অর্থনীতি ও নীতি

বাংলাদেশ আবার আইএমএফের দ্বারে, ২০২৯ সাল পর্যন্ত নতুন ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণের আবেদন

১৬ অক্টোবর, ২০২৬4 মিনিটের পড়া
বাংলাদেশ আবার আইএমএফের দ্বারে, ২০২৯ সাল পর্যন্ত নতুন ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণের আবেদন

সাড়ে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ কর্মসূচি থেকে নির্ধারিত সময়ের আট মাস আগেই সরে আসার পাঁচ মাস পর বাংলাদেশ ফিরে গেছে ব্যাংককের আলোচনার টেবিলে, এবার চাইছে নতুন করে সাড়ে চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের ঋণ। রাজস্ব জিডিপির অনুপাত নেমে এসেছে মাত্র সাত শতাংশে, আর ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ পৌঁছে গেছে মোট ঋণের প্রায় এক তৃতীয়াংশে, এমন সময়েই এসেছে এই নতুন আবেদন। অর্থ উপদেষ্টা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলছেন, আলোচনা বছরের শেষ নাগাদ শেষ হওয়ার কথা, আর ঋণ ছাড় হবে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ত্রৈমাসিক কিস্তিতে।

নির্ধারিত সময়ের আট মাস আগে একটা আইএমএফ কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসার পাঁচ মাসের মধ্যেই বাংলাদেশ আবার সেই পথে ফিরছে। ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে অর্থ উপদেষ্টা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নিশ্চিত করেছেন, সরকার নতুন করে সাড়ে চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের একটা ঋণ চাইছে, যা ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ত্রৈমাসিক কিস্তিতে ছাড় হওয়ার কথা।

  • ২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশ সাড়ে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ কর্মসূচি থেকে সরে আসে, নির্ধারিত শেষ হওয়ার আট মাস আগে, তখন পর্যন্ত পাঁচটি কিস্তিতে পাওয়া গিয়েছিল ৩.৮ বিলিয়ন ডলার।
  • নতুন আবেদনে চাওয়া হচ্ছে সাড়ে চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার, যা স্টাফ লেভেল চুক্তির পর ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ত্রৈমাসিক কিস্তিতে ছাড় হবে।
  • আইএমএফ জোর দিচ্ছে রাজস্ব আদায়ের ওপর, কারণ বাংলাদেশের কর জিডিপি অনুপাত নেমে এসেছে মাত্র সাত শতাংশে, আর ব্যাংক খাতের সংস্কারের ওপর, যেখানে খেলাপি ঋণ পৌঁছে গেছে মোট ঋণের প্রায় ৩৩ শতাংশে।
  • এই মাসের শেষ দিকে আইএমএফের একটি মিশন বাংলাদেশ সফরে আসছে, আর বোর্ডের সিদ্ধান্ত আসবে স্টাফ পর্যায়ের আলোচনা ও এক্সিকিউটিভ বোর্ড পর্যালোচনার পরই।

যে কর্মসূচি থেকে বাংলাদেশ সরে এসেছিল

এই নতুন আবেদনের পেছনের গল্পটা শুরু হয় আগের একটা কর্মসূচি থেকে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আগের সরকারের আমলে বাংলাদেশ ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ ঋণে সই করে, যা পরে বাড়িয়ে সাড়ে পাঁচ বিলিয়ন ডলার করা হয়। অন্তর্বর্তীকালীন ও বর্তমান সরকার মিলে পাঁচটি কিস্তি শেষ করার পর দেশ পেয়েছিল ৩.৮ বিলিয়ন ডলার। তারপর, ২০২৬ সালের মে মাসে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার নির্ধারিত সময়ের আট মাস আগেই এই কর্মসূচি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়, ফলে প্রায় ১.৭ বিলিয়ন ডলার আর তোলা হয়নি।

তখন কর্মকর্তারা এই সিদ্ধান্তকে একটা আস্থার প্রতীক বলে তুলে ধরেছিলেন, আইএমএফের শর্তের বদলে সার্বভৌম বন্ডের মাধ্যমে টাকা তোলার একটা সুযোগ। নিজের শর্তে ঋণ নেওয়ার বিকল্প হিসেবে বন্ড বাজারের পরিকল্পনার কথা তখন বেশ জোর দিয়ে বলা হচ্ছিল। পাঁচ মাস পর সেই হিসাব বদলে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সঙ্গে জড়িত জ্বালানির খরচ, খেলাপি ঋণের ভারে কাতরানো ব্যাংক খাত, আর জিডিপির অনুপাতে দিন দিন ছোট হয়ে আসা রাজস্ব ভিত্তি সরকারকে আবার ওয়াশিংটনের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

এবার আইএমএফ যা চাইছে

১৫ অক্টোবর ব্যাংককে একটি আঞ্চলিক সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফের এশিয়া প্যাসিফিক বিভাগের উপ পরিচালক সোনালী জেইন চন্দ্র বলেন, নতুন কর্মসূচির আলোচনায় রাজস্ব আদায় আর আর্থিক খাতের সংস্কারই মূল বিষয়। বাংলাদেশের কর জিডিপি অনুপাত বিশ্বের সবচেয়ে নিচের দিকে, আর এটা বাড়াতে না পারলে ব্যাংক ঋণের ওপর এত বেশি নির্ভর না করে উন্নয়ন খাতে খরচ চালানো কঠিন হয়ে যাবে।

জেইন চন্দ্র সাংবাদিকদের বলেন, "নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনার অংশ হিসেবে এই বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে," আর যুক্ত করেন যে আইএমএফ ঢাকার সঙ্গে সংস্কার নিয়ে কাজ করছে এবং অগ্রগতি দেখছে।

আইএমএফ আরও চায় বাংলাদেশ মুদ্রানীতি কঠোর রাখুক, যতদিন না মূল্যস্ফীতি, যা আইএমএফের হিসাবে এই অর্থবছরে গড়ে ১০.৯ শতাংশ থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। জীবনযাত্রার খরচ নিয়ে চাপে থাকা একটা সরকারের জন্য এটা স্বস্তিদায়ক কোনো দাবি না, কিন্তু আইএমএফ কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে অসময়ে নীতি শিথিল করলে পুরো কর্মসূচির বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়বে।

তাড়াহুড়ার পেছনের সংখ্যাগুলো

মাপকাঠি২০২৩ সালের কর্মসূচিপ্রস্তাবিত নতুন কর্মসূচি
ঋণের আকার৪.৭ বিলিয়ন ডলার, পরে বাড়িয়ে সাড়ে পাঁচ বিলিয়ন ডলারসাড়ে চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার (আলোচনায়)
ছাড় হওয়া অর্থপাঁচ কিস্তিতে ৩.৮ বিলিয়ন ডলারএখনও শুরু হয়নি; ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে ত্রৈমাসিক
খেলাপি ঋণের লক্ষ্য২০২৬ সালের মধ্যে ১০ শতাংশএখনও নির্ধারিত নয়; বাস্তব হার প্রায় ৩৩ শতাংশ
রাজস্ব জিডিপি অনুপাতলক্ষ্য ৯.২ শতাংশবাস্তবে ৭ শতাংশ, আইএমএফের বড় চিন্তার কারণ

পুরোনো কর্মসূচি যেখানে পৌঁছানোর কথা ছিল আর বাংলাদেশ আসলে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, তার মধ্যকার এই ফারাকই বুঝিয়ে দেয় কেন এবার আইএমএফ এত কঠোর। যে খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশে নামার কথা ছিল, তা বরং তিন গুণ বেড়ে গেছে, আর যে করভিত্তি বাড়ানোর আশা করা হয়েছিল, তা বরং আরও সংকুচিত হয়েছে।

বার চার্টে দেখানো হয়েছে বাংলাদেশের আইএমএফ ঋণ প্রতিশ্রুতি ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ৪.৭ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সাড়ে পাঁচ বিলিয়ন ডলারে বেড়ে ২০২৬ সালের অক্টোবরে নতুন সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের আবেদনে পৌঁছানো
চার্ট: বিডি ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ, তথ্যসূত্র দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও দ্য স্টার।

২০২৯ পর্যন্ত বিস্তৃত একটা সময়রেখা

খসরু যেমন আশা করছেন, যদি বছরের শেষ নাগাদ দুই পক্ষ স্টাফ পর্যায়ের একটা চুক্তিতে পৌঁছায়, তারপরও কোনো টাকা ছাড়ের আগে প্রস্তাবটিকে আইএমএফের এক্সিকিউটিভ বোর্ডের অনুমোদন পেতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ঋণের সঠিক আকার বা কিস্তির সংখ্যা নিশ্চিত করতে সতর্ক থেকেছেন, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমাটা নিয়ে তিনি স্পষ্ট ছিলেন, ২০৩০ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে, ২০২৯ সালের মধ্যে সংস্কারগুলো মূলত বাস্তবায়িত হতে হবে।

খসরু আইএমএফের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে তার আলোচনাকে "ফলপ্রসূ আলোচনা" বলে বর্ণনা করেন, তবে সতর্ক করে দেন যে কর্মসূচির সঙ্গে শর্ত থাকবে, যার কিছু এখনও নিয়ে আলোচনা চলতে পারে।

এই মাসের শেষ দিকে আইএমএফের একটি মিশন ঢাকায় আসছে বিস্তারিত বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে, যার পরে ঋণের আকার, সময়সীমা আর নির্দিষ্ট শর্তগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করবে।

এটা আপনার জন্য কী বোঝায়

সাধারণ সঞ্চয়কারী আর ঋণগ্রহীতাদের জন্য একটা আইএমএফ কর্মসূচির মানে সাধারণত দুটো জিনিস, একটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক যা সুদের হার দ্রুত কমাতে রাজি হবে না, আর একটা সরকার যারা নতুন আয়ের পথ খুঁজছে, নতুন বড় হারের বদলে বরং বিস্তৃত কর আদায়ের মাধ্যমে। যারা এনবিআরের কড়া তদারকির আওতায় পড়বে এমন ব্যবসা চালান, বা এ বছর প্রথমবার রিটার্ন দিচ্ছেন, তারা নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার আগে নিজের অবস্থান যাচাই করতে ইনকাম ট্যাক্স ক্যালকুলেটর ব্যবহার করে দেখতে পারেন।

আমানতকারীদের জন্য, একটা বিশ্বাসযোগ্য আইএমএফ চুক্তি সাধারণত টাকার ওপর আর রিজার্ভের স্তরের ওপর আস্থা বাড়ায়, যা গুরুত্বপূর্ণ যদি আপনার সঞ্চয়পত্র, এফডিআর থাকে, বা রেমিট্যান্স পাঠানো বা পাওয়ার পরিকল্পনা থাকে। কিন্তু এটা নিজে থেকে আজকের দ্বিগুণ অঙ্কের সুদের হার থেকে দ্রুত স্বস্তি দেয় না। যতদিন আইএমএফ মূল্যস্ফীতি কমাতে কঠোর নীতির ওপর জোর দেবে, ততদিন এই হার উঁচুই থাকার কথা, তাই এ বছর ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা মানুষদের উচিত আগাম হার কমার আশা না করে বর্তমান হার মাথায় রেখেই বাজেট করা।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

ব্যয়বহুল এলএনজি টার্মিনাল পরিকল্পনা বাতিল করে চীন ও স্পট কার্গোর ওপর ভর করছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা কুতুবজোমে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে, যার খরচ হতো ২০ বছরে ১৩,১৬১ কোটি টাকা পর্যন্ত, তার বদলে স্পট আর জি টু জি বাজার থেকে নয়টি এলএনজি কার্গো কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কয়েক দিন পরে ব্যাংককে চীনের এক্সিম ব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দল বিদ্যুৎ মন্ত্রীকে বলেছে, তারা পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্প্রসারণ আর ঢাকার চারপাশের গ্রিড উন্নয়নে অর্থায়ন দ্রুত করতে চায়। এই দুটো পদক্ষেপ মিলে দেখায় সরকার কীভাবে সামনের জ্বালানি খরচ আর দীর্ঘমেয়াদে ব্যবস্থাটা ঠিক করার অর্থায়নের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজছে।

বিশ্বব্যাংক থেকে বাড়তি ১০ বিলিয়ন ডলারের জন্য দ্রুত প্রকল্প অনুমোদনের প্রতিশ্রুতি দিল বাংলাদেশ

বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের কাছে আগামী তিন বছরে বাড়তি ১০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা চেয়েছে, যা দিয়ে জ্বালানি ভর্তুকি, ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণ আর জরুরি আমদানি সামলানো হবে। বিনিময়ে ঢাকা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে প্রকল্প অনুমোদনের সময় ১৮ মাস থেকে আট মাসে আর বাস্তবায়নের সময় সাত বছর থেকে পাঁচ বছরে কমাবে। ব্যাংকক সভায় করা এই চাওয়ার পাশাপাশি চলছে আইএমএফের সঙ্গে ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে আলাদা আলোচনাও।

ব্যাংকক সভায় আইএমএফের চোখে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নামল ৩.২ শতাংশে, মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১০.৯ শতাংশ

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বাংলাদেশের চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩.২ শতাংশে নামিয়েছে, আর মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস বাড়িয়ে ১০.৯ শতাংশ ধরেছে, যা ২০১১ সালের পর দেখা যায়নি। ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় প্রকাশিত এই পূর্বাভাস বিশ্বব্যাংক আর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের চেয়েও বেশি হতাশাজনক। এমন সময় এই খবর এলো যখন ঢাকা দুই সংস্থার কাছ থেকেই জ্বালানি ও সারের ভর্তুকির জন্য নতুন অর্থায়নের আলোচনা করছে।