চার কার্যদিবসের দরপতন কাটিয়ে ডিএসইএক্স বাড়ল ৩৮ পয়েন্ট, কম দামে শেয়ার কেনার হিড়িক
বুধবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মূল সূচক ডিএসইএক্স বেড়েছে ৩৮.১২ পয়েন্ট বা ০.৭০ শতাংশ, বন্ধ হয়েছে ৫,৪৬৩.৩৫ পয়েন্টে, আগের চার কার্যদিবসে হারানো প্রায় ১২৫ পয়েন্টের একটা অংশ ফিরে পেয়ে। ইবিএল সিকিউরিটিজের ব্রোকাররা এই ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য বলছেন বিনিয়োগকারীরা সম্প্রতি সবচেয়ে বেশি দাম হারানো শেয়ারে ফিরে এসেছেন, তবে তারা দিনটাকে অস্থির আর সার্বিক বিনিয়োগকারী মনোভাবকে এখনো নিস্তেজ বলেই বর্ণনা করেছেন। এই উত্থান এসেছে বিডি ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউয়ে বিএসইসির আইপিও অনুমোদনের সময় কমানোর প্রতিশ্রুতির প্রতিবেদন প্রকাশের মাত্র দুই কার্যদিবস পর, যে সংস্কারের লক্ষ্য এমন একটা বাজারে নতুন তালিকাভুক্তি আনা যা মাত্র পরপর চার কার্যদিবস কমে বন্ধ হয়েছিল।
নিজেরাই বলছে, ঘুরে দাঁড়ানো এখনো ঠুনকো
বুধবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মূল সূচক ডিএসইএক্স বেড়েছে ৩৮.১২ পয়েন্ট বা ০.৭০ শতাংশ, বন্ধ হয়েছে ৫,৪৬৩.৩৫ পয়েন্টে, আগের চার কার্যদিবসে হারানো প্রায় ১২৫ পয়েন্টের একটা অংশ ফিরে পেয়ে। ব্লু-চিপ সূচক ডিএস৩০ বেড়েছে ১৯.১১ পয়েন্ট, গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২,০৯৬.২৪ পয়েন্টে, শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস বেড়েছে ৮.৭৯ পয়েন্ট, হয়েছে ১,১৯৬.৬৭, আর চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সিএসপিআই বেড়েছে ৯৮ পয়েন্ট, গিয়েছে ১৪,৬৫৫-এ, সিএসসিএক্স বেড়েছে ৭০ পয়েন্ট, হয়েছে ৯,০০৯। ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে ৬০৪ কোটি টাকা, আগের দিনের চেয়ে ৭ শতাংশ বেশি, দামের উত্থানের পাশাপাশি লেনদেনের গতিও কিছুটা বেড়েছে বলা যায়।
স্থানীয় বাজার প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ইবিএল সিকিউরিটিজের ব্রোকাররা এই দিনের উত্থানকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যে, বিনিয়োগকারীরা আগের সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি দাম হারানো শেয়ারগুলোতে ফিরে এসেছেন, এটা সাধারণত কয়েক কার্যদিবসের পতনের পর দেখা যাওয়া বাছাই করা কম দামে শেয়ার কেনার ধরন, কোনো নতুন খবরের ভিত্তিতে ব্যাপক র্যালি নয়। দিনটা একদমই সরলরেখার মতো ওপরে যায়নি। শুরুতে বাছাই করা ক্রয়চাপে সূচক উঠেছিল, দিনের মাঝামাঝি নতুন করে বিক্রির চাপে তা নেমে গিয়েছিল, আর শেষ বেলার ক্রয়চাপে তা আবার পজিটিভ জায়গায় ফিরে আসে বন্ধের সময়। ইবিএল সিকিউরিটিজ বলেছে সার্বিক বিনিয়োগকারী মনোভাব এখনো নিস্তেজ, আর এই ঘুরে দাঁড়ানোকে তারা ঠুনকো বলে অভিহিত করেছে, যে কথাটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটা বুধবারের উত্থানকে একটা দুর্বল সময়ের মাঝে একটা বিরতি হিসেবে দেখায়, কোনো মোড় ঘোরানোর মুহূর্ত নয়।
টাকা কোথায় সরল
দিনটার ব্রেডথ বা ব্যাপ্তি পজিটিভ ছিল, তবে একচেটিয়া নয়। লেনদেন হওয়া ৩৯১টি শেয়ারের মধ্যে ১৯১টির দাম বেড়েছে, ১৩৪টির কমেছে, আর ৬৬টি অপরিবর্তিত ছিল, মানে সূচক বাড়লেও বাজারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শেয়ার তখনো লোকসানে বন্ধ হয়েছে। খাতভিত্তিক পারফরম্যান্স ছিল অসমান, যা বাছাই করে কেনার গল্পের সঙ্গে ব্যাপক র্যালির চেয়ে বেশি মেলে, পাট খাত সবচেয়ে এগিয়ে ছিল ৫ শতাংশ বৃদ্ধি নিয়ে, কাগজ খাত বেড়েছে ২.৮ শতাংশ আর ইঞ্জিনিয়ারিং খাত ২.২ শতাংশ, অন্যদিকে মিউচুয়াল ফান্ড কমেছে ১.৫ শতাংশ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান কমেছে ০.৯ শতাংশ আর সেবা খাত কমেছে ০.৪ শতাংশ। এই খাতগুলোর কোনোটার একক পরিবর্তনই ৩৮ পয়েন্টের সূচক বৃদ্ধি ব্যাখ্যা করার মতো যথেষ্ট বড় নয়, যা বলে দেয় উত্থানটা কোনো একটা বা দুটো বড় খাতে জমাট না হয়ে আগে মার খাওয়া শেয়ারগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল।
লেনদেনের হিসাবে সবচেয়ে বড় অংশ ছিল টেক্সটাইল খাতের, ৩২ শতাংশ, যা ওষুধ খাতের ৯.৮ শতাংশ আর সাধারণ বীমা খাতের ৯.৫ শতাংশের চেয়ে অনেক এগিয়ে, যা দেখিয়ে দেয় লেনদেনের পরিমাণ আর খাতের দামের উত্থান সবসময় একসঙ্গে চলে না, দামে এগিয়ে ছিল পাট আর ইঞ্জিনিয়ারিং, কিন্তু লেনদেনের পরিমাণে এগিয়ে ছিল টেক্সটাইল। এই রকম গরমিল সেই পাঠকের জন্য মনে রাখার মতো, যারা দিনের সংখ্যাকে স্রেফ একটা সরল গল্প বলে ধরে নেন, বিনিয়োগকারীরা আগের মার খাওয়া শেয়ারে ফিরে এসেছেন, বাস্তব ছবিটা একটা শিরোনামের সংখ্যা, যেমন "ডিএসইএক্স বাড়ল ৩৮ পয়েন্ট", তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
| সূচক / পরিমাপ | বুধবারের বন্ধ | পরিবর্তন |
|---|---|---|
| ডিএসইএক্স | ৫,৪৬৩.৩৫ | +৩৮.১২ (+০.৭০%) |
| ডিএস৩০ | ২,০৯৬.২৪ | +১৯.১১ |
| ডিএসইএস (শরিয়াহ) | ১,১৯৬.৬৭ | +৮.৭৯ |
| সিএসপিআই (চট্টগ্রাম) | ১৪,৬৫৫ | +৯৮ |
| সিএসসিএক্স (চট্টগ্রাম) | ৯,০০৯ | +৭০ |
| ডিএসই লেনদেন | ৬০৪ কোটি টাকা | আগের দিনের চেয়ে +৭% |
পেছনের গল্প: সংস্কারের চেষ্টা আর নড়বড়ে বাজার
বুধবারের এই উত্থান এসেছে বিডি ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের মাত্র দুই কার্যদিবস পর, যেখানে বলা হয়েছিল বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান আইপিও অনুমোদনের সময় প্রায় ১৮ মাস থেকে কমিয়ে প্রায় তিন মাসে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আর অন্তত একটা বিদেশি মালিকানার প্রতিষ্ঠান এই দ্রুত প্রক্রিয়ায় আবেদনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। সেই ঘোষণা, জুলাইয়ে শুরু হওয়া একটা সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ আর সেপ্টেম্বরে বড় বহুজাতিক ও দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য তালিকাভুক্তি বাধ্যতামূলক করার হুঁশিয়ারির পর সংস্কারের তৃতীয় পদক্ষেপ, এসেছিল এমন এক সময়ে যাকে আগের প্রতিবেদনে "বেখাপ্পা মুহূর্ত" বলা হয়েছিল, কারণ তখন ডিএসইএক্স দুর্বল ব্যাংক আয়ের কারণে পরপর চার কার্যদিবস কমে বন্ধ হয়েছিল। বুধবারের ঘুরে দাঁড়ানোর আগের সেই চার কার্যদিবসের দরপতনই আসলে সেই প্রতিবেদনে উল্লেখিত সময়টা, যার মানে আইপিও সংস্কার যে বাজারকে নতুন তালিকাভুক্তি দিয়ে চাঙ্গা করতে চাইছে, সেই বাজার আপাতত এখনো আয়ের মৌসুম ঘিরে তৈরি হওয়া বিক্রির চাপ সামলাচ্ছে, তালিকাভুক্তি সংস্কারের প্রতিক্রিয়ায় নয়।
এই সময়টা নিয়ন্ত্রক আর ব্রোকারদের সামনের পথ কীভাবে দেখছেন তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত আইপিও প্রক্রিয়া একটা মধ্যমেয়াদি কাঠামোগত সমাধান, যার লক্ষ্য এক্সচেঞ্জে আরও কোম্পানি আর আরও লেনদেনের পরিমাণ আনা, এটা ইতিমধ্যে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর আয়ের পারফরম্যান্স বদলে দেয় না, যা ব্রোকাররা সাম্প্রতিক দুর্বলতার একটা কারণ বলে চিহ্নিত করেছেন। বুধবারের এই বৃদ্ধি প্রকৃত কয়েক কার্যদিবসের ঘুরে দাঁড়ানোয় রূপ নেবে, নাকি ইবিএল সিকিউরিটিজের সতর্কবার্তার মতোই একদিনের বাউন্স হয়ে থেকে যাবে, তা সম্ভবত নির্ভর করবে সামনের কোম্পানিগুলোর আয়ের প্রতিবেদনের ওপর, আর বুধবারের ক্রয়চাপে এগিয়ে থাকা আগে মার খাওয়া শেয়ারগুলো প্রাথমিক কম দামে কেনার চাহিদা মিটে যাওয়ার পর তাদের লাভ ধরে রাখতে পারে কিনা তার ওপর। যে বাজার গত এক সপ্তাহ ধরে বিক্রির চাপ সামলাচ্ছে, তার জন্য গড়ের চেয়ে সামান্য বেশি লেনদেন নিয়ে একটা পজিটিভ সেশন আশাব্যঞ্জক একটা লক্ষণ, তবে এখনো পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য নয়।
তথ্যসূত্র
এরপর পড়ুন
২৬ মাস বোর্ডশূন্য থাকার পর বিএসইসি পুনর্গঠন করল ১,৭০০ কোটি টাকার বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল
বাংলাদেশের ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড টানা ২৬ মাস কোনো পরিচালনা বোর্ড ছাড়াই চলেছে, শেষ পর্যন্ত এই সপ্তাহে নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সাত সদস্যের একটা অন্তর্বর্তী প্যানেল গঠন করেছে। প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকার এই তহবিল, যা অদাবিকৃত লভ্যাংশ আর শেয়ারের সমন্বয়ে গড়া, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার জন্য তৈরি, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একটা আইনি বিরোধ ২০২৪ সাল থেকে পুরো কাঠামোটাকেই স্থবির করে রেখেছিল। বিএসইসি এখন চায় এই প্রশ্নের চিরস্থায়ী সমাধানের জন্য একটা পূর্ণাঙ্গ আইন, যার খসড়া শিগগিরই সংসদে যাওয়ার কথা।
অনিয়মের পর নগদ লভ্যাংশের নিয়মে কড়াকড়ি আনল বিএসইসি, স্বতন্ত্র পরিচালক পুনর্নিয়োগে দিল স্বস্তি
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানি এখন থেকে নগদ লভ্যাংশের প্রস্তাব এজিএমে তুলতে পারবে না যতক্ষণ না পুরো টাকা একটা আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা থেকে সনদায়িত হয়। সাম্প্রতিক অনিয়মের পরই এই সিদ্ধান্ত এসেছে, সঙ্গে আছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি। একই সভায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্বতন্ত্র পরিচালক পুনর্নিয়োগের প্রক্রিয়া সহজ করেছে, প্রতিবার নতুন পর্যালোচনার বদলে শুধু একটা ক্লিন ক্রেডিট রিপোর্টই এখন যথেষ্ট।
২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ২৮ শতাংশ, সবচেয়ে বড় ধাক্কা ইকুইটিতে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগের বছরের তুলনায় ২৮ শতাংশ কম অর্থ বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন। নতুন বিনিয়োগকারীর আস্থার সবচেয়ে স্পষ্ট সূচক নিট ইকুইটি মূলধন প্রবাহ কমেছে ৫৫ শতাংশ, নেমে এসেছে মাত্র ১৫৫ মিলিয়ন ডলারে। অর্থনীতিবিদরা এই পতনের পেছনে জ্বালানি সংকট, বাণিজ্য বিঘ্ন এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপকেই মূল কারণ বলছেন।