২৬ মাস বোর্ডশূন্য থাকার পর বিএসইসি পুনর্গঠন করল ১,৭০০ কোটি টাকার বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল
বাংলাদেশের ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড টানা ২৬ মাস কোনো পরিচালনা বোর্ড ছাড়াই চলেছে, শেষ পর্যন্ত এই সপ্তাহে নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সাত সদস্যের একটা অন্তর্বর্তী প্যানেল গঠন করেছে। প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকার এই তহবিল, যা অদাবিকৃত লভ্যাংশ আর শেয়ারের সমন্বয়ে গড়া, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার জন্য তৈরি, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একটা আইনি বিরোধ ২০২৪ সাল থেকে পুরো কাঠামোটাকেই স্থবির করে রেখেছিল। বিএসইসি এখন চায় এই প্রশ্নের চিরস্থায়ী সমাধানের জন্য একটা পূর্ণাঙ্গ আইন, যার খসড়া শিগগিরই সংসদে যাওয়ার কথা।
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য রাখা ১,৭০০ কোটি টাকা ২৬ মাস ধরে এমন একটা তহবিলের অধীনে পড়ে ছিল যার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দায়িত্বে থাকা কেউ ছিল না। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এখন এই ফাঁক পূরণ করেছে, ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড চালানোর জন্য সাত সদস্যের একটা অন্তর্বর্তী বোর্ড নিয়োগ দিয়ে, পাশাপাশি সংসদে একটা নতুন আইন পাস করানোর চেষ্টা করছে যা শেষ পর্যন্ত ঠিক করবে এই অর্থের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে আর কীভাবে খরচ করা যাবে।
- ২০২১ সালে অদাবিকৃত লভ্যাংশ আর অন্য বিনিয়োগকারীর সম্পদ থেকে তৈরি ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডে ২০২৪ সাল থেকে এই সপ্তাহ পর্যন্ত কোনো পরিচালনা বোর্ড ছিল না, প্রায় ২৬ মাসের একটা ফাঁক।
- বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাত সদস্যের একটা অন্তর্বর্তী বোর্ড অব গভর্নরসের, যাতে আছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আর দুটো পেশাদার সংস্থার প্রধান।
- তহবিলে আছে প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকা, তার মধ্যে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা নগদ আর ৮০০ কোটি টাকা তালিকাভুক্ত শেয়ারে।
- প্রস্তাবিত ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড অ্যাক্ট, ২০২৬ বর্তমান বিধিভিত্তিক কাঠামোর জায়গা নেবে, এর আগে একটা যুগ্ম কমিটি প্রাথমিকভাবে তহবিলটা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার সুপারিশ করেছিল, যা বিএসইসি প্রত্যাখ্যান করেছে।
কেন তহবিলটা দুই বছর খালি পড়ে ছিল
সিএমএসএফ তৈরি হয়েছিল ২০২১ সালে এমন অর্থ জমা করার জন্য যা নাহলে অদাবিকৃত থেকে যেত, অদাবিকৃত লভ্যাংশ, কেউ তোলেনি এমন রাইট শেয়ার, আর আইপিওর অবন্টিত সাবস্ক্রিপশন অর্থ। তহবিলের মূল বিধি অনুযায়ী, এর নগদ অর্থের ৪০ শতাংশ পর্যন্ত তালিকাভুক্ত শেয়ার কেনাবেচায় ব্যবহার করা যেত, অন্তত অর্ধেক যেত মার্জিন লেন্ডিং করা মার্কেট ইন্টারমিডিয়ারিদের পুনঃঅর্থায়নে, আর বাকিটা যেতে পারত ফিক্সড ডিপোজিট আর সরকারি সিকিউরিটিজে।
এই কাঠামো ঠিকঠাক চলছিল যতদিন না ২০২৪ সালে তহবিলের বোর্ডের মেয়াদ শেষ হয়। তারপর কোনো নতুন বোর্ড আসেনি। এই দেরির পেছনে ছিল আইনি কর্তৃত্ব নিয়ে একটা বিরোধ, বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের তোলা প্রশ্ন, তহবিলটার আসলে অদাবিকৃত বিনিয়োগকারীর লভ্যাংশ গ্রহণ চালিয়ে যাওয়ার মতো যথাযথ আইনি ভিত্তি আছে কিনা। প্রশ্নটার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত, তহবিল কাগজে কলমে টিকে থাকলেও এর পরিচালনা একদম স্থবির হয়ে ছিল।
নতুন বোর্ডে কারা আছেন
বিএসইসির অন্তর্বর্তী বোর্ড অব গভর্নরসে একসঙ্গে আছেন নিয়ন্ত্রক, মার্কেট প্রতিষ্ঠান আর পেশাদার সংস্থার প্রতিনিধি। বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান আর কমিশনার হোসেন সাদাতের সঙ্গে আছেন ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট সাব্বির আহমেদ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের প্রেসিডেন্ট রিয়াদ মাহমুদ, আর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের মনোনয়ন নিশ্চিত হলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব যোগ দেবেন, আর সিএমএসএফের নিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সদস্য সচিব হিসেবে কাজ করবেন।
প্রক্রিয়ার কাছাকাছি থাকা মানুষদের মতে, অর্থ মন্ত্রণালয় আর বিএসইসির কর্মকর্তাদের একটা যুগ্ম কমিটি প্রথমে তহবিলটা পুরোপুরি বন্ধ করে তার সম্পদ সরকারি কোষাগারে সরিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করেছিল। বিএসইসি তাতে আপত্তি জানিয়ে বলে, এই অর্থ শুধু বিনিয়োগকারীদের জন্যই ব্যবহার করা উচিত।
এই মতবিরোধই নিয়ন্ত্রককে পুরোনো বিধির অধীনে স্রেফ একটা বোর্ড পুনর্গঠনের বদলে সম্পূর্ণ নতুন একটা আইনের খসড়া তৈরির দিকে ঠেলে দেয়।
নতুন আইনে কী হবে
প্রস্তাবিত ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড অ্যাক্ট, ২০২৬ সিএমএসএফকে বদলে দেবে অদাবিকৃত মার্কেট সম্পদের একটা আনুষ্ঠানিক রক্ষক হিসেবে, অদাবিকৃত লভ্যাংশ আর রাইট শেয়ার, অবন্টিত আইপিও আর কিউআইও সাবস্ক্রিপশন অর্থ, বিলুপ্ত কোম্পানির অদাবিকৃত সম্পদ, বিনিয়োগ থেকে আয়, আর সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক অনুদান। তহবিল যোগ্য বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ, রাইট শেয়ার, বোনাস শেয়ার, সাবস্ক্রিপশন অর্থ আর বিলুপ্ত কোম্পানির সম্পদের দাবি মেটাবে, আর এই দাবি কখনো মেয়াদোত্তীর্ণ হবে না, যাতে একজন বিনিয়োগকারী মারা গেলেও তার উত্তরাধিকারীরা যাচাইয়ের শর্তে পরে দাবি করতে পারেন। খসড়ায় আরও আছে সিএমএসএফ লভ্যাংশ বণ্টন আর উৎসে কর কর্তনের জন্য একটা কেন্দ্রীয় কাঠামো চালানোর পরিকল্পনা, সঙ্গে বিনিয়োগকারী শিক্ষা আর প্রশিক্ষণে অর্থায়ন।
| তহবিলের তথ্য | পরিমাণ |
|---|---|
| তহবিলের মোট আকার | প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকা |
| নগদ অর্থ | প্রায় ৯০০ কোটি টাকা |
| শেয়ার হোল্ডিং | প্রায় ৮০০ কোটি টাকা |
| বোর্ড শূন্যতা | ২৬ মাস, ২০২৪ থেকে অক্টোবর ২০২৬ |
| নতুন বোর্ডের আকার | ৭ সদস্য, অন্তর্বর্তী |
এটা আপনার জন্য কী বোঝায়
আপনি যদি কখনো বাংলাদেশের কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে শেয়ার রেখে বাড়ি বদলান, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বদলান, বা স্রেফ কোনো লভ্যাংশের হিসাব হারিয়ে ফেলেন, এই তহবিলই শেষ পর্যন্ত আপনাকে তা ফিরিয়ে দেওয়ার কথা। একটা কার্যকর বোর্ড, আর পরে কখনো মেয়াদোত্তীর্ণ না হওয়া দাবিসহ একটা পূর্ণাঙ্গ আইন, বছরের পর বছর পরেও অদাবিকৃত লভ্যাংশ বা রাইট শেয়ার ফিরে পাওয়াটা সহজ করার কথা, সেই অর্থ অনির্দিষ্টকাল ঝুলে থাকার বদলে।
ঢাকার শেয়ারবাজারে সক্রিয় বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় সংকেতটা নিয়ন্ত্রক ধারাবাহিকতা নিয়ে। সিএমএসএফের আরেকটা কাজ ছিল ব্রোকারেজ হাউজের মার্জিন লেন্ডিং পুনঃঅর্থায়নে সহায়তা করা, যা চাপের সময় মার্কেট তারল্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একটা আইনি ধোঁয়াশায় আটকে থাকার বদলে সঠিকভাবে পরিচালিত একটা তহবিল, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বের হয়ে যাওয়া আর বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে পুনরাবৃত্ত বিরোধের একটা কঠিন সময়ের পর বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে আস্থা পুনর্গঠনের বড় প্রচেষ্টার আরেকটা ছোট অংশ। আপনি যদি বাজারে নতুন বিনিয়োগের কথা ভাবছেন, তাহলে নতুন আইনটা কত দ্রুত সংসদে পাস হয় তা নজরে রাখা ভালো, কারণ তা থেকেই বোঝা যাবে এই অন্তর্বর্তী বোর্ড একটা তাড়াহুড়োর সমাধান নাকি স্থায়ী কিছু।
তথ্যসূত্র
এরপর পড়ুন
অনিয়মের পর নগদ লভ্যাংশের নিয়মে কড়াকড়ি আনল বিএসইসি, স্বতন্ত্র পরিচালক পুনর্নিয়োগে দিল স্বস্তি
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানি এখন থেকে নগদ লভ্যাংশের প্রস্তাব এজিএমে তুলতে পারবে না যতক্ষণ না পুরো টাকা একটা আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা থেকে সনদায়িত হয়। সাম্প্রতিক অনিয়মের পরই এই সিদ্ধান্ত এসেছে, সঙ্গে আছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি। একই সভায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্বতন্ত্র পরিচালক পুনর্নিয়োগের প্রক্রিয়া সহজ করেছে, প্রতিবার নতুন পর্যালোচনার বদলে শুধু একটা ক্লিন ক্রেডিট রিপোর্টই এখন যথেষ্ট।
২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ২৮ শতাংশ, সবচেয়ে বড় ধাক্কা ইকুইটিতে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগের বছরের তুলনায় ২৮ শতাংশ কম অর্থ বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন। নতুন বিনিয়োগকারীর আস্থার সবচেয়ে স্পষ্ট সূচক নিট ইকুইটি মূলধন প্রবাহ কমেছে ৫৫ শতাংশ, নেমে এসেছে মাত্র ১৫৫ মিলিয়ন ডলারে। অর্থনীতিবিদরা এই পতনের পেছনে জ্বালানি সংকট, বাণিজ্য বিঘ্ন এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপকেই মূল কারণ বলছেন।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে মুনাফায় চাপ, ডিএসই সূচক নেমে এলো ৫,৪০৪ পয়েন্টে
ঢাকার শেয়ারবাজারের মূল সূচক ডিএসই সোমবার ৪৬ পয়েন্ট কমে ৫,৪০৪ পয়েন্টে নেমে এসেছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট আরও বাড়ার কারণে বিনিয়োগকারীদের অস্বস্তি বেড়েই চলেছে। তালিকাভুক্ত প্রায় পাঁচটি কোম্পানির মধ্যে চারটিরই শেয়ারদর কমেছে, আর লেনদেনের পরিমাণ আগের দিনের তুলনায় এক পঞ্চমাংশের বেশি কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫৩ কোটি টাকায়। বিশ্লেষকদের মতে জ্বালানি সংকটের প্রভাব এখন কোম্পানিগুলোর মুনাফায় দেখা যাচ্ছে, যদিও ট্রেজারি বিলের সুদহার কমায় কিছু শেয়ারকে তুলনামূলক সস্তা মনে হচ্ছে।