ডিএসইএক্স ৫,৬০০ ছুঁইছুঁই, টানা চার কার্যদিবস ঊর্ধ্বমুখী ঢাকার শেয়ারবাজার
ঢাকার শেয়ারবাজার টানা চতুর্থ কার্যদিবসের মতো ঊর্ধ্বমুখী থেকেছে ২০ সেপ্টেম্বর, ডিএসইএক্স ৬০ পয়েন্ট বেড়ে বন্ধ হয়েছে ৫,৫৯২ পয়েন্টে, আর টানা চার দিনে মোট বৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২১৩ পয়েন্টে। এই উত্থান ছড়িয়ে ছিল পুরো বাজারজুড়ে, মোট ৩৮৮টি শেয়ারের মধ্যে ২৮৭টিরই দাম বেড়েছে, আর এটা মিলে যাচ্ছে মুডিসের সাম্প্রতিক আউটলুক উন্নীতকরণ আর সরকারের ৯০ দিনের মধ্যে পুঁজিবাজার সংস্কারের প্রতিশ্রুতির সাথে। তবে পুরো সপ্তাহের হিসাব দৈনিক শিরোনামের চেয়ে অনেক জটিল, লেনদেন প্রায় স্থির ছিল আর সূচক বাড়লেও সামগ্রিক বাজার মূলধন আসলে কমেছে।
ঢাকার শেয়ারবাজার টানা চতুর্থ কার্যদিবসের মতো ঊর্ধ্বমুখী থেকেছে ২০ সেপ্টেম্বর, বেঞ্চমার্ক সূচক ডিএসইএক্স ৬০ পয়েন্ট বেড়ে বন্ধ হয়েছে ৫,৫৯২ পয়েন্টে, আর টানা চার কার্যদিবসে মোট বৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২১৩ পয়েন্টে। দিনের লেনদেন বেড়ে হয়েছে ৭৪৭ কোটি টাকা, আর এই টানা উত্থানে মাসের শুরুর দিকের বড় দরপতনের ক্ষতি অনেকটাই পুষিয়ে গেছে, সংশোধন শুরু হওয়ার পর এটাই বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে স্বস্তির কয়েকটা দিন।
এই উত্থান কোনো নির্দিষ্ট কয়েকটা বড় শেয়ারে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং ছড়িয়ে ছিল পুরো বাজারজুড়ে। মোট ৩৮৮টি লেনদেন হওয়া শেয়ারের মধ্যে ২৮৭টির দাম বেড়েছে, মাত্র ৬২টির কমেছে আর ৩৯টি অপরিবর্তিত ছিল। ইবিএল সিকিউরিটিজের বিশ্লেষকরা এই অনুপাতকে বলছেন শক্তিশালী বিনিয়োগকারী অংশগ্রহণ ও ব্যাপকভিত্তিক ক্রয়চাপের ফল। ব্লু চিপ সূচক ডিএস৩০ ২০ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২,১২১ এ, আর শরিয়াহভিত্তিক সূচক ডিএসইএস ১২ পয়েন্ট বেড়ে পৌঁছেছে ১,১১৯ এ।
চার কার্যদিবস, একই দিকে
এই উত্থানের শুরু অন্তত ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ধরা যায়, যেদিন ডিএসইএক্স টানা তৃতীয় কার্যদিবসের মতো বেড়ে ৩৮.১ পয়েন্ট বা ০.৬৯ শতাংশ বৃদ্ধি নিয়ে বন্ধ হয় ৫,৫৩২ পয়েন্টে, লেনদেন হয় ৬৫৫ কোটি টাকা, যা আগের দিনের চেয়ে ১৮ শতাংশ বেশি। ওই দিন বাজার মূলধন প্রায় ৩,২৫৭ কোটি টাকা বেড়ে পৌঁছায় ৬.৯২ লাখ কোটি টাকায়। পুরো এই উত্থানের সময়জুড়ে বস্ত্র ও সাধারণ বীমা খাত, এই দুটি খাত অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি লেনদেন টেনেছে, সাথে ব্যাংক খাতের শেয়ারও একই সংস্কারের গল্পে ভর করে লাভবান হয়েছে।
| কার্যদিবস | ডিএসইএক্স সমাপনী | পরিবর্তন | লেনদেন |
|---|---|---|---|
| উত্থানের তৃতীয় দিন (১৭ সেপ্টেম্বর) | ৫,৫৩২ | +৩৮.১ পয়েন্ট | ৬৫৫ কোটি টাকা |
| উত্থানের চতুর্থ দিন (২০ সেপ্টেম্বর) | ৫,৫৯২ | +৬০ পয়েন্ট | ৭৪৭ কোটি টাকা |
| চার দিনের সম্মিলিত হিসাব | প্রযোজ্য নয় | +২১৩ পয়েন্ট | প্রযোজ্য নয় |
উত্থানের চতুর্থ দিনে মোট লেনদেনের ২৪ শতাংশ এসেছে বস্ত্র খাত থেকে, তারপর সাধারণ বীমা ১৩.২ শতাংশ আর ব্যাংক খাত ১২ শতাংশ, এই খাতভিত্তিক বিন্যাসটা মোটামুটি একই রকম আছে পুরো উত্থানজুড়ে। আলাদা কোম্পানির মধ্যে খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার বেড়েছে ৯.৮৮ শতাংশ, আইসিবি এএমসিএল সোনালী ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড বেড়েছে ৯.৮৬ শতাংশ, আর প্রাইম ফিন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড বেড়েছে ৯.৭৫ শতাংশ, সবগুলোই প্রায় দৈনিক সার্কিট সীমা ছুঁয়ে ফেলেছে।
আসলে কেনাকাটার পেছনে কী কাজ করছে
বিশ্লেষকরা কোনো একটা একক কারণ নয়, বরং একগুচ্ছ কারণের কথা বলছেন। আগের সংশোধনের পর দরপতনে থাকা শেয়ার কম দামে কিনে নেওয়ার প্রবণতাই শুরুতে বাজারকে ঠেলে দিয়েছিল, বিনিয়োগকারীরা মূল্যপতিত ব্লু চিপ আর মিড ক্যাপ শেয়ারগুলোকে বেশি বিক্রি হয়ে যাওয়া হিসেবে দেখেছেন। শিল্প এলাকায় গ্যাস সরবরাহ উন্নতির লক্ষণ এতে আরও জোর যুগিয়েছে, যা এমন এক বাজারের জন্য বড় স্বস্তির খবর যেখানে জ্বালানি সংকট বারবার কারখানাগুলোকে রেশনিংয়ে বাধ্য করেছে আর উৎপাদনভিত্তিক শেয়ারগুলোর আয়ের প্রত্যাশায় চাপ ফেলেছে। ট্রেজারি বিলের সুদহার কমে যাওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের কিছু অংশ স্থায়ী আয়ের বিনিয়োগ থেকে সরে আবার শেয়ারবাজারের দিকে ফিরেছে, আর এই ধরনের পরিবর্তন প্রথমে দেখা যায় ব্লু চিপ ও মিউচুয়াল ফান্ডের লেনদেনে, ঠিক যেখানে এই উত্থানের বেশিরভাগ লেনদেন কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
এই উত্থান বিডি ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউর সাম্প্রতিক দুটি প্রতিবেদনের সাথেও মিলে যাচ্ছে। মুডিস ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের সার্বভৌম ক্রেডিট আউটলুক নেগেটিভ থেকে স্টেবলে উন্নীত করেছে, আর একই সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী ৯০ দিনের মধ্যে সংস্কার প্যাকেজের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যাতে আইপিও অনুমোদনের সময় কমানো আর ভবিষ্যতে ডেরিভেটিভস মার্কেট চালুর কথা আছে। এই দুটো ঘটনাই ঠিক এই উত্থানের সময়সীমার মধ্যে পড়েছে, আর স্থানীয় ব্যবসায়িক গণমাধ্যমের সাথে কথা বলা ট্রেডাররা বারবার মুডিসের সিদ্ধান্তকেই আস্থা বাড়ানোর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যদিও রেটিং সংস্থাটি বাংলাদেশের প্রকৃত বি২ রেটিং অপরিবর্তিত রেখেছে আর সতর্ক করেছে যে ব্যাংক খাতের প্রায় এক তৃতীয়াংশ ঋণই খেলাপি।
সাপ্তাহিক হিসাব দৈনিক শিরোনামের চেয়ে জটিল
১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর মিলিয়ে পুরো সপ্তাহের হিসাবে তাকালে ছবিটা এক দিনের শিরোনামের মতো একতরফা আনন্দের নয়। সপ্তাহের গড় দৈনিক লেনদেন দাঁড়িয়েছে ৫৫৪ কোটি টাকা, প্রায় স্থির, আগের সপ্তাহের চেয়ে মাত্র ০.১১ শতাংশ বেশি। পুরো সপ্তাহের বাজার বিস্তারে দেখা যায় ২১৩টি শেয়ারের দাম কমেছে আর মাত্র ১৪৭টির বেড়েছে, আর সূচক কিছুটা বাড়লেও পুরো সপ্তাহে বাজার মূলধন প্রায় ৭০০ কোটি টাকা কমেছে। সাপ্তাহিক হিসাবে সিমেন্ট খাত সবচেয়ে বেশি ১.৭ শতাংশ বেড়েছে, তারপর সাধারণ বীমা ১.৫ শতাংশ আর ব্যাংক খাত ১.১ শতাংশ। অন্যদিকে লাইফ ইনস্যুরেন্সের শেয়ার কমেছে ১.৩ শতাংশ, বিবিধ খাত ১.২ শতাংশ আর মিউচুয়াল ফান্ড ১.২ শতাংশ কমেছে একই সময়ে।
সপ্তাহজুড়ে আলাদা আলাদা শেয়ারের ওঠানামা সূচকের তুলনায় অনেক বেশি অস্থির ছিল। আল-হাজ টেক্সটাইলের শেয়ার বেড়েছে ২০.৬ শতাংশ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্স বেড়েছে ১৮.৪ শতাংশ আর ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্ক বেড়েছে ১৭.৫ শতাংশ। আবার অন্যদিকে বিডি থাই ফুডের শেয়ার কমেছে ১৫.৯ শতাংশ, সাইফ পাওয়ারটেক কমেছে ১০.৩ শতাংশ আর ফারইস্ট লাইফ ইনস্যুরেন্স কমেছে ১০.১ শতাংশ। মৃদু ইতিবাচক একটা শিরোনাম সংখ্যার নিচে এমন তীব্র উত্থান-পতন পাশাপাশি থাকাটাই বলে দেয়, বাজার এখনো পুরোপুরি সমান্তরাল কোনো ক্রয়ের ঢেউয়ে নয়, বরং কোম্পানিভিত্তিক খবর আর সীমিত তারল্যের ওপর ভর করেই চলছে।
সংস্কারের প্রতিশ্রুতির আলোয় এই উত্থান বিচার করা
এই উত্থানকে গুরুত্ব দিয়ে লক্ষ্য করার কারণ হলো, এটা মুনাফার মৌলিক ভিত্তির চেয়ে নীতিগত প্রত্যাশার সাথে অনেক বেশি সরাসরিভাবে জড়িত। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ঐতিহাসিকভাবে ভারত বা থাইল্যান্ডের মতো আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় প্রায় অর্ধেক দৈনিক লেনদেনের হারে চলে, আর সিকিউরিটিজ নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিজেই স্বীকার করেছে যে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় স্বল্পমেয়াদি আমানত আর অবকাঠামো ও শিল্প প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি ঋণের মধ্যে বিপজ্জনক অসামঞ্জস্য আছে। এই উত্থানে যারা শেয়ার কিনছেন, তারা মূলত বাজি ধরছেন যে সরকারের সংস্কার প্রতিশ্রুতি, বিশেষ করে আইপিও অনুমোদনের সময় দুই বছরের মতো দীর্ঘ সময় থেকে কমিয়ে কয়েক মাসে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি, সত্যিই বাস্তবায়িত হবে, ঢাকায় আগে আসা এমন অনেক প্রতিশ্রুতির মতো কথায় থেকে যাবে না।
সরকারি কর্মকর্তারা বলেছেন, বাংলাদেশিরা দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই বাজারে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে পাবেন, অর্থাৎ প্রথম যাচাইয়ের সময় পড়বে নভেম্বর বা ডিসেম্বরের কাছাকাছি। ততদিন পর্যন্ত এই উত্থানকে সবচেয়ে নিরাপদভাবে দেখার উপায় হলো, এটা কঠিন এক সংশোধনের পর প্রকৃত স্বস্তি, গ্যাস সরবরাহ আর মুডিসের আউটলুক পরিবর্তন নিয়ে প্রকৃত আশাবাদ, আর সংস্কারের প্রতিশ্রুতিকে আপাতত সন্দেহের সুযোগ দেওয়া একটা বাজারের প্রতিফলন, এই সংস্কার কাজ করছে তার নিশ্চিত প্রমাণ নয়। প্রকৃত পরীক্ষাটা হবে তখনই, যখন এই উত্থান প্রথমবার থমকে যাবে আর বিনিয়োগকারীরা ঠিক করবেন সেই দরপতনকে কেনার সুযোগ হিসেবে দেখবেন, নাকি আশাবাদ বাস্তবতার চেয়ে এগিয়ে গিয়েছিল তার প্রমাণ হিসেবে।
তথ্যসূত্র
এরপর পড়ুন
২৬ মাস বোর্ডশূন্য থাকার পর বিএসইসি পুনর্গঠন করল ১,৭০০ কোটি টাকার বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল
বাংলাদেশের ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড টানা ২৬ মাস কোনো পরিচালনা বোর্ড ছাড়াই চলেছে, শেষ পর্যন্ত এই সপ্তাহে নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সাত সদস্যের একটা অন্তর্বর্তী প্যানেল গঠন করেছে। প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকার এই তহবিল, যা অদাবিকৃত লভ্যাংশ আর শেয়ারের সমন্বয়ে গড়া, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার জন্য তৈরি, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একটা আইনি বিরোধ ২০২৪ সাল থেকে পুরো কাঠামোটাকেই স্থবির করে রেখেছিল। বিএসইসি এখন চায় এই প্রশ্নের চিরস্থায়ী সমাধানের জন্য একটা পূর্ণাঙ্গ আইন, যার খসড়া শিগগিরই সংসদে যাওয়ার কথা।
অনিয়মের পর নগদ লভ্যাংশের নিয়মে কড়াকড়ি আনল বিএসইসি, স্বতন্ত্র পরিচালক পুনর্নিয়োগে দিল স্বস্তি
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানি এখন থেকে নগদ লভ্যাংশের প্রস্তাব এজিএমে তুলতে পারবে না যতক্ষণ না পুরো টাকা একটা আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা থেকে সনদায়িত হয়। সাম্প্রতিক অনিয়মের পরই এই সিদ্ধান্ত এসেছে, সঙ্গে আছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি। একই সভায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্বতন্ত্র পরিচালক পুনর্নিয়োগের প্রক্রিয়া সহজ করেছে, প্রতিবার নতুন পর্যালোচনার বদলে শুধু একটা ক্লিন ক্রেডিট রিপোর্টই এখন যথেষ্ট।
২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ২৮ শতাংশ, সবচেয়ে বড় ধাক্কা ইকুইটিতে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগের বছরের তুলনায় ২৮ শতাংশ কম অর্থ বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন। নতুন বিনিয়োগকারীর আস্থার সবচেয়ে স্পষ্ট সূচক নিট ইকুইটি মূলধন প্রবাহ কমেছে ৫৫ শতাংশ, নেমে এসেছে মাত্র ১৫৫ মিলিয়ন ডলারে। অর্থনীতিবিদরা এই পতনের পেছনে জ্বালানি সংকট, বাণিজ্য বিঘ্ন এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপকেই মূল কারণ বলছেন।