আয় নিয়ে উদ্বেগে টানা দ্বিতীয় দিন পড়ল ঢাকার শেয়ারবাজার, থেমে গেল র্যালি
মুডিজের আউটলুক আপগ্রেড আর ব্যাংক পরিচালকদের শেয়ার কেনার ঢেউয়ের জোরে ৫,৫৯৬ পয়েন্টে ওঠার মাত্র তিন কার্যদিবস পর, ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার বেঞ্চমার্ক ডিএসইএক্স টানা দ্বিতীয় সেশনে পড়ে গেছে, ৪৫ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৫,৫৩২ পয়েন্টে, আর লেনদেন ৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৭২৭ কোটি টাকায়। বিশ্লেষকরা এই পতনের জন্য জুন অর্থবছর শেষ হওয়া কোম্পানিগুলোর আসন্ন আয় নিয়ে উদ্বেগকে দায়ী করছেন, লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ, পূবালী ব্যাংক আর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের মতো বড় মূলধনের শেয়ার এই পতনের নেতৃত্বে। এই ধরনটা বাজার থেকে গভীর কোনো পলায়নের চেয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সীমায় পৌঁছানো একটা সস্তা শেয়ার কেনার র্যালির সাথেই বেশি মিলে যায়, যদিও আগামী কয়েক সপ্তাহে আয়ের প্রতিবেদন আসতে শুরু করলে চিত্রটা আরও স্পষ্ট হবে।
এই সপ্তাহের শুরুতে ঢাকার বেঞ্চমার্ক সূচককে ৫,৫৯৬ পয়েন্টে তুলে আনা র্যালির গতি এখন ফুরিয়ে গেছে। ডিএসইএক্স ৪৫ পয়েন্ট বা ০.৮১ শতাংশ কমে ২৭ সেপ্টেম্বর বন্ধ হয়েছে ৫,৫৩২ পয়েন্টে, টানা দ্বিতীয় দিনের পতন, আর লেনদেনের পরিমাণ ৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৭২৭ কোটি টাকায়। এই পিছু হটা এমন এক সময়ে এলো যখন মাত্র তিন কার্যদিবস আগে এই একই সূচক মুডিজের আউটলুক আপগ্রেড আর পুঁজিবাজারের নিয়মকানুন সংস্কারের সরকারি প্রতিশ্রুতির জোরে টানা চার দিনের উত্থান দেখিয়েছিল, যাকে এই প্রকাশনা তখন একটা প্রকৃত, যদিও এলোমেলো, ঘুরে দাঁড়ানো হিসেবে তুলে ধরেছিল। সেই ঘুরে দাঁড়ানো এখন ডিএসইর পুরনো পর্যবেক্ষকদের কাছে অনেক বেশি চেনা এক পরিস্থিতিতে জায়গা করে দিয়েছে, আয় প্রকাশের মৌসুমের আগে সতর্কতা, যা বিনিয়োগকারীরা এখনও পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছেন না।
তিন কার্যদিবসে কী বদলে গেল
২৪ সেপ্টেম্বর ডিএসইএক্স বন্ধ হয়েছিল ৫,৫৯৬ পয়েন্টে, টানা কয়েক দিনের উত্থানের পর, যার পেছনে বাজার অংশগ্রহণকারীরা কৃতিত্ব দিয়েছিলেন বাংলাদেশের ক্রেডিট আউটলুক নেতিবাচক থেকে স্থিতিশীলে উন্নীত করার মুডিজের সিদ্ধান্তকে, তার সাথে ব্যাংক পরিচালকদের নিজেদের শেয়ার কেনার একটা ঢেউকে, যা এই প্রকাশনা একই সপ্তাহে প্রতিবেদনে তুলে ধরেছিল, যার মধ্যে ছিল ইস্টার্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে তার বাবার কাছ থেকে ৩৮ কোটি টাকার শেয়ার উপহার, আর প্রাইম ব্যাংকের অন্তর্গত ব্যক্তিদের মিলিয়ে ১৩.৯ কোটি টাকার ব্লক মার্কেট কেনাকাটা। সার্বভৌম আপগ্রেড আর দৃশ্যমান অন্তর্গত ক্রয়ের এই মিলনকে বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক ব্যালেন্স শিটের সবচেয়ে কাছের মানুষদের কাছ থেকে আসা একটা মৃদু আস্থার ভোট হিসেবে পড়েছিলেন। তিন সেশন পরে, সেই আস্থা দৃশ্যত ঠান্ডা হয়ে গেছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের তথ্য অনুযায়ী, বাজার অংশগ্রহণকারীরা ২৭ সেপ্টেম্বরের এই পতনের জন্য মূলত কোম্পানির আয় নিয়ে উদ্বেগকে দায়ী করেছেন, সাথে চলমান মুনাফা তোলাও এর প্রভাব আরও বাড়িয়েছে। ইবিএল সিকিউরিটিজ বলেছে, সতর্ক বিনিয়োগকারীরা আরও ঊর্ধ্বমুখী গতির ব্যাপারে সীমিত আস্থা নিয়ে অপেক্ষা করে দেখার একটা পন্থা নিয়েছেন, আর শেল্টেক ব্রোকারেজ বলেছে এই সেশনে বিক্রির চাপই প্রাধান্য পেয়েছে।
বড় মূলধনের শেয়ারগুলোই পতনের নেতৃত্ব দিয়েছে
সূচকের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করা শেয়ারগুলো কোনো ছোট বা কম লেনদেন হওয়া নাম না, বরং বাজারের কিছু সবচেয়ে বড় উপাদান। লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ, পূবালী ব্যাংক আর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশকে ২৭ সেপ্টেম্বরের সেশনে সূচকের প্রধান টানাটানির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বড়, ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষিত শেয়ারগুলোতে এই ঘনত্ব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটা ইঙ্গিত দেয় এই পিছু হটা কোনো সংকীর্ণ, নির্দিষ্ট খাতের টালমাটাল অবস্থা না, বরং বাজারের সবচেয়ে বেশি ওজনদার নামগুলো জুড়ে ঝুঁকির একটা ব্যাপক পুনর্মূল্যায়ন, ঠিক সেই নামগুলোই যাদের আয়ের প্রতিবেদনের জন্য বিনিয়োগকারীরা এখন অপেক্ষা করছেন। বিশেষভাবে অনিশ্চয়তা ঘিরে আছে জুন অর্থবছর শেষ হওয়া কোম্পানিগুলোর ফলাফল নিয়ে, যাদের সংখ্যা আগামী কয়েক সপ্তাহে বিনিয়োগকারীদের হাতে পৌঁছাতে শুরু করবে, আর সেগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে পড়া হবে এটা বোঝার জন্য যে বাড়তি জ্বালানি খরচ, উঁচু নীতি সুদহার, আর ধীরগতির বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি এই বছর কোম্পানিগুলোর মুনাফার হার ঠিক কতটা চাপে ফেলেছে।
দুটো আলাদা গল্পের ওপর দাঁড়ানো একটা র্যালি
এই প্রকাশনা যে ২৪ সেপ্টেম্বরের ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে প্রতিবেদন করেছিল তা দুটো আলাদা স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, যেগুলো একসাথে চলতে বাধ্য না। প্রথমটা ছিল সামষ্টিক মনোভাব, মুডিজের ১৬ সেপ্টেম্বরের আউটলুক আপগ্রেড, যদিও এতে বাংলাদেশের অন্তর্নিহিত বি২ রেটিং অপরিবর্তিতই থেকেছে, বাজার এটাকে দেশের ক্রেডিট গতিপথ অবনতি থামার একটা সংকেত হিসেবে পড়েছিল। দ্বিতীয়টা ছিল ব্যাংক খাতের সাথে সম্পর্কিত একটা সুশাসন-ঘেঁষা সংকেত, অন্তর্গত ব্যক্তিদের নিজেদের শেয়ার হোল্ডিং বাড়ানো, যা সেই সময় বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছিলেন আংশিকভাবে বিএসইসির একটা নিয়মের প্রতি যান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া, যে নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংক স্পনসর আর পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে অন্তত ৩০ শতাংশ শেয়ার ধরে রাখতে হয়, বিশুদ্ধ আস্থার বাজি না। তিন কার্যদিবস পর দেখা যাচ্ছে, এই দুই স্তম্ভের মধ্যে প্রথমটাই, সামষ্টিক গল্পটাই, দ্বিতীয়টার চেয়ে দ্রুত লেনদেনের মনোভাবের ওপর তার প্রভাব হারাচ্ছে, কারণ এই পিছু হটা পূবালী ব্যাংক আর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের মতো ব্যাংকিং নামগুলোতেও আঘাত করেছে, যদিও সপ্তাহের শুরুতে ব্যাংক শেয়ার তুলতে সাহায্য করা সেই অন্তর্গত ক্রয় উল্টে গেছে এমন কোনো প্রতিবেদন আসেনি।
| সেশন | ডিএসইএক্স ক্লোজ | পরিবর্তন | লেনদেন |
|---|---|---|---|
| ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (র্যালি) | ৫,৫৯৬ | +৫৫ পয়েন্ট | উল্লেখ নেই |
| ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (পতন) | ৫,৫৩২ | -৪৫ পয়েন্ট (-০.৮১%) | ৭২৭ কোটি টাকা (-৪%) |
কেন এটাকে সস্তা শেয়ার কেনার সীমায় পৌঁছানো বলে মনে হচ্ছে
সূচক ৫,৫৯৬ পয়েন্টের দিকে ওঠার সময়েও বিশ্লেষকরা ইতিমধ্যে চিহ্নিত করেছিলেন যে সেপ্টেম্বরের এই র্যালি সামষ্টিক-চালিত একটা বড় উত্থানের নতুন পর্যায়ের চেয়ে আয় প্রকাশের মৌসুমের আগে সস্তা শেয়ার কেনার একটা প্রক্রিয়ার মতো বেশি লাগছিল, কারণ কয়েকটা ইতিবাচক সেশন সত্ত্বেও সূচক তার ২০ সেপ্টেম্বরের স্তরের চেয়ে সামান্যই ওপরে ছিল। ২৭ সেপ্টেম্বরের এই পতন সেই পাঠের সাথেই মিলে যায়। মূলত সস্তা মনে হওয়া শেয়ার কিনতে থাকা বিনিয়োগকারীদের চালিত একটা র্যালি সাধারণত দাম আর সস্তা মনে না হওয়ার মতো স্তরে ফিরে গেলেই দ্রুত গতি হারায়, বিশেষ করে যখন পরবর্তী নির্ধারিত ঘটনা, এক্ষেত্রে জুন অর্থবছর শেষের আয় প্রতিবেদনের একটা ঢেউ, এমন কিছু যা প্রভাবিত করার মতোই সহজে হতাশও করতে পারে। এই গতিশীলতা আগামী কয়েক সপ্তাহের জন্য ডিএসইএক্সকে একটা অস্বাভাবিকভাবে তথ্য-নির্ভর অবস্থানে রেখে দেয়, বাংলাদেশের উন্নতি হতে থাকা ক্রেডিট গল্পের আরও নিশ্চিতকরণ কেনাকাটা আবার জ্বালিয়ে দিতে পারে, কিন্তু ব্যাংকিং আর শিল্প খাতের নাম থেকে দুর্বল আয়ের একটা ধারা এই সপ্তাহের দুই সেশনের পতনকে আরও দীর্ঘ কিছুতে পরিণত করতে পারে।
এরপর যা দেখার আছে
সবচেয়ে তাৎক্ষণিক সংকেত হবে সূচকের সাথে সাথে লেনদেনের পরিমাণও কমতে থাকে কিনা তা দেখা। সূচক পড়ার সাথে সাথে লেনদেনের মূল্য ৪ শতাংশ কমে ৭২৭ কোটি টাকায় নেমে আসা সাধারণত আতঙ্কের চেয়ে দ্বিধার সংকেত দেয়, কারণ বাজার থেকে প্রকৃত পলায়নে সাধারণত দাম কমা আর লেনদেনের পরিমাণ বাড়া দুটোই একসাথে দেখা যায়, যখন বিক্রেতারা দরজার দিকে ছুটতে থাকেন। আপাতত, এই ধরনটা দরজার দিকে ছোটার চেয়ে বিনিয়োগকারীদের পাশে সরে দাঁড়ানোর মতোই বেশি লাগছে, যা অর্থনীতির মৌলিক অবনতির পুনর্মূল্যায়নের চেয়ে আয়ের তথ্যের জন্য অপেক্ষা করা একটা বাজারের সাথে বেশি খাপ খায়। এই পার্থক্যটা ঠিক থাকে কিনা তা আগামী কয়েক সপ্তাহে জুন অর্থবছরের ফলাফল আসতে শুরু করলে আরও স্পষ্ট হয়ে যাবে।
তথ্যসূত্র
এরপর পড়ুন
২৬ মাস বোর্ডশূন্য থাকার পর বিএসইসি পুনর্গঠন করল ১,৭০০ কোটি টাকার বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল
বাংলাদেশের ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড টানা ২৬ মাস কোনো পরিচালনা বোর্ড ছাড়াই চলেছে, শেষ পর্যন্ত এই সপ্তাহে নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সাত সদস্যের একটা অন্তর্বর্তী প্যানেল গঠন করেছে। প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকার এই তহবিল, যা অদাবিকৃত লভ্যাংশ আর শেয়ারের সমন্বয়ে গড়া, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার জন্য তৈরি, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একটা আইনি বিরোধ ২০২৪ সাল থেকে পুরো কাঠামোটাকেই স্থবির করে রেখেছিল। বিএসইসি এখন চায় এই প্রশ্নের চিরস্থায়ী সমাধানের জন্য একটা পূর্ণাঙ্গ আইন, যার খসড়া শিগগিরই সংসদে যাওয়ার কথা।
অনিয়মের পর নগদ লভ্যাংশের নিয়মে কড়াকড়ি আনল বিএসইসি, স্বতন্ত্র পরিচালক পুনর্নিয়োগে দিল স্বস্তি
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানি এখন থেকে নগদ লভ্যাংশের প্রস্তাব এজিএমে তুলতে পারবে না যতক্ষণ না পুরো টাকা একটা আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা থেকে সনদায়িত হয়। সাম্প্রতিক অনিয়মের পরই এই সিদ্ধান্ত এসেছে, সঙ্গে আছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি। একই সভায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্বতন্ত্র পরিচালক পুনর্নিয়োগের প্রক্রিয়া সহজ করেছে, প্রতিবার নতুন পর্যালোচনার বদলে শুধু একটা ক্লিন ক্রেডিট রিপোর্টই এখন যথেষ্ট।
২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ২৮ শতাংশ, সবচেয়ে বড় ধাক্কা ইকুইটিতে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগের বছরের তুলনায় ২৮ শতাংশ কম অর্থ বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন। নতুন বিনিয়োগকারীর আস্থার সবচেয়ে স্পষ্ট সূচক নিট ইকুইটি মূলধন প্রবাহ কমেছে ৫৫ শতাংশ, নেমে এসেছে মাত্র ১৫৫ মিলিয়ন ডলারে। অর্থনীতিবিদরা এই পতনের পেছনে জ্বালানি সংকট, বাণিজ্য বিঘ্ন এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপকেই মূল কারণ বলছেন।