ব্যাংকিং ও এফডিআর

ব্র্যাক ব্যাংকের সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডারকে তিনগুণ বোর্ড আসন দিল বাংলাদেশ ব্যাংক

১৩ অক্টোবর, ২০২৬4 মিনিটের পড়া
ব্র্যাক ব্যাংকের সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডারকে তিনগুণ বোর্ড আসন দিল বাংলাদেশ ব্যাংক

ব্র্যাক ব্যাংকের জন্য একটি বোর্ড নিয়ম শিথিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যার ফলে ব্যাংকটির সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার এখন একজনের পরিবর্তে তিনজন পর্যন্ত প্রতিনিধি পরিচালক নিয়োগ দিতে পারবে। ১২ অক্টোবরের এই সার্কুলারে উপকৃত হচ্ছে ব্র্যাক, যার হাতে একজন কর্মকর্তার তথ্যানুযায়ী ব্যাংকটির ৪৬ শতাংশ শেয়ার আছে। এই বছরের মধ্যে এটি দ্বিতীয় এমন নির্দিষ্ট ব্যাংকের জন্য দেওয়া ছাড়, এর আগে মার্চে ট্রাস্ট ব্যাংককেও একই ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছিল।

ব্র্যাক ব্যাংকের জন্য দীর্ঘদিনের একটি বোর্ড নিয়ম শিথিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যার ফলে ব্যাংকটির সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার এখন একজনের পরিবর্তে তিনজন পর্যন্ত প্রতিনিধি পরিচালক নিয়োগ দিতে পারবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১২ অক্টোবর একটি সার্কুলার জারি করে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ এর ১২১ ধারার ক্ষমতা ব্যবহার করে ওই আইনেরই ২৩(১)(kakaka) উপধারার একটি অংশ শুধু ব্র্যাক ব্যাংকের জন্য মওকুফ করে দিয়েছে।

  • বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী ব্র্যাক ব্যাংকের ৪৬ শতাংশ শেয়ারের মালিক ব্র্যাক, এখন একজনের পরিবর্তে তিনজন পর্যন্ত পরিচালক নিয়োগ দিতে পারবে
  • এই ছাড় শুধু ব্র্যাক ব্যাংকের জন্যই প্রযোজ্য, ব্যাংকিং খাতে কোনো একক প্রতিষ্ঠানই তিনজনের বেশি পরিচালক নিয়োগ দিতে পারবে না
  • এর আগে মার্চে ট্রাস্ট ব্যাংকের একমাত্র পৃষ্ঠপোষক শেয়ারহোল্ডার আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টকেও একই ধরনের আলাদা ছাড় দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক
  • এই সিদ্ধান্ত এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক বোর্ডে পরিবারভিত্তিক নিয়ন্ত্রণের সীমা পুরো খাতের জন্য শিথিল করার কয়েক সপ্তাহ পরেই

যে নিয়মটি ব্র্যাককে পিছিয়ে রেখেছিল

ব্যাংক কোম্পানি আইনের ২৩(১)(kakaka) উপধারা অনুযায়ী, কোনো একক প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ারহোল্ডার যত বড় অংশীদারিত্বই রাখুক, একটি ব্যাংকের বোর্ডে একজনের বেশি প্রতিনিধি পরিচালক রাখতে পারে না। ব্র্যাকের জন্য, যে বেসরকারি সংস্থাটি বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তার তথ্যানুযায়ী ব্র্যাক ব্যাংকের ৪৬ শতাংশ শেয়ারের মালিক, এর মানে ছিল প্রায় অর্ধেক মালিকানা থাকা সত্ত্বেও বোর্ডে তাদের আসন সংখ্যা ঠিক তেমনই, যতটা একজন খুবই ছোট শেয়ারহোল্ডারেরও থাকতে পারত। ১২ অক্টোবরে জারি করা নতুন সার্কুলারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের ১২১ ধারার মওকুফ ক্ষমতা প্রয়োগ করে ব্র্যাককে তিনজন পর্যন্ত প্রতিনিধি পরিচালক নিয়োগের অনুমতি দিয়েছে, তবে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্যও এই সীমা তিনেই বেঁধে রেখেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য এমন ছাড় নতুন কিছু নয়

এই ধরনের ছাড় পাওয়া ব্র্যাক ব্যাংকই প্রথম নয়। মার্চ মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসিকেও একই বিধিনিষেধ থেকে ছাড় দিয়েছিল, যাতে তাদের একমাত্র পৃষ্ঠপোষক শেয়ারহোল্ডার আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট একজনের বেশি পরিচালক নিয়োগ দিতে পারে, সে সময় এই খবর প্রকাশ করেছিল দ্য ডেইলি স্টার। সেই ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ব্যাখ্যা করেছিলেন, ট্রাস্ট ব্যাংকের একমাত্র পৃষ্ঠপোষক শেয়ারহোল্ডার থাকার কারণেই এই ছাড় যুক্তিসঙ্গত, কারণ সাধারণত বেশিরভাগ ব্যাংকেরই একাধিক পৃষ্ঠপোষক শেয়ারহোল্ডার থাকে। ব্র্যাক ব্যাংকের ঘটনাটি খুঁটিনাটিতে আলাদা, কারণ ব্র্যাক ট্রাস্ট ব্যাংকের মতো একমাত্র শেয়ারহোল্ডার নয়, তবে মূল যুক্তিটা একই রকম, নিয়ন্ত্রকরা যা মনে হচ্ছে একটা একটা ঘটনা ধরে বিবেচনা করে বড় শেয়ারহোল্ডারকে তার অংশীদারিত্বের অনুপাতে বোর্ডে উপস্থিতি দিতে রাজি, কোনো সাধারণ নিয়ম বদলের মাধ্যমে নয়।

সময়টাও গুরুত্বপূর্ণ। বিডি ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ এই মাসের শুরুতেই প্রতিবেদন করেছিল, বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ মোকাবিলার ১৮ মাসের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যাংক বোর্ডে পরিবারভিত্তিক নিয়ন্ত্রণের নিয়মও পুরো খাতের জন্য শিথিল করেছে। ব্র্যাক ব্যাংকের এই ছাড় বলে দিচ্ছে, নিয়ন্ত্রকরা একইসাথে একাধিক ফ্রন্টে বোর্ড গঠনের নিয়ম সামঞ্জস্য করতে রাজি, একদিকে বোর্डে কতজন পরিবারের সদস্য থাকতে পারবে তার সীমা, আর আলাদাভাবে একক বড় প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ারহোল্ডার কতটি আসন পেতে পারে তার সীমাও।

পুরনো নিয়ম বনাম নতুন ছাড়

প্রচলিত নিয়ম (ধারা ২৩(১)(kakaka))ব্র্যাক ব্যাংকের ছাড় (১২ অক্টোবরের সার্কুলার)
প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ারহোল্ডারের প্রতিনিধি পরিচালকসর্বোচ্চ একজনতিনজন পর্যন্ত
প্রযোজ্যসব ব্যাংক, সব প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ারহোল্ডারশুধু ব্র্যাক ব্যাংক, যেকোনো একক প্রতিষ্ঠানের জন্য সর্বোচ্চ তিন
আইনি ভিত্তিব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১, ধারা ২৩(১)(kakaka)একই আইনের ১২১ ধারার আওতায় মওকুফ
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আগের ট্রাস্ট ব্যাংকের ঘটনার বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন, বেশিরভাগ ব্যাংকেরই একাধিক পৃষ্ঠপোষক শেয়ারহোল্ডার থাকে, যে কারণে একজন পরিচালকের সীমা তাদের জন্য ব্যবহারিকভাবে তেমন কঠোর নয়, যতটা ব্র্যাক ব্যাংকের মতো ব্যাংকের জন্য, যেখানে একজন শেয়ারহোল্ডারের হাতেই প্রায় অর্ধেক মালিকানা।

নিয়ন্ত্রকরা কেন ব্যাংক ধরে ধরে এটা সামলাচ্ছেন

বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে সরাসরি ২৩(১)(kakaka) ধারাটাই পুরো খাতের জন্য পুনর্লিখন করতে পারত, যেখানে অনুমোদিত প্রতিনিধি পরিচালকের সংখ্যা শেয়ারহোল্ডারের অংশীদারিত্বের আকারের সাথে যুক্ত থাকত। কিন্তু এর বদলে তারা এখন পর্যন্ত দুবারই নির্দিষ্ট ব্যাংকের জন্য সীমিত ছাড় দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে, প্রথমে ট্রাস্ট ব্যাংকের অস্বাভাবিক একক পৃষ্ঠপোষক কাঠামোর জন্য, আর এখন ব্র্যাক ব্যাংকের ৪৬ শতাংশ কেন্দ্রীভূত মালিকানার জন্য। এই একটা একটা ঘটনা ধরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রকের হাতে প্রতিটি সিদ্ধান্তের ওপর বেশি নিয়ন্ত্রণ থাকে এবং খাতের প্রতিটি বড় শেয়ারহোল্ডার স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই সুবিধা দাবি করার দরজা খুলে যায় না, তবে এর অর্থ এটাও যে একই রকম পরিস্থিতিতে থাকা অন্য ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের সম্ভবত নিজেদের জন্য আলাদাভাবে ছাড়ের আবেদন করতে হবে, কোনো সাধারণ নিয়ম বদলের সুফল এমনিতেই পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।

আপনার জন্য এর মানে কী

ব্র্যাক ব্যাংকের আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতাদের জন্য, বোর্ডের আসন বদল সাধারণত দৈনন্দিন ব্যাংকিং কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব ফেলে না, তবে এটা মনে করিয়ে দেয় যে বড় শেয়ারহোল্ডাররা কৌশল, ঋণ অগ্রাধিকার এবং ঝুঁকি গ্রহণের সিদ্ধান্তে তাদের আনুষ্ঠানিক প্রভাব জোরদার করছে, এমন একটি ব্যাংকে যা বহু পরিবার আর ছোট ব্যবসায়ী সঞ্চয় ও ঋণের জন্য ব্যবহার করে। এই ধরনের পরিচালনা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া কোনো ব্যাংকে যদি আপনার স্থায়ী আমানত বা ডিপিএস হিসাব থাকে, সাধারণত তা সব তফসিলি ব্যাংকের জন্য প্রযোজ্য একই আমানত সুরক্ষা নিয়মেই সুরক্ষিত থাকে, তবে আগামী কয়েক মাসে ব্যাংকের তথ্য প্রকাশে চোখ রাখাটা যুক্তিসঙ্গত।

ব্র্যাক ব্যাংক বা অন্য কোনো তালিকাভুক্ত ব্যাংকের সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের জন্য, এই ছাড় একটা দৃষ্টান্ত হিসেবে নজরে রাখার মতো বিষয়। এটা বলে দিচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংক একটা একটা ঘটনা বিবেচনা করে প্রভাবশালী শেয়ারহোল্ডারের বোর্ড উপস্থিতি তার মালিকানার অনুপাতে বাড়াতে রাজি, যা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে যদি আপনি এমন কোনো ব্যাংকের শেয়ার ধরে থাকেন যার মালিকানা কাঠামো একইভাবে কেন্দ্রীভূত এবং আপনি অনুমান করার চেষ্টা করছেন তার বোর্ড ভবিষ্যতে কীভাবে বদলাতে পারে।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

বিদেশি ব্যাংকের মুনাফা প্রথমার্ধে ৩৮ শতাংশ কমল, ট্রেজারি বাজিতে এগিয়ে দেশি ব্যাংক

বাংলাদেশে কার্যরত নয়টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সম্মিলিত নিট মুনাফা ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ৩৮ শতাংশ কমে হয়েছে ২,৩২১ কোটি টাকা, দুর্বল বাণিজ্য অর্থায়ন ও জ্বালানি সংকটের কারণে। একই সময়ে, অনেক তালিকাভুক্ত দেশি ব্যাংক ভালো মুনাফা বৃদ্ধি দেখিয়েছে, যার প্রায় পুরোটাই এসেছে সরকারি সিকিউরিটিজের বিনিয়োগ আয় থেকে, নতুন ঋণ বিতরণ থেকে নয়। বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার খাতের গড়ের চেয়ে এখনও অনেক কম এবং তাদের মূলধন মজুদ অনেক বেশি শক্তিশালী।

উত্তোলনের চাপে ন্যাশনাল ব্যাংককে ৭,০০০ কোটি টাকা ধার দিল সোনালী ব্যাংক, পরীক্ষার মুখে বাংলাদেশের বেলআউট পরিকল্পনা

রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংককে ৭,০০০ কোটি টাকা ধার দিয়েছে, যার পুরোটার গ্যারান্টি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, তিন দিনে প্রায় ৭,৫০০টি উত্তোলনের আবেদন আসার পর। এই ঋণ ন্যাশনাল ব্যাংককে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে পুরো উত্তোলন সুবিধা ফিরিয়ে আনার সময়সীমা পূরণে সহায়তা করার জন্য। ব্যাংকটি এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণী, যা সিকদার পরিবারের আমলে শুরু হওয়া সমস্যার গভীরতার কথা মনে করিয়ে দেয়।

আইডিআরএর তৃতীয় দফার পরিশোধে বিমা দাবি নিষ্পত্তি ছাড়াল ৬৪ কোটি টাকা

বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) ৪ অক্টোবর ৭,৬৪১ জন পলিসিহোল্ডারকে ২৬.৩৭ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে, যা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় দফা এবং সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে চলা একটা অভিযানের তৃতীয় দফা, যার মাধ্যমে মোট ১৬,০৫৮ জন পলিসিহোল্ডারের ৬৩.৯১ কোটি টাকার দাবি মেটানো হয়েছে। সর্বশেষ দফায় সবচেয়ে বেশি অংশ পেয়েছেন পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের পলিসিহোল্ডাররা, ২,৩৪৮ জনকে দেওয়া হয়েছে ৯ কোটি টাকা, আরও পাঁচটি লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানিও এই দফায় ছিল। এই পরিশোধের টাকা আসছে বিমা কোম্পানিগুলোর নিজস্ব সম্পদ ও সরকারি সিকিউরিটি থেকে, সরকারি বেলআউট থেকে নয়, যা আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভীনের এমন একটা খাতে আস্থা পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার অংশ যেখানে দাবি বছরের পর বছর অপরিশোধিত থেকে গেছে।