়। বাংলাদেশি জুয়েলার্সরা মাঝে মাঝে আরও ঘনঘন, ছোট আকারের সমন্বয়ের দাবি তুলেছেন, বলছেন এতে মজুত রাখা খুচরা বিক্রেতা আর কেনার সময় ঠিক করতে চাওয়া ক্রেতা উভয়ের জন্যই সুবিধা হবে, তবে বাজুস এখনও তার নোটিশভিত্তিক ব্যবস্থাই বজায় রেখেছে।

বাংলাদেশি ক্রেতাদের জন্য এর মানে কী

সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বাস্তব ফলাফল হলো, সোনা আর আগের মতো ধীরগতির সম্পদ হিসেবে আচরণ করছে না। বিয়ের মৌসুমে যারা কেনাকাটা করেন, বাংলাদেশে খুচরা সোনার চাহিদার একটা বড় অংশ যাদের হাত ধরেই আসে, তারা এখন দাম দুই সপ্তাহ স্থিতিশীল থাকবে ধরে না নিয়ে বরং বাজুসের দৈনিক ঘোষণা দেখেই কেনার সময় ঠিক করছেন। জুয়েলার্সরা বলছেন, এই ক্রমাগত দাম বদলানো তাদের মজুত পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলছে, কারণ এক দামে কেনা মালামাল শোরুমের কাউন্টারে পৌঁছানোর মধ্যেই দামের অনেক পার্থক্য তৈরি হয়ে যেতে পারে।

আগামী কয়েকদিনে দাম কমার চেয়ে বরং আরও বদলানোর সম্ভাবনাই বেশি। ফেডারেল রিজার্ভের সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্ত এক সপ্তাহের মধ্যেই আসছে, আর তেলের বাজারে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এখনও চড়া, তাই মাসের শেষ সমন্বয়টা বাজুস এখনও করেনি বলেই মনে হচ্ছে। আপাতত মঙ্গলবারের এই ১,০৫০ টাকা বৃদ্ধি একটা সাধারণ সংশোধন মাত্র, বড় কোনো ধারা বদলের ইঙ্গিত নয়, তবে এটা মনে করিয়ে দেয় যে ২০২৬ সালে বাংলাদেশে সোনা এমন একটা বাজারে পরিণত হয়েছে যা যতটা পর্যবেক্ষণ করা হয় প্রায় ততটাই ঘন ঘন বদলায়।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

আবারও কমল সোনার দাম, ২২ ক্যারেট ভরি এখন ২,৩৪,০৩৮ টাকা

মঙ্গলবার বাজুস ২২ ক্যারেট হলমার্ক সোনার দাম ভরিতে ১,১০৮ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করেছে ২,৩৪,০৩৮ টাকা, তিন কার্যদিবসের মধ্যে এটা দ্বিতীয় দাম কমানো, এমন এক সপ্তাহের পর যেখানে দাম হাজার হাজার টাকা ওঠানামা করেছে। আন্তর্জাতিক বুলিয়ন বাজারের অস্থিরতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এ বছর এখন পর্যন্ত সোনার দাম ১১১ বার সমন্বয় হয়েছে। একই সময়ে রূপার দামও সোনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলেছে।

সপ্তাহে তৃতীয় দফা কমলো সোনার দাম, ২২ ক্যারেট নামলো ২,৩১,৮৮০ টাকায়

৫ দিনের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো সোনার দাম কমালো বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন। ২ সেপ্টেম্বর থেকে ২২ ক্যারেট সোনার ভরি নেমে এসেছে ২,৩১,৮৮০ টাকায়। বাজুস বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে খাঁটি সোনার দাম কমার কারণেই এই সমন্বয়। ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই দামই বহাল আছে। সঙ্গে সামান্য কমেছে রুপার দামও।

স্বর্ণের দাম আপডেট: তিন দিনে দুই দফা কমিয়ে বাজুস ২২ ক্যারেট সোনার দাম নামাল ২ লাখ ৩৬ হাজার ২৫৪ টাকায়

আগস্টের সেই টানা দাম ওঠানামার পর সেপ্টেম্বরে এসে সোনার বাজার এখন কিছুটা স্থির, তবে দাম নিম্নমুখী। বাজুস তিন দিনে দুই দফায় ২২ ক্যারেট সোনার দাম কমিয়েছে, ২৯ ও ৩১ আগস্ট, প্রতি ভরিতে মোট ১১,৪৮৯ টাকা কমেছে। ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নতুন এই কম দামই স্থির আছে, সঙ্গে কমেছে রূপার দামও। আমাদের আগের প্রতিবেদনের পর কী বদলেছে, আর গয়না কিনতে চাইলে এখন কী মাথায় রাখবেন, তা নিয়েই এই প্রতিবেদন।