বাণিজ্য ও রপ্তানি

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানির দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় উঠল ৫৩ মাসের সর্বোচ্চে

১৩ অক্টোবর, ২০২৬4 মিনিটের পড়া
মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানির দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় উঠল ৫৩ মাসের সর্বোচ্চে

সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ৮.১০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের আমদানি ঋণপত্র বা এলসি খুলেছেন, যা গত ৫৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত বছরের তুলনায় এই বৃদ্ধি ২২.৩৭ শতাংশ, তবে ব্যাংকাররা বলছেন এই উল্লম্ফনের মূল কারণ আমদানির পরিমাণ বাড়া নয়, বরং জ্বালানি, সার ও কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়াই এই উচ্চ আমদানি ব্যয়ের একটা প্রধান কারণ।

সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা আমদানির জন্য ৮.১০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ঋণপত্র বা এলসি খুলেছেন, যা গত ৫৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ, অর্থাৎ ২০২২ সালের এপ্রিলের পর থেকে এত বেশি এলসি আর খোলা হয়নি। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এলসি খোলা হয়েছিল ৬.৬২ বিলিয়ন ডলারের, সে হিসাবে বৃদ্ধির হার ২২.৩৭ শতাংশ। তবে ব্যাংকাররা বলছেন, এই উল্লম্ফনের পেছনে মূল কারণ আমদানি পরিমাণ বাড়া নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের জের ধরে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া।

  • সেপ্টেম্বরে এলসি খোলা হয়েছে ৮.১০ বিলিয়ন ডলারের, যা ২০২২ সালের এপ্রিলের ৮.৪১ বিলিয়ন ডলারের পর সর্বোচ্চ
  • গত বছরের তুলনায় বৃদ্ধি ২২.৩৭ শতাংশ, এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ৬.৩৮ বিলিয়ন ডলারের
  • ব্যাংকাররা বলছেন, আমদানির পরিমাণ নয়, জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বাড়াই এই উল্লম্ফনের মূল কারণ
  • সেপ্টেম্বরে কেবল সারের আমদানিতেই খরচ হয়েছে ২০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি, আগের তুলনায় বেশি দামে

৫৩ মাসের সর্বোচ্চ, তবে কারণটা ভিন্ন

উপর থেকে দেখলে এলসি খোলার এই উল্লম্ফনকে সুখবর বলেই মনে হবে, বেশি ব্যবসায়ী আমদানির জন্য ঋণপত্র খুলছেন মানে সাধারণত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে। কিন্তু দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে কথা বলা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা এতটা আশাবাদী নন। তারা বলছেন, এই বৃদ্ধি মূলত সেসব খাতেই কেন্দ্রীভূত যেখানে পরিমাণ নয়, বরং প্রতি ইউনিটের দাম বেড়েছে। জ্বালানি তেলের আমদানিই এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। আমদানিকারকরা প্রায় একই পরিমাণ জ্বালানির জন্য আগের তুলনায় অনেক বেশি দাম গুনছেন, যা মূলত গত দুই মাসে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব।

সারের আমদানিতেও একই চিত্র। সেপ্টেম্বরে ২০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের সার আমদানি হয়েছে, এবং ব্যাংকাররা বলছেন একই পরিমাণ সারের জন্য এখন আগের চেয়ে স্পষ্টতই বেশি খরচ হচ্ছে। কাঁচামালের আমদানিও পরিমাণে কিছুটা বেড়েছে, যদিও মাত্রাটা সামান্য, জিংক, ফ্ল্যাট স্টিল এবং বিটুমিনের হিসাবেও আগের তুলনায় বৃদ্ধি দেখা গেছে। অন্যদিকে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি প্রায় অপরিবর্তিত থেকেছে, যা ব্যাংকারদের মতে বড় ধরনের শিল্প সম্প্রসারণ এখনো শুরু হয়নি বলেই নির্দেশ করে।

ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীরা যা বলছেন

"কাঁচামাল আমদানিও কিছুটা বেড়েছে, যা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে কিছু উন্নতির আভাস দিতে পারে," বলেছেন প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান ও রশিদ। তিনি যোগ করেন, পুনরুদ্ধারের গতি সম্ভবত ধীরই হবে, তবে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে বাড়তে পারে।

একজন জ্যেষ্ঠ ব্যবসায়ী সংগঠনের কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই আমদানি পণ্যের দাম ধীরে ধীরে বাড়ছে, এবং গত দুই মাসে এই বৃদ্ধি বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়েছে। একজন জ্যেষ্ঠ বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা আরও বলেন, এলসি খোলার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা বড় কোনো বাধার মুখে পড়ছেন না, কারণ ব্যাংকগুলোর কাছে এখন ট্রেড ফাইন্যান্সের জন্য যথেষ্ট ডলার তারল্য আছে, যা অতীতের ডলার সংকটের তুলনায় একটা বড় পরিবর্তন।

বাণিজ্যের বড় ছবিটা

সেপ্টেম্বরের এলসির তথ্য সাম্প্রতিক অন্য প্রতিবেদনগুলোর সঙ্গেও মিলে যায়, যেখানে দেখা যাচ্ছে বাণিজ্য প্রবাহ বড় হচ্ছে বলা যায় না, তবে তা অবশ্যই আগের চেয়ে খরচবহুল হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যালেন্স অব পেমেন্ট তথ্য অনুযায়ী, যা ঢাকা ট্রিবিউন প্রতিবেদন করেছে, ২০২৬২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে পণ্য আমদানি বছরওয়ারি ১২ শতাংশের বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২.২০ বিলিয়ন ডলারে। একই সময়ে রপ্তানি হয়েছে ৮.৩৮ বিলিয়ন ডলারের, ফলে জুলাই আগস্টে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩.৮২ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের ২.৯৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বেশি, এই ঘাটতি নিয়ে বিডি ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ এই মাসের শুরুতেই বিস্তারিত প্রতিবেদন করেছিল। সব মিলিয়ে একটা চিত্র স্পষ্ট হয়, বন্দর দিয়ে পণ্য যতটা বাড়ছে তার চেয়ে বেশি গতিতে বাড়ছে আমদানি ব্যয়, মূলত পণ্য আনতে এখন যে খরচ হচ্ছে তার কারণেই।

বার চার্টে বাংলাদেশের মাসিক এলসি খোলার তুলনা, সেপ্টেম্বর ২০২৫ এ ৬.৬২ বিলিয়ন ডলার, এপ্রিল ২০২২ এ ৮.৪১ বিলিয়ন ডলার এবং সেপ্টেম্বর ২০২৬ এ ৮.১০ বিলিয়ন ডলার
চার্ট: বিডি ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ, তথ্যসূত্র দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও ঢাকা ট্রিবিউন।

সাম্প্রতিক মানদণ্ডের তুলনায় সেপ্টেম্বরের এলসি

সময়কালএলসি খোলামন্তব্য
এপ্রিল ২০২২৮.৪১ বিলিয়ন ডলারআগের সর্বোচ্চ
সেপ্টেম্বর ২০২৫৬.৬২ বিলিয়ন ডলারএক বছর আগের তুলনা
সেপ্টেম্বর ২০২৬৮.১০ বিলিয়ন ডলার৫৩ মাসের সর্বোচ্চ

কোন কোন খাতে খরচ বেড়েছে, একটু বিস্তারিত

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের তথ্যে কয়েকটি কাঁচামাল খাতের কথা উল্লেখ আছে, যেখানে দুই সময়ের তুলনায় পরিমাণেও কিছুটা বৃদ্ধি দেখা গেছে, যদিও সেটা সামান্যই। জিংক আমদানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪,২০০ ইউনিটে, আগে যা ছিল ৩,২০০, ফ্ল্যাট স্টিল বেড়েছে প্রায় ৫০০ থেকে ৫৭৫ ইউনিটে, আর বিটুমিন বেড়েছে প্রায় ৪৫০ থেকে ৬৫০ ইউনিটে। এই বৃদ্ধিগুলো একক হিসাবে খুব বড় নয়, কিন্তু জ্বালানি ও সারের ইউনিট মূল্য অনেক বেশি বেড়ে যাওয়ার সাথে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, কেন সার্বিক এলসি খরচ এক পঞ্চমাংশের বেশি বেড়ে গেছে, যদিও একজন জ্যেষ্ঠ বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা বলছেন ব্যবসায়ীরা আমদানিতে বড় কোনো নতুন বাধার কথা জানাচ্ছেন না। যে চিত্রটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে তা হলো, আমদানি তালিকা মূলত একই রকম থাকলেও তার দামই বেড়ে গেছে, ব্যবসায়ীরা হঠাৎ অনেক বেশি পরিমাণে সবকিছু কিনছেন বলে নয়।

আপনার জন্য এর মানে কী

আপনি যদি কাঁচামাল, জ্বালানি বা সার আমদানিনির্ভর কোনো ব্যবসা চালান, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি বিশ্ববাজারে তেলের দাম উঁচু রাখা পর্যন্ত আপনার আমদানি খরচ বাড়তিই থাকবে বলে ধরে নেওয়া ভালো, টাকার বিপরীতে ডলারের দর স্থিতিশীল থাকলেও। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে আগেই সরবরাহ চুক্তি চূড়ান্ত করে রাখা বা দাম নির্ধারণে বাড়তি মার্জিন রাখা বিবেচনা করতে পারেন, খরচ নিজে থেকে কমে যাওয়ার অপেক্ষায় না থেকে। যেহেতু ব্যাংকগুলোর কাছে এখন পর্যাপ্ত ডলার তারল্য আছে, এলসি পাওয়াটা আগের মতো বড় বাধা হওয়ার কথা নয়, অর্থায়নের সংকট নয়, এখন সমস্যা মূলত খরচেই।

সাধারণ ভোক্তাদের জন্য, জ্বালানি ও সারের আমদানি খরচ বাড়লে তার প্রভাব সময়ের সাথে পরিবহন ভাড়া আর খাদ্যপণ্যের দামেও গিয়ে পড়ে, কারণ সারের দাম কৃষি খরচ আর জ্বালানির দাম দেশের প্রায় সব পরিবহনকেই প্রভাবিত করে। ডলারের দরের ওঠানামা হিসাব করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে লেনদেনের আগে সাইটের কারেন্সি কনভার্টার দিয়ে বর্তমান হার যাচাই করে নেওয়া যেতে পারে।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

পোশাক ছাড়িয়ে যুক্তরাজ্যে ১০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য বাংলাদেশের

যুক্তরাজ্যের আমদানি বাজারে বাংলাদেশের অংশ এখন মাত্র ০.৪৯ শতাংশ, এবং কর্মকর্তারা বলছেন এই অংশ দ্বিগুণ করে ১ শতাংশে নিতে পারলে তা বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির সমান হতে পারে। বাংলাদেশ আজ যুক্তরাজ্যে যা বিক্রি করে তার মধ্যে পোশাক ছাড়া অন্য পণ্যের অংশ মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ, যদিও প্রসেসড ফুড, ওষুধ, জুতা ও আসবাবপত্রের চাহিদা আছে। যুক্তরাজ্যের একটি বাণিজ্য সুবিধা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার পরও এই প্রবেশাধিকারের বেশিরভাগ শুল্কমুক্ত রাখবে, তবে রপ্তানিকারকদের এখনও মান ও সার্টিফিকেশনের ঘাটতি পূরণ করতে হবে।

উত্তরায় শ্রমিক বিক্ষোভের পর নতুন মজুরি বোর্ড গঠনে উদ্যোগী সরকার, দাবি মাসে ৩০,০০০ টাকা

উত্তরায় শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের একদিন পর বাংলাদেশের শ্রম মন্ত্রণালয় কারখানা মালিক ও শ্রমিকদের কাছ থেকে নতুন মজুরি বোর্ডের জন্য প্রতিনিধির নাম চাইছে, বিক্ষোভের দাবি ছিল মাসিক মজুরি ৩০,০০০ টাকা করা। বর্তমান ন্যূনতম মজুরি ১২,৫০০ টাকা ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নির্ধারিত হয়েছিল, এবং শ্রমিক নেতারা বলছেন আইন অনুযায়ী পর্যালোচনা এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। কারখানা মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে পরের মজুরি বোর্ড ঠিক কবে আসবে তা নিয়ে মতভেদ আছে, যা নতুন মজুরি ২০২৭ বা ২০২৮ সাল পর্যন্ত বিলম্বিত করতে পারে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রপ্তানি বেড়ে ১৩.১ বিলিয়ন ডলার, এগিয়ে ওষুধ ও পাট

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ৬.৩৪ শতাংশ, দাঁড়িয়েছে ১৩.০৯৪ বিলিয়ন ডলারে, যেখানে একা সেপ্টেম্বরেই বেড়েছে ৮.৫৪ শতাংশ, জুলাইয়ের একটা অপ্রত্যাশিত পতনের পরও। তৈরি পোশাক এখনো এই প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি, ১০.৫৭৮ বিলিয়ন ডলার, তবে ওষুধ, পাটজাত পণ্য আর লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ছোট ভিত্তি থেকে আরও জোরে বেড়েছে, আর তুরস্কে রপ্তানি দ্বিগুণের বেশি হয়ে গেছে। এই ঘুরে দাঁড়ানো এসেছে এমন এক জুলাইয়ের পর, যখন বিজিএমইএর তথ্যে পোশাক রপ্তানি আসলে ১.৯২ শতাংশ কমে গিয়েছিল, কারণ আগের বছরের জুলাই ছিল অস্বাভাবিক রকম উঁচু একটা ভিত্তি, যা দেখিয়ে দেয় মাসে মাসে এই ঘুরে দাঁড়ানো কতটা অসমান ছিল।