নিউ ইয়র্ক সম্মেলনে ১০০ কোটি ডলার লক্ষ্য, ভিওনের ২৫ কোটি ডলার প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে
টেলিকম প্রতিষ্ঠান ভিওন আর তাদের বাংলাদেশি ইউনিট বাংলালিংক গত ২৮ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে ব্ল্যাকরক, রথসচাইল্ড, আইএফসি আর বিশ্বব্যাংককে একসাথে বসিয়েছিল, নিজেদের ২৫ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পুরো ১০০ কোটি ডলার টেনে আনার আশায়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ফাঁকে হওয়া এই আয়োজনে একই দিনে ঘোষণা এসেছে একটা নতুন স্যাটেলাইট সেবা, একটা ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্স আর একটা নতুন মোবাইল পেমেন্ট অ্যাপের। মাত্র দুই দিন আগেই বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটা ডিজিটাল ব্যাংককে অনুমোদন দিয়েছিল, যেটাকে নিউ ইয়র্কের প্রচারণায় প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। পুরো ১০০ কোটি ডলার সত্যিই আসবে কিনা তা নির্ভর করছে সেইসব বিনিয়োগকারীদের ওপর, যারা বাংলাদেশের ডলার সংকট আর এ বছর প্রায় সত্তর শতাংশ কমে যাওয়া তাজা বৈদেশিক বিনিয়োগ নিয়ে বেশ সতর্ক হয়ে উঠেছেন।
টেলিকম কোম্পানি ভিওন আর তাদের বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান বাংলালিংক গত ২৮ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে একটা বন্ধ দরজার মিটিংয়ে ব্ল্যাকরক, রথসচাইল্ড, আইএফসি আর বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে একসাথে বসিয়েছিল। উদ্দেশ্য একটাই, নিজেদের ২৫ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য পুরো ১০০ কোটি ডলার টেনে আনা। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহের ফাঁকে হওয়া এই আয়োজনের নাম দেওয়া হয়েছিল ইনভেস্ট ইন বাংলাদেশ নাউ, আর একই দিনে ঘোষণা এসেছিল একটা নতুন স্যাটেলাইট সেবা, একটা নতুন ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্স আর একটা নতুন মোবাইল পেমেন্ট অ্যাপের।
একটা প্রতিশ্রুতিকে ঘিরে সাজানো ঘর
এই গোলটেবিল বৈঠকটা ইচ্ছা করেই ছোট রাখা হয়েছিল। অর্থ উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নিজে টেলিযোগাযোগ আর বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টাদের নিয়ে হাজির ছিলেন, মুখোমুখি বসেছিলেন এমন সব প্রতিষ্ঠানের সাথে যারা সচরাচর বাংলাদেশ নিয়ে একসাথে কোনো অনুষ্ঠানে থাকে না। ভিওনের নিজস্ব ২৫ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতিটাই ছিল পুরো আয়োজনের ভিত্তি, বাকিদের বোঝানোর একটা উপায় যে টাকাটা সত্যিই আসছে। ভিওনের প্রধান নির্বাহী কান তেরজিওগ্লু বলেছেন, বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য দারুণ একটা সুযোগ তৈরি করছে। চেয়ারম্যান অগি ফাবেলা আবার মনে করিয়ে দিয়েছেন দেশটার আকারের কথা, সতেরো কোটির বেশি মানুষ, আর দ্রুত বেড়ে চলা একটা ডিজিটাল অর্থনীতি। বাংলালিংকের প্রধান নির্বাহী ইয়োহান বুসে এই অনুষ্ঠানকে বলেছেন তাদের কোম্পানির নিজস্ব বিবর্তনের একটা টার্নিং পয়েন্ট, স্রেফ সংযোগ সেবাদাতা থেকে একটা পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল কোম্পানিতে রূপান্তরের প্রতীক।
একদিনে তিনটা ঘোষণা
এই আয়োজনকে স্রেফ একটা বিনিয়োগের প্রেজেন্টেশনের চেয়ে বেশি কিছু বানিয়েছে তিনটা আলাদা নিয়ন্ত্রক আর প্রোডাক্ট ঘোষণা, যেগুলো একই সময়ে এসেছে। বাংলালিংক অনুমতি পেয়েছে স্টারলিংক ডাইরেক্ট টু সেল স্যাটেলাইট সংযোগ চালুর, যেটা দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম হবে, সাধারণ মোবাইল ফোনেও এমন এলাকায় সংযোগ দেবে যেখানে টাওয়ারের নেটওয়ার্ক পৌঁছায় না। বাংলাদেশ ব্যাংক আবার প্রাথমিক সবুজ সংকেত দিয়েছে নোভা ডিজিটাল ব্যাংক নামের একটা প্রস্তাবিত ব্যাংকের জন্য, যেটার পেছনে আছে ভিওনের ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপ, বাংলালিংক আর স্কয়ার গ্রুপ। এই অনুমোদন এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সপ্তাহের শুরুতে দেওয়া আরও চারটা ডিজিটাল ব্যাংক অনুমোদনের ঠিক পাশাপাশি। এছাড়া বাংলালিংক নিজেদের ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম মুক্ত পে চালু করেছে, যেটা দিয়ে তারা বিকাশ আর নগদের দখলে থাকা মোবাইল মানি বাজারের একটা অংশ কাড়তে চাইছে। আলাদা আলাদাভাবে দেখলে প্রতিটা ঘটনাই ছোটখাটো একটা নিয়ন্ত্রক অগ্রগতি। কিন্তু একই দিনে, নিউ ইয়র্কের একটা বিনিয়োগকারী সম্মেলনের সাথে মিলিয়ে সাজালে সেগুলোকে মনে হয় একটা পরিকল্পিত প্রচেষ্টা, যাতে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে বাস্তবের চেয়ে আরও এগিয়ে থাকা মনে হয়।
তিন দিনের পুরনো একটা সিদ্ধান্তের ওপর ভর করে
নোভা ডিজিটাল ব্যাংকের অনুমোদনটা আসলে খুব একটা নতুন খবর ছিল না, বরং বাংলাদেশ ব্যাংক আগেই যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তার সাথে একটা নাম জুড়ে দেওয়া হয়েছে মাত্র। গত ২৬ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংক চৌদ্দটা আবেদনকারীর মধ্যে থেকে বাছাই করা পাঁচটা ডিজিটাল ব্যাংককে সম্মতিপত্র দিয়েছিল, প্রায় তিন বছর ধরে ঝুলে থাকা একটা লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার পর। বিজয়ীদের মধ্যে ছিল বিকাশ, রবি আজিয়াটা আর ভিওনের সমর্থনপুষ্ট উদ্যোগ। এই অনুমোদনের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে তিনশো কোটি টাকার একটা বাড়তি মূলধন শর্ত, যাতে দুর্বল প্রতিষ্ঠান বাজারে ঢুকতে না পারে, কারণ নিয়ন্ত্রকরা চান এই ব্যাংকগুলো ছোট ঋণগ্রহীতা আর ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে থাকা পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছাক, প্রচলিত ব্যাংকগুলোর সাথে কর্পোরেট ঋণের প্রতিযোগিতায় না নেমে। নিউ ইয়র্কের এই সম্মেলনটা ঠিক তিন দিনের পুরনো এই খবরটার ওপর ভর করেই দাঁড়িয়েছিল, প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছে যে বাংলাদেশের লাইসেন্সিং জটিলতা অবশেষে কেটে গেছে, ঠিক তখনই যখন ভিওনের বৈশ্বিক পুঁজির জন্য একটা বিশ্বাসযোগ্য গল্প দরকার ছিল।
যে সংশয় ঘরের ভেতর কাটাতে হয়েছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী এ বছরের প্রথম প্রান্তিকে তাজা বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রায় সত্তর শতাংশ কমে গেছে, যদিও অর্থ মন্ত্রণালয় আলাদাভাবে বার্ষিক ১৫০০ কোটি ডলার বৈদেশিক বিনিয়োগ টানার লক্ষ্য ঠিক করেছে বিভিন্ন নীতি সংস্কারের মাধ্যমে। যারা এই বাজারটা ঘনিষ্ঠভাবে দেখেন তারা প্রায় একই তালিকার সমস্যাগুলোর কথা বলেন বারবার, গত দুই বছরে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে বড় ওঠানামা, একাধিক সংস্থা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা কাস্টমস আর লাইসেন্সিং জটিলতা, পরে শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে আসার সীমিত সুযোগ, আর দেশীয় ভেঞ্চার ক্যাপিটালের এতটাই ছোট আকার যে বিদেশি টাকার সাথে যৌথ বিনিয়োগ করার মতো অবস্থাই নেই। এই একই সমস্যাগুলো বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতকে আরও কঠিনভাবে আঘাত করেছে, এই বছরের প্রথমার্ধে দেশীয় স্টার্টআপে বিনিয়োগ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় পঁচানব্বই শতাংশ কমে গেছে, অথচ একই সময়ে বৈশ্বিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। একটা টেলিকম কোম্পানির ২৫ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি এসবের কিছুই মুছে দেয় না, কিন্তু ভিওনের বাজি হলো, একটা বড়, শক্তিশালী পুঁজির অ্যাংকর বিনিয়োগকারী নিজে ঝুঁকি নিয়ে এমন কিছু করে দেখাতে পারে যা বছরের পর বছর সরকারি রোডশো করেও সম্ভব হয়নি, অর্থাৎ ব্ল্যাকরক পর্যায়ের পুঁজিকে বিশ্বাস করানো যে বাংলাদেশের ডিজিটাল খাতটা, পুরো অর্থনীতি না হলেও, বিনিয়োগের যোগ্য।
নিউ ইয়র্ক সম্মেলনের মূল পরিসংখ্যান
| বিষয় | পরিসংখ্যান |
|---|---|
| ভিওনের প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি | ২৫ কোটি ডলার |
| সামগ্রিক বিনিয়োগ লক্ষ্য | ১০০ কোটি ডলার |
| বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্স (২৬ সেপ্টেম্বর) | ১৪টার মধ্যে ৫টা |
| ডিজিটাল ব্যাংকের নতুন ন্যূনতম মূলধন শর্ত | ৩০০ কোটি টাকা |
| প্রথম প্রান্তিকে তাজা বৈদেশিক বিনিয়োগ হ্রাস | প্রায় ৭০ শতাংশ |
| সরকারের বার্ষিক বৈদেশিক বিনিয়োগ লক্ষ্য | ১৫০০ কোটি ডলার |
এরপর কী হবে
ব্ল্যাকরক, রথসচাইল্ড, আইএফসি বা বিশ্বব্যাংক, এই ঘরে থাকা কোনো প্রতিষ্ঠানই সম্মেলনে নিজেদের পক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট ডলারের অঙ্ক প্রকাশ্যে ঘোষণা করেনি, আর ভিওনও এখনো বলেনি বাকি সাড়ে সাতশো কোটি টাকার সমপরিমাণ ৭৫ কোটি ডলার কবে বা কার কাছ থেকে তোলা হবে। আসল পরীক্ষাটা আসলে আর্থিক নয়, বরং কার্যকরী, স্টারলিংক ডাইরেক্ট টু সেল সত্যিই গ্রাহকের হাতে পৌঁছায় কিনা, নোভা ডিজিটাল ব্যাংক পূর্ণাঙ্গ লাইসেন্স পাওয়ার বাকি ধাপগুলো পার হতে পারে কিনা, আর মুক্ত পে বিকাশ আর নগদের কাছ থেকে অর্থবহ কোনো বাজার অংশ কাড়তে পারে কিনা, যেখানে দুটো প্রতিষ্ঠানই বছরের পর বছর ধরে গ্রাহকের আস্থা গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ প্রচারণা একই ডলার সংকট আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মুখে পড়তেই থাকবে, যেগুলো এই বছর তাজা বিনিয়োগ সত্তর শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে, সম্মেলন হোক বা না হোক। নিউ ইয়র্কের এই আয়োজন যেটা করতে পেরেছে তা হলো একটা নির্দিষ্ট অঙ্ক আর একটা নির্দিষ্ট কোম্পানির নিজের টাকা জুড়ে দেওয়া এমন একটা প্রচারণার সাথে যা এতদিন সরকার মূলত কথার কথা হিসেবেই বলে এসেছে।
তথ্যসূত্র
এরপর পড়ুন
২৬ মাস বোর্ডশূন্য থাকার পর বিএসইসি পুনর্গঠন করল ১,৭০০ কোটি টাকার বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল
বাংলাদেশের ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড টানা ২৬ মাস কোনো পরিচালনা বোর্ড ছাড়াই চলেছে, শেষ পর্যন্ত এই সপ্তাহে নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সাত সদস্যের একটা অন্তর্বর্তী প্যানেল গঠন করেছে। প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকার এই তহবিল, যা অদাবিকৃত লভ্যাংশ আর শেয়ারের সমন্বয়ে গড়া, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার জন্য তৈরি, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একটা আইনি বিরোধ ২০২৪ সাল থেকে পুরো কাঠামোটাকেই স্থবির করে রেখেছিল। বিএসইসি এখন চায় এই প্রশ্নের চিরস্থায়ী সমাধানের জন্য একটা পূর্ণাঙ্গ আইন, যার খসড়া শিগগিরই সংসদে যাওয়ার কথা।
অনিয়মের পর নগদ লভ্যাংশের নিয়মে কড়াকড়ি আনল বিএসইসি, স্বতন্ত্র পরিচালক পুনর্নিয়োগে দিল স্বস্তি
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানি এখন থেকে নগদ লভ্যাংশের প্রস্তাব এজিএমে তুলতে পারবে না যতক্ষণ না পুরো টাকা একটা আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা থেকে সনদায়িত হয়। সাম্প্রতিক অনিয়মের পরই এই সিদ্ধান্ত এসেছে, সঙ্গে আছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি। একই সভায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্বতন্ত্র পরিচালক পুনর্নিয়োগের প্রক্রিয়া সহজ করেছে, প্রতিবার নতুন পর্যালোচনার বদলে শুধু একটা ক্লিন ক্রেডিট রিপোর্টই এখন যথেষ্ট।
২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ২৮ শতাংশ, সবচেয়ে বড় ধাক্কা ইকুইটিতে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগের বছরের তুলনায় ২৮ শতাংশ কম অর্থ বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন। নতুন বিনিয়োগকারীর আস্থার সবচেয়ে স্পষ্ট সূচক নিট ইকুইটি মূলধন প্রবাহ কমেছে ৫৫ শতাংশ, নেমে এসেছে মাত্র ১৫৫ মিলিয়ন ডলারে। অর্থনীতিবিদরা এই পতনের পেছনে জ্বালানি সংকট, বাণিজ্য বিঘ্ন এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপকেই মূল কারণ বলছেন।