বৈদেশিক মুদ্রা ও রেমিট্যান্স

মালদ্বীপ থেকে রেমিট্যান্স সহজ করতে টাকা রুফিয়া বিনিময়ের প্রস্তাব দিল বাংলাদেশ

১২ অক্টোবর, ২০২৬3 মিনিটের পড়া
মালদ্বীপ থেকে রেমিট্যান্স সহজ করতে টাকা রুফিয়া বিনিময়ের প্রস্তাব দিল বাংলাদেশ

মালদ্বীপে থাকা এক লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী যাতে সহজে দেশে টাকা পাঠাতে পারেন, সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক মালদ্বীপ মনিটরি অথরিটিকে একটা মুদ্রা সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মালদ্বীপ থেকে আনুষ্ঠানিক রেমিট্যান্স প্রায় ১৬.৪ শতাংশ কমে ১১৮ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসার পর এই উদ্যোগ নেওয়া হলো, যদিও সেখানে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা এক লাখের ওপরেই আছে। প্রস্তাবে আছে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের মাধ্যমে রুফিয়া নিষ্পত্তি, টাকায় মূল্যায়িত ট্রাভেল কার্ড এবং সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় মুদ্রা বিনিময়, তবে তিনটি পথই এখনও দুই পক্ষের নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের অপেক্ষায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক মালের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে একটা নির্দিষ্ট আবেদন নিয়ে চিঠি লিখেছে, মালদ্বীপে থাকা এক লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী যাতে পথে কোনো অনানুষ্ঠানিক দালালের কমিশন না দিয়ে সহজে দেশে টাকা পাঠাতে পারেন। গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের ৮ অক্টোবরের এই চিঠি মালদ্বীপ মনিটরি অথরিটির গভর্নর আহমেদ মুনাওয়ারকে লেখা, এমন এক সময়ে যখন মালদ্বীপ থেকে আনুষ্ঠানিক রেমিট্যান্স কমছে, যদিও সেখানে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা কমেনি।

  • বাংলাদেশ ব্যাংক মালদ্বীপ মনিটরি অথরিটির কাছে একটা মুদ্রা সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে, যাতে রেমিট্যান্স পাঠানো সহজ হয়
  • ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মালদ্বীপ থেকে আনুষ্ঠানিক রেমিট্যান্স কমেছে প্রায় ১৬.৪ শতাংশ, আগের বছরের ১৪১.১ মিলিয়ন ডলার থেকে নেমে এসেছে প্রায় ১১৮ মিলিয়ন ডলারে
  • কর্মীরা মালদ্বীপের রুফিয়া সহজে ব্যবহারযোগ্য টাকায় রূপান্তর করতে সমস্যায় পড়েন, অনেকেই খোলাবাজারে ডলার কিনতে বাধ্য হন বা আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের উচ্চ ফি দিতে হয়
  • প্রস্তাবে তিনটি পথ আছে, এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের মাধ্যমে রুফিয়া নিষ্পত্তি, টাকায় মূল্যায়িত ট্রাভেল কার্ড, এবং সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা

এই শ্রমশক্তির আকারই বুঝিয়ে দেয় বিষয়টা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। চিঠিতে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল নাগাদ মালদ্বীপে বিদেশি কর্মীর সংখ্যা ছিল দুই লাখের বেশি, যার মধ্যে এক লাখের বেশি বাংলাদেশি। তবু আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে দেশে পাঠানো টাকার পরিমাণ এই উপস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে বাড়েনি। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে মালদ্বীপ থেকে বাংলাদেশ পেয়েছে মাত্র ৩৮.০৫ মিলিয়ন ডলার, এই গতি পুরো বছর ধরে চললে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এমনিতেই কমে যাওয়া মোট অঙ্কের চেয়েও পিছিয়ে থাকবে।

বার চার্টে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য দেখানো হয়েছে, মালদ্বীপ থেকে রেমিট্যান্স ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১৪১.১ মিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১৮ মিলিয়ন ডলারে কমেছে, আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এসেছে ৩৮.০৫ মিলিয়ন ডলার
চার্ট: বিডি ফিনান্সিয়াল রিভিউ, তথ্যসূত্র বাংলাদেশ ব্যাংক, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের মাধ্যমে।

টাকা সহজে কেন দেশে আসছে না

গভর্নরের চিঠি অনুযায়ী মূল সমস্যা হলো, বাংলাদেশি ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো মালদ্বীপের রুফিয়া সরাসরি নিতে রাজি হয় না। এই অনীহা কর্মীদের দুটো অস্বস্তিকর পথে ঠেলে দেয়, হয় খোলাবাজারে অনানুষ্ঠানিক রেটে ডলার কেনা, বা সীমিত আনুষ্ঠানিক চ্যানেল ব্যবহারের জন্য উঁচু ফি দেওয়া। দুটো পথই অদক্ষ, আর দুটোতেই এমন টাকা হারিয়ে যায় যা পুরো মূল্যে বাংলাদেশের পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছাতে পারতো।

দুই দেশের মধ্যে এই নিয়ে কথা এটাই প্রথমবার নয়। এ বছরের শুরুর দিকে মালদ্বীপে বাংলাদেশের হাইকমিশনার ব্যাংক অব মালদ্বীপের প্রধান নির্বাহীর সাথে বৈঠক করেছিলেন, রুফিয়া সরাসরি টাকায় রূপান্তরের একটা সহজ উপায় খুঁজতে, পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ঋণ নিয়েও বৃহত্তর ব্যাংকিং সহযোগিতার কথা হয়েছিল। সেই বৈঠকে সদিচ্ছা আর আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি মিলেছিল, কিন্তু অক্টোবরের গভর্নর পর্যায়ের এই চিঠিতেই প্রথমবার নির্দিষ্ট পদ্ধতিগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব করা হলো।

পাইপলাইন ঠিক করার তিনটি উপায়

চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক যে তিনটি ভিন্ন পদ্ধতি মালদ্বীপ মনিটরি অথরিটিকে বিবেচনা করতে বলেছে তা হলো এরকম। প্রথমটি হলো এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন নামের একটা আঞ্চলিক পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে রুফিয়া পাঠানো, যাতে বাংলাদেশে প্রাপকরা নিজেরা বৈদেশিক মুদ্রা রূপান্তরের ঝামেলায় না গিয়ে অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকের মাধ্যমে সরাসরি টাকা পান। দ্বিতীয়টি রেমিট্যান্সের বদলে ভ্রমণ খরচ নিয়ে, মালদ্বীপের ব্যাংক ও মানি ট্রান্সফার অপারেটররা বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে রুফিয়া নিতে পারবে, আর বাংলাদেশি ব্যাংকগুলো মালদ্বীপে ব্যবহারযোগ্য টাকায় মূল্যায়িত কার্ড ইস্যু করতে পারবে। তৃতীয় এবং কাঠামোগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবটি হলো দুই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে একটা দ্বিপক্ষীয় মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা, যা সরাসরি কর্মীদের আয় দেশে ফেরানো সহজ করার লক্ষ্যে করা।

বাংলাদেশ ব্যাংক মালদ্বীপে বাংলাদেশ মিশনের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটা যৌথ প্রতিনিধি দল পাঠানোর প্রস্তাবও দিয়েছে, যাতে এমএমএর সাথে সরাসরি আলোচনা করা যায়। তবে তিনটি পদ্ধতির কোনোটিই দুই পক্ষের নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন এবং দুই দেশের নিজ নিজ আইন মেনে চলা ছাড়া এগোতে পারবে না, তাই এই প্রস্তাবকে একটা চুক্তি হয়ে যাওয়ার চেয়ে বরং আলোচনার শুরুর অবস্থান হিসেবে দেখা ভালো।

"ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো মালদ্বীপের মুদ্রা সরাসরি নিতে রাজি হয় না।" , বাংলাদেশ ব্যাংকের রেমিট্যান্স চ্যানেল সংক্রান্ত চিঠি থেকে

আপনার জন্য এর মানে কী

মালদ্বীপে থাকা এক লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী এবং তাদের আয়ের উপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর জন্য এই প্রস্তাবের তাৎক্ষণিক প্রভাব আসলে শূন্য, দুই কেন্দ্রীয় ব্যাংক পদ্ধতি আর সময়সীমা নিয়ে একমত না হওয়া পর্যন্ত কিছুই বদলাবে না। কিন্তু সোয়াপ বা ক্লিয়ারিং ব্যবস্থা যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে কর্মীরা খোলাবাজারে ডলার রূপান্তরে কমিশন না দিয়ে বেশি অংশ টাকায় দেশে পাঠাতে পারবেন, আর পরিবারগুলো সেই টাকা নিয়ে পরিকল্পনা করতে পারবে একটা অনুমানযোগ্য বিনিময় হারের ভিত্তিতে, অনানুষ্ঠানিক বাজারের সেই সপ্তাহের যা খুশি রেট নয়।

এর মধ্যে, কেবল মালদ্বীপ নয় যেকোনো দেশ থেকে রেমিট্যান্স পাওয়া পরিবারগুলো বিডি ফিনান্সিয়াল রিভিউয়ের কারেন্সি কনভার্টার দিয়ে যাচাই করে নিতে পারে একটা নির্দিষ্ট পাঠানো টাকা আসলে কত টাকার সমান, খরচ বা সঞ্চয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে, আর কেউ একসাথে পাওয়া রেমিট্যান্সের টাকা ফিক্সড ডিপোজিটে রাখতে চাইলে এফডিআর রেট তুলনা টুল দিয়ে বর্তমান ব্যাংক অফারগুলো তুলনা করে নিতে পারে।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

বিদেশ যাত্রীদের জন্য নগদ ডলার কেনার সীমা ৩,০০০ ডলারে বাড়াল বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংক একজন যাত্রী এক লেনদেনে মানি চেঞ্জার থেকে কত নগদ ডলার কিনতে পারবেন তার সীমা ২,০০০ থেকে ৩,০০০ ডলারে বাড়িয়েছে। গত মাসে বার্ষিক ভ্রমণ কোটা ১৮,০০০ ডলারে বাড়ানোর পরের এই পদক্ষেপ। ২০২৪ সাল থেকে এই সীমাগুলো কীভাবে বদলেছে এবং বিদেশ যাওয়ার প্ল্যান থাকলে এর মানে কী, তা দেখে নেওয়া যাক।

শক্তিশালী টাকা নিঃশব্দে কমিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশের রপ্তানি সুবিধা, ঠিক যখন রপ্তানি রেকর্ড ছুঁয়েছে

দেশের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও জুলাই আর আগস্ট দুই মাসেই ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী হয়েছে বাংলাদেশের টাকা, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিয়াল এফেক্টিভ এক্সচেঞ্জ রেট সূচককে বাড়িয়ে নিয়ে গেছে ১০৫.৩৭ এ, এমন একটা মাত্রা যা বলে দেয় মুদ্রাটা এখন তার বাণিজ্য সহযোগীদের তুলনায় অতিমূল্যায়িত। নাম প্রকাশ না করা বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকাকে অবমূল্যায়ন হতে দেওয়ার কথা ভাবা উচিত, আর সতর্ক করেছেন টাকা এভাবে শক্তিশালী থাকলে রপ্তানি আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সময়টা একটু বেখাপ্পা, এই সতর্কবার্তা এসেছে ঠিক তখনই যখন বাংলাদেশের রপ্তানি এফওয়াই২৭ এর প্রথম প্রান্তিকে ৬.৩ শতাংশ বেড়ে পৌঁছেছে ১৩.১ বিলিয়ন ডলারে, যা প্রশ্ন তোলে একটা স্থায়ীভাবে অতিমূল্যায়িত মুদ্রা এই পুনরুদ্ধারের কতটুকু টিকিয়ে রাখতে দেবে।

সেপ্টেম্বরের ১১ মাসের সর্বনিম্ন থেকে ঘুরে অক্টোবরের শুরুতে রেমিট্যান্স বাড়ল ২১ শতাংশ

প্রবাসী আয় অক্টোবরের প্রথম পাঁচ দিনে আগের বছরের তুলনায় ২১.৪ শতাংশ বেড়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, যা সেপ্টেম্বরের ১১ মাসের সর্বনিম্ন ২.৭৭ বিলিয়ন ডলার থেকে একটা বড় ঘুরে দাঁড়ানো। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিক তবু আগের বছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি, ৮.৫৭ বিলিয়ন ডলারে বন্ধ হয়েছে, কারণ ব্যাংক আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর কারণ বলছে হুন্ডির ওপর কড়াকড়ি আর ডলারের বিনিময় হারের তুলনামূলক স্থিতিশীলতা, যা প্রবাসী আয়কে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, কয়েক দিনের ভালো সংখ্যা সেপ্টেম্বরের পতনের অন্তর্নিহিত কারণ পুরোপুরি মুছে দেয় না, তবে অক্টোবরের শুরুর এই সংখ্যা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ যে এটা একটা সাময়িক ধাক্কা ছিল, কোনো স্থায়ী মোড় পরিবর্তন নয়।