অর্থনীতি ও নীতি

বিশ্বব্যাংকের সতর্কতা, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি আটকে থাকবে পরপর দুই বছর ৩.৪ শতাংশে

৭ অক্টোবর, ২০২৬4 মিনিটের পড়া
বিশ্বব্যাংকের সতর্কতা, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি আটকে থাকবে পরপর দুই বছর ৩.৪ শতাংশে

বিশ্বব্যাংক এখন বলছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি বাড়বে মাত্র ৩.৪ শতাংশ, ঠিক আগের বছরের মতোই ধীর গতিতে, যা দেশের ঐতিহাসিক গড় ৫.৬ শতাংশের চেয়ে অনেক কম। বিশ্বব্যাংক বলছে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৩৩.২ শতাংশে পৌঁছেছে আর মূলধন পর্যাপ্ততা নেমে গেছে নেতিবাচক মাত্রায়, সঙ্গে জ্বালানি সংকট এখন বাংলাদেশকে গ্যাসের চাহিদার প্রায় এক তৃতীয়াংশ আমদানি করতে বাধ্য করছে। এই পূর্বাভাস এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের তিন মাস আগে দেওয়া ৪.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের চেয়ে অনেক বেশি নিরাশাজনক, যা দেখায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ওপর আস্থা কত দ্রুত কমে যাচ্ছে।

বিশ্বব্যাংক এখন বলছে, জুলাই থেকে শুরু হওয়া চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি বাড়বে মাত্র ৩.৪ শতাংশ, ঠিক আগের বছরের মতোই ধীর গতিতে, যা গত এক দশকের গড় ৫.৬ শতাংশের চেয়ে অনেক কম। এই পূর্বাভাস এসেছে বিশ্বব্যাংকের সবচেয়ে সাম্প্রতিক বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে, যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে ব্যাংক খাত আসলেই একটা সংকটে আছে, জ্বালানি ব্যবস্থা আগের চেয়েও বেশি আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, আর রাজস্ব আদায়ের যন্ত্রটা নিজের লক্ষ্য থেকে আরও পিছিয়ে পড়ছে। পরের বছরের জন্য কিছুটা উন্নতির আশা দেখানো হয়েছে, ৩.৯ শতাংশ, তবে বিশ্বব্যাংক নিজেই বলছে এটাও ভঙ্গুর, সংস্কার কাজ কতটা এগোয় তার ওপর নির্ভর করবে, যে সংস্কার এখন পর্যন্ত ধীরগতিতে চলছে।

ব্যাংক খাত, যাকে বিশ্বব্যাংক সরাসরি বলছে বড় বাধা

প্রতিবেদনের সবচেয়ে কঠিন সংখ্যাগুলো ব্যাংক খাত নিয়ে। জুন পর্যন্ত হিসাবে খেলাপি ঋণ বেড়ে মোট বিতরণ করা ঋণের ৩৩.২ শতাংশে পৌঁছে গেছে, আর পুরো ব্যাংক খাতের গড় মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত নেমে গেছে নেতিবাচক মাত্রায়, মাইনাস ২.৬ শতাংশে, যেখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত মান অন্তত ১০ শতাংশ হওয়ার কথা। বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির হার, যা সাধারণত ব্যবসা সম্প্রসারণ আর নতুন কর্মসংস্থানের জ্বালানি হিসেবে কাজ করে, নেমে এসেছে মাত্র ৪.৫ শতাংশে, যা বিশ্বব্যাংকের ভাষায় গত ৩৩ বছরের সবচেয়ে ধীর গতি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, "ব্যাংক পুনর্গঠন আর খেলাপি ঋণ সমাধানে দ্রুত আর সময়সীমা বেঁধে পদক্ষেপ নেওয়া এখন জরুরি," এই ভাষা শুনতে সাধারণ সতর্কবার্তার চেয়ে বরং একটা স্পষ্ট ইঙ্গিতের মতো, যে সমস্যাটা এখন ধীরে ধীরে সমাধানের পর্যায় পার হয়ে গেছে।

এই সংখ্যাটা একেবারে না মিললেও কাছাকাছি, বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই অক্টোবরের শুরুতে সংসদে উপস্থাপন করা পাঁচ বছরের একটা পরিকল্পনায় খেলাপি ঋণের হার ৩২.৭৮ শতাংশ বলে জানিয়েছিল, যেখানে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ধরা হয়েছে প্রায় ৬.০৬ লাখ কোটি টাকা। সেই পরিকল্পনায় একটা ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট তৈরির প্রস্তাব আছে, যার মাধ্যমে লাইসেন্সধারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরাসরি ব্যাংক থেকে খেলাপি ঋণ কিনতে পারবে, আর সেপ্টেম্বরে চালু হওয়া এমক্যাপিটালের প্রবাসী বিনিয়োগ তহবিলেও আলাদাভাবে একটা ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ফান্ড রাখা হয়েছে। এই দুটো উদ্যোগ বলে দেয়, দেশীয় নীতিনির্ধারকরা ঠিক যে সমস্যাটার কথা বিশ্বব্যাংক বলছে, তা নিয়ে আগে থেকেই সচেতন, যদিও সমাধানগুলো এখনও মূলত কাগজেই সীমাবদ্ধ।

জ্বালানির খরচ যেটা কেবলই বাড়ছে

প্রতিবেদনের দ্বিতীয় বড় উদ্বেগের জায়গা জ্বালানি সরবরাহ। দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন কমে যাচ্ছে, আর এখন চাহিদার প্রায় এক তৃতীয়াংশ গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে, যা বিশ্বব্যাংকের মতে শিল্প উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে আর সেই ধরনের বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে যা সাধারণত প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সাহায্য করে। বাণিজ্যের হিসাবেও এর প্রতিফলন স্পষ্ট, চলতি অর্থবছরের জুলাই আর আগস্টেই জ্বালানি তেল আমদানির খরচ দ্বিগুণের বেশি বেড়ে গেছে, যা এই দুই মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ২৯ শতাংশ বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটা অর্থনীতি যখন দ্রুত বাড়তে চায়, কিন্তু কারখানা চালানোর জ্বালানির ক্রমবর্ধমান অংশই আমদানি করতে হয়, তখন বিশ্বব্যাংকের ভাষায় সেই অর্থনীতি যেন নিজের সঙ্গেই লড়াই করছে।

দুর্বল রাজস্ব, বাড়তে থাকা ঘাটতি

রাজস্বের দিক থেকে বিশ্বব্যাংক বলছে, রাজস্ব আদায় জিডিপির মাত্র ৮.৩ শতাংশ, যা বিশ্বের সবচেয়ে কম অনুপাতগুলোর একটি, আর চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি বেড়ে জিডিপির ৪.৮ শতাংশে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এটা বাংলাদেশের নিজস্ব রাজস্ব বোর্ডের এই বছরের অভিজ্ঞতার সঙ্গেই মিলে যায়, যারা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তাদের বড় করদাতা ইউনিটগুলোর ৮৫ শতাংশেই ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি, প্রায় ২০,৫০০ কোটি টাকার এই ঘাটতি এখন সরকারকে দেশীয় ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেওয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

দারিদ্র্য বাড়তেই আছে

প্রতিবেদনের সবচেয়ে মানবিক সংখ্যাটা বোধহয় দারিদ্র্যের। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে জাতীয় দারিদ্র্যের হার এখন ২২.৫ শতাংশ, ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে, আর চলতি অর্থবছর শেষে এটা আরও বেড়ে ২২.৮ শতাংশে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের আগের ডেভেলপমেন্ট আপডেটগুলোতেই এই বৃদ্ধির চিত্র ধাপে ধাপে উঠে এসেছে, এক বছর আগের একটা সংস্করণে দারিদ্র্যকে চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বলা হয়েছিল, যার কারণ হিসেবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি আর বাস্তব মজুরি কমে যাওয়াকে দায়ী করা হয়েছিল, তবে তখন আশা করা হয়েছিল সংস্কার এগোলে হার নেমে ১৮ থেকে ১৯ শতাংশে চলে আসতে পারে। সেই আশাবাদী পথটা বাস্তবে ধরা দেয়নি, বরং প্রতিটা নতুন আপডেটে দারিদ্র্যের হার আগের চেয়ে বেশিই রেকর্ড হয়েছে।

অর্থবছরবিশ্বব্যাংক (অক্টোবর ২০২৬)এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (জুলাই ২০২৬)
২০২৫-২৬ (প্রকৃত)৩.৪%৩.৭%
২০২৬-২৭ (পূর্বাভাস)৩.৪%৪.৫%
২০২৭-২৮ (পূর্বাভাস)৩.৯%এখনো দেওয়া হয়নি

পূর্বাভাসদাতাদের মধ্যে বাড়তে থাকা ফারাক

বিশ্বব্যাংকের নিজের সংখ্যার পাশাপাশি যা চোখে পড়ে, তা হলো অন্য পূর্বাভাসদাতাদের সঙ্গে এখন কতটা ফারাক তৈরি হয়েছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক জুলাই মাসে তাদের নিজস্ব পূর্বাভাস হালনাগাদ করে বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ধরেছিল ৪.৫ শতাংশ, যা বিশ্বব্যাংকের অক্টোবরের সংখ্যার চেয়ে এক শতাংশ পয়েন্টেরও বেশি, যদিও এডিবি নিজেও এই সংখ্যাটা আগের ৪.৭ শতাংশ থেকে কমিয়েছিল, কারণ হিসেবে বলেছিল "চলমান জ্বালানি সংকট আর আর্থিক খাতের দুর্বলতা", ঠিক সেই দুটো সমস্যার কথাই বিশ্বব্যাংক এখন আরও স্পষ্টভাবে বলছে। বিশ্বব্যাংকের নিজের পূর্বাভাসের ইতিহাসও এই বছর পিছিয়ে যাওয়ার একই গল্প বলে, এপ্রিলের একটা আপডেটে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৯ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, যাকে বিশ্বব্যাংক নিজেই পরপর তিন বছরের মন্থরতা বলেছিল। কিন্তু প্রকৃত ফল এসেছে তার চেয়েও কম, ৩.৪ শতাংশ, অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি বিশ্বব্যাংকের নিজের এপ্রিলের সতর্ক পূর্বাভাসের চেয়েও আধা শতাংশ পয়েন্ট কম হয়েছে।

সব মিলিয়ে দেখলে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আর এই বছরের বিভিন্ন সময়ের পূর্বাভাসে একটা বিষয়ে মিল আছে, নির্দিষ্ট দশমিক সংখ্যা যা-ই হোক, প্রতিটা নতুন হিসাবই আগের চেয়ে কম দেখাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক এখন ২০২৭-২৮ অর্থবছরের জন্য যে ৩.৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলছে, তা আসলে বাস্তবে আসবে কিনা, তা নির্ভর করবে সংসদে এখন পর্যালোচনায় থাকা ব্যাংক পুনর্গঠন সংক্রান্ত আইন, এই মাসের শুরুতে ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের একটা প্রতিনিধি দলের সঙ্গে হওয়া জ্বালানি অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা, আর এনবিআরের ওপর চাপে থাকা রাজস্ব ব্যবস্থা, এসব প্রস্তাব থেকে বাস্তবায়নে এখনকার চেয়ে কত দ্রুত এগোয় তার ওপর। বর্তমান পরিস্থিতি দেখে সতর্ক থাকাটাই নিরাপদ মনে হচ্ছে।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

ব্যয়বহুল এলএনজি টার্মিনাল পরিকল্পনা বাতিল করে চীন ও স্পট কার্গোর ওপর ভর করছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা কুতুবজোমে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে, যার খরচ হতো ২০ বছরে ১৩,১৬১ কোটি টাকা পর্যন্ত, তার বদলে স্পট আর জি টু জি বাজার থেকে নয়টি এলএনজি কার্গো কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কয়েক দিন পরে ব্যাংককে চীনের এক্সিম ব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দল বিদ্যুৎ মন্ত্রীকে বলেছে, তারা পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্প্রসারণ আর ঢাকার চারপাশের গ্রিড উন্নয়নে অর্থায়ন দ্রুত করতে চায়। এই দুটো পদক্ষেপ মিলে দেখায় সরকার কীভাবে সামনের জ্বালানি খরচ আর দীর্ঘমেয়াদে ব্যবস্থাটা ঠিক করার অর্থায়নের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজছে।

বাংলাদেশ আবার আইএমএফের দ্বারে, ২০২৯ সাল পর্যন্ত নতুন ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণের আবেদন

সাড়ে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ কর্মসূচি থেকে নির্ধারিত সময়ের আট মাস আগেই সরে আসার পাঁচ মাস পর বাংলাদেশ ফিরে গেছে ব্যাংককের আলোচনার টেবিলে, এবার চাইছে নতুন করে সাড়ে চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের ঋণ। রাজস্ব জিডিপির অনুপাত নেমে এসেছে মাত্র সাত শতাংশে, আর ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ পৌঁছে গেছে মোট ঋণের প্রায় এক তৃতীয়াংশে, এমন সময়েই এসেছে এই নতুন আবেদন। অর্থ উপদেষ্টা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলছেন, আলোচনা বছরের শেষ নাগাদ শেষ হওয়ার কথা, আর ঋণ ছাড় হবে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ত্রৈমাসিক কিস্তিতে।

বিশ্বব্যাংক থেকে বাড়তি ১০ বিলিয়ন ডলারের জন্য দ্রুত প্রকল্প অনুমোদনের প্রতিশ্রুতি দিল বাংলাদেশ

বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের কাছে আগামী তিন বছরে বাড়তি ১০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা চেয়েছে, যা দিয়ে জ্বালানি ভর্তুকি, ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণ আর জরুরি আমদানি সামলানো হবে। বিনিময়ে ঢাকা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে প্রকল্প অনুমোদনের সময় ১৮ মাস থেকে আট মাসে আর বাস্তবায়নের সময় সাত বছর থেকে পাঁচ বছরে কমাবে। ব্যাংকক সভায় করা এই চাওয়ার পাশাপাশি চলছে আইএমএফের সঙ্গে ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে আলাদা আলোচনাও।