বাংলাদেশের ২০,০০০ কোটি টাকার কারখানা পুনরুদ্ধার তহবিল থেকে এখন পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে মাত্র ৫০ কোটি টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংক চার মাস আগে বন্ধ আর অর্ধেক সক্ষমতায় চলা কারখানা সচল করতে ২০,০০০ কোটি টাকার একটা তহবিল চালু করেছিল, কিন্তু এখন পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে মাত্র ৫০ কোটি টাকা, তিনজন গ্রাহককে, আর ৭৫০ কোটি টাকা চাওয়া ২৫টি আবেদন অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, আবেদন অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাংক বোর্ড সভা ডাকতেই এক মাস সময় লেগে যাচ্ছে, আর ক্লিন ক্রেডিট রেকর্ডের শর্তই সম্ভবত ঠিক সেই সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাদ দিয়ে দিচ্ছে, যাদের জন্য এই তহবিল তৈরি হয়েছিল। জুন মাসে তহবিল চালুর সময়েই এই আশঙ্কা করা হয়েছিল।
বন্ধ আর অর্ধেক সক্ষমতায় চলা কারখানাগুলোকে ফের সচল করতে বাংলাদেশ ব্যাংক চার মাস আগে ২০ হাজার কোটি টাকার একটা তহবিল চালু করেছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই তহবিল থেকে বিতরণ হয়েছে মাত্র ৫০ কোটি টাকা, তাও কেবল তিনজন গ্রাহককে। অন্যদিকে ২৫টি আবেদন, যার মোট পরিমাণ ৭৫০ কোটি টাকা, এখনও আটকে আছে। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, সমস্যাটা চাহিদার নয়, সমস্যাটা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার, আর তারা সরাসরি আঙুল তুলছেন অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোর বোর্ড সভা ডাকতেই কত সময় লেগে যাচ্ছে তার দিকে, যে সভা না হলে কোনো আবেদনই অনুমোদন পায় না।
তহবিলটা আসলে কী করার কথা ছিল
জুন মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক যখন এই তহবিল ঘোষণা করেছিল, তখন যুক্তিটা ছিল খুবই সহজ। বাংলাদেশের অনেক বড় কারখানা আর রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রপাতি এখনও সচল, কিন্তু তাদের হাতে যথেষ্ট কার্যকরী মূলধন নেই, যে কারণে তারা শ্রমিকের বেতন দিতে, কাঁচামাল কিনতে, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল মেটাতে বা হাতে থাকা রপ্তানি আদেশ পূরণ করতে পারছে না। এই তহবিলের আওতায় অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বার্ষিক ৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারে, প্রথম ছয় মাস কোনো সুদ ছাড়াই, আর গ্রাহকদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশের বেশি সুদ নেওয়া যাবে না, কোনো অতিরিক্ত ফি ছাড়াই। ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ এক বছর, যা পুনর্নবীকরণযোগ্য যদি ব্যবসা ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখায়, কোনো একক কোম্পানি বা গ্রুপ ২০০ কোটি টাকার বেশি নিতে পারবে না, আর রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো অগ্রাধিকার পাবে। তহবিলটা তিন বছরের আবর্তনশীল ভিত্তিতে চলে, শ্রমিকদের বেতন সরাসরি তাদের ব্যাংক হিসাবে পাঠাতে হয়, আর প্রতি তিন মাসে কারখানা পরিদর্শনের নিয়মও রাখা হয়েছে।
যে সতর্কবার্তাগুলো সত্যি হয়ে গেল
তহবিল চালু হওয়ার এক সপ্তাহও পার হয়নি, তখনই অর্থনীতিবিদ আর ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সতর্ক করতে শুরু করেছিল যে এর নিজস্ব শর্তগুলোই এর লক্ষ্য ব্যর্থ করে দিতে পারে। গ্রাহকের ক্লিন সিআইবি রেকর্ড থাকার শর্তটা নিয়েই সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয়েছিল। বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম তখন বলেছিলেন, "যে কারখানা তারল্য সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে, তার তো ঋণ পরিশোধে সমস্যা হওয়াটাই স্বাভাবিক।" তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, এই তহবিল ঠিক যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্ধার করতে চায়, সেগুলোরই ক্রেডিট রেকর্ড দাগি হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তাও এই টানাপোড়েনের কথা স্বীকার করেছিলেন, বলেছিলেন "অনেক সংকটে থাকা কারখানা প্রচলিত ঋণ নীতির শর্ত পূরণ করতে পারে না।" ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এক বছরের পরিশোধ মেয়াদকেও অবাস্তব বলেছিল, কারণ তাদের যুক্তি ছিল একটা বন্ধ কারখানা ফের চালু করা, সরবরাহ চেইন পুনর্গঠন করা, ক্রেতার আস্থা ফিরিয়ে আনা আর শ্রমিক পুনর্নিয়োগ করা, এসবে বারো মাসের চেয়ে বেশি সময় লাগে। তারা তখনই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আহ্বান জানিয়েছিল, শুধু পুরোনো ক্রেডিট রেকর্ডের ওপর নির্ভর না করে কারখানার ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা আর মালিকের নতুন মূলধন জোগান দেওয়ার সক্ষমতা বিবেচনা করে আবেদন মূল্যায়ন করতে।
আবেদন কেন এখনও আটকে আছে
চার মাস পরে এসে সেই সতর্কবার্তাগুলো আর সাবধানতা নয়, বরং একটা পূর্বাভাসের মতোই সত্যি হয়ে গেছে। ব্যবসায়ী নেতারা এখন বলছেন, মূল বাধাটা প্রক্রিয়াগত, এই তহবিলের ঋণ অনুমোদনের জন্য যে ব্যাংক বোর্ড সভা প্রয়োজন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই সভা ডাকতেই এক মাস সময় লেগে যাচ্ছে। শিল্প প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোকে অনুরোধ করেছেন, এই তহবিলের জমে থাকা আবেদন সাফ করতে সাপ্তাহিক বা প্রয়োজন অনুযায়ী বোর্ড সভা করার জন্য। বিকেএমইএর সভাপতি হাতেম এই সপ্তাহে স্পষ্ট করেই বলেছেন, "ব্যাংকগুলোর সহযোগিতার অভাবে অনেকেই আবেদনই করতে পারছেন না।" সময়সূচির সমস্যা ছাড়াও আবেদনকারীরা বলছেন, ব্যাংকগুলো আবেদন গ্রহণেই অনীহা দেখায়, আর ব্যবসায়ীদের চোখে অতিরিক্ত বলে মনে হওয়া নথিপত্র চায়, যে অভিযোগগুলো তহবিল চালুর সময় তোলা আপত্তির সঙ্গে প্রায় পুরোপুরি মিলে যায়।
| সূচক | পরিমাণ |
|---|---|
| তহবিলের মোট আকার | ২০,০০০ কোটি টাকা |
| প্রাপ্ত আবেদন | ২৫ জন গ্রাহক, চাহিদা ৭৫০ কোটি টাকা |
| বিতরণ করা ঋণ | ৩ জন গ্রাহক, ৫০ কোটি টাকা |
| এখন পর্যন্ত বিতরণের অনুপাত | প্রায় ০.২৫% |
| গ্রাহকের জন্য সর্বোচ্চ সুদের হার | বার্ষিক ৭% |
| একক কোম্পানি বা গ্রুপের সীমা | ২০০ কোটি টাকা |
পরিকল্পনা আর বাস্তবায়নের মধ্যে ফারাক
বিতরণের এই সংখ্যাগুলো স্পষ্ট করে দেখায়, তহবিলের নকশা আর তার বাস্তবায়নের মধ্যে ফারাকটা কতটা বড় হয়ে গেছে। ২০,০০০ কোটি টাকার তহবিলের বিপরীতে মাত্র ৫০ কোটি টাকা বিতরণ, মানে প্রায় শূন্য দশমিক দুই পাঁচ শতাংশ, চার মাস পরে এসেও, যেখানে তহবিলটা আবর্তনশীল আর তুলনামূলক দ্রুতগতির হওয়ার কথা ছিল। মোট ৭৫০ কোটি টাকার আবেদনও পুরো তহবিলের চার শতাংশের কম, যা থেকে বোঝা যায় ক্লিন ক্রেডিট রেকর্ডের শর্ত আর তার পেছনের সতর্কতা সম্ভবত ঠিক সেই সংকটে থাকা, নগদ টাকার অভাবে ভুগতে থাকা ব্যবসাগুলোকেই বাদ দিয়ে দিচ্ছে, যাদের জন্য এই তহবিল তৈরি হয়েছিল, ঠিক যেমনটা জুনে সমালোচকরা বলেছিলেন। অন্যদিকে যে ব্যবসাগুলো প্রচলিত শর্তে সহজেই যোগ্য হয়ে যায়, তাদের আসলে এই উদ্ধার তহবিলের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, এমনটা বলা কঠিন।
এটাই একমাত্র বড় রিফাইন্যান্স স্কিম নয় যা ব্যাংকগুলোর বোর্ড অনুমোদনের এই একই ধীর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আলাদা একটা রপ্তানি সহায়ক প্রি-ফাইন্যান্স তহবিল এই মাসেই ৫,০০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭,০০০ কোটি টাকা করা হয়েছে, যা রপ্তানি, সবুজ আর ডিজিটাল খাতে মিলিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালিত ১০,০০০ কোটি টাকার বেশি রিফাইন্যান্স স্কিমের একটা অংশ। সেই সম্প্রসারিত তহবিল কারখানা পুনরুদ্ধার তহবিলের চেয়ে বেশি গতিতে এগোয়, নাকি একই বোর্ড সভার বাধায় আটকে যায়, তা দেখেই বোঝা যাবে ব্যাংকগুলো এই অভিযোগ ওঠার পর তাদের ভেতরের প্রক্রিয়ায় আদৌ কোনো পরিবর্তন আনল কিনা।
আসলে কী করলে এর গতি বাড়বে
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এখন যে সমাধানগুলো চাইছে, তা মূলত জুন মাসে প্রস্তাব করা সমাধানগুলোরই পুনরাবৃত্তি, জমে থাকা আবেদন সাফ করতে দ্রুত আর ঘন ঘন বোর্ড সভা, শুধু তারল্য সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ক্রেডিট রেকর্ডের ওপর নির্ভর না করে কারখানার ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা আর মালিকের নতুন মূলধন জোগানের সক্ষমতা বিবেচনা করে একটা নমনীয় মূল্যায়ন কাঠামো, আর প্রতিটা আবেদনকারীকে সন্দেহের চোখে না দেখে সহজ করা নথিপত্রের শর্ত। এর কোনোটার জন্যই নতুন কোনো আইন বা তহবিলের নতুন নকশার প্রয়োজন নেই, আর সেটাই একটা কারণ কেন চার মাস পরেও চলতে থাকা এই স্থবিরতাকে কোনো জটিল অমীমাংসিত সমস্যার চেয়ে বরং বাংলাদেশ ব্যাংক অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোকে দ্রুত কাজ করাতে আসলে কতটা জোর দিতে পারে, তার একটা পরীক্ষা বলেই বেশি মনে হয়। আপাতত তহবিলের ১৯,৯৫০ কোটি টাকাই অব্যবহৃত থেকে গেছে, আর যে কারখানাগুলোকে বাঁচানোর জন্য এই তহবিল তৈরি হয়েছিল, তারা এখনও অপেক্ষায়।
তথ্যসূত্র
এরপর পড়ুন
বিদেশি ব্যাংকের মুনাফা প্রথমার্ধে ৩৮ শতাংশ কমল, ট্রেজারি বাজিতে এগিয়ে দেশি ব্যাংক
বাংলাদেশে কার্যরত নয়টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সম্মিলিত নিট মুনাফা ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ৩৮ শতাংশ কমে হয়েছে ২,৩২১ কোটি টাকা, দুর্বল বাণিজ্য অর্থায়ন ও জ্বালানি সংকটের কারণে। একই সময়ে, অনেক তালিকাভুক্ত দেশি ব্যাংক ভালো মুনাফা বৃদ্ধি দেখিয়েছে, যার প্রায় পুরোটাই এসেছে সরকারি সিকিউরিটিজের বিনিয়োগ আয় থেকে, নতুন ঋণ বিতরণ থেকে নয়। বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার খাতের গড়ের চেয়ে এখনও অনেক কম এবং তাদের মূলধন মজুদ অনেক বেশি শক্তিশালী।
উত্তোলনের চাপে ন্যাশনাল ব্যাংককে ৭,০০০ কোটি টাকা ধার দিল সোনালী ব্যাংক, পরীক্ষার মুখে বাংলাদেশের বেলআউট পরিকল্পনা
রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংককে ৭,০০০ কোটি টাকা ধার দিয়েছে, যার পুরোটার গ্যারান্টি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, তিন দিনে প্রায় ৭,৫০০টি উত্তোলনের আবেদন আসার পর। এই ঋণ ন্যাশনাল ব্যাংককে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে পুরো উত্তোলন সুবিধা ফিরিয়ে আনার সময়সীমা পূরণে সহায়তা করার জন্য। ব্যাংকটি এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণী, যা সিকদার পরিবারের আমলে শুরু হওয়া সমস্যার গভীরতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
ব্র্যাক ব্যাংকের সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডারকে তিনগুণ বোর্ড আসন দিল বাংলাদেশ ব্যাংক
ব্র্যাক ব্যাংকের জন্য একটি বোর্ড নিয়ম শিথিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যার ফলে ব্যাংকটির সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার এখন একজনের পরিবর্তে তিনজন পর্যন্ত প্রতিনিধি পরিচালক নিয়োগ দিতে পারবে। ১২ অক্টোবরের এই সার্কুলারে উপকৃত হচ্ছে ব্র্যাক, যার হাতে একজন কর্মকর্তার তথ্যানুযায়ী ব্যাংকটির ৪৬ শতাংশ শেয়ার আছে। এই বছরের মধ্যে এটি দ্বিতীয় এমন নির্দিষ্ট ব্যাংকের জন্য দেওয়া ছাড়, এর আগে মার্চে ট্রাস্ট ব্যাংককেও একই ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছিল।