পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগ

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে মুনাফায় চাপ, ডিএসই সূচক নেমে এলো ৫,৪০৪ পয়েন্টে

১৩ অক্টোবর, ২০২৬4 মিনিটের পড়া
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে মুনাফায় চাপ, ডিএসই সূচক নেমে এলো ৫,৪০৪ পয়েন্টে

ঢাকার শেয়ারবাজারের মূল সূচক ডিএসই সোমবার ৪৬ পয়েন্ট কমে ৫,৪০৪ পয়েন্টে নেমে এসেছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট আরও বাড়ার কারণে বিনিয়োগকারীদের অস্বস্তি বেড়েই চলেছে। তালিকাভুক্ত প্রায় পাঁচটি কোম্পানির মধ্যে চারটিরই শেয়ারদর কমেছে, আর লেনদেনের পরিমাণ আগের দিনের তুলনায় এক পঞ্চমাংশের বেশি কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫৩ কোটি টাকায়। বিশ্লেষকদের মতে জ্বালানি সংকটের প্রভাব এখন কোম্পানিগুলোর মুনাফায় দেখা যাচ্ছে, যদিও ট্রেজারি বিলের সুদহার কমায় কিছু শেয়ারকে তুলনামূলক সস্তা মনে হচ্ছে।

তিন কার্যদিবসের মধ্যে দুবার পতনের মুখে পড়ল ঢাকার শেয়ারবাজার। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ায় সোমবার বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধাক্কা লাগল। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, প্রধান সূচক ডিএসই রোববারের ৫,৪৫১ পয়েন্ট থেকে ৪৬.২ পয়েন্ট বা প্রায় ০.৮৫ শতাংশ কমে সোমবার ৫,৪০৪ পয়েন্টে বন্ধ হয়েছে।

  • ডিএসই সূচক ৪৬.২ পয়েন্ট কমে ৫,৪০৪ পয়েন্টে, লেনদেন হওয়া ৩৮৫ কোম্পানির মধ্যে ৩০৩টির দরই কমেছে
  • লেনদেনের পরিমাণ এক পঞ্চমাংশের বেশি কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫৩ কোটি টাকায়, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম কম
  • আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মিউচুয়াল ফান্ড খাতেই সবচেয়ে বেশি দরপতন হয়েছে
  • ট্রেজারি বিলের সুদের হার কমে যাওয়ায় কিছু কম দামের শেয়ারকে এখন তুলনামূলক লাভজনক মনে হচ্ছে, বলছেন বিশ্লেষকরা

বাজার যেন পতনের চক্রে আটকে আছে

সোমবার লেনদেন হওয়া ৩৮৫টি কোম্পানির মধ্যে ৩০৩টির শেয়ারদর কমেছে, বেড়েছে কেবল ৪৭টির, আর ৩৫টি অপরিবর্তিত ছিল। অর্থাৎ দিনের লেনদেনে প্রায় ৭৯ শতাংশ কোম্পানিরই দর কমেছে, যা সাম্প্রতিক মন্দার মধ্যেও ব্যবসায়ীদের চোখে একতরফা বিক্রির চাপ বলে মনে হয়েছে। ব্লু চিপ কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএস৩০ ৯ পয়েন্ট কমে ২,০৯৫ এ নেমেছে, আর শরিয়াহ ভিত্তিক সূচক ডিএসইএস কিছুটা ভিন্ন পথে হেঁটে ১২ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,০৭১ এ।

বাজারে আসলে কতটা টাকা হাতবদল হচ্ছে তার একটা মোটামুটি হিসাব দেয় লেনদেনের পরিমাণ, যা আগের দিনের ৫৬৬ কোটি টাকা থেকে কমে ৪৫৩ কোটি টাকায় নেমেছে, অর্থাৎ ২০ শতাংশের বেশি পতন। মোট লেনদেনের প্রায় এক চতুর্থাংশ হয়েছে বস্ত্র খাতে, তারপর সাধারণ বিমা খাতে প্রায় ১১ শতাংশ এবং প্রকৌশল খাতের শেয়ারে ৯ শতাংশ। এর মানে লেনদেন এখনো কিছু নির্দিষ্ট খাতেই সীমাবদ্ধ, পুরো বাজারে ছড়িয়ে পড়েনি।

জ্বালানি সংকটের প্রভাব এখন সংখ্যায় দেখা যাচ্ছে

ব্রোকারেজ হাউজ ইবিএল সিকিউরিটিজ তাদের দৈনিক বাজার পর্যালোচনায় বলেছে, পুঁজিবাজার এখনো "দীর্ঘমেয়াদি নিম্নমুখী ধারায় আটকে আছে।" বাজার সংশ্লিষ্টরা সোমবারের এই পতনের পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট কারণের কথা বলছেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন, যা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কারখানার উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে এবং এখন তালিকাভুক্ত উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর মুনাফার পূর্বাভাসেও তার ছাপ পড়তে শুরু করেছে।

"পুঁজিবাজার দীর্ঘমেয়াদি নিম্নমুখী ধারায় আটকে আছে," নিজেদের বাজার পর্যালোচনায় বলেছে ইবিএল সিকিউরিটিজ, যারা দুর্বল ক্রয় চাহিদা এবং অতিমূল্যায়িত শেয়ারে ফটকা লেনদেনকেও বাজারের মন্দার অতিরিক্ত কারণ বলে চিহ্নিত করেছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে সবচেয়ে বেশি ৩.৬ শতাংশ দরপতন হয়েছে, তারপর মিউচুয়াল ফান্ডে ২.৯ শতাংশ এবং সাধারণ বিমা খাতে ২.৭ শতাংশ। একমাত্র পাট খাত ইতিবাচক ধারায় ছিল, সেখানে দর বেড়েছে ২.৪ শতাংশ। আলোচিত কোম্পানিগুলোর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের শেয়ার বেড়েছে ৮.৩৩ শতাংশ, জিবিবি পাওয়ারের ৮.২৬ শতাংশ এবং প্রাইম টেক্সটাইল স্পিনিং মিলসের ৮.২১ শতাংশ। অন্যদিকে এমবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ফিনিক্স ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড এবং সিএপিএম আইবিবিএল ইসলামিক মিউচুয়াল ফান্ড প্রায় ১০ শতাংশের সার্কিট সীমার কাছাকাছি কমেছে। লেনদেনের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিল ইভিন্স টেক্সটাইল, বেক্সিমকো এবং সোনালী আঁশ ইন্ডাস্ট্রিজ।

একনজরে সোমবারের বাজার

সূচকসোমবার, ১২ অক্টোবরআগের কার্যদিবস
ডিএসই৫,৪০৪৫,৪৫১
ডিএস৩০ (ব্লু চিপ)২,০৯৫২,১০৪
ডিএসইএস (শরিয়াহ)১,০৭১১,০৫৯
লেনদেন৪৫৩ কোটি টাকা৫৬৬ কোটি টাকা
দর বৃদ্ধি / পতন / অপরিবর্তিত৪৭ / ৩০৩ / ৩৫প্রযোজ্য নয়
বার চার্টে ১২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের ডিএসই বাজারের চিত্র, ৩০৩টি কোম্পানির দরপতন, ৪৭টির বৃদ্ধি এবং ৩৫টি অপরিবর্তিত
চার্ট: বিডি ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ, তথ্যসূত্র দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।

তবু কেন কিছু বিশ্লেষক সুযোগ দেখছেন

ব্যাপক দরপতনের মধ্যেও কিছু বিশ্লেষক বলছেন, এই পতনই বরং কিছু শেয়ারকে আকর্ষণীয় করে তুলছে। তারা উল্লেখ করেছেন, গত কয়েক সপ্তাহে ট্রেজারি বিলের সুদের হার যথেষ্ট কমেছে, যা নিয়ে বিডি ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ আগেই বিস্তারিত প্রতিবেদন করেছিল। ১১ অক্টোবরের নিলামে ৯১ দিন, ১৮২ দিন ও ৩৬৪ দিনের বিলের সুদহার কমে ৭.৬৫ থেকে ৭.৮৯ শতাংশের মধ্যে নেমে আসে, যা অক্টোবরের শুরুর তুলনায় প্রায় ৪৮ বেসিস পয়েন্ট কম। সরকারি বন্ডে মুনাফা কমে যাওয়ায় কিছু ফান্ড ম্যানেজার মনে করছেন, মৌলভিত্তিতে ভালো কিন্তু কম দামে থাকা কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়া উচিত, যদিও সোমবারের লেনদেনে এখনো তার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়নি।

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও ঢাকার মতোই দুর্বলতা দেখা গেছে। সেখানকার মূল সূচক সিএএসপিআই ৮৪ পয়েন্ট কমে ১৪,৫৫১ এ এবং সিএসসিএক্স সূচক ৫৩ পয়েন্ট কমে ৮,৯৪৬ এ নেমেছে, লেনদেন হয়েছে ২৯ কোটি টাকা।

আপনার জন্য এর মানে কী

যারা বস্ত্র, প্রকৌশল বা স্পিনিং মিলের মতো জ্বালানি নির্ভর খাতের শেয়ারে বিনিয়োগ করে রেখেছেন, তাদের জন্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট একটা সতর্কবার্তা, কারণ উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটলে তা দ্রুতই প্রান্তিক আয় ও লভ্যাংশে প্রভাব ফেলতে পারে। যাদের হাতে নগদ টাকা আছে, তাদের জন্য পতনশীল বাজার এবং কমতে থাকা ট্রেজারি সুদহার একসাথে দেখাটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে সরকারি বন্ডের নিরাপত্তা আর শেয়ারের ঝুঁকির মধ্যে ফারাক কমে আসে, যা ধীরে ধীরে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের আবার বাজারে ফিরিয়ে আনতে পারে। স্থায়ী আমানত আর শেয়ারবাজারের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এফডিআর রেট তুলনা ক্যালকুলেটর দিয়ে বর্তমান সুদহারগুলো দেখে নেওয়া যেতে পারে।

যাদের ব্যবসা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য সোমবারের বাজারের প্রতিক্রিয়া বলে দিচ্ছে, বিনিয়োগকারীরা ইতিমধ্যেই লোডশেডিংয়ের খরচ হিসাবে ধরে নিচ্ছেন, আনুষ্ঠানিক আয়ের প্রতিবেদনে তা প্রতিফলিত হওয়ার আগেই। এই প্রান্তিকের বাকি সময়ে জ্বালানি সংকট চলতে থাকবে এমন ধরে নিয়েই নগদ প্রবাহের পরিকল্পনা ঝালিয়ে নেওয়া বরং বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে, দ্রুত সমাধান হবে এমন প্রত্যাশা না করে।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

২৬ মাস বোর্ডশূন্য থাকার পর বিএসইসি পুনর্গঠন করল ১,৭০০ কোটি টাকার বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল

বাংলাদেশের ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড টানা ২৬ মাস কোনো পরিচালনা বোর্ড ছাড়াই চলেছে, শেষ পর্যন্ত এই সপ্তাহে নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সাত সদস্যের একটা অন্তর্বর্তী প্যানেল গঠন করেছে। প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকার এই তহবিল, যা অদাবিকৃত লভ্যাংশ আর শেয়ারের সমন্বয়ে গড়া, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার জন্য তৈরি, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একটা আইনি বিরোধ ২০২৪ সাল থেকে পুরো কাঠামোটাকেই স্থবির করে রেখেছিল। বিএসইসি এখন চায় এই প্রশ্নের চিরস্থায়ী সমাধানের জন্য একটা পূর্ণাঙ্গ আইন, যার খসড়া শিগগিরই সংসদে যাওয়ার কথা।

অনিয়মের পর নগদ লভ্যাংশের নিয়মে কড়াকড়ি আনল বিএসইসি, স্বতন্ত্র পরিচালক পুনর্নিয়োগে দিল স্বস্তি

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানি এখন থেকে নগদ লভ্যাংশের প্রস্তাব এজিএমে তুলতে পারবে না যতক্ষণ না পুরো টাকা একটা আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা থেকে সনদায়িত হয়। সাম্প্রতিক অনিয়মের পরই এই সিদ্ধান্ত এসেছে, সঙ্গে আছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি। একই সভায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্বতন্ত্র পরিচালক পুনর্নিয়োগের প্রক্রিয়া সহজ করেছে, প্রতিবার নতুন পর্যালোচনার বদলে শুধু একটা ক্লিন ক্রেডিট রিপোর্টই এখন যথেষ্ট।

২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ২৮ শতাংশ, সবচেয়ে বড় ধাক্কা ইকুইটিতে

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগের বছরের তুলনায় ২৮ শতাংশ কম অর্থ বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন। নতুন বিনিয়োগকারীর আস্থার সবচেয়ে স্পষ্ট সূচক নিট ইকুইটি মূলধন প্রবাহ কমেছে ৫৫ শতাংশ, নেমে এসেছে মাত্র ১৫৫ মিলিয়ন ডলারে। অর্থনীতিবিদরা এই পতনের পেছনে জ্বালানি সংকট, বাণিজ্য বিঘ্ন এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপকেই মূল কারণ বলছেন।