সংবাদ

টানা তিন কার্যদিবসের উত্থানের পর মুনাফা তুলে নেওয়ার চাপে থমকে গেল ডিএসইএক্স

৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬5 মিনিটের পড়া

বুধবার দিনের শুরুতে ঢাকার শেয়ারবাজারের মূল সূচক আগের দুই কার্যদিবসের মতোই ঊর্ধ্বমুখী ছিল। কিন্তু লেনদেন শেষে সূচক ১.৬৭ পয়েন্ট কমে দাঁড়ায় ৫,৬৬২.০৯ পয়েন্টে, কারণ বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নেন আর লেনদেনও কিছুটা কমে যায়। সিমেন্ট আর লাইফ ইনস্যুরেন্স খাত সবচেয়ে ভালো অবস্থানে ছিল, আর সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে ছিল টেক্সটাইল খাত।

বুধবার সকালের দিকে মনে হচ্ছিল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মূল সূচক আরও একদিনের জন্য উত্থানের ধারা ধরে রাখবে, যা আগেই সূচককে মনস্তাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ৫,৬৬০ পয়েন্টের ঘরে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু লেনদেন শেষ হতে হতে সেই গতি হারিয়ে যায়। দিনশেষে ডিএসইএক্স ১.৬৭ পয়েন্ট কমে দাঁড়ায় ৫,৬৬২.০৯ পয়েন্টে। সংখ্যার হিসাবে এই পতন সামান্য হলেও, এর মধ্য দিয়ে থেমে যায় টানা তিন কার্যদিবসের উত্থান, যা বছরের শুরুর দিকের কঠিন সময় পার করে সবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় থাকা বাজারে নতুন করে ক্রেতা টেনে এনেছিল।

পয়েন্টের হিসাবে এই পতন খুব বড় না হলেও, আগের দুই কার্যদিবসের তুলনায় এটি স্পষ্টতই সুরের পরিবর্তন। আগের দুই দিনে বিনিয়োগকারীরা নতুন আস্থা আর কম দামের শেয়ারে কেনাকাটার ঢেউয়ে সূচক ওপরে তুলেছিলেন। লেনদেনের অঙ্কেও একই রকম শীতলতার ছাপ দেখা গেছে, বুধবার লেনদেন হয়েছে ৭২১ কোটি টাকার, যা আগের দিনের ৭৩১ কোটি টাকার তুলনায় ১.৪ শতাংশ কম। বাজারের প্রশস্ততার হিসাবেও একই চিত্র। ৩৯৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার লেনদেন হওয়া দিনে ২২৫টির দরপতন হয়েছে, মাত্র ১২৫টির দাম বেড়েছে, আর ৪৫টি অপরিবর্তিত ছিল, এই অনুপাত স্পষ্ট করে দেয় দিনশেষে বিক্রেতারাই বাজার নিয়ন্ত্রণে ছিলেন।

ইবিএল সিকিউরিটিজের মতে, এই পতনের পেছনে মূল কারণ বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দৃঢ় আস্থার অভাব, যা তাদের দ্রুত মুনাফা তুলে নিতে বাধ্য করেছে এবং আগের উত্থানকে বেশিদূর এগোতে দেয়নি। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, বিকেলের সেশনে বিক্রির চাপ আরও বেড়ে যায়, কারণ যারা আগের উত্থানে কিনেছিলেন তারা চতুর্থ দিনের জন্য অপেক্ষা না করে লাভ ঘরে তোলাটাই নিরাপদ মনে করেছেন। ঢাকার মতো বাজারে, যেখানে বড় আঞ্চলিক এক্সচেঞ্জগুলোর তুলনায় তারল্য এখনও পাতলা, সেখানে একটি তীব্র স্বল্পমেয়াদি উত্থানের পর এমন আচরণ খুবই স্বাভাবিক, কারণ প্রথম দিকের ক্রেতারা মুনাফা তুলে নিতে শুরু করলেই বাজারের মনোভাব দ্রুত বদলে যেতে পারে।

ডিএসইএক্স আসলে কী পরিমাপ করে তা মনে রাখা দরকার। এই সূচক ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে প্রতিদিন লেনদেন হওয়া প্রায় ৩৯০ থেকে ৪০০টি কোম্পানির বিস্তৃত বাজার চিত্র তুলে ধরে, যে কারণে এটি বাজারের মনোভাব বোঝার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সূচক। তবে ডিএস৩০-এর মতো সংকীর্ণ ব্লু-চিপ সূচক একই দিনে ভিন্ন চিত্র দেখাতে পারে, কারণ তা নির্ভর করে সবচেয়ে বড় আর সবচেয়ে বেশি লেনদেন হওয়া শেয়ারগুলো ছোট ও মাঝারি মূলধনের শেয়ারের তুলনায় কেমন করেছে তার ওপর। বুধবারের মতো কোনো নির্দিষ্ট বড় শেয়ারে কেন্দ্রীভূত না হয়ে খাতজুড়ে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়া পতন সাধারণত প্রকৃত বিনিয়োগকারী মনোভাবের বেশি নির্ভরযোগ্য চিত্র দেয়, একটিমাত্র বড় শেয়ারের ওঠানামায় প্রভাবিত সূচকের চেয়ে।

বাজারের প্রতিটি খাত একইভাবে চলেনি, আর সেই খাতভিত্তিক চিত্রটা হয়তো সূচকের একক সংখ্যার চেয়েও বেশি তথ্যবহুল। সিমেন্ট খাত সবচেয়ে এগিয়ে ছিল, দিনে বেড়েছে ১.৮ শতাংশ, তারপরে লাইফ ইনস্যুরেন্স ১.৭ শতাংশ আর তথ্যপ্রযুক্তি খাত ১ শতাংশ। সিমেন্ট খাত পর্যবেক্ষণকারী বিশ্লেষকরা বলছেন, অবকাঠামো নির্মাণ সম্পর্কিত স্থিতিশীল চাহিদা আর উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখার সক্ষমতাই সাম্প্রতিক সময়ে এই খাতকে বাজারের বাকি অংশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রেখেছে, যদিও বুধবারের এই বৃদ্ধিকে একদিনের তথ্য হিসেবেই দেখা উচিত, স্থায়ী প্রবণতা হিসেবে নয়।

অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে ছিল টেক্সটাইল খাত, কমেছে ২.৪ শতাংশ, তার পরেই মিউচুয়াল ফান্ড ১.৪ শতাংশ আর সার্ভিস খাত ১.১ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানির গুরুত্ব বিবেচনায় নিলে, আগামী কয়েক সপ্তাহে টেক্সটাইল খাতের এই দুর্বলতা নজরে রাখার মতো বিষয়। তালিকাভুক্ত টেক্সটাইল কোম্পানিগুলোতে টানা পতন কখনও কখনও, যদিও সবসময় নয়, রপ্তানি চাহিদা বা উৎপাদন খরচ নিয়ে বৃহত্তর উদ্বেগের প্রতিফলন হতে পারে।

একটি অস্থির লেনদেন দিনের অর্থ বোঝার জন্য সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে সূচকের সংখ্যার চেয়ে বাজারের প্রশস্ততার পরিবর্তনটাই হয়তো বেশি কাজে লাগবে। সূচকের সামান্য পতনের পাশাপাশি দরপতন আর দরবৃদ্ধির অনুপাত তিন থেকে একের মতো হওয়া বোঝায়, এই পতন কোনো একটি বা দুটি বড় ওজনের শেয়ারের কারণে নয় বরং পুরো বাজার জুড়েই ছড়িয়ে পড়েছিল। আগের দুই দিনের উত্থানেও আর বুধবারের পতনেও এই ব্যাপক অংশগ্রহণ বুঝিয়ে দেয়, বাজার এখন কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির খবরের চেয়ে সক্রিয় ট্রেডারদের স্বল্পমেয়াদি অবস্থান নেওয়ার প্রবণতা দ্বারাই বেশি চালিত হচ্ছে।

বুধবারের বিক্রির ধরনটাও আগামী সেশনগুলো কেমন যাবে তা বুঝতে সাহায্য করে। ব্রোকাররা যেমন বলছেন, এই পতন মূলত খুচরা বিনিয়োগকারী আর স্বল্পমেয়াদি ট্রেডারদের মুনাফা তুলে নেওয়ার কারণে হলে, সাধারণত অধৈর্য বিক্রেতারা বেরিয়ে গেলেই এক-দুই সেশনের মধ্যে বাজার স্থিতিশীল হয়ে যায়। এটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বা বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের বড় আকারে বিনিয়োগ কমানোর কারণে হওয়া পতনের চেয়ে আলাদা, যা সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে দাম চাপে রাখে আর একদিনের বদলে টানা কয়েক সেশন জুড়ে বিক্রির চাপ দেখা যায়। বুধবারের ধরন, সকালে শক্তিশালী শুরু আর বিকেলে মুনাফা তুলে নেওয়া, প্রথম ধরনের সঙ্গেই বেশি মিলে যায়, যদিও একদিনের লেনদেনের তথ্য দিয়ে কোন ধরনের বিনিয়োগকারী বাজার চালাচ্ছেন তা নিয়ে দৃঢ় সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।

ডিএসইএক্সের সাম্প্রতিক গতিপথ এই বছর ঢাকার বাজার পর্যবেক্ষকদের কাছে একটি পরিচিত ধরন তুলে ধরছে, কম দামে কেনার সুযোগ খুঁজে বহুদিনের তীব্র উত্থান, তারপর দাম বিনিয়োগকারীদের কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছালেই মুনাফা তুলে নেওয়ার সমান তীব্র বিরতি। বুধবারের লেনদেন যে ৭০০ থেকে ৭৫০ কোটি টাকার সীমার মধ্যে ছিল, তা ব্রোকারদের ভাষায় এক্সচেঞ্জের জন্য একটি স্বাভাবিক, মাঝারি সক্রিয় লেনদেন দিনের মধ্যেই পড়ে, যা আতঙ্কিত বিক্রির ইঙ্গিত দেয় না, আবার বাজারের দিক স্থায়ীভাবে বদলে যাওয়ার মতো অংশগ্রহণের ঢেউও দেখায় না।

আগের দুই সেশনের উত্থানের সময় যারা বাজারে ঢুকেছিলেন, তাদের জন্য ব্রোকাররা সাধারণত পরামর্শ দেন একদিনের পতনকে বেশি গুরুত্ব না দিতে, তা সে কয়েকদিন আগে কেনা শেয়ার আতঙ্কিত হয়ে বিক্রি করে দেওয়া হোক বা উল্টো দিকে ধরে নিয়ে আক্রমণাত্মকভাবে আরও কেনা যে উত্থান নিশ্চয়ই তাড়াতাড়ি আবার শুরু হবে। যে বাজারে মনোভাব এত অল্প সময়েই তীব্রভাবে বদলে যেতে পারে, সেখানে পরের দুই-তিন সেশনে লেনদেন আর বাজারের প্রশস্ততা স্থিতিশীল হয় কিনা তা দেখাটাই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য একদিনের ক্লোজিংয়ে প্রতিক্রিয়া দেখানোর চেয়ে বেশি কার্যকর। বুধবারে ভালো করা সিমেন্ট বা লাইফ ইনস্যুরেন্সের মতো নির্দিষ্ট খাতে আগ্রহী বিনিয়োগকারীদেরও উচিত এক সেশনের মুনাফার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে পুরো এক সপ্তাহ ধরে সেই খাতের শক্তি টিকে থাকে কিনা তা দেখা।

বুধবারের এই সামান্য পতন দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার শুরু হবে নাকি শুধু একদিনের বিরতির পর আবার উত্থান শুরু হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে এক্সচেঞ্জের বাইরের কিছু বিষয়ের ওপর, যেমন মূল্যস্ফীতির গতিপথ, সুদহার নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরবর্তী সিদ্ধান্ত, আর আসন্ন প্রান্তিক আয়ের প্রতিবেদনগুলো মুনাফা তুলে নিতে প্রস্তুত বিনিয়োগকারীদের কাছে কীভাবে গৃহীত হয়। আপাতত, বাজার সংশ্লিষ্টরা এই সামান্য পতনকে ভালো একটি উত্থানের পর স্বাভাবিক নিয়মরক্ষা হিসেবেই দেখছেন, গভীর কোনো সংশোধনের শুরু হিসেবে নয়, যদিও এত ছোট আকারের একটি বাজারে মনোভাব একদিনের লেনদেনেই আবার বদলে যেতে পারে।

ডিএসই খাতভিত্তিক পারফরম্যান্স, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬। সূত্র: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ।

ডিএসই খাতভিত্তিক পারফরম্যান্স, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬। সূত্র: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

টানা দ্বিতীয় দিনও ঊর্ধ্বমুখী ডিএসই, সূচক পৌঁছালো ৫,৬৬০ পয়েন্টে

দুই মাসের সর্বনিম্নে নামার পর টানা দুই কার্যদিবস উর্ধ্বমুখী রইলো ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স। ২ সেপ্টেম্বর সূচক ২৩ পয়েন্ট বেড়ে বন্ধ হয়েছে ৫,৬৬০ পয়েন্টে। লেনদেন বেড়েছে ২২.৫ শতাংশ, বিনিয়োগকারীরা কম দামে থাকা টেক্সটাইল, বিমা আর ফার্মা খাতের শেয়ার কিনতে আগ্রহী হয়েছেন, তবে বিশ্লেষকরা বলছেন সামগ্রিক বাজার মনোভাব এখনও সতর্ক।

টানা ১৩ কার্যদিবস দরপতনের পর দুই মাসের সর্বনিম্নে ডিএসইএক্স

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স টানা ১৩ কার্যদিবস ধরে পড়ছে, প্রায় ৫ শতাংশ হারিয়ে ৩১ আগস্ট ৫,৫৯৮ পয়েন্টে নেমে এসেছে,গত প্রায় দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। লেনদেনের পরিমাণ কমে যাওয়া আর বাজারের হতাশাজনক পরিবেশ বলে দিচ্ছে, বিনিয়োগকারীরা দেশের জ্বালানি সংকট নিয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনার অপেক্ষায় আছেন,যদিও অর্থনীতির অন্য দিকে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিন্তু ভালো খবরই দিচ্ছে।

রেকর্ড রেমিট্যান্স, বাড়ছে রিজার্ভ, পড়ছে শেয়ারবাজার: বাংলাদেশের অর্থনীতির হালচাল

এই আগস্টে বাংলাদেশ একটা অদ্ভুত দ্বিমুখী অর্থনীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে রেমিট্যান্স গত বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে আর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ক্রমাগত বাড়ছে, অথচ গ্যাস সংকটের আশঙ্কা আর মার্জিন নিয়ম নিয়ে গুজবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ নিম্নমুখী। এই মাসের তিনটা বড় অর্থনৈতিক খবর কীভাবে একসাথে জড়িয়ে আছে, আর দ্রব্যমূল্য, চাকরি ও আপনার বিনিয়োগের জন্য এর মানে কী, তা জেনে নিন।