নতুন নিয়মে ব্যাংক প্রধানদের ব্যক্তিগত জবাবদিহিতা বাড়াল বাংলাদেশ ব্যাংক
বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের নিয়ন্ত্রকের কাছে জমা দেওয়া কমপ্লায়েন্স কাগজপত্রে নিজে সই করতে বাধ্য করেছে, যাতে প্রতিষ্ঠান চালানো ব্যক্তির স্বাক্ষর ছাড়াই পরিদর্শনের জবাব জমা দেওয়ার ফাঁক বন্ধ হয়। এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর এক সার্কুলারে ব্রোকারেজ আর সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাংকের মানের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং ইউনিট গড়তে বলা হয়েছিল, আর এপ্রিলে ব্যাংক চেয়ারম্যানদের দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকারনামায় সই করতে বলা হয়েছিল। এই তিনটা সার্কুলার মিলিয়ে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশের আর্থিক নিয়ন্ত্রকদের নেওয়া সবচেয়ে সংগঠিত সুশাসন উদ্যোগগুলোর একটা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার লক্ষ্য শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, নির্দিষ্ট ব্যক্তিদেরও কমপ্লায়েন্স ব্যর্থতার জন্য দায়বদ্ধ করা।
বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো বড় ধরনের নির্দেশনা জারি করেছে ২০ সেপ্টেম্বর, যেখানে প্রতিটি তফসিলি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান আর মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীকে নিজে সই করতে বলা হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেওয়া কমপ্লায়েন্স কাগজপত্রে। তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হওয়া এই নির্দেশনা এমন একটা ফাঁক বন্ধ করছে যার সুযোগে, নিয়ন্ত্রকদের ভাষায়, ব্যাংকগুলো পরিদর্শনের জবাব আর শোকজের উত্তর প্রতিষ্ঠান আসলে যিনি চালান তার কোনো স্বাক্ষর ছাড়াই নিরবে জমা দিয়ে দিত।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে এখন থেকে নিজেদের প্রধান অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তার সাথে যৌথভাবে সই করতে হবে পরিদর্শনের ফলাফলের জবাবে দেওয়া প্রতিটি কমপ্লায়েন্স প্রতিবেদনে, প্রতিটি বিশেষ আর্থিক বিবরণীতে, আর বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া প্রতিটি শোকজ নোটিশের জবাবে। এমডি বা সিইও অনুপস্থিত থাকলে আইনগতভাবে অনুমোদিত কোনো প্রতিনিধি তার জায়গায় সই করতে পারবেন, তবে শুধু কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তার সইয়ে প্রতিবেদন পাঠানো যাবে না, যা কিছু প্রতিষ্ঠানে নাকি সাধারণ চর্চায় পরিণত হয়ে গিয়েছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনই কেন এগোলো
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, সংক্ষেপে বিএফআইইউ, বলেছে তারা দেখেছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রধান নির্বাহীর সই ছাড়াই কমপ্লায়েন্স প্রতিবেদন জমা দিচ্ছিল, যাকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সঠিক সুশাসনের পরিপন্থী বলে অভিহিত করেছে। এই ব্যাখ্যাটা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একক জালিয়াতি বা কেলেঙ্কারির দিকে ইঙ্গিত না করে বিএফআইইউ আসলে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর জবাবদিহিতার কাঠামোতে একটা গভীর দুর্বলতার কথা বলছে, যেখানে সাংগঠনিক কাঠামোয় বেশ কয়েক ধাপ নিচে থাকা একজন কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক বিষয়ে কার্যত প্রতিষ্ঠানের হয়ে কথা বলতে পারতেন, অথচ প্রধান নির্বাহী সেই কাগজপত্র থেকে দূরে থেকে যেতেন।
এই নির্দেশনার আইনগত ভিত্তি তিনটি আলাদা আইন থেকে এসেছে, ১৯৯১ সালের ব্যাংক কোম্পানি আইন যা ২০২৩ সালে সংশোধিত হয়েছে, ২০২৩ সালের ফিন্যান্স কোম্পানি আইন, আর ২০২৪ সালের পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস আইন। এতে বিএফআইইউর নাগালের মধ্যে শুধু চিরাচরিত ব্যাংক নয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান আর এখন প্রতিদিনের লেনদেনের একটা বড় অংশ সামলানো মোবাইল ওয়ালেট প্রতিষ্ঠানগুলোও চলে এসেছে। এই ব্যাপ্তি বলে দেয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক জবাবদিহিতার এই ফাঁকটাকে শুধু প্রচলিত ব্যাংকিংয়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো নিয়ন্ত্রিত আর্থিক খাতজুড়ে ছড়ানো একটা সমস্যা হিসেবে দেখছে।
এই বছরের বড় এক প্যাটার্নের অংশ
যৌথ স্বাক্ষরের এই নিয়ম হঠাৎ একা আসেনি। মাত্র পাঁচ দিন আগে, ১৫ সেপ্টেম্বর, বিএফআইইউ আলাদা একটা সার্কুলার জারি করে ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক, পোর্টফোলিও ম্যানেজার, সিকিউরিটিজ কাস্টডিয়ান আর সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব আনুষ্ঠানিক অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাঠামো গড়ে তুলতে বলেছে, যা ব্যাংকগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকলেও পুঁজিবাজারের জগতে আগে ততটা কঠোরভাবে প্রয়োগ হতো না। এই সার্কুলার অনুযায়ী, প্রতিটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে তাদের প্রধান কার্যালয়ে একটা কেন্দ্রীয় কমপ্লায়েন্স ইউনিট গড়তে হবে, যার নেতৃত্বে থাকবেন নিজস্ব প্রধান অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা, আর শাখা পর্যায়ের কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তারা সেই কাঠামোর মধ্য দিয়ে রিপোর্ট করবেন।
১৫ সেপ্টেম্বরের এই সার্কুলার শুধু একজন কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ার চেয়ে অনেক বেশি কিছু দাবি করে। এতে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুবিধাভোগী মালিক হিসেবে চিহ্নিত করতে বাড়তি সতর্কতা, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট বা জন্মসনদ দিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ গ্রাহক পরিচয় যাচাই, গোএএমএল সিস্টেমের মাধ্যমে সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদনসহ চলমান লেনদেন পর্যবেক্ষণ, নতুন কর্মী নিয়োগে পটভূমি যাচাই, স্বাধীন অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা দিয়ে যাচাইকৃত ছয় মাস অন্তর স্ব-মূল্যায়ন, আর অ্যাকাউন্ট বন্ধ হওয়ার পরও অন্তত পাঁচ বছর তথ্য সংরক্ষণের নির্দেশ আছে। ২০ সেপ্টেম্বরের স্বাক্ষর সংক্রান্ত নিয়মের সাথে মিলিয়ে দেখলে, এই দুই সার্কুলার মিলে ব্যাংকগুলোতে বছরের পর বছর চালু থাকা একই কমপ্লায়েন্স কাঠামো ব্রোকারেজ আর সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ছড়িয়ে দিচ্ছে, আর একইসাথে ব্যাংকে সেই কাঠামো আসলেই কাজ করছে কিনা তার জন্য ব্যক্তিগতভাবে কে দায়ী থাকবেন সেটাও আরও কঠোর করছে।
আগেই দেওয়া এক সতর্কবার্তা
এই মাসের এই দুটো সার্কুলার আসলে এপ্রিলে বিএফআইইউর দেওয়া আরেকটা নির্দেশনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালক আর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নিজে দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকারনামায় সই করে তা নিজেদের অফিসে টাঙিয়ে রাখতে বলা হয়েছিল, সাথে মানি লন্ডারিং আর ঋণপত্র জালিয়াতি প্রতিরোধ নিয়ে আলাদা ঘোষণাও দিতে হতো। এপ্রিলের সেই নির্দেশনায় কারণ স্পষ্টভাবেই বলা ছিল, দুর্বল কর্পোরেট সুশাসন, খারাপ ঋণ শৃঙ্খলা আর অপর্যাপ্ত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কথা, আর স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছিল সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় মাপের ঋণ জালিয়াতি হয়েছে। এই নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি নতুন নিয়োগ বা পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে এই অঙ্গীকারনামা বাধ্যতামূলক করা হয়, যাতে এটা একবারের কোনো আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে ব্যাংক পরিচালনার নিয়মিত অংশ হয়ে যায়।
একসাথে দেখলে, এপ্রিলের অঙ্গীকারনামা, ১৫ সেপ্টেম্বরের পুঁজিবাজার কমপ্লায়েন্স কাঠামো আর ২০ সেপ্টেম্বরের যৌথ স্বাক্ষরের নিয়ম, এই তিনটাই দেখায় একটা নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোনো একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনায় প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না, বরং একটা তালিকা ধরে এগোচ্ছে। প্রথমে এলো ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের একেবারে শীর্ষে থাকা মানুষদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত ও প্রতীকী অঙ্গীকার। তারপর এলো আর্থিক খাতের বড় একটা অংশজুড়ে সন্দেহজনক কার্যকলাপ শনাক্ত ও রিপোর্ট করার কর্মকাঠামো। আর এখন এলো এমন এক নিয়ম, যাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো পর্যবেক্ষণের জবাবে প্রতিষ্ঠান কী করেছে তার কাগজপত্রে শুধু কমপ্লায়েন্স বিভাগের নয়, প্রধান নির্বাহীর নামও থাকে।
বৃহত্তর অভিযানের সাথে এর সম্পর্ক
এই সময়টা বাংলাদেশ ব্যাংকের সেপ্টেম্বরজুড়ে চালানো একটা বড় অভিযানের সাথেও মিলে যাচ্ছে। মাসের শুরুর দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিটি ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা আর পেমেন্ট অপারেটরকে ৩০টি নির্দিষ্ট বেআইনি ঋণদানকারী অ্যাপে অবিলম্বে পেমেন্ট সেবা বন্ধ করতে বলেছিল, যেগুলোর বিরুদ্ধে ৮০০ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর সুদ নেওয়া আর ফোন থেকে সংগ্রহ করা তথ্য দিয়ে ঋণগ্রহীতাদের ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ ছিল। এই নির্দেশনাটা নিজেই ছয় সপ্তাহে অন্তত চতুর্থ দফা পদক্ষেপ ছিল এসব অ্যাপের বিরুদ্ধে। এই মাসেই বাংলাদেশ ব্যাংক নমিনি পরিচালকদের নিয়ম আরও কঠোর করেছে, তাদের যে ব্যাংক পরিচালনায় সাহায্য করেন সেখানে ন্যূনতম শেয়ার নিজেদের নামে রাখতে বলেছে, যা কাগজে দায়িত্ব কার আর বাস্তবে দায়িত্ব কে বহন করেন তার মধ্যকার ফাঁক কমানোর আরেকটা পদক্ষেপ।
এই প্রেক্ষাপটে দেখলে যৌথ স্বাক্ষরের এই নিয়মকে বিচ্ছিন্ন কোনো কমপ্লায়েন্স পরিবর্তনের চেয়ে বরং বেশ কয়েকটা আলাদা সুশাসন উদ্যোগকে জোড়া দেওয়া একটা সংযোগসূত্র মনে হয়। যে নমিনি পরিচালককে এখন সত্যিকারের শেয়ার রাখতে হবে, যে প্রধান নির্বাহীকে এখন নিজে কমপ্লায়েন্স প্রতিবেদনে সই করতে হবে, আর যে ব্রোকারেজগুলোকে এখন ব্যাংকের মানের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কার্যক্রম চালাতে হবে, এই সবকিছুই একই লক্ষ্যের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, এমন একটা আর্থিক খাত যেখানে জবাবদিহিতা কোনো নামহীন প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় মিলিয়ে না গিয়ে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির কাছে থাকে।
ব্যাংক আর কমপ্লায়েন্স দলের পরবর্তী পদক্ষেপ
কমপ্লায়েন্স বিভাগগুলোর জন্য তাৎক্ষণিক বাস্তব পরিবর্তনটা প্রক্রিয়াগত। শুধু কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তার সইয়ের ওপর গড়ে তোলা ফাইলিং ব্যবস্থা আর অভ্যন্তরীণ অনুমোদন প্রক্রিয়া নতুন করে সাজাতে হবে, যাতে প্রতিটি পরিদর্শন জবাব, বিশেষ আর্থিক বিবরণী আর শোকজের উত্তর বাংলাদেশ ব্যাংকে যাওয়ার আগে এমডি বা সিইওর টেবিল হয়ে যায়, আর প্রকৃত অনুপস্থিতিতে আইনগতভাবে অনুমোদিত প্রতিনিধি কীভাবে দায়িত্ব নেবেন তার একটা নথিভুক্ত প্রক্রিয়াও থাকতে হবে। ব্রোকারেজ আর মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর জন্য বেশি চাপ আসবে ১৫ সেপ্টেম্বরের সার্কুলার থেকে, কারণ এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকগুলোকেই এখন প্রায় শূন্য থেকে কেন্দ্রীয় কমপ্লায়েন্স ইউনিট আর গোএএমএল রিপোর্টিং সক্ষমতা গড়ে তুলতে হচ্ছে, বিদ্যমান কোনো ব্যাংক ধাঁচের কর্মসূচি সামান্য বদলে নেওয়ার বদলে।
এই তিনটা সার্কুলারের কোনোটাই আলাদাভাবে দেখলে কমপ্লায়েন্স বিভাগের বাইরে খুব একটা মনোযোগ কাড়ত না। কিন্তু পাঁচ মাসের মধ্যে একসাথে দেখলে, এগুলো সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের আর্থিক নিয়ন্ত্রকদের নেওয়া সবচেয়ে সংগঠিত সুশাসন উদ্যোগগুলোর একটা হয়ে দাঁড়ায়। আসল পরীক্ষাটা হবে, প্রতিষ্ঠানগুলো যখন এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হবে তখন সত্যিকারের ব্যবস্থা নেওয়া হয় কিনা, নাকি এই নিয়মগুলো শুধু একটা আগে থেকেই দীর্ঘ কমপ্লায়েন্স তালিকায় আরেকটা সংযোজন হয়েই থেকে যায়।
তথ্যসূত্র
এরপর পড়ুন
এপ্রিল মার্চ অর্থবছরে যাওয়ার পরিকল্পনা জমা দিতে মন্ত্রণালয়গুলোকে ২৫ অক্টোবরের সময়সীমা দিল সরকার
বাংলাদেশের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও তার অধীনস্থ দপ্তরকে বলেছে, ২৫ অক্টোবরের মধ্যে একটা সময়বাঁধা পরিকল্পনা জমা দিতে, যেখানে জুলাই থেকে জুন অর্থবছর ধরে তৈরি করা আইন, বিধি আর ব্যবস্থাগুলো নতুন করে লেখার পথ বের করতে হবে। ২০২৮-২৯ সাল থেকে অর্থবছর এপ্রিল থেকে মার্চে নেওয়ার আগস্টের সিদ্ধান্তের পর এটাই সরকারের প্রথম বড় পরীক্ষা। একই সপ্তাহে আরেকটা ছোট সময়সীমাও বদলেছে, কর কর্তৃপক্ষ ভ্যাট রিটার্ন জমার তারিখও পিছিয়ে ২৫ অক্টোবর করেছে।
বাচ্চু কাণ্ডের তেরো বছর পরও মন্দ ঋণের গর্ত থেকে বের হতে পারছে না বেসিক ব্যাংক
বেসিক ব্যাংকের ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের হিসাব বলছে, শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু আমলের ঋণ কেলেঙ্কারি প্রকাশ পাওয়ার তেরো বছরের বেশি সময় পরও ব্যাংকের মোট ঋণের ৬৪.৪৯ শতাংশ, অর্থাৎ ৮,১৫৩ কোটি টাকা, এখনও খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত। ব্যাংকটি এখন ৫,১৪৮ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি আর ৫,০৫১ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতিতে ভুগছে, আর এর শীর্ষ ২০ খেলাপি গ্রাহকই একা বকেয়া রেখেছে ২,২৮৮ কোটি টাকা, যার মধ্যে মাত্র প্রায় ২ শতাংশ কখনও আদায় হয়েছে। চেয়ারম্যান হেলাল আহমেদ চৌধুরী বলছেন, ব্যাংক ৫,০০০ কোটি টাকার স্বল্প সুদের আমানত পেলে তিন বছরের মধ্যে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব, কিন্তু বেসিকের খেলাপি ঋণের অনুপাত এখনও পুরো ব্যাংকিং খাতের ৩২.৭৮ শতাংশ গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। ব্যাংকটির এই সংকট দেশের পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বৃহত্তর সমস্যার প্রতিচ্ছবি, যাদের মিলিত খেলাপি ঋণ চলতি বছরের প্রথমার্ধেই বেড়েছে ৬,৩০৪ কোটি টাকা।
৮৫ শতাংশ খাতে ভ্যাট লক্ষ্য হাতছাড়া এনবিআরের, নতুন বিআইএন বাধ্যবাধকতায় চাপে ছোট ব্যবসা
সদ্য প্রকাশিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তথ্যে দেখা যাচ্ছে ৩৪টি বড় করদাতা ইউনিটের মধ্যে ২৯টিই ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি, ১,০৮,০০০ কোটি টাকার লক্ষ্যের বিপরীতে প্রায় ২০,৫০০ কোটি টাকার ঘাটতি রয়ে গেছে, যদিও কর্মকর্তারা এখন স্বীকার করছেন অনেক লক্ষ্যই অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যথেষ্ট বিবেচনা না করে ঠিক করা হয়েছিল। একই সময়ে, ব্যাংক হিসাব খোলা বা ঋণ পাওয়ার জন্য ২০১২ সালের একটা বিধিবদ্ধ বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বরের শর্ত সত্যিকার অর্থে কার্যকর করা হচ্ছে, যা সবচেয়ে কঠিনভাবে আঘাত করছে বাংলাদেশের ১ কোটি ১৭ লাখ অর্থনৈতিক ইউনিটের ৯৯ শতাংশ তৈরি করা কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট আর মাঝারি উদ্যোগগুলোকে। এনবিআর বলছে ব্যাংক বা তাদের নিজের কর্মকর্তা কেউই প্রশাসনিকভাবে বিআইএন নিয়ম মাফ করতে পারেন না, যদিও অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ছোট ব্যবসার জন্য ছাড় বা ধাপে ধাপে চালুর অনুরোধ করেছে। দুটো পথ মিলিয়ে বোঝা যায়, একটা রাজস্ব বোর্ড প্রতিরোধ করতে পারা বড় করদাতাদের থেকে লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে, অথচ দ্রুত মেনে চলার সক্ষমতা সবচেয়ে কম থাকা ব্যবসার ওপর নিয়ন্ত্রণ শক্ত করছে, এমন একটা প্যাটার্ন যা সরকারের এই প্রান্তিকে ব্যাংক থেকে ক্রমবর্ধমান ধার করার দরকারের সাথেও জড়িত।