বাণিজ্য ও রপ্তানি

জ্বালানি তেলের আমদানি বেড়ে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ল ২৯ শতাংশ, পৌঁছাল ৩.৮২ বিলিয়ন ডলারে

৭ অক্টোবর, ২০২৬4 মিনিটের পড়া
জ্বালানি তেলের আমদানি বেড়ে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ল ২৯ শতাংশ, পৌঁছাল ৩.৮২ বিলিয়ন ডলারে

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি আগের বছরের তুলনায় ২৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৮২ বিলিয়ন ডলারে, মূলত জ্বালানি তেল আমদানির খরচ দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাওয়ার কারণে। শুধু জুলাই মাসেই ঘাটতি বেড়ে হয়েছিল ২.০৯ বিলিয়ন ডলার, তবে আগস্টে রেমিট্যান্সের জোরে চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত বেড়ে দাঁড়ায় ৫৯৯ মিলিয়ন ডলারে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাড়তে থাকা জ্বালানি খরচই এখন দেশের বৈদেশিক হিসাবের সবচেয়ে বড় চাপের জায়গা।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে, জুলাই আর আগস্টে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৮২ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৯ শতাংশ বেশি। এর কারণ খুব সহজ, আমদানি খরচ বেড়েছে রপ্তানি আয়ের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে। এই দুই মাসে রপ্তানি হয়েছে ৮.৩৮ বিলিয়ন ডলারের, যা ৫.৮ শতাংশ বেশি, কিন্তু আমদানি হয়েছে ১২.২০ বিলিয়ন ডলারের, বেড়েছে ১২.১ শতাংশ। গত বছর এই দুই মাসে ঘাটতি ছিল ২.৯৬ বিলিয়ন ডলার, এবার তা অনেকটাই বেড়ে গেছে। আর এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এমন একটা সময়ে যখন দেশের বৈদেশিক হিসাব একদিকে জ্বালানি তেলের বাড়তি খরচের চাপে, আর অন্যদিকে রেমিট্যান্স আর তুলনামূলক স্থিতিশীল টাকার ওপর ভর করে টিকে আছে।

জ্বালানি তেলই মূল সমস্যা

এই ঘাটতি বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ জ্বালানি তেল। দুই মাসে জ্বালানি তেল আমদানিতে খরচ দ্বিগুণের বেশি বেড়ে গিয়ে পৌঁছেছে ২.৪৯ বিলিয়ন ডলারে, যেখানে গত বছর এই খরচ ছিল তার প্রায় অর্ধেক। বিশ্বব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এই সংখ্যাটা নিয়েই সরাসরি কথা বলেছেন। তিনি বলেন, "জ্বালানি তেল আমদানি খরচ ১১৫ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে। এটাই মূলত আমদানি খরচ ১২ শতাংশ বাড়ার পেছনের বড় কারণ।" অর্থাৎ শুধু এই একটা খাতই এখন দুই মাসে দেশের মোট আমদানির পাঁচ ভাগের এক ভাগের মতো দখল করে নিয়েছে। এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, বাংলাদেশের বাণিজ্য ভারসাম্য কতটা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ওপর, আর কারখানা আর বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখতে আমদানি করা গ্যাস ও তেলের ওপর।

এই চিত্র আসলে জুলাই মাসেই ধরা পড়েছিল, আগস্টের হিসাব যোগ হওয়ার আগেই। শুধু জুলাই মাসের হিসাবে ঘাটতি দাঁড়ায় ২.০৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের জুলাইয়ের ১.৫১ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে অনেকটাই বেশি। এই একটা মাসে আমদানি বেড়েছিল ৮.৬ শতাংশ, আর আরও চিন্তার বিষয় হলো রপ্তানি কমে গিয়েছিল ১.৬ শতাংশ। কারখানার যন্ত্রপাতি আমদানি, যা সাধারণত ব্যবসা সম্প্রসারণ বা উৎপাদন বাড়ানোর সময় কেনা হয়, জুলাই মাসে কমে গিয়েছিল ২৭ শতাংশ, নেমে এসেছিল ৮৮২ মিলিয়ন ডলারে। তখনই অর্থনীতিবিদরা এই প্রবণতাকে বেসরকারি বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়ার একটা সংকেত হিসেবে দেখেছিলেন।

আগস্টে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানো, তবে সব জায়গায় না

জুলাই আর পুরো দুই মাসের হিসাবের মধ্যে যে পার্থক্য তৈরি হলো, তার পেছনে আগস্ট মাসের ভালো পারফরম্যান্সের একটা বড় ভূমিকা আছে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে এখনও সবচেয়ে বড় জায়গা দখল করে থাকা পোশাক খাত এই দুই মাসে ৫.৩ শতাংশ বেড়ে পৌঁছেছে ৭.৪৯ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ জুলাইয়ের পতন কাটিয়ে সামগ্রিক হিসাব ইতিবাচক করতে আগস্টে পোশাক খাতকে বেশ ভালো একটা মাস পার করতে হয়েছে। এই ঘুরে দাঁড়ানোর কারণেই মোট রপ্তানি দুই মাস শেষে ৫.৮ শতাংশ বেড়ে শেষ হয়েছে, যদিও অর্থবছরের শুরুটা হয়েছিল নেতিবাচক অবস্থান থেকে।

বিডি ফাইনান্সিয়াল রিভিউ আগেই সেপ্টেম্বরের একক মাসের রপ্তানি হিসাব নিয়ে প্রতিবেদন করেছিল, যেখানে দেখা গিয়েছিল চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক আগের বছরের তুলনায় ৬.৩৪ শতাংশ এগিয়ে আছে। সেখানে ওষুধ, পাট, চামড়া আর হোম টেক্সটাইলের মতো পোশাক-বহির্ভূত খাতগুলো শতকরা হিসাবে পোশাক খাতের চেয়েও বেশি গতিতে বাড়ছিল, যদিও মোট রপ্তানির অঙ্কে পোশাকই এখনও সবচেয়ে বড়। এই বিস্তৃত চিত্র বলে দেয়, আগস্টের ঘুরে দাঁড়ানোটা কেবল নিট বা ওভেন পোশাকে সীমাবদ্ধ কোনো সাময়িক ঘটনা নয়, বরং নতুন অর্থবছরে একটা বিস্তৃত, যদিও এখনও মাঝারি মাত্রার উন্নতির অংশ।

সময়কালরপ্তানিআমদানিবাণিজ্য ঘাটতি
জুলাই-আগস্ট, ২০২৫-২৬৭.৯২ বিলিয়ন ডলার১০.৮৮ বিলিয়ন ডলার২.৯৬ বিলিয়ন ডলার
জুলাই-আগস্ট, ২০২৬-২৭৮.৩৮ বিলিয়ন ডলার১২.২০ বিলিয়ন ডলার৩.৮২ বিলিয়ন ডলার
বার্ষিক পরিবর্তন+৫.৮%+১২.১%+২৯%

চলতি হিসাব এখনও টিকে আছে রেমিট্যান্সের ভরসায়

শুধু বাণিজ্য হিসাবের দিকে তাকালে পুরো ছবিটা খারাপই লাগবে, কিন্তু বাংলাদেশের সামগ্রিক চলতি হিসাব বলছে একটা মিশ্র গল্প। দুই মাসে চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত আগের বছরের তুলনায় তিন গুণের বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৯৯ মিলিয়ন ডলারে, আর এর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রেমিট্যান্সের, যা প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়ে পৌঁছেছে ৫.৮৩ বিলিয়ন ডলারে। এটা জুলাই মাসের তুলনায় একটা বড় পরিবর্তন, কারণ জুলাইয়ে একা চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত ছিল মাত্র ৬৪ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের জুলাইয়ের ১২৫ মিলিয়ন ডলারের চেয়েও কম। এই দুটো হিসাবের মধ্যকার পার্থক্য বলে দেয়, আগস্ট মাসে রেমিট্যান্স আর সামগ্রিক চলতি হিসাব জুলাইয়ের চেয়ে অনেকটাই ভালো করেছে, যদিও এর নিচে বাণিজ্য ঘাটতি তখনও বাড়ছিল।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন সতর্ক করেছেন, চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত দেখে ভাবার কোনো কারণ নেই যে বৈদেশিক হিসাব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আছে। তিনি বলেন, "আর্থিক হিসাবে বড় অঙ্কের বহিঃপ্রবাহ হয়েছে, আর তার কারণেই সামগ্রিক ঘাটতি বেড়েছে।" তিনি এখানে কোনো একটা খাতের দিকে না তাকিয়ে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। জুলাই মাসের হিসাবেই এই টানাপোড়েনটা ছোট আকারে দেখা গিয়েছিল, চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকলেও আর্থিক হিসাবের বহিঃপ্রবাহের কারণে সেই মাসের সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্য দাঁড়িয়েছিল ৬৩৩ মিলিয়ন ডলার ঘাটতিতে, যে ধরনের সংখ্যা বৈদেশিক রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি করে, রেমিট্যান্স যতই ভালো দেখাক না কেন।

বাকি অর্থবছরের জন্য এর মানে কী

এই বাড়তি ঘাটতির খবর এমন একটা সময়ে এলো যখন অর্থবছরের মাত্র দুই মাস পার হয়েছে, আর সরকার ইতিমধ্যে জানিয়েছে তারা নিজেদের আর্থিক ঘাটতি মেটাতে বন্ড বাজার আর ব্যাংক থেকে ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করার পরিকল্পনা করছে। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা একটা বড় বাণিজ্য ঘাটতি একই বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারের ওপর আরও চাপ তৈরি করে, যে মুদ্রা দিয়ে বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ আর আমদানি ঋণপত্র খোলার কাজ চালিয়ে যেতে হয়। জ্বালানি তেল আর কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র সামলানো ব্যাংকাররা বলছেন, তারা সবচেয়ে বেশি চোখ রাখছেন জ্বালানি তেলের খরচের দিকে, কারণ অর্থবছরের বাকি দশ মাসে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বাড়লে এই ঘাটতি আরও বাড়বে, রপ্তানি বা রেমিট্যান্স যত ভালোই করুক না কেন।

এই দুই মাসের হিসাব নীতিনির্ধারকদের সামনে একটা পরিচিত চ্যালেঞ্জ রেখে গেছে, রপ্তানি আর রেমিট্যান্স বাড়ছে, যা দেখতে ভালো, কিন্তু কারখানা আর বিদ্যুৎ গ্রিড সচল রাখতে আমদানি করা জ্বালানির খরচ বাড়ছে তার চেয়েও বেশি গতিতে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাকি সময়ে এই ফারাক কমবে না আরও বাড়বে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ওপর, আর জুলাই মাসে দেখা যন্ত্রপাতি আমদানির পতন সাময়িক ছিল না বেসরকারি বিনিয়োগে দীর্ঘমেয়াদি মন্থরতার শুরু, তার ওপর।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

পোশাক ছাড়িয়ে যুক্তরাজ্যে ১০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য বাংলাদেশের

যুক্তরাজ্যের আমদানি বাজারে বাংলাদেশের অংশ এখন মাত্র ০.৪৯ শতাংশ, এবং কর্মকর্তারা বলছেন এই অংশ দ্বিগুণ করে ১ শতাংশে নিতে পারলে তা বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির সমান হতে পারে। বাংলাদেশ আজ যুক্তরাজ্যে যা বিক্রি করে তার মধ্যে পোশাক ছাড়া অন্য পণ্যের অংশ মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ, যদিও প্রসেসড ফুড, ওষুধ, জুতা ও আসবাবপত্রের চাহিদা আছে। যুক্তরাজ্যের একটি বাণিজ্য সুবিধা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার পরও এই প্রবেশাধিকারের বেশিরভাগ শুল্কমুক্ত রাখবে, তবে রপ্তানিকারকদের এখনও মান ও সার্টিফিকেশনের ঘাটতি পূরণ করতে হবে।

উত্তরায় শ্রমিক বিক্ষোভের পর নতুন মজুরি বোর্ড গঠনে উদ্যোগী সরকার, দাবি মাসে ৩০,০০০ টাকা

উত্তরায় শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের একদিন পর বাংলাদেশের শ্রম মন্ত্রণালয় কারখানা মালিক ও শ্রমিকদের কাছ থেকে নতুন মজুরি বোর্ডের জন্য প্রতিনিধির নাম চাইছে, বিক্ষোভের দাবি ছিল মাসিক মজুরি ৩০,০০০ টাকা করা। বর্তমান ন্যূনতম মজুরি ১২,৫০০ টাকা ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নির্ধারিত হয়েছিল, এবং শ্রমিক নেতারা বলছেন আইন অনুযায়ী পর্যালোচনা এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। কারখানা মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে পরের মজুরি বোর্ড ঠিক কবে আসবে তা নিয়ে মতভেদ আছে, যা নতুন মজুরি ২০২৭ বা ২০২৮ সাল পর্যন্ত বিলম্বিত করতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানির দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় উঠল ৫৩ মাসের সর্বোচ্চে

সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ৮.১০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের আমদানি ঋণপত্র বা এলসি খুলেছেন, যা গত ৫৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত বছরের তুলনায় এই বৃদ্ধি ২২.৩৭ শতাংশ, তবে ব্যাংকাররা বলছেন এই উল্লম্ফনের মূল কারণ আমদানির পরিমাণ বাড়া নয়, বরং জ্বালানি, সার ও কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়াই এই উচ্চ আমদানি ব্যয়ের একটা প্রধান কারণ।