বাণিজ্য ও রপ্তানি

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রপ্তানি বেড়ে ১৩.১ বিলিয়ন ডলার, এগিয়ে ওষুধ ও পাট

৮ অক্টোবর, ২০২৬4 মিনিটের পড়া
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রপ্তানি বেড়ে ১৩.১ বিলিয়ন ডলার, এগিয়ে ওষুধ ও পাট

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ৬.৩৪ শতাংশ, দাঁড়িয়েছে ১৩.০৯৪ বিলিয়ন ডলারে, যেখানে একা সেপ্টেম্বরেই বেড়েছে ৮.৫৪ শতাংশ, জুলাইয়ের একটা অপ্রত্যাশিত পতনের পরও। তৈরি পোশাক এখনো এই প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি, ১০.৫৭৮ বিলিয়ন ডলার, তবে ওষুধ, পাটজাত পণ্য আর লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ছোট ভিত্তি থেকে আরও জোরে বেড়েছে, আর তুরস্কে রপ্তানি দ্বিগুণের বেশি হয়ে গেছে। এই ঘুরে দাঁড়ানো এসেছে এমন এক জুলাইয়ের পর, যখন বিজিএমইএর তথ্যে পোশাক রপ্তানি আসলে ১.৯২ শতাংশ কমে গিয়েছিল, কারণ আগের বছরের জুলাই ছিল অস্বাভাবিক রকম উঁচু একটা ভিত্তি, যা দেখিয়ে দেয় মাসে মাসে এই ঘুরে দাঁড়ানো কতটা অসমান ছিল।

যে প্রান্তিক শুরু আর শেষে একরকম ছিল না

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ১৩.০৯৪ বিলিয়ন ডলার, আগের বছরের একই তিন মাসের ১২.৩১৩ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে ৬.৩৪ শতাংশ বেশি। ঢাকা ট্রিবিউন আর ইউএনবির প্রতিবেদনে উল্লেখিত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) এই তথ্য বলছে, একা সেপ্টেম্বরেই এসেছে ৩.৯৩৭ বিলিয়ন ডলার, গত বছরের সেপ্টেম্বরের চেয়ে ৮.৫৪ শতাংশ বেশি, যা প্রান্তিকের সবচেয়ে ভালো মাস। ইপিবির একজন কর্মকর্তা এই প্রবৃদ্ধিকে রপ্তানি খাতের সহনশীলতা আর আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অব্যাহত আস্থার প্রমাণ বলে উল্লেখ করেছেন, এবং বলেছেন ব্যুরো বাজার বৈচিত্র্যকরণ আর পণ্যের মান বাড়ানোর কাজ চালিয়ে যাবে।

প্রান্তিকের শেষের এই ভালো অবস্থার আড়ালে শুরুটা কিন্তু মসৃণ ছিল না। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পোশাক রপ্তানি আসলে কমে গিয়েছিল ১.৯২ শতাংশ, নেমে এসেছিল ৩.৮৯ বিলিয়ন ডলারে, বিজিএমইএর পৃথক একটা প্রতিবেদন অনুযায়ী। ওভেন পোশাক কমেছিল ৩.১৬ শতাংশ আর নিট পোশাক কমেছিল ০.৯০ শতাংশ সেই মাসে। বিজিএমইএ এই পতনের মূল কারণ বলেছে অস্বাভাবিক উঁচু তুলনামূলক ভিত্তি, কারণ ২০২৫ সালের জুলাই নিজেই ২৪.৬৭ শতাংশ বেড়ে রেকর্ডের কাছাকাছি একটা মাস ছিল, আর সেই সঙ্গে তারা দেশের নিয়মিত গ্যাস সংকটকেও কারখানার উৎপাদনের সবচেয়ে বড় বাধা বলে চিহ্নিত করেছে। ভিত্তির প্রভাব আর জ্বালানি সংকট যা-ই হোক, আগস্ট আর সেপ্টেম্বর সেই ঘাটতি উল্টে দিয়েছে, ফলে পোশাকের হিসাবে লোকসান দিয়ে শুরু হওয়া প্রান্তিকটা পুরো তিন মাসে ৬.১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দিয়ে শেষ হয়েছে।

পোশাক এখনো প্রধান ভরসা, তবে একা নয়

প্রান্তিকজুড়ে পোশাক রপ্তানি থেকে এসেছে ১০.৫৭৮ বিলিয়ন ডলার, প্রবৃদ্ধি ৬.১০ শতাংশ, যা মোট রপ্তানির প্রায় চার-পঞ্চমাংশ এখনো ধরে রেখেছে, সবচেয়ে বড় একক খাত হিসেবে। নিট পোশাক ওভেনের চেয়ে বেশি বেড়েছে, ৬.৮৮ শতাংশ বনাম ৫.১১ শতাংশ, আর সেপ্টেম্বরে দুটো খাতেই প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যা সেই মাসের সার্বিক পোশাক রপ্তানি ঘুরে দাঁড়ানোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। শুধু এই সংখ্যাগুলো ধরলেই একটা সন্তোষজনক, পরিচিত রপ্তানি গল্প তৈরি হয়ে যায়, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে পোশাক দশকের পর দশক ধরে প্রধান চালিকাশক্তি, আর যে প্রান্তিকে পোশাক বাড়ে সেটাকে স্বাভাবিকভাবেই একটা মোটামুটি ভালো প্রান্তিক বলা যায়।

এবারের আসল চমক হলো বাকি সব খাত কতটা জোরে বেড়েছে। ওষুধ রপ্তানি প্রান্তিকে বেড়েছে ৪০.৩৯ শতাংশ, আর একা সেপ্টেম্বরেই অবিশ্বাস্য ৬৪.৩৩ শতাংশ, যা ট্র্যাক করা সব খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি। পাট ও পাটজাত পণ্য প্রান্তিকে বেড়েছে ৩১.৫৫ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে ২২.৭২ শতাংশ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বেড়েছে ১৪.৭৪ শতাংশ, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ১৬.৫১ শতাংশ আর হোম টেক্সটাইল ১১.৯৪ শতাংশ। ডলারের অঙ্কে এই খাতগুলোর কোনোটাই পোশাকের কাছাকাছি নয়, কিন্তু তাদের এই প্রবৃদ্ধির হার বলে দেয়, ক্রেতারা পোশাকের বাইরে বাংলাদেশের আরও বিচিত্র পণ্য কিনতে আগের চেয়ে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছেন। একমাত্র পিছিয়ে থাকা খাত ছিল কৃষিপণ্য ও হিমায়িত এবং জীবিত মাছ, যেখানে প্রান্তিকে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যদিও প্রতিবেদনে এর সুনির্দিষ্ট হার জানানো হয়নি।

খাতপ্রথম প্রান্তিকের মূল্যপ্রান্তিক প্রবৃদ্ধিসেপ্টেম্বরের প্রবৃদ্ধি
মোট রপ্তানি১৩.০৯৪ বিলিয়ন ডলার+৬.৩৪%+৮.৫৪%
পোশাক (সর্বমোট)১০.৫৭৮ বিলিয়ন ডলার+৬.১০%+৮.৫৬%
নিট পোশাক৫.৯৬৩ বিলিয়ন ডলার+৬.৮৮%+৮.৫৮%
ওভেন পোশাক৪.৬১৪ বিলিয়ন ডলার+৫.১১%+৮.৫৪%
ওষুধ-+৪০.৩৯%+৬৪.৩৩%
পাট ও পাটজাত পণ্য-+৩১.৫৫%+২২.৭২%
লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং-+১৬.৫১%-
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য-+১৪.৭৪%+২০.১৯%
হোম টেক্সটাইল-+১১.৯৪%-

তুরস্ক আর ছোট বাজারগুলোর বড় ভূমিকা

গন্তব্যের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার, প্রান্তিকে কিনেছে ২.৫৯১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, আগের বছরের ২.৩২৭ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে ১১.৩৪ শতাংশ বেশি। তারপর যুক্তরাজ্য ১.৩৭০ বিলিয়ন ডলার আর জার্মানি ১.২১৮ বিলিয়ন ডলার নিয়ে, আর ভারত ও জাপান, যারা গন্তব্যের তালিকায় ষষ্ঠ আর নবম স্থানে, তাদেরও প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যদিও প্রতিবেদনে এই দুই বাজারের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা দেওয়া হয়নি। সবচেয়ে বড় চমক তুরস্ক, যেখানে রপ্তানি দ্বিগুণের বেশি বেড়ে গেছে, ১০৫.২১ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২১০.৫৪ মিলিয়ন ডলারে, বৃদ্ধির হার ১০০.১১ শতাংশ, যা ট্র্যাক করা বড় গন্তব্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

কম ভিত্তি থেকে দ্বিগুণ হওয়া একটা বাজার আর যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশাল ভিত্তির ওপর ১১ শতাংশ বাড়া, এই দুটো একেবারে আলাদা গল্প, আর বাংলাদেশের বাণিজ্য ভারসাম্যের জন্য কোন ধরনের প্রবৃদ্ধি বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। যুক্তরাষ্ট্রের এই বাড়তি অঙ্কটা ডলারের হিসাবে তুরস্ক এখন বাংলাদেশ থেকে যা কেনে তার পুরো পরিমাণের চেয়েও বেশি। তারপরও, হাতে গোনা কয়েকটা পশ্চিমী বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানো বছরের পর বছর ধরে বাণিজ্যনীতির একটা ঘোষিত লক্ষ্য, আর বারো মাসে দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার মতো গতিতে বাড়া একটা বাজার, এমনকি সেটা ছোট ভিত্তি থেকে শুরু হলেও, ঠিক সেই রকম সংকেত যা বাণিজ্য কর্মকর্তারা দেখাতে চান যখন তারা বলেন বৈচিত্র্যকরণের চেষ্টা স্রেফ কথায় নয়, বাস্তবেও এগোচ্ছে।

সংখ্যাগুলো যে প্রশ্নের জবাব দেয় না

ইপিবির এই ব্যাখ্যা, সহনশীলতা আর ক্রেতাদের অব্যাহত আস্থা, একটা সত্যিই ভালো সংখ্যার সবচেয়ে সুন্দর দিকটা তুলে ধরার মতো একটা গল্প। কিন্তু এটা খেয়াল করার মতো যে এই ব্যাখ্যায় বিজিএমইএর সেই গ্যাস সংকটের কথা আসছে না, যা মাত্র দুই মাস আগে জুলাইয়ের পোশাক রপ্তানি কমে যাওয়ার জন্য দায়ী করা হয়েছিল, এবং তখন সেটাকে একমাসের ঘটনা না বলে কারখানার উৎপাদনের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা বলা হয়েছিল। বাকি অর্থবছরে গ্যাস সরবরাহ যদি এমন টানাপোড়েনেই থাকে, তাহলে জুলাইয়ের পতন আর সেপ্টেম্বরের ৮.৫৪ শতাংশ উল্লম্ফনের মধ্যে যে মাস-থেকে-মাসের অস্থিরতা দেখা গেছে, তা আবারও ফিরে আসতে পারে, যেখানে বিদেশি ক্রেতার চাহিদার চেয়ে উৎপাদন সক্ষমতাই মাসভেদে বেশি প্রভাব ফেলবে।

প্রান্তিকের মোট সংখ্যা একা যে প্রশ্নের জবাব দিতে পারে না তা হলো, দ্রুত বেড়ে চলা ছোট খাতগুলো, ওষুধ, পাট, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, আসলেই নতুন অর্ডারের একটা প্রকৃত বর্ধনশীল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, নাকি এই প্রবৃদ্ধির একটা অংশ একবারের চালান বা চুক্তির সময়সূচির প্রতিফলন, যা পরের প্রান্তিকে আর দেখা যাবে না। একটা প্রান্তিকে ওষুধ রপ্তানিতে ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি একটা আশাব্যঞ্জক তথ্য, এখনো কোনো ট্রেন্ড নয়, আর আসল পরীক্ষা হবে বছরের শেষ দিকে প্রকাশিতব্য দ্বিতীয় প্রান্তিকের তথ্যে, যখন কম ভিত্তির প্রভাব কমে আসবে, তখন এই ছোট খাতগুলো এই গতির কাছাকাছি কিছু ধরে রাখতে পারে কিনা তা দেখার মধ্যে।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

পোশাক ছাড়িয়ে যুক্তরাজ্যে ১০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য বাংলাদেশের

যুক্তরাজ্যের আমদানি বাজারে বাংলাদেশের অংশ এখন মাত্র ০.৪৯ শতাংশ, এবং কর্মকর্তারা বলছেন এই অংশ দ্বিগুণ করে ১ শতাংশে নিতে পারলে তা বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির সমান হতে পারে। বাংলাদেশ আজ যুক্তরাজ্যে যা বিক্রি করে তার মধ্যে পোশাক ছাড়া অন্য পণ্যের অংশ মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ, যদিও প্রসেসড ফুড, ওষুধ, জুতা ও আসবাবপত্রের চাহিদা আছে। যুক্তরাজ্যের একটি বাণিজ্য সুবিধা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার পরও এই প্রবেশাধিকারের বেশিরভাগ শুল্কমুক্ত রাখবে, তবে রপ্তানিকারকদের এখনও মান ও সার্টিফিকেশনের ঘাটতি পূরণ করতে হবে।

উত্তরায় শ্রমিক বিক্ষোভের পর নতুন মজুরি বোর্ড গঠনে উদ্যোগী সরকার, দাবি মাসে ৩০,০০০ টাকা

উত্তরায় শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের একদিন পর বাংলাদেশের শ্রম মন্ত্রণালয় কারখানা মালিক ও শ্রমিকদের কাছ থেকে নতুন মজুরি বোর্ডের জন্য প্রতিনিধির নাম চাইছে, বিক্ষোভের দাবি ছিল মাসিক মজুরি ৩০,০০০ টাকা করা। বর্তমান ন্যূনতম মজুরি ১২,৫০০ টাকা ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নির্ধারিত হয়েছিল, এবং শ্রমিক নেতারা বলছেন আইন অনুযায়ী পর্যালোচনা এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। কারখানা মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে পরের মজুরি বোর্ড ঠিক কবে আসবে তা নিয়ে মতভেদ আছে, যা নতুন মজুরি ২০২৭ বা ২০২৮ সাল পর্যন্ত বিলম্বিত করতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানির দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় উঠল ৫৩ মাসের সর্বোচ্চে

সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ৮.১০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের আমদানি ঋণপত্র বা এলসি খুলেছেন, যা গত ৫৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত বছরের তুলনায় এই বৃদ্ধি ২২.৩৭ শতাংশ, তবে ব্যাংকাররা বলছেন এই উল্লম্ফনের মূল কারণ আমদানির পরিমাণ বাড়া নয়, বরং জ্বালানি, সার ও কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়াই এই উচ্চ আমদানি ব্যয়ের একটা প্রধান কারণ।