২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ২৮ শতাংশ, সবচেয়ে বড় ধাক্কা ইকুইটিতে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগের বছরের তুলনায় ২৮ শতাংশ কম অর্থ বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন। নতুন বিনিয়োগকারীর আস্থার সবচেয়ে স্পষ্ট সূচক নিট ইকুইটি মূলধন প্রবাহ কমেছে ৫৫ শতাংশ, নেমে এসেছে মাত্র ১৫৫ মিলিয়ন ডলারে। অর্থনীতিবিদরা এই পতনের পেছনে জ্বালানি সংকট, বাণিজ্য বিঘ্ন এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপকেই মূল কারণ বলছেন।
২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আগের বছরের তুলনায় ২৮ শতাংশ কমেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী। আর সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে সেই খাতে, যেটাকে অর্থনীতিবিদরা সবচেয়ে গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করেন, নতুন ইকুইটি মূলধন। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ নেমে এসেছে প্রায় ৭৯৫ মিলিয়ন ডলারে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল ১,১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি।
- ২০২৬ সালের জানুয়ারি জুনে নিট এফডিআই বছরওয়ারি ২৮ শতাংশ কমে প্রায় ৭৯৫ মিলিয়ন ডলারে
- নতুন ব্যবসায়িক প্রতিশ্রুতির সবচেয়ে স্পষ্ট সূচক নিট ইকুইটি মূলধন কমেছে ৫৫ শতাংশ, দাঁড়িয়েছে ১৫৫ মিলিয়ন ডলারে
- আন্তঃকোম্পানি ঋণ কমেছে ৯১ শতাংশ, আর পুনঃবিনিয়োগকৃত মুনাফা বেড়েছে ৬৮ শতাংশ
- অর্থনীতিবিদরা এই পতনের পেছনে জ্বালানি সংকট, সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য বিঘ্নকেই মূল কারণ বলছেন
কেন সার্বিক সংখ্যার চেয়ে ইকুইটি মূলধনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিট এফডিআই পরিসংখ্যানে তিনটি একেবারে ভিন্ন জিনিস মিলিয়ে দেখানো হয়, নতুন বা সম্প্রসারিত ব্যবসায় বিনিয়োগকারীদের আনা তাজা ইকুইটি মূলধন, বিদেশি মূল কোম্পানি ও তার বাংলাদেশি সহযোগীর মধ্যে আন্তঃকোম্পানি ঋণ, এবং বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানি দেশে যে মুনাফা দেশে রেখে দেয় তা দেশে ফিরিয়ে না নিয়ে। এই তিনটির মধ্যে ইকুইটি মূলধনকেই সাধারণত বিনিয়োগকারীদের আস্থার সবচেয়ে সত্যিকারের প্রতিফলন বলে গণ্য করা হয়, কারণ এটা এমন টাকা যা নতুন কিছুতে ব্যয় হচ্ছে, কেবল আগের জায়গায় থেকে যাওয়া টাকা নয়।
আর এই খাতেই সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে। নিট ইকুইটি মূলধন প্রবাহ ৫৫ শতাংশ কমে ২০২৫ সালের প্রথমার্ধের ৩৪৫ মিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ১৫৫ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। আন্তঃকোম্পানি ঋণ বছরওয়ারি ৯১ শতাংশ কমেছে, যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এই হারের পেছনের ডলার অঙ্কটা আলাদাভাবে দেখানো হয়নি। পুনঃবিনিয়োগকৃত মুনাফা বরং বিপরীত দিকে গেছে, বেড়েছে ৬৮ শতাংশ, যা বোঝায় বাংলাদেশে কর্মরত কিছু বিদেশি কোম্পানি মুনাফা দেশে ফিরিয়ে না নিয়ে বা নতুন প্রকল্প শুরু না করে বরং দেশেই রেখে দিচ্ছে, যা নতুন সম্প্রসারণের চেয়ে অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ওঠার অপেক্ষায় থাকার লক্ষণ বলেই মনে হয়।
অর্থনীতিবিদরা পতনের পেছনে কী দেখছেন
"এমনিতেই নিচু মাত্রা থেকে আরও বড় পতন হওয়াটা তাই বিশেষভাবে চিন্তার বিষয়," বলেছেন ঢাকাভিত্তিক গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক।
রাজ্জাক বলেন, ইকুইটি বিনিয়োগ বিশেষভাবে "নতুন বা সম্প্রসারিত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে তাজা মূলধনের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি বহন করে," তাই এর ৫৫ শতাংশ পতন তাকে সার্বিক এফডিআই সংখ্যার চেয়েও বেশি চিন্তিত করে। তিনি এই দুর্বলতার পেছনে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্য বিঘ্ন, দুর্বল বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি, বাংলাদেশের নিজস্ব সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের চলমান জটিলতাকে কারণ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, "বাকি মাসগুলোতে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন না হলে, বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালও আরেকটি হতাশাজনক বছর হয়েই থাকবে বলে মনে হচ্ছে।"
যে পুনরুদ্ধার এরই মধ্যে থমকে যাচ্ছে
বছরের প্রথমার্ধের এই পতন এমন একটা বছরের পর এসেছে যাকে কাগজে কলমে একটা বড় মোড় বলেই মনে হচ্ছিল। আঙ্কটাডের বিশ্ব বিনিয়োগ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে এফডিআই প্রবাহ ৪৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ১.৭৮ বিলিয়ন ডলারে, যা ২০২৪ সালে ছিল ১.২৩ বিলিয়ন ডলার, এমনটাই জানিয়েছে ঢাকা ট্রিবিউন। কিন্তু ২০২৫ সালের এই উত্থানও বেশ কিছু ছোট অর্থনীতির চেয়ে পিছিয়ে ছিল, উগান্ডা সেই বছর টেনেছে ৩.৪০ বিলিয়ন ডলার, আর ঘানা ও কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিটি টেনেছে প্রায় ১.৯০ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ জনসংখ্যা ও অর্থনীতির আকারে বহু গুণ বড় হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ এই অঙ্কগুলো ছুঁতে পারেনি। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধ বলে দিচ্ছে, সেই গতি আর বজায় নেই, বরং হয়তো উলটো দিকেই মোড় নিচ্ছে।
২০২৫ ও ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের বিনিয়োগ প্রবাহ
| পরিমাপ | ২০২৫ এর প্রথমার্ধ | ২০২৬ এর প্রথমার্ধ | পরিবর্তন |
|---|---|---|---|
| নিট এফডিআই (সার্বিক) | ১,১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি | প্রায় ৭৯৫ মিলিয়ন ডলার | ২৮% কমেছে |
| নিট ইকুইটি মূলধন | ৩৪৫ মিলিয়ন ডলার | ১৫৫ মিলিয়ন ডলার | ৫৫% কমেছে |
| আন্তঃকোম্পানি ঋণ | প্রযোজ্য নয় | প্রযোজ্য নয় | ৯১% কমেছে |
| পুনঃবিনিয়োগকৃত মুনাফা | প্রযোজ্য নয় | প্রযোজ্য নয় | ৬৮% বেড়েছে |
কেন সার্বিক এফডিআই সংখ্যাটা বিভ্রান্তিকর হতে পারে
এটা মনে রাখা জরুরি যে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিট এফডিআই পরিসংখ্যান আর আঙ্কটাডের বার্ষিক পরিসংখ্যান একদম একই মাপকাঠিতে তুলনীয় নয়, দুটো আলাদা পদ্ধতি এবং সময়সীমা অনুসরণ করে তৈরি, তাই ২০২৫ সালের পূর্ণ বছরের আঙ্কটাড পরিসংখ্যান আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্ধবছরের পরিসংখ্যানকে একই গল্পের দুই অংশ না ভেবে আলাদা দুটি তথ্যবিন্দু হিসেবেই দেখা উচিত। তবে দুটো পরিসংখ্যানই একটা বিষয়ে একমত, দিক নির্দেশনায়, বাংলাদেশ এখনও তার আকারের বা তার চেয়েও ছোট অন্যান্য উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে যতটা বিদেশি মূলধন প্রবাহিত হয় তার একটা ছোট ভগ্নাংশই টানতে পারছে, এবং যা আসছে তার মধ্যে তাজা ইকুইটির বদলে পুনঃবিনিয়োগকৃত মুনাফার অংশই বাড়ছে, এই ধরনের প্যাটার্ন সাধারণত তখনই দেখা যায় যখন বিনিয়োগকারীরা নতুন বাজি ধরার বদলে আগের অবস্থান রক্ষা করার দিকেই বেশি মনোযোগী থাকেন।
আপনার জন্য এর মানে কী
বিদেশি বিনিয়োগনির্ভর খাতে চাকরিপ্রার্থী বা কর্মীদের জন্য তাজা ইকুইটি মূলধনের টানা পতন বিশেষভাবে নজরে রাখার বিষয়, কারণ নতুন প্রকল্পই সাধারণত নতুন নিয়োগ তৈরি করে, পুনঃবিনিয়োগকৃত মুনাফা নয়। বহুজাতিক নিয়োগকর্তারা যদি মূলত মুনাফাই পুনর্ব্যবহার করতে থাকেন, সম্প্রসারণে অর্থ ব্যয় না করে, তাহলে সেই খাতে চাকরির প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে, যদিও কোম্পানিগুলো নিজেরা লাভজনকই থাকবে। যারা বহুজাতিক ক্লায়েন্টদের পণ্য বা সেবা দিয়ে থাকেন ছোট ব্যবসায়ী হিসেবে, তাদের জন্যও একই যুক্তি উলটো দিক থেকে কাজ করে, নতুন বিদেশি বিনিয়োগের উদ্যোগ কম হলে আগামী এক দুই বছরে নতুন কাজের প্রবাহও ধীর হয়ে যেতে পারে।
খুচরা বিনিয়োগকারীদের জন্য, দুর্বল এফডিআই পরিবেশ প্রায়ই সতর্ক পুঁজিবাজারের সঙ্গে একসাথে দেখা যায়, কারণ বিদেশি পোর্টফোলিও প্রবাহ এবং প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ দুটোই বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্পর্কিত একই ধরনের সংকেতের প্রতি সংবেদনশীল। টাকায় সঞ্চয় রাখবেন নাকি অন্য কোথাও বৈচিত্র্য আনবেন তা নিয়ে ভাবলে, বিনিয়োগের পরিবেশ অনিশ্চিত থাকা অবস্থায় বাড়তি টাকা কোথায় রাখবেন তা ঠিক করার আগে সাইটের এফডিআর ও ডিপিএস ক্যালকুলেটর দিয়ে বিকল্পগুলো তুলনা করে দেখা যেতে পারে।
তথ্যসূত্র
এরপর পড়ুন
২৬ মাস বোর্ডশূন্য থাকার পর বিএসইসি পুনর্গঠন করল ১,৭০০ কোটি টাকার বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল
বাংলাদেশের ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড টানা ২৬ মাস কোনো পরিচালনা বোর্ড ছাড়াই চলেছে, শেষ পর্যন্ত এই সপ্তাহে নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সাত সদস্যের একটা অন্তর্বর্তী প্যানেল গঠন করেছে। প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকার এই তহবিল, যা অদাবিকৃত লভ্যাংশ আর শেয়ারের সমন্বয়ে গড়া, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার জন্য তৈরি, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একটা আইনি বিরোধ ২০২৪ সাল থেকে পুরো কাঠামোটাকেই স্থবির করে রেখেছিল। বিএসইসি এখন চায় এই প্রশ্নের চিরস্থায়ী সমাধানের জন্য একটা পূর্ণাঙ্গ আইন, যার খসড়া শিগগিরই সংসদে যাওয়ার কথা।
অনিয়মের পর নগদ লভ্যাংশের নিয়মে কড়াকড়ি আনল বিএসইসি, স্বতন্ত্র পরিচালক পুনর্নিয়োগে দিল স্বস্তি
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানি এখন থেকে নগদ লভ্যাংশের প্রস্তাব এজিএমে তুলতে পারবে না যতক্ষণ না পুরো টাকা একটা আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা থেকে সনদায়িত হয়। সাম্প্রতিক অনিয়মের পরই এই সিদ্ধান্ত এসেছে, সঙ্গে আছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি। একই সভায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্বতন্ত্র পরিচালক পুনর্নিয়োগের প্রক্রিয়া সহজ করেছে, প্রতিবার নতুন পর্যালোচনার বদলে শুধু একটা ক্লিন ক্রেডিট রিপোর্টই এখন যথেষ্ট।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে মুনাফায় চাপ, ডিএসই সূচক নেমে এলো ৫,৪০৪ পয়েন্টে
ঢাকার শেয়ারবাজারের মূল সূচক ডিএসই সোমবার ৪৬ পয়েন্ট কমে ৫,৪০৪ পয়েন্টে নেমে এসেছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট আরও বাড়ার কারণে বিনিয়োগকারীদের অস্বস্তি বেড়েই চলেছে। তালিকাভুক্ত প্রায় পাঁচটি কোম্পানির মধ্যে চারটিরই শেয়ারদর কমেছে, আর লেনদেনের পরিমাণ আগের দিনের তুলনায় এক পঞ্চমাংশের বেশি কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫৩ কোটি টাকায়। বিশ্লেষকদের মতে জ্বালানি সংকটের প্রভাব এখন কোম্পানিগুলোর মুনাফায় দেখা যাচ্ছে, যদিও ট্রেজারি বিলের সুদহার কমায় কিছু শেয়ারকে তুলনামূলক সস্তা মনে হচ্ছে।