পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগ

বিএসইসির অঙ্গীকার, আইপিও অনুমোদনের সময় ১৮ মাস থেকে কমিয়ে মাত্র ৩ মাস

৫ অক্টোবর, ২০২৬5 মিনিটের পড়া
বিএসইসির অঙ্গীকার, আইপিও অনুমোদনের সময় ১৮ মাস থেকে কমিয়ে মাত্র ৩ মাস

বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি একটি প্রাথমিক গণপ্রস্তাব অনুমোদনের সময় আঠারো মাস থেকে কমিয়ে প্রায় তিন মাসে আনবে, এবং শিগগিরই আবেদনকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যে অন্তত একটি বিদেশি মালিকানার প্রতিষ্ঠান থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই ঘোষণা একটি সংস্কার উদ্যোগের তৃতীয় পদক্ষেপ, যা জুলাই মাসে শুরু হয়েছিল মাত্র ১০ শতাংশ শেয়ার ছাড়ার শর্তে সরাসরি তালিকাভুক্তির বিকল্প দিয়ে, এবং সেপ্টেম্বরে বড় বহুজাতিক ও দেশীয় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূলক তালিকাভুক্তির হুমকি দিয়ে। এই উদ্যোগ এমন একটা অস্বস্তিকর সময়ে এলো, যখন কয়েকটি ব্যাংকের দুর্বল আয়ের কারণে ডিএসইএক্স সূচক পরপর চার কার্যদিবস কমেছিল।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি একটি প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও অনুমোদনের সময় আঠারো মাস থেকে কমিয়ে প্রায় তিন মাসে নিয়ে আসবে, এবং তিনি আশা করছেন অন্তত একটি বিদেশি মালিকানার প্রতিষ্ঠানসহ কিছু ভালো কোম্পানি শিগগিরই আবেদন করবে। মাসুদ খান সাংবাদিকদের বলেন, "আমরা আইপিও খরা চলতে দিতে পারি না," এবং এই সংস্কারকে তিনি বিএসইসি, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের মধ্যে সমন্বয়ের একটা সমাধান বলে বর্ণনা করেন, যাতে আবেদন জমা পড়ার পর অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত এগোয়।

এই ঘোষণা গ্রীষ্মের শুরু থেকে গড়ে ওঠা একটি সংস্কার উদ্যোগের তৃতীয় সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ, এবং আগের দুটি পদক্ষেপের সঙ্গে একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা একটা নির্দিষ্ট ধারণা নিয়ে কাজ করছে, কেন বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এমন কোম্পানিদের আকর্ষণ করতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে যাদের তালিকাভুক্ত হওয়া উচিত বলে সবাই একমত। এটি এমন একটা সময়ে এলো, যখন সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ডিএসইএক্স সূচক পরপর চার কার্যদিবস কমেছে, কয়েকটি তালিকাভুক্ত ব্যাংকের দুর্বল আয়ের কারণে।

আঠারো মাস নয়, তিন মাস

বিদ্যমান প্রক্রিয়া নিয়ে মাসুদ খানের অভিযোগ সুনির্দিষ্ট, তার ভাষায় উদ্যোক্তাদের এখন স্তূপ করা কাগজপত্র জমা দিতে হয়, তারপর সিদ্ধান্তের জন্য দেড় থেকে দুই বছর অপেক্ষা করতে হয়, এমন দীর্ঘ সময় যে অনেক মুনাফাজনক, ভালো চলা কোম্পানি স্রেফ ব্যাংক ঋণ বেছে নেয় এবং পুঁজিবাজারে আসার কথা আর ভাবেই না। নতুন লক্ষ্য হলো, বিএসইসি, ডিএসই আর সিএসই একসাথে সমান্তরালভাবে কাজ করে এই সময়টাকে প্রায় তিন মাসে নামিয়ে আনা। এই দ্রুত অনুমোদনের পাশাপাশি বিএসইসি বলছে, বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকার বন্ড অনুমোদন করেছে, যা দেখায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা শুধু শেয়ারবাজার নয়, বরং পুরো পুঁজিবাজারেই গতি আনতে চাইছে।

সরাসরি তালিকাভুক্তির পথ, জুলাইয়ে তৈরি

এই সপ্তাহের ঘোষণা সরাসরি জুলাই মাসে মাসুদ খানের দেওয়া একটি নিয়ম পরিবর্তনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেই সময় বিএসইসি বলেছিল, বেসরকারি কোম্পানিগুলো মাত্র ১০ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করেই সরাসরি তালিকাভুক্ত হতে পারবে, যেখানে সরকারি মালিকানার কোম্পানির জন্য ঐতিহাসিকভাবে ২৫ শতাংশ শেয়ার ছাড়ার শর্ত ছিল। মাসুদ খান নির্দিষ্টভাবে ইউনিলিভার বাংলাদেশ এবং ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের নাম উল্লেখ করেছিলেন, এই ধরনের বড়, এরই মধ্যে সুপরিচিত কোম্পানির জন্যই এই পথ তৈরি করা হয়েছে, যাদের আইপিওর মাধ্যমে নতুন পুঁজি তোলার আসলে কোনো প্রয়োজন নেই, কিন্তু যাদের শেয়ার সাধারণ মানুষ এখন একদমই কিনতে পারে না। সেই সময় মাসুদ খান বলেছিলেন, "বর্তমান আইপিও প্রক্রিয়া দীর্ঘ এবং জটিল," এবং যুক্ত করেছিলেন, সরাসরি তালিকাভুক্তির এই বিকল্প, সহজ করা আইপিও ও পাবলিক ইস্যু বিধি এবং ডিএসইর বাড়তি তদারকি ক্ষমতার সঙ্গে মিলে "নিয়ন্ত্রক মান বজায় রেখেই" তহবিল সংগ্রহের গতি বাড়াবে।

বহুজাতিক কোম্পানির জন্য বাধ্যবাধকতা, সেপ্টেম্বরে তৈরি

সরাসরি তালিকাভুক্তির ঘোষণার দুই মাস পর বিএসইসি আরেক দফা কড়াকড়ি আরোপ করে। সেপ্টেম্বরে মাসুদ খান বলেন, কমিশন এমন বহুজাতিক ও বড় দেশীয় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানদের লক্ষ্য করবে যাদের সম্পদ বা বাৎসরিক আয় কমপক্ষে ৫০০ কোটি টাকা, এবং এর শুরুটা হবে স্বেচ্ছায় উৎসাহ দিয়ে, কিন্তু সেই স্বেচ্ছা পদ্ধতি কাজ না করলে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি হুমকিও থাকবে এর পেছনে। মাসুদ খান বলেন, "কোম্পানিগুলোকে প্রথমে স্বেচ্ছায় পুঁজিবাজারে আসতে উৎসাহিত করা হবে। তবে তারা না এলে, জনস্বার্থে আমাদের আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করার সুযোগও আছে," এবং তিনি সিকিউরিটিজ আইনের ধারা ২৮ এর কথা উল্লেখ করেন, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে জনস্বার্থে প্রয়োজন মনে করলে তালিকাভুক্তি বাধ্যতামূলক করার ক্ষমতা দেয়। বিএসইসি এই হুমকির পেছনে আইনি ভিত্তি দিতে একটি আনুষ্ঠানিক "পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানি" সংজ্ঞাও তৈরি করছে, কোম্পানির আকার অনুযায়ী তিন থেকে বারো মাসের মধ্যে ফল দেখার আশা করা হচ্ছে, এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা সম্প্রসারিত নিরীক্ষার কথাও বলেছে, যা স্বাভাবিক হিসাব পরীক্ষার চেয়ে বেশি কিছু যাচাই করে, সম্পদের বাস্তবতা নিশ্চিত করতে, যাতে কোম্পানি আবেদন করার পর স্টক এক্সচেঞ্জের যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত হয়।

তিনটি পদক্ষেপকে একটি নীতি হিসেবে পড়া

একসাথে পাশাপাশি রাখলে এই ধারাবাহিকতা তিনটি আলাদা ঘোষণার চেয়ে বেশি একটা জিনিসের মতো দেখায়, একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা যা একটি বড় কোম্পানির ব্যক্তিমালিকানায় থাকার প্রতিটা অজুহাত বন্ধ করে দিচ্ছে। জুলাইয়ের সরাসরি তালিকাভুক্তির বিকল্প আইপিওর মাধ্যমে আসলেই টাকা তোলার প্রয়োজনীয়তা সরিয়ে দেয়। সেপ্টেম্বরের বাধ্যবাধকতার হুমকি স্রেফ সাড়া না দেওয়ার সুযোগ সরিয়ে দেয়। এই সপ্তাহের তিন মাসের অনুমোদন সময়সীমা এই অজুহাতটা সরিয়ে দেয় যে প্রক্রিয়াটাই অনেক ধীর ও অনিশ্চিত, ঝুঁকি নেওয়ার যোগ্য না। এই ধারাবাহিকতা শুরু থেকেই পরিকল্পিত ছিল, নাকি পরিস্থিতির জবাবে একের পর এক তৈরি হয়েছে, তা যা-ই হোক, কাগজে-কলমে এর প্রভাব একটাই, একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা একটি মাত্র হাতিয়ারের ওপর নির্ভর না করে আইপিও খরাকে সব দিক থেকে আক্রমণ করার চেষ্টা করছে।

সময়টাও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বৃহত্তর বাজার এখন কোথায় আছে তা দেখলে বোঝা যায়। বিডি ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ আগেই জানিয়েছিল, ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডিএসইএক্স সূচক পরপর চার কার্যদিবস কমেছিল, লেনদেন ১৫ শতাংশ কমেছিল, এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশসহ কয়েকটি ব্যাংকের প্রথমার্ধের দুর্বল আয়ের কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা বাড়ছিল। বিদ্যমান সূচক যখন টালমাটাল, তখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা নতুন, বড় কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে, এটা একটা বাজি, যে ইউনিলিভার বাংলাদেশের মতো পরিচিত নতুন নাম, এরই মধ্যে লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলোর জন্য একক কোনো নীতি সংশোধনের চেয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে বেশি কাজ করবে।

সময়সংস্কারমূল বিষয়
জুলাই ২০২৬সরাসরি তালিকাভুক্তির নিয়ম পরিবর্তনবেসরকারি কোম্পানির জন্য শেয়ার ছাড়ার শর্ত ১০ শতাংশে কমানো; ইউনিলিভার বাংলাদেশ, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের নাম উল্লেখ
সেপ্টেম্বর ২০২৬বড় কোম্পানির জন্য বাধ্যতামূলক তালিকাভুক্তির হুমকি৫০০ কোটি টাকা বা তার বেশি সম্পদ/আয়ের কোম্পানিকে লক্ষ্য; স্বেচ্ছা পদ্ধতি না কাজ করলে ধারা ২৮ এর আইনি ক্ষমতা
অক্টোবর ২০২৬আইপিও অনুমোদনের সময়সীমা কমানোপ্রায় ১৮ মাস থেকে কমিয়ে প্রায় ৩ মাস; অন্তত একটি বিদেশি মালিকানার কোম্পানির আবেদনের প্রত্যাশা
বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেবন্ড অনুমোদনপ্রায় ৩,০০০ কোটি টাকা অনুমোদিত

কী দেখলে বোঝা যাবে এটা আসলে কাজ করেছে

দ্রুত সময়সীমা আর আইনি হুমকির ঘোষণা তালিকাভুক্তির সমান নয়। এই তিন ধাপের উদ্যোগের আসল পরীক্ষা হবে, কোনো পরিচিত বড় কোম্পানি, সম্ভবত মাসুদ খান আগে যে নামগুলো বলেছেন তার একটি, বিএসইসির নির্ধারিত তিন থেকে বারো মাসের সময়সীমার মধ্যে আসলেই আইপিও বা সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করে কিনা, এবং সেই আবেদন পুরনো আঠারো মাসের বদলে প্রায় তিন মাসের কাছাকাছি সময়ে এগোয় কিনা। এমন কোনো আবেদন আসার আগ পর্যন্ত এই সংস্কার পরিকল্পনা একটা ইচ্ছার ঘোষণাই থেকে যাবে, বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের আইপিও খরা আসলেই ভেঙেছে এমন প্রমাণ নয়।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

২৬ মাস বোর্ডশূন্য থাকার পর বিএসইসি পুনর্গঠন করল ১,৭০০ কোটি টাকার বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল

বাংলাদেশের ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড টানা ২৬ মাস কোনো পরিচালনা বোর্ড ছাড়াই চলেছে, শেষ পর্যন্ত এই সপ্তাহে নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সাত সদস্যের একটা অন্তর্বর্তী প্যানেল গঠন করেছে। প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকার এই তহবিল, যা অদাবিকৃত লভ্যাংশ আর শেয়ারের সমন্বয়ে গড়া, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার জন্য তৈরি, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একটা আইনি বিরোধ ২০২৪ সাল থেকে পুরো কাঠামোটাকেই স্থবির করে রেখেছিল। বিএসইসি এখন চায় এই প্রশ্নের চিরস্থায়ী সমাধানের জন্য একটা পূর্ণাঙ্গ আইন, যার খসড়া শিগগিরই সংসদে যাওয়ার কথা।

অনিয়মের পর নগদ লভ্যাংশের নিয়মে কড়াকড়ি আনল বিএসইসি, স্বতন্ত্র পরিচালক পুনর্নিয়োগে দিল স্বস্তি

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানি এখন থেকে নগদ লভ্যাংশের প্রস্তাব এজিএমে তুলতে পারবে না যতক্ষণ না পুরো টাকা একটা আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা থেকে সনদায়িত হয়। সাম্প্রতিক অনিয়মের পরই এই সিদ্ধান্ত এসেছে, সঙ্গে আছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি। একই সভায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্বতন্ত্র পরিচালক পুনর্নিয়োগের প্রক্রিয়া সহজ করেছে, প্রতিবার নতুন পর্যালোচনার বদলে শুধু একটা ক্লিন ক্রেডিট রিপোর্টই এখন যথেষ্ট।

২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ২৮ শতাংশ, সবচেয়ে বড় ধাক্কা ইকুইটিতে

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগের বছরের তুলনায় ২৮ শতাংশ কম অর্থ বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন। নতুন বিনিয়োগকারীর আস্থার সবচেয়ে স্পষ্ট সূচক নিট ইকুইটি মূলধন প্রবাহ কমেছে ৫৫ শতাংশ, নেমে এসেছে মাত্র ১৫৫ মিলিয়ন ডলারে। অর্থনীতিবিদরা এই পতনের পেছনে জ্বালানি সংকট, বাণিজ্য বিঘ্ন এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপকেই মূল কারণ বলছেন।