অর্থনীতি ও নীতি

বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণদের এক তৃতীয়াংশের বেশি চাকরি পাচ্ছেন না, দেখাচ্ছে আইএমএফের তথ্য

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬4 মিনিটের পড়াহালনাগাদ ১০ অক্টোবর, ২০২৬
বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণদের এক তৃতীয়াংশের বেশি চাকরি পাচ্ছেন না, দেখাচ্ছে আইএমএফের তথ্য

এই মাসে প্রকাশিত আইএমএফের নতুন গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের এক তৃতীয়াংশের বেশি বেকার, যা সব বাংলাদেশি তরুণের জন্য প্রায় ১০ শতাংশ বেকারত্বের হারের চেয়ে অনেক বেশি। এই তথ্য বছরের পর বছরের দেশীয় শ্রমশক্তি জরিপের সাথে মিলে যায়, যেখানে দেখা যাচ্ছে ডিগ্রিধারী বেকার তরুণের অংশ কমার বদলে বাড়ছে। বিডজবস ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর এর জন্য স্নাতকদের কাজে লাগানোর মতো নতুন শিল্পের অভাবকে দায়ী করেছেন, আর বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা আর ভারতের চেয়ে ভালো অবস্থানে থাকলেও দ্রুত বর্ধনশীল দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অর্থনীতির চেয়ে পিছিয়ে আছে। আইএমএফ আরও সতর্ক করেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্নাতক আর উপলব্ধ চাকরির মধ্যেকার এই অসামঞ্জস্য মেটানো আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে যারা চাকরি খুঁজছেন, তাদের এক তৃতীয়াংশের বেশি চাকরি পাচ্ছেন না, এই মাসে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নতুন গবেষণা অনুযায়ী, যা দেশের ক্রমাগত বেশি বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক তৈরির প্রবণতার সাথে বেশ বেমানান লাগছে। আইএমএফের সেপ্টেম্বর সংখ্যার ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ম্যাগাজিনে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার দেখানো হয়েছে ৩৬ শতাংশ, যা ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী সব বাংলাদেশি তরুণের জন্য নথিভুক্ত প্রায় ১০ শতাংশ বেকারত্বের হারের চেয়ে অনেক বেশি। এই দুই সংখ্যার মধ্যেকার ব্যবধানই আসল গল্প বলে দেয়, বাংলাদেশে বছরের পর বছর আর পরিবারের সঞ্চয় খরচ করে ডিগ্রি নেওয়া চাকরি পাওয়ার পথ ছোট করে না। বরং মনে হচ্ছে তা আরও দীর্ঘ করে তোলে।

যে সমস্যা এই বছরের খবরের অনেক আগে থেকেই ছিল

আইএমএফের এই সংখ্যা হঠাৎ করে আসেনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো নিজেই বছরের পর বছর ধরে এই গল্পের একটা রূপ পর্যবেক্ষণ করে আসছে। তাদের সাম্প্রতিকতম শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য বলছে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী বেকার তরুণের সংখ্যা প্রায় ২০.৩ লাখ, যাদের প্রায় ২৯ শতাংশের স্নাতক ডিগ্রি আছে। এটা ব্যুরোর ২০২৩ সালের জরিপের চেয়ে অনেক বেশি অংশ, যখন বেকার তরুণদের ৩১.৫ শতাংশের উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন ছিল মোট ১৯.৪ লাখ বেকার তরুণের মধ্যে, আর সামগ্রিক তরুণ বেকারত্বের হার ছিল ৭.২ শতাংশ। দুটো তথ্যের পেছনেই একই কাঠামোগত সত্য লুকিয়ে আছে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত চাকরিপ্রার্থীদের ১৭ শতাংশের বেশি দুই বছরের বেশি সময় ধরে বেকার আছেন, এমন একটা মেয়াদ যা বেশিরভাগ অর্থনীতিতে একটা শ্রমশক্তি জরিপের একটা সংখ্যা না হয়ে নিজেই একটা সংকট হিসেবে বিবেচিত হতো।

কেন বেশি ডিগ্রি বেশি চাকরি আনেনি

আইএমএফের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের শ্রমশক্তিতে স্নাতক ডিগ্রিধারীর অংশ ২০১০ সালের ৩.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে দাঁড়িয়েছে ৯ শতাংশে, বারো বছরে আড়াই গুণ বৃদ্ধি। প্রতি বছর প্রায় ২২ থেকে ২৩ লাখ তরুণ বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন, আর তাদের মধ্যে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার জন এখন স্নাতক ডিগ্রি নিয়েই আসেন। চাকরির পোর্টাল বিডজবস ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর প্রথম আলোকে একটা সরাসরি ব্যাখ্যা দিয়েছেন কেন অর্থনীতি এই স্নাতকদের কাজে লাগাতে সংগ্রাম করেছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে গতিতে স্নাতক তৈরি করছে, অর্থনীতি সেই গতিতে সেই স্নাতকদের উপযোগী চাকরি তৈরি করতে পারছে না। তিনি বলেন, "স্নাতকদের কাজে লাগানোর মতো নতুন শিল্প আর কারখানা তৈরি হয়নি," যা ইঙ্গিত করে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা যা শেখায় আর তার শিল্প ভিত্তি, যা এখনও মূলত পোশাক শিল্প আর অন্যান্য কম দক্ষতার রপ্তানি খাতের ওপর নির্ভরশীল, যা আসলে দরকার তার মধ্যেকার ফারাকের দিকে।

প্রতিবেশীদের তুলনায় বাংলাদেশ কোথায়

এই প্রবণতায় বাংলাদেশ একা নয়, আর আইএমএফের আঁকা আঞ্চলিক তুলনাটা নিজেই অনেক কিছু বলে দেয়। শ্রীলঙ্কায় শিক্ষিত তরুণ বেকারত্বের হার ৪৩ শতাংশ, আর ভারতেরটা ৪০ শতাংশের বেশি, দুটোই বাংলাদেশের ৩৬ শতাংশের চেয়ে খারাপ। কিন্তু তহবিলের গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলো, যেমন ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া আর থাইল্যান্ডের চেয়ে পিছিয়ে আছে, যারা নিজেদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হওয়ার পরেও স্নাতকদের চাকরির সাথে মেলানোর কাজটা ভালোভাবে করেছে। আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন শুধু বর্তমান ফারাকটা বর্ণনা করার বদলে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে ঝুঁকিটা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, "কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রবৃদ্ধি আর উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সম্ভাবনা আছে, কিন্তু দক্ষতা তৈরির চেয়ে দ্রুত গতিতে এর গ্রহণ এগোলে এই প্রযুক্তি তরুণ শ্রমিকদের ওপর শ্রমবাজারের চাপও বাড়িয়ে দিতে পারে," এমন একটা সতর্কবার্তা যা এমন একটা দেশের জন্য বিশেষভাবে প্রযোজ্য যেখানে স্নাতকদের সরবরাহ ইতিমধ্যেই তাদের কাজে লাগানোর মতো চাকরির চেয়ে এগিয়ে গেছে।

দেশশিক্ষিত তরুণ বেকারত্বের হার
শ্রীলঙ্কা৪৩%
ভারত৪০ শতাংশের বেশি
বাংলাদেশ৩৬%

মূল সংখ্যার নিচে লুকানো লিঙ্গ আর সময়ের গল্প

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৩ সালের জরিপ, যা এখনও বাংলাদেশের বেকার তরুণরা ঠিক কারা তার সবচেয়ে বিস্তারিত সরকারি হিসাব, দেখায় একটা শ্রমবাজার যা শিক্ষার মতোই লিঙ্গ দ্বারাও গঠিত। পুরুষ তরুণ বেকারত্বের হার ছিল ৯.৬ শতাংশ, নারীদের ক্ষেত্রে ৪.৮ শতাংশের বিপরীতে, কিন্তু যখন তথ্যে এমন মানুষদের ধরা হয় যারা না কাজ করছেন, না পড়াশোনা করছেন, না কোনো প্রশিক্ষণে আছেন, তখন এই ব্যবধান উল্টে যায়। কর্মসংস্থান, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণে না থাকা মানুষের অংশ, যা নিট হার নামে পরিচিত, তরুণীদের জন্য ছিল ২২.১ শতাংশ, তরুণদের ১৫.৪ শতাংশের বিপরীতে, আর এই নিট শ্রেণীর ৬১.৭ শতাংশই ছিলেন নারী। দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব, অর্থাৎ দুই বছর বা তার বেশি সময় ধরে কাজ না থাকা, জরিপে তরুণীদের ৭.৯ শতাংশকে প্রভাবিত করেছে। একসাথে দেখলে এই সংখ্যাগুলো বলে দেয়, বাংলাদেশের তরুণ কর্মসংস্থান সমস্যা আসলে একটা সংকট না, অন্তত দুটো একে অপরের সাথে জড়িয়ে থাকা সংকট, একদিকে খুব কম উপযুক্ত সুযোগের পেছনে ছোটা স্নাতকদের নিয়ে একটা সমস্যা, আর অন্যদিকে শ্রমবাজার থেকে পুরোপুরি বাদ পড়ে যাওয়া তরুণীদের নিয়ে আরও বড় আর আরও লিঙ্গভিত্তিক একটা সমস্যা।

পরিবর্তনের জন্য কী দরকার

আইএমএফ বা যে স্থানীয় মন্তব্য থেকে তারা তথ্য নিয়েছে, কেউই কোনো সহজ সমাধান দেয়নি, আর সৎ উত্তর সম্ভবত এটাই যে কোনো সহজ সমাধান নেই। মাশরুরের বক্তব্য চাহিদার দিকটার দিকে ইঙ্গিত করে, ব্যবসা বা প্রকৌশল ডিগ্রিকে উৎপাদনশীলভাবে কাজে লাগাতে পারে এমন নতুন শিল্প আর কারখানা ছাড়া বাংলাদেশ এমন চাকরির জন্য স্নাতক তৈরি করতেই থাকবে যা এখনও অস্তিত্বেই নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর আইএমএফের নিজস্ব জোর একটা দ্বিতীয়, পরিকল্পনা করা কঠিন এমন চলক যোগ করে, কারণ স্বয়ংক্রিয়করণ হয় বাংলাদেশের স্নাতকরা যে উচ্চ দক্ষতার ভূমিকা খুঁজছেন তা তৈরি করতে পারে, অথবা তারা যে প্রাথমিক স্তরের অফিস চাকরিগুলো হয়তো নিতে পারতেন তা চেপে ধরতে পারে। এই বছরের আইএমএফের সংখ্যাকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পাওয়া বাংলাদেশের নিজস্ব জরিপ তথ্যের সাথে তুলনা করলে স্পষ্ট হয়ে যায়, দেশটির বিশ্ববিদ্যালয় কী তৈরি করে আর অর্থনীতির কী দরকার তার মধ্যেকার ফারাক মেটানোর জন্য কয়েক বছর সময় ছিল, আর সেই সময়ে ডিগ্রিধারী বেকার তরুণের অংশ সঠিক দিকে না গিয়ে উল্টো দিকেই এগিয়েছে।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

ব্যয়বহুল এলএনজি টার্মিনাল পরিকল্পনা বাতিল করে চীন ও স্পট কার্গোর ওপর ভর করছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা কুতুবজোমে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে, যার খরচ হতো ২০ বছরে ১৩,১৬১ কোটি টাকা পর্যন্ত, তার বদলে স্পট আর জি টু জি বাজার থেকে নয়টি এলএনজি কার্গো কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কয়েক দিন পরে ব্যাংককে চীনের এক্সিম ব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দল বিদ্যুৎ মন্ত্রীকে বলেছে, তারা পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্প্রসারণ আর ঢাকার চারপাশের গ্রিড উন্নয়নে অর্থায়ন দ্রুত করতে চায়। এই দুটো পদক্ষেপ মিলে দেখায় সরকার কীভাবে সামনের জ্বালানি খরচ আর দীর্ঘমেয়াদে ব্যবস্থাটা ঠিক করার অর্থায়নের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজছে।

বাংলাদেশ আবার আইএমএফের দ্বারে, ২০২৯ সাল পর্যন্ত নতুন ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণের আবেদন

সাড়ে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ কর্মসূচি থেকে নির্ধারিত সময়ের আট মাস আগেই সরে আসার পাঁচ মাস পর বাংলাদেশ ফিরে গেছে ব্যাংককের আলোচনার টেবিলে, এবার চাইছে নতুন করে সাড়ে চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের ঋণ। রাজস্ব জিডিপির অনুপাত নেমে এসেছে মাত্র সাত শতাংশে, আর ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ পৌঁছে গেছে মোট ঋণের প্রায় এক তৃতীয়াংশে, এমন সময়েই এসেছে এই নতুন আবেদন। অর্থ উপদেষ্টা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলছেন, আলোচনা বছরের শেষ নাগাদ শেষ হওয়ার কথা, আর ঋণ ছাড় হবে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ত্রৈমাসিক কিস্তিতে।

বিশ্বব্যাংক থেকে বাড়তি ১০ বিলিয়ন ডলারের জন্য দ্রুত প্রকল্প অনুমোদনের প্রতিশ্রুতি দিল বাংলাদেশ

বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের কাছে আগামী তিন বছরে বাড়তি ১০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা চেয়েছে, যা দিয়ে জ্বালানি ভর্তুকি, ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণ আর জরুরি আমদানি সামলানো হবে। বিনিময়ে ঢাকা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে প্রকল্প অনুমোদনের সময় ১৮ মাস থেকে আট মাসে আর বাস্তবায়নের সময় সাত বছর থেকে পাঁচ বছরে কমাবে। ব্যাংকক সভায় করা এই চাওয়ার পাশাপাশি চলছে আইএমএফের সঙ্গে ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে আলাদা আলোচনাও।