আবারও কমল সোনার দাম, ২২ ক্যারেট ভরি এখন ২,৩৪,০৩৮ টাকা
মঙ্গলবার বাজুস ২২ ক্যারেট হলমার্ক সোনার দাম ভরিতে ১,১০৮ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করেছে ২,৩৪,০৩৮ টাকা, তিন কার্যদিবসের মধ্যে এটা দ্বিতীয় দাম কমানো, এমন এক সপ্তাহের পর যেখানে দাম হাজার হাজার টাকা ওঠানামা করেছে। আন্তর্জাতিক বুলিয়ন বাজারের অস্থিরতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এ বছর এখন পর্যন্ত সোনার দাম ১১১ বার সমন্বয় হয়েছে। একই সময়ে রূপার দামও সোনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলেছে।
মঙ্গলবার দেশের সোনার বাজার একটু সস্তা হয়ে গেছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) ২২ ক্যারেট হলমার্ক সোনার দাম ভরিতে ১,১০৮ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করেছে ২,৩৪,০৩৮ টাকা, যা বেলা মধ্য সকাল থেকে কার্যকর হয়েছে। তিন কার্যদিবসের মধ্যে এটা দ্বিতীয় দাম কমানোর ঘটনা, আর এটা দিয়েই একটা সত্যিকারের অস্থির সময়ের সমাপ্তি ঘটল, যেখানে গত এক সপ্তাহে দাম হাজার হাজার টাকা ওঠানামা করেছে, কারণ স্থানীয় জুয়েলাররা আন্তর্জাতিক বুলিয়ন বাজারের অস্থিরতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করছেন।
২২ ক্যারেটের প্রধান দামের পাশাপাশি বাজুস অন্যান্য মানের সোনার দামও কমিয়েছে। ২১ ক্যারেট সোনা এখন প্রতি ভরি বিক্রি হচ্ছে ২,২৩,৫৪১ টাকায়, কমেছে ১,০৪৯ টাকা। ১৮ ক্যারেট সোনার দাম ৯৩৩ টাকা কমে হয়েছে ১,৯১,৯৩১ টাকা, আর সনাতন পদ্ধতির সোনা, যা মূলত পুরোনো ধাঁচের হাতে গড়া গয়নার সঙ্গে জড়িত, তার দাম ৭০০ টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ১,৫৬,৮২২ টাকায়। এসব দামে বাধ্যতামূলক মূল্য সংযোজন কর যুক্ত আছে, তবে গয়না তৈরির সময় জুয়েলাররা যে মজুরি বা মেকিং চার্জ নেন তা এই মূল দামের ওপরে আলাদাভাবে যোগ হয়।
এক সপ্তাহের টানাপোড়েন
মঙ্গলবারের এই দাম কমানো বুঝতে হলে কয়েক দিন পেছনে তাকানো দরকার। ৬ সেপ্টেম্বর বাজুস ইতিমধ্যেই ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরিতে ২,২১৬ টাকা কমিয়ে ২,৩৫,১৪৬ টাকায় নামিয়েছিল, স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনার দাম কমে যাওয়াকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে। তার কয়েক দিন আগে আবার সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা ঘটেছিল, ৩ সেপ্টেম্বর বাজুস ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরিতে ৫,৪৮২ টাকার মতো বড় অঙ্কে বাড়িয়েছিল, আর সেই বৃদ্ধিও এসেছিল টানা তিনবার দাম কমার পর। মঙ্গলবারের কমতির সঙ্গে শনিবারেরটা যোগ করলে, সর্বশেষ দুই দফা সমন্বয়ে মোট দাম কমেছে ভরিতে ৩,৩২৪ টাকা, যা সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে হওয়া বড় বৃদ্ধির একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ফিরিয়ে নিয়েছে।
চলতি বছরে এ পর্যন্ত বাজুস মোট ১১১ বার সোনার দাম সমন্বয় করেছে, এর মধ্যে ৫৬ বার বেড়েছে, ৫৪ বার কমেছে আর একবার শুধু ভ্যাটের কারণে সমন্বয় হয়েছে। এই অস্বাভাবিক ঘন ঘন পরিবর্তন বলে দেয়, স্থানীয় দাম আন্তর্জাতিক সোনার বাজারের ওঠানামার সঙ্গে কতটা সরাসরি জড়িয়ে আছে। বাজুসের মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া অনুযায়ী, তাদের মূল্য নির্ধারণ ও পর্যবেক্ষণ স্থায়ী কমিটি তেজাবি সোনার প্রচলিত দাম আর আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে তুলনা করে দাম পর্যালোচনা করে, আর ব্যবধান যথেষ্ট বড় হলেই তারা দেশীয় দাম সমন্বয় করে, কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে চলার বদলে।
সোনার দাম কেন এত লাফালাফি করছে
ঢাকার এই ওঠানামা আসলে আন্তর্জাতিক বুলিয়ন বাজারের একটা বড় প্রবণতারই প্রতিফলন, যেখানে বড় অর্থনীতিগুলোর সুদের হার নিয়ে প্রত্যাশা বদলানো, বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টানা সোনা কেনা, আর ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ঘিরে মাঝে মাঝে নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে এ বছর সোনার দাম বারবার ওঠানামা করেছে। আন্তর্জাতিক দাম যেকোনো দিকে বড় আকারে নড়লে বাংলাদেশের দেশীয় দামও সাধারণত এক-দুই দিনের মধ্যে সেই পথ অনুসরণ করে, কারণ এখানে আনুষ্ঠানিক জুয়েলারি ব্যবসার মাধ্যমে বিক্রি হওয়া প্রায় সব সোনাই আমদানি করা বুলিয়নের দামের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়, দেশে উল্লেখযোগ্য কোনো সোনার খনি নেই বললেই চলে।
সাধারণ ক্রেতাদের জন্য এই দ্রুত সাড়া দেওয়ার প্রবণতার দুটো দিকই আছে। এর মানে হলো, দেশীয় দাম কোনো নির্দিষ্ট দিনে সোনার প্রকৃত মূল্যকে সঠিকভাবেই তুলে ধরে, বৈশ্বিক বাজারের পেছনে সপ্তাহখানেক পিছিয়ে থাকে না। কিন্তু এর মানে এটাও যে বিয়ের মৌসুম বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট তারিখ ঘিরে সোনা কেনার পরিকল্পনা করা কারো পক্ষে কয়েক দিন পরের সঠিক দাম আগেভাগে অনুমান করার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। ঢাকার সোনার বাজারের জুয়েলাররা বলছেন, দাম কমার ঘোষণা এলেই ক্রেতাদের খোঁজখবর হঠাৎ বেড়ে যায়, যারা অপেক্ষায় ছিলেন তারা পরের সমন্বয় আসার আগেই কম দামটা লুফে নিতে ছুটে আসেন, পরের সমন্বয়ে দাম যে দিকেই যাক না কেন।
রূপার দামেও পরিবর্তন, তবে তুলনামূলক কম
সোনার সঙ্গে রূপার দামও একই রকম উঁচু-নিচু পথে চলেছে, যদিও রূপার মূল দাম কম হওয়ায় টাকার অঙ্কে পরিবর্তনটা স্বাভাবিকভাবেই ছোট দেখায়। ৩ সেপ্টেম্বর বাজুস যখন সোনার দাম বাড়িয়েছিল, একই বিজ্ঞপ্তিতে তারা ২২ ক্যারেট রূপার দামও ভরিতে ১১৬ টাকা বাড়িয়েছিল। বাজুস সাধারণত দুই ধাতুর দাম একসঙ্গেই সমন্বয় করে, যা মনে করিয়ে দেয় সোনার দামে যে আন্তর্জাতিক চাপ কাজ করছে, রূপার ওপরও ঠিক একইভাবে তার প্রভাব পড়ে।
ক্রেতাদের যা মাথায় রাখা দরকার
মঙ্গলবারের দাম অনুযায়ী ২২ ক্যারেট সোনার ভরি এখন ২,৩৪,০৩৮ টাকা, যা ৩ সেপ্টেম্বরের বড় বৃদ্ধির পর যে জায়গায় ছিল তার চেয়ে প্রায় ৩,৩০০ টাকা কম, তবে সেই বৃদ্ধির আগে টানা কমতে থাকা সময়ের দামের চেয়ে এখনো অনেকটা বেশি। যারা কাছাকাছি সময়ে বড় অঙ্কের সোনা কেনার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য ভালো হবে কেনার দিন বাজুসের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নেওয়া, কয়েক দিন আগের দামের ওপর ভরসা না করে, কারণ এ বছর বাজুস কতবার দাম বদলেছে তা দেখলেই বোঝা যায়। এক বছরে ১১১ বার দাম সমন্বয় থেকে একটাই বার্তা পাওয়া যায়, বাংলাদেশে সোনার দাম এখন প্রায় আন্তর্জাতিক বাজারের মতোই তরলভাবে বদলাচ্ছে, আর যারা ভালো দামে কিনতে চান তাদেরও জুয়েলারদের মতোই বাজারের দিকে প্রায় সমান মনোযোগ দিয়ে চোখ রাখতে হচ্ছে।
বিয়ে, উৎসব আর সময় মেলানোর সমস্যা
সোনার বাজারে এই ঘন ঘন ওঠানামা একটা বাস্তব পরিকল্পনার সমস্যা তৈরি করে, কারণ এখানে সোনা কেনা সারা বছর সমানভাবে ছড়িয়ে না থেকে নির্দিষ্ট কিছু উপলক্ষ ঘিরেই বেশি হয়। বিশেষ করে বিয়ের কেনাকাটা সাধারণত অনুষ্ঠানের অনেক আগে থেকেই ঠিক করা হয়, পরিবারগুলো প্রায়ই মাস কয়েক আগেই গয়নার বাজেট ঠিক করে ফেলে, যদিও শেষ পর্যন্ত কত টাকা দিতে হবে তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে কেনার দিন বাজুস কোন দাম নির্ধারণ করেছে তার ওপর। ঢাকার পুরোনো সোনার বাজারের জুয়েলাররা বলছেন, পরিকল্পনার সময় আর দামের অস্থিরতার মধ্যে এই অসামঞ্জস্যের কারণে অনেক ক্রেতা এখন বড় বিক্রেতাদের দেওয়া কিস্তিভিত্তিক কেনার ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছেন, যেখানে একদিনে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করার বদলে নির্দিষ্ট বিরতিতে অল্প অল্প করে সোনা কেনা যায়।
দেশীয় বাজারের এই ওঠানামা আসলে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে একটা বড় প্রবণতার অংশ, যেখানে সোনা ক্রমেই সঞ্চয়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ, ভারত আর পাকিস্তানের ক্রেতারা সবাই একই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের দিকে চোখ রাখেন, যদিও স্থানীয় শুল্ক, ভ্যাটের নিয়ম আর জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির কারণে প্রতিটা বাজারে খুচরা দামে কিছুটা পার্থক্য থাকে। বাংলাদেশি ক্রেতাদের জন্য দেশীয় দাম হয়তো তুলনামূলক বেশি স্বচ্ছ, কারণ যেসব বাজারে দোকানভেদে অনানুষ্ঠানিক প্রিমিয়াম ব্যাপকভাবে ভিন্ন হয় তার তুলনায় এখানে বাজুস একটাই সংগঠনভিত্তিক দাম প্রকাশ করে যা প্রতিটা হলমার্কযুক্ত বিক্রেতার মেনে চলার কথা, যদিও এ বছর সেই দামও মোটেও স্থির থাকেনি।
এরপর পড়ুন
সপ্তাহে তৃতীয় দফা কমলো সোনার দাম, ২২ ক্যারেট নামলো ২,৩১,৮৮০ টাকায়
৫ দিনের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো সোনার দাম কমালো বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন। ২ সেপ্টেম্বর থেকে ২২ ক্যারেট সোনার ভরি নেমে এসেছে ২,৩১,৮৮০ টাকায়। বাজুস বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে খাঁটি সোনার দাম কমার কারণেই এই সমন্বয়। ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই দামই বহাল আছে। সঙ্গে সামান্য কমেছে রুপার দামও।
স্বর্ণের দাম আপডেট: তিন দিনে দুই দফা কমিয়ে বাজুস ২২ ক্যারেট সোনার দাম নামাল ২ লাখ ৩৬ হাজার ২৫৪ টাকায়
আগস্টের সেই টানা দাম ওঠানামার পর সেপ্টেম্বরে এসে সোনার বাজার এখন কিছুটা স্থির, তবে দাম নিম্নমুখী। বাজুস তিন দিনে দুই দফায় ২২ ক্যারেট সোনার দাম কমিয়েছে, ২৯ ও ৩১ আগস্ট, প্রতি ভরিতে মোট ১১,৪৮৯ টাকা কমেছে। ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নতুন এই কম দামই স্থির আছে, সঙ্গে কমেছে রূপার দামও। আমাদের আগের প্রতিবেদনের পর কী বদলেছে, আর গয়না কিনতে চাইলে এখন কী মাথায় রাখবেন, তা নিয়েই এই প্রতিবেদন।
সোনার দামে রোলারকোস্টার: এক মাসে ভরিতে ২৫ হাজার টাকার উত্থান-পতন কেন?
চার সপ্তাহেরও কম সময়ে বাংলাদেশে ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরিতে ২ লাখ ২৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ২ লাখ ৪৮ হাজার টাকা ছুঁয়ে আবার নেমে এসেছে ২ লাখ ৪১ হাজার টাকায়। বিয়ের গয়না কিনতে চান, নাকি সঞ্চয় হিসেবে সোনা রাখছেন, অথবা শুধু বুঝতে চান দোকানের রেট কেন বারবার বদলায় তাহলে জেনে নিন আসলে কী এই দাম ওঠানামার পেছনে, আর আপনার পরের কেনাকাটার জন্য এর মানে কী।


