বৈদেশিক মুদ্রা ও রেমিট্যান্স

সেপ্টেম্বর জুড়ে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি দ্রুত কমছে, তবে অর্থবছরের গতি এখনও শক্তিশালী

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬4 মিনিটের পড়াহালনাগাদ ১০ অক্টোবর, ২০২৬
সেপ্টেম্বর জুড়ে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি দ্রুত কমছে, তবে অর্থবছরের গতি এখনও শক্তিশালী

বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ এখনও গত বছরের তুলনায় বেশ এগিয়ে আছে, কিন্তু সেপ্টেম্বর মাস যত গড়িয়েছে, প্রবৃদ্ধির গতি ততই কমেছে। মাসের শুরুতে প্রবাহ গত বছরের তুলনায় ২৩ শতাংশের বেশি বেড়েছিল, কিন্তু মাসের তৃতীয় সপ্তাহ নাগাদ সেই প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ১.৬ শতাংশে। এই ধীরগতি সত্ত্বেও পুরো অর্থবছরের চিত্র এখনও ভালো, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আয় গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে সহায়তা করে চলেছে, তবে বিশ্লেষকরা নজর রাখছেন সেপ্টেম্বরের এই ধীরগতি অক্টোবরেও অব্যাহত থাকে কিনা তা দেখার জন্য।

সেপ্টেম্বরের প্রথম ছয় দিনেই বাংলাদেশে এসেছে ৬৩৭ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স, গত বছরের একই সময়ের ৫১৬ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় যা ২৩.৪ শতাংশ বেশি। এমন সংখ্যা দেখে মনে হচ্ছিল আরেকটা রেকর্ড মাস আসছে, যা ২০২৬ সালের বেশিরভাগ সময় ধরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে কিছুটা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করেছে। কিন্তু তিন সপ্তাহ পরেই সেই গতি প্রায় হারিয়ে গেছে। সেপ্টেম্বরের ২১ তারিখ নাগাদ মাসের মোট প্রবাহ দাঁড়িয়েছে ২.০৬৩ বিলিয়ন ডলারে, গত বছরের একই সময়ের ২.০৩১ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় যা মাত্র ১.৬ শতাংশ বেশি, আর্থিক সংবাদমাধ্যম টিওবি নিউজে প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী।

যে মাস গরম শুরু হয়ে দ্রুত ঠান্ডা হয়ে গেল

সেপ্টেম্বর জুড়ে প্রায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রকাশিত তিনটি আলাদা তথ্য, বিএসএস নিউজ, ডেইলি নিউ নেশন আর টিওবি নিউজে প্রকাশিত, দেখাচ্ছে প্রবৃদ্ধির হার প্রতিবার মাপার সময়ই কমছে, যদিও ডলারের অঙ্কে মোট পরিমাণ বাড়তেই থেকেছে। মাসের প্রথম ছয় দিনে প্রবাহ গত বছরের তুলনায় ২৩.৪ শতাংশ বেশি ছিল। তেরো দিনে গিয়ে সেই প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৯.৩ শতাংশে, ২০২৫ সালের একই সময়ের ১.৩০৬ বিলিয়ন ডলারের বিপরীতে এবার এসেছে ১.৪২৭ বিলিয়ন ডলার। একুশ দিনে গিয়ে প্রবৃদ্ধি আরও কমে দাঁড়ায় মাত্র ১.৬ শতাংশে। তিনটি তথ্যের কোনোটিতেই রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার প্রমাণ নেই। প্রতিটিতেই দেখা যাচ্ছে ডলারের অঙ্কে এই বছর গত বছরের চেয়ে ভালোভাবেই এগিয়ে আছে। যা বদলেছে তা হলো এই ব্যবধান বাড়ার গতি, আর সেই গতি একটা মোটামুটি ধারাবাহিক রেখা ধরে কমে এসেছে।

সময়কাল (সেপ্টেম্বর ২০২৬)এই বছরগত বছরের একই সময়বছরওয়ারি পরিবর্তন
১ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর৬৩৭ মিলিয়ন ডলার৫১৬ মিলিয়ন ডলার+২৩.৪%
১ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর১.৪২৭ বিলিয়ন ডলার১.৩০৬ বিলিয়ন ডলার+৯.৩%
১ থেকে ২১ সেপ্টেম্বর২.০৬৩ বিলিয়ন ডলার২.০৩১ বিলিয়ন ডলার+১.৬%

পুরো অর্থবছরের চিত্র এখনও বেশ ভালো

ক্যালেন্ডার মাসের শুরু থেকে না মেপে যদি ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া বাংলাদেশের অর্থবছর ধরে হিসাব করা হয়, তাহলে এই ধীরগতি চোখে পড়লেও ততটা নাটকীয় মনে হয় না, কারণ শক্তিশালী জুলাই আর আগস্ট মাস এখনও সামগ্রিক হিসাবে বেশিরভাগ কাজ করে দিচ্ছে। ১ জুলাই থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রেমিট্যান্স দাঁড়িয়েছে ৬.৪৬২ বিলিয়ন ডলারে, গত বছরের ৫.৪১৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় যা ১৯.৩ শতাংশ বেশি। ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানলে অর্থবছরের মোট দাঁড়ায় ৭.২৫৩ বিলিয়ন ডলারে, ৬.২০৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১৬.৯ শতাংশ বেশি। ২১ সেপ্টেম্বর নাগাদ অর্থবছরের অঙ্ক পৌঁছায় ৭.৮৮৮ বিলিয়ন ডলারে, গত বছরের ৬.৯৩০ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় যা ১৩.৮ শতাংশ বেশি। মাসিক হিসাবে যে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে এখানেও ঠিক তাই দেখা যাচ্ছে, শুধু অনেক বড় ভিত্তি থেকে আর অনেক মৃদু ঢালে, যা ঠিক তেমনই হওয়ার কথা যদি শক্তিশালী জুলাই আর আগস্টের হিসাব একটা তুলনামূলক সাধারণ সেপ্টেম্বরের কারণে ধীরে ধীরে পাতলা হতে থাকে।

অর্থবছরের এ পর্যন্ত হিসাব (২০২৬-২৭)এই বছরগত বছরের একই সময় (২০২৫-২৬)বছরওয়ারি পরিবর্তন
১ জুলাই থেকে ৬ সেপ্টেম্বর৬.৪৬২ বিলিয়ন ডলার৫.৪১৬ বিলিয়ন ডলার+১৯.৩%
১ জুলাই থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর৭.২৫৩ বিলিয়ন ডলার৬.২০৬ বিলিয়ন ডলার+১৬.৯%
১ জুলাই থেকে ২১ সেপ্টেম্বর৭.৮৮৮ বিলিয়ন ডলার৬.৯৩০ বিলিয়ন ডলার+১৩.৮%

এই ধীরগতির পেছনে কী থাকতে পারে

বছরওয়ারি তুলনা এত দ্রুত কেন কমে এলো তার কোনো ব্যাখ্যা বাংলাদেশ ব্যাংক এখনও প্রকাশ করেনি, আর এই তথ্যের সবচেয়ে সম্ভাব্য পাঠ হলো একটা ভিত্তি প্রভাব। গত বছরের সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স নিজেই ছিল অস্বাভাবিক রকম শক্তিশালী, সরকার পরিবর্তনের পর আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের প্রতি আস্থা বাড়ার আর অবৈধ হুন্ডি লেনদেনের বিরুদ্ধে চলা লাগাতার অভিযানের সুবাদে, যে হুন্ডি লেনদেন আগে প্রবাসী আয়ের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যাংক হিসাবে পৌঁছানোর আগেই সরিয়ে নিত। ইতিমধ্যে উঁচুতে থাকা গত বছরের সেপ্টেম্বরের সাথে এই বছরের তুলনা করলে প্রায় গাণিতিক নিয়মেই শতাংশের হিসাবে কম বৃদ্ধি দেখাবে, যদিও প্রকৃত ডলারের পরিমাণ বাড়তেই থাকে। এই প্রবাহ যারা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করেন তারা সাধারণভাবে, এই নির্দিষ্ট মাসের জন্য না হলেও, উপসাগরীয় দেশগুলোতে বিদেশে জনশক্তি নিয়োগের গতি, মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামা যা একটা নির্দিষ্ট রেমিট্যান্সের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে, আর গন্তব্য দেশগুলোর শিক্ষাবর্ষ আর নিয়োগ চক্রের সাথে জড়িত মৌসুমি ধরনের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যেগুলো দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতায় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত না দিয়েও মাসে মাসে ওঠানামা ঘটাতে পারে।

রিজার্ভ আর টাকার জন্য কেন এটা এখনও গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশ ব্যাংক বারবার বলে এসেছে, রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি রেমিট্যান্সই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থান ধরে রাখার দুটো প্রধান স্তম্ভের একটা। এই মাসের শুরুর দিকের বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে মোট রিজার্ভ ৩৬ থেকে ৩৭ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ছিল, আর আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ তার চেয়ে কয়েক বিলিয়ন ডলার কম, যা তহবিলের সুপারিশ করা ন্যূনতম তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের চেয়ে বেশ বেশিই আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহ এই রিজার্ভের অবস্থান আর সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে সহায়তা করে চলেছে, এমন ভাষা এই বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য প্রকাশের সময় বারবার এসেছে, তা কোনো মাসের প্রবৃদ্ধির হার ২০ শতাংশের কাছাকাছি থাকুক বা প্রায় স্থির থাকুক না কেন। বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের কাছ থেকে ডলারের স্থির প্রবাহ সরাসরি টাকার বাজারেও প্রভাব ফেলে, বাড়তে থাকা বাণিজ্য ঘাটতি আর সরকারের বেশি ঋণ নেওয়ার কারণে বিনিময় হারের ওপর যে চাপ পড়তে পারত তা কিছুটা কমিয়ে দেয়।

এরপর যা দেখার আছে

২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্তের এই হিসাব এখনও অস্থায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের মাস চলাকালীন প্রতিবেদন সবসময় যেমন থাকে, আর অক্টোবরের শুরুতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুরো সেপ্টেম্বরের তথ্য প্রকাশ করলেই মাসের সম্পূর্ণ চিত্র নিশ্চিত হবে। প্রবৃদ্ধির হার শূন্যের দিকে আরও কমতে থাকবে, নাকি এখন যেখানে আছে সেখানেই স্থিতিশীল থাকবে, নাকি মাসের শেষ সপ্তাহের হিসাব যোগ হলে আবার ঘুরে দাঁড়াবে, এটাই এখন রেমিট্যান্স প্রবাহ অনুসরণকারী যে কারো জন্য সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন। একটা দুর্বল সেপ্টেম্বর নিজে থেকে অর্থবছরের শক্তিশালী প্রথম প্রান্তিককে উল্টে দেবে না, তবে বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি দৃশ্যমানভাবে কমতে থাকার পরপর দ্বিতীয় মাস দেখা গেলে প্রশ্ন আরও জোরালো হবে যে গত এক বছরের অসাধারণ গতি কি তার দীর্ঘমেয়াদি স্বাভাবিক প্রবণতার দিকে ফিরতে শুরু করেছে।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

মালদ্বীপ থেকে রেমিট্যান্স সহজ করতে টাকা রুফিয়া বিনিময়ের প্রস্তাব দিল বাংলাদেশ

মালদ্বীপে থাকা এক লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী যাতে সহজে দেশে টাকা পাঠাতে পারেন, সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক মালদ্বীপ মনিটরি অথরিটিকে একটা মুদ্রা সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মালদ্বীপ থেকে আনুষ্ঠানিক রেমিট্যান্স প্রায় ১৬.৪ শতাংশ কমে ১১৮ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসার পর এই উদ্যোগ নেওয়া হলো, যদিও সেখানে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা এক লাখের ওপরেই আছে। প্রস্তাবে আছে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের মাধ্যমে রুফিয়া নিষ্পত্তি, টাকায় মূল্যায়িত ট্রাভেল কার্ড এবং সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় মুদ্রা বিনিময়, তবে তিনটি পথই এখনও দুই পক্ষের নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের অপেক্ষায়।

বিদেশ যাত্রীদের জন্য নগদ ডলার কেনার সীমা ৩,০০০ ডলারে বাড়াল বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংক একজন যাত্রী এক লেনদেনে মানি চেঞ্জার থেকে কত নগদ ডলার কিনতে পারবেন তার সীমা ২,০০০ থেকে ৩,০০০ ডলারে বাড়িয়েছে। গত মাসে বার্ষিক ভ্রমণ কোটা ১৮,০০০ ডলারে বাড়ানোর পরের এই পদক্ষেপ। ২০২৪ সাল থেকে এই সীমাগুলো কীভাবে বদলেছে এবং বিদেশ যাওয়ার প্ল্যান থাকলে এর মানে কী, তা দেখে নেওয়া যাক।

শক্তিশালী টাকা নিঃশব্দে কমিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশের রপ্তানি সুবিধা, ঠিক যখন রপ্তানি রেকর্ড ছুঁয়েছে

দেশের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও জুলাই আর আগস্ট দুই মাসেই ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী হয়েছে বাংলাদেশের টাকা, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিয়াল এফেক্টিভ এক্সচেঞ্জ রেট সূচককে বাড়িয়ে নিয়ে গেছে ১০৫.৩৭ এ, এমন একটা মাত্রা যা বলে দেয় মুদ্রাটা এখন তার বাণিজ্য সহযোগীদের তুলনায় অতিমূল্যায়িত। নাম প্রকাশ না করা বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকাকে অবমূল্যায়ন হতে দেওয়ার কথা ভাবা উচিত, আর সতর্ক করেছেন টাকা এভাবে শক্তিশালী থাকলে রপ্তানি আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সময়টা একটু বেখাপ্পা, এই সতর্কবার্তা এসেছে ঠিক তখনই যখন বাংলাদেশের রপ্তানি এফওয়াই২৭ এর প্রথম প্রান্তিকে ৬.৩ শতাংশ বেড়ে পৌঁছেছে ১৩.১ বিলিয়ন ডলারে, যা প্রশ্ন তোলে একটা স্থায়ীভাবে অতিমূল্যায়িত মুদ্রা এই পুনরুদ্ধারের কতটুকু টিকিয়ে রাখতে দেবে।