রাজস্ব কমে যাওয়ায় ত্রৈমাসিক ভ্যাট পদ্ধতি থেকে সরে আসার কথা ভাবছে এনবিআর
ব্যবসায়ীদের মাসিক থেকে ত্রৈমাসিক ভ্যাট পরিশোধ পদ্ধতিতে সরানোর মাত্র দুই মাসের মাথায় বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এখন সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার কথা ভাবছে, কারণ জুলাই ও আগস্টে ভ্যাট আদায় আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে। বোর্ড বলছে, ব্যবসায়ীরা আদায় করা ভ্যাট আইনসিদ্ধভাবে তিন মাস পর্যন্ত নিজেদের কাছে রাখতে পারায় ঝুঁকি নজরদারি করতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে, কিন্তু ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বলছে এত দ্রুত নিয়ম পাল্টানো হলে ত্রৈমাসিক পদ্ধতি যে সম্মতি সংস্কার আনতে চেয়েছিল তা-ই মাঠে মারা যাবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য এখন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনুমোদনের অপেক্ষা চলছে, তবে এনবিআর যা-ই সিদ্ধান্ত নিক না কেন, ব্যবসায়ীদের সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ প্রথম ত্রৈমাসিক রিটার্ন জমা দিতে হবে।
বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিজেদেরই একটি বড় সংস্কার চালুর মাত্র তিন মাসের মধ্যে তা থেকে সরে আসার কথা ভাবছে। ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন করে চালু করা ত্রৈমাসিক ভ্যাট পরিশোধ পদ্ধতি বাতিল করে আবার মাসিক রিটার্ন ও পরিশোধ ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া হবে কিনা তা নিয়ে বিবেচনা চলছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটের অংশ হিসেবে জুলাই ২০২৬ থেকে চালু হওয়া এই পদ্ধতিতে নিবন্ধিত ব্যবসায়ীরা গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা মূল্য সংযোজন কর সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার আগে সর্বোচ্চ তিন মাস নিজেদের কাছে রাখতে পারতেন, যা মূলত মাসিক সম্মতির খরচ নিয়ে বছরের পর বছর অভিযোগ করে আসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাগজপত্রের বোঝা কমানোর জন্য আনা হয়েছিল।
তবে বাস্তব দুই মাসের হিসাব পরিকল্পনাটিকে নাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৯,৩০১ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছরের একই মাসে ছিল ১১,৫৪৭ কোটি টাকা। আগস্ট ২০২৬-এ আদায় হয়েছে ৮,৩৬২ কোটি টাকা, যেখানে ২০২৫ সালের আগস্টে ছিল ১১,০৮১ কোটি টাকা। দুই মাস মিলিয়ে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম, এমন এক সময়ে যখন সরকারের ওপর রাজস্বের ভিত্তি সংকুচিত হতে দেওয়ার বদলে বাড়ানোর চাপ রয়েছে।
এনবিআর কেন দ্বিধায়
এই পুনর্বিবেচনার পেছনের যুক্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, বোর্ড নজরদারি ও ঝুঁকি, দুই দিক থেকেই সমস্যায় পড়েছে। আগের মাসিক ব্যবস্থায় ভ্যাট সার্কেল অফিসগুলো প্রতিষ্ঠান, বিভাগ ও ইউনিট অনুযায়ী চলতি ভিত্তিতে আদায় নজরে রাখতে পারত, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ঘাটতি বা অনিয়ম শনাক্ত করা যেত। ত্রৈমাসিক ব্যবস্থায় টানা তিন মাসের জন্য সেই নজরদারি হারিয়ে যাচ্ছে, আর এনবিআর বলছে তাদের কাছে এখনো এমন প্রযুক্তি অবকাঠামো নেই যা প্রায় বাস্তব সময়ে পৃথক ইনভয়েসের বিপরীতে ভ্যাট জমার হিসাব রাখতে পারে, যা দীর্ঘ পরিশোধ সময়কে নিরাপদে পরিচালনা করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ভিত্তি।
আরও একটা মৌলিক উদ্বেগ আছে প্রণোদনা নিয়ে। ব্যবসায়ীরা গ্রাহকদের কাছ থেকে যে ভ্যাট আদায় করেন তা কার্যত সরকারের পক্ষে জমা না দেওয়া পর্যন্ত তাদের কাছে রাখা সরকারি অর্থ। এই সময়সীমা এক মাস থেকে তিন মাসে বাড়ানোর মানে হলো প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি অঙ্কের টাকা বেশি দিন ধরে রাখতে পারছে, আর কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে কিছু ব্যবসায়ী এমন অর্থ থেকে সুদ বা অন্য কোনোভাবে সুবিধা নিচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রাপ্য। সম্মতিও কমে গেছে বলে মনে হচ্ছে, জুনে ৩ লাখ ২৮ হাজার রিটার্ন জমা পড়লেও জুলাইয়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬ হাজারে। এনবিআর এটিকে প্রাথমিক প্রমাণ হিসেবে দেখছে যে রিটার্ন জমার চাপ কমানো সংস্কারকদের প্রত্যাশার বিপরীতে সম্মতি বাড়ায়নি, বরং কমিয়ে দিয়েছে।
পাল্টা যুক্তি দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা
সমাধান যে মাসিক পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া, সবাই তা মানছেন না। কর নীতি নিয়ে সরব নেসলে বাংলাদেশের সাবেক পরিচালক দেবব্রত রায় চৌধুরী সতর্ক করে বলেছেন, এখন মাসিক পদ্ধতিতে ফিরে গেলে তা সরকারের নিজের ঘোষিত লক্ষ্যের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক হবে, যে লক্ষ্য ছিল ব্যবসায়ীদের সম্মতির বোঝা কমানো, আর এফওয়াই২৭ বাজেটে ত্রৈমাসিক পদ্ধতি প্রথম ঘোষণার সময় এটাই ছিল মূল বিক্রয় যুক্তি। ছোট ব্যবসায়ীরা একই যুক্তির আরও বাস্তব সংস্করণ তুলে ধরছেন। ইস্পাত ব্যবসায়ী আমির হোসেন নুরানী বলেন, মাসিক ভ্যাট রিটার্ন ছোট ও মাঝারি ব্যবসার জন্য বিশেষভাবে কষ্টকর, কারণ শুধু কাগজপত্র সামলাতেই তাদের প্রায়ই আলাদা কর্মী রাখতে হয়, যা তাদের ইতিমধ্যে সরু মুনাফার মার্জিনে বাড়তি স্থায়ী খরচ যোগ করে।
বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এই তথ্য যে, ত্রৈমাসিক সুবিধা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার পরও মাঠপর্যায়ের কর কর্মকর্তারা বাস্তবে মাসিক পরিশোধের জন্য চাপ দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করেননি বলে কিছু ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, আইনত অপেক্ষা করার অধিকার থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় অফিস থেকে মাসিক পরিশোধ চালিয়ে যাওয়ার চাপের কথা জানিয়েছেন অনেকে। নীতি কাগজে-কলমে যেমন আর মাঠে বাস্তবায়নে যেমন, এই ফারাকের কারণে সংস্কারের প্রথম প্রান্তিকের হিসাব নিয়ে এনবিআরের পক্ষে স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ জুলাই-আগস্টের ঘাটতির একাংশ হয়তো বিভ্রান্তিকর বাস্তবায়নেরই ফল, শুধু ব্যবসায়ীদের নতুন অধিকার প্রয়োগ করে পরিশোধ পিছিয়ে দেওয়ার ফল নয়।
সংখ্যায় এক নজরে
| সময়কাল | ভ্যাট আদায় | ২০২৫ সালের একই মাস | পরিবর্তন |
|---|---|---|---|
| জুলাই ২০২৬ | ৯,৩০১ কোটি টাকা | ১১,৫৪৭ কোটি টাকা | প্রায় ১৯% কম |
| আগস্ট ২০২৬ | ৮,৩৬২ কোটি টাকা | ১১,০৮১ কোটি টাকা | প্রায় ২৫% কম |
| দুই মাস মিলিয়ে | ১৭,৬৬৩ কোটি টাকা | ২২,৬২৮ কোটি টাকা | প্রায় ২২% কম |
এরপর কী হবে
আপাতত কাগজে-কলমে ত্রৈমাসিক পদ্ধতিই বলবৎ আছে। এনবিআর ব্যবসায়ীদের বলেছে, নীতিগত বিতর্কের ফল যা-ই হোক না কেন, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়কাল ধরে তাদের প্রথম ত্রৈমাসিক রিটার্ন সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ জমা দিতে হবে। অর্থমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রথম পুরো প্রান্তিকের তথ্য পর্যালোচনার পরই ত্রৈমাসিক পদ্ধতি রাখা, সংশোধন করা নাকি বাতিল করা হবে তা নিয়ে সিদ্ধান্ত আসবে, আর এই মাপের যেকোনো পরিবর্তনের জন্য এনবিআরের পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনুমোদন লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই ঘটনাপ্রবাহ এমন এক বছরে যোগ হলো যখন বর্তমান প্রশাসনকে একসঙ্গে একাধিক ফ্রন্টে কর নীতি নিয়ে জবাবদিহি করতে হচ্ছে, জ্বালানি সংকট সহজ করতে সৌর সরঞ্জাম আমদানি শুল্কে বড় কাটছাঁট থেকে শুরু করে পুঁজিবাজার খাতে নতুন মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বাধ্যবাধকতা, এমনকি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রথমবারের মতো সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার প্রস্তুতি পর্যন্ত। একটি ব্যবসাবান্ধব সরলীকরণ হিসেবে উন্মোচনের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় ফ্ল্যাগশিপ ভ্যাট সংস্কার থেকে দ্রুত সরে আসা হবে এক অস্বাভাবিকভাবে দৃশ্যমান স্বীকারোক্তি যে সংখ্যার মুখোমুখি হয়ে একটি প্রধান নীতি টিকতে পারেনি, আর এনবিআরকে এখন সেই সুনামের ক্ষতির বিপরীতে বিবেচনা করতে হবে চলতি ব্যবস্থা অর্থবছরের বাকি সময় অপরিবর্তিত রাখলে দুই মাসের ঘাটতি অনুযায়ী মাসে প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকা ভ্যাট রাজস্ব ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা।
তথ্যসূত্র
এরপর পড়ুন
জ্বালানি সংকট বাড়ার মধ্যেই এনবিআর সোলার সরঞ্জামের আমদানি কর ১৭% থেকে কমিয়ে ১% করল
বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আগামী ১৮০ দিনের জন্য অধিকাংশ সোলার বিদ্যুৎ সরঞ্জামের আমদানি কর কমিয়ে মাত্র ১ শতাংশ করেছে, যা আগে কার্যকরভাবে ছিল ১৭ শতাংশ, আর এর আওতায় পড়ছে প্যানেল ও ইনভার্টার থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ সংরক্ষণের লিথিয়াম ব্যাটারি পর্যন্ত সবকিছু। এই আদেশ নতুন কোনো প্রণোদনার চেয়ে বেশি একটা দেরি করে হলেও প্রয়োজনীয় সংশোধনী, কারণ জুনের জাতীয় বাজেটে ঘোষিত আরও বিস্তৃত শূন্য শতাংশ কর প্যাকেজের কয়েক মাস পরও কাস্টমস অফিসগুলো কিছু আমদানিকারকের কাছ থেকে ২৩ থেকে ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আদায় করছিল, কোন সরঞ্জাম আসলে যোগ্য তা নিয়ে অমীমাংসিত বিভ্রান্তির কারণে। এই কর ছাড়টা এমন এক গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের মাঝখানে এলো যা পোশাক কারখানাগুলোকে জোনভিত্তিক গ্যাস রেশনিং দাবি করতে বাধ্য করেছে আর এই মাসে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি বড় অর্থনৈতিক খবরের পেছনের প্রেক্ষাপট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুই মাসের মাথায় ভ্যাট ব্যবস্থা পাল্টানোর চিন্তায় এনবিআর, রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা
বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড মাত্র দুই মাস আগে চালু করা ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন পদ্ধতি থেকে সরে আসার কথা ভাবছে, কারণ জুলাই ও আগস্টে ভ্যাট আদায় গত বছরের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ কম হয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ৪,৯৬৫ কোটি টাকা। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, তিন মাসের এই সময়সীমার কারণে আগের মতো সার্কেল ও ইউনিট ধরে রাজস্ব আদায় পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে না, আবার কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন বড় প্রতিষ্ঠানগুলো আদায় করা ভ্যাট জমা না দিয়ে সেই টাকায় সুদ আয় করছে। মাসিক ঝামেলা কমার স্বস্তি পাওয়া ব্যবসায়ীরা এখন এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জোরালো আপত্তি জানাচ্ছেন, আর শেষ পর্যন্ত হয়তো একটা মাঝামাঝি পথ বের হবে, রিটার্ন জমা থাকবে ত্রৈমাসিক কিন্তু টাকা জমা দিতে হবে মাসে মাসে।
ত্রৈমাসিক ভ্যাট পদ্ধতিতে ঘাটতি ১৭,৬৬৩ কোটি টাকা, মাসিক পদ্ধতিতে ফেরার কথা ভাবছে এনবিআর
মাত্র কয়েক মাস আগে ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে প্রতি মাসের বদলে তিন মাস পরপর ভ্যাট রিটার্ন ও পরিশোধের সুযোগ দিয়েছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এখন সেই সিদ্ধান্তই আবার পাল্টানোর কথা ভাবছে সংস্থাটি। জুলাই ও আগস্টে ভ্যাট আদায় আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ কমে গেছে, ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৭,৬৬৩ কোটি টাকায়, যা কর্মকর্তা আর আট লাখেরও বেশি ভ্যাট নিবন্ধিত ব্যবসায়ীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
