পোশাক ছাড়িয়ে যুক্তরাজ্যে ১০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য বাংলাদেশের
যুক্তরাজ্যের আমদানি বাজারে বাংলাদেশের অংশ এখন মাত্র ০.৪৯ শতাংশ, এবং কর্মকর্তারা বলছেন এই অংশ দ্বিগুণ করে ১ শতাংশে নিতে পারলে তা বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির সমান হতে পারে। বাংলাদেশ আজ যুক্তরাজ্যে যা বিক্রি করে তার মধ্যে পোশাক ছাড়া অন্য পণ্যের অংশ মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ, যদিও প্রসেসড ফুড, ওষুধ, জুতা ও আসবাবপত্রের চাহিদা আছে। যুক্তরাজ্যের একটি বাণিজ্য সুবিধা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার পরও এই প্রবেশাধিকারের বেশিরভাগ শুল্কমুক্ত রাখবে, তবে রপ্তানিকারকদের এখনও মান ও সার্টিফিকেশনের ঘাটতি পূরণ করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্রিটেনে প্রচুর টি-শার্ট বিক্রি করে, কিন্তু বাকি সব মিলিয়ে বিক্রি হয় খুবই কম। এই ভারসাম্যহীনতা থেকেই উঠে আসছে একটা দশ বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন, যা এই সপ্তাহে ঢাকায় আলোচনায় উঠেছে, পোশাক যদি একমাত্র গল্প না থেকে, তাহলে যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আসলে কতটা বড় হতে পারে।
- যুক্তরাজ্যের আমদানি বাজারে বাংলাদেশের অংশ এখন মাত্র ০.৪৯ শতাংশ। এটা ১ শতাংশে পৌঁছালে রপ্তানি প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
- বাংলাদেশ যুক্তরাজ্যে যা বিক্রি করে তার মধ্যে পোশাক ছাড়া অন্য পণ্যের অংশ মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ।
- যুক্তরাজ্যের ডিসিটিএস নামের একটি বাণিজ্য সুবিধা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে গেলেও বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ রপ্তানিকে শুল্কমুক্ত রাখবে।
- কর্মকর্তারা বলছেন এখন মূল বাধা শুল্ক নয়, বরং মান, সার্টিফিকেশন ও সচেতনতার অভাব।
পোশাক কীভাবে বাকি সবকিছুর জায়গা নিয়ে নিল
দশকের পর দশক ধরে তৈরি পোশাক বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য, এবং এই সাফল্যের একটা পাশ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে, রপ্তানিকারকদের মনোযোগে এবং ক্রেতাদের ধারণায় আর কিছুর জন্য বেশি জায়গা থাকেনি। ডিসিসিআই মিলনায়তনে "এক্সপোর্টিং টু দ্য ইউকে: অপরচুনিটিজ বিয়ন্ড আরএমজি" শীর্ষক কর্মশালায়, যা আয়োজন করেছিল রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এবং ব্রিটিশ হাইকমিশন, কর্মকর্তারা এই অসমতার একটা সংখ্যা দিয়েছেন, বাংলাদেশের যুক্তরাজ্যে রপ্তানির মধ্যে পোশাক ছাড়া অন্য পণ্যের অংশ মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ, বাকি প্রায় সবটাই পোশাক।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান ও চিফ এক্সিকিউটিভ মোহাম্মদ হাসান আরিফ তার মূল বক্তব্যে নির্দিষ্ট কিছু খাতের কথা বলেছেন যেখানে তিনি আসল চাহিদা দেখছেন, প্রসেসড ফুড, ওষুধ, জুতা ও আসবাবপত্র। তার বার্তা এটা ছিল না যে পোশাক কমাতে হবে, বরং বাকি খাতগুলোকে এমনভাবে বাড়াতে হবে যাতে তা যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশি পণ্যের প্রকৃত চাহিদার সাথে মিলে যায়।
১০ বিলিয়ন ডলারের সংখ্যাটা কোথা থেকে এলো
এই শিরোনামের সংখ্যাটা একটা সহজ হিসাব থেকে এসেছে, বাংলাদেশ এখন যুক্তরাজ্যের মোট আমদানি বাজারের প্রায় ০.৪৯ শতাংশ ধরে রাখে। এই অংশ যদি দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ১ শতাংশ হয়, কর্মকর্তারা হিসাব করছেন তাহলে রপ্তানির মূল্য বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। সেখানে পৌঁছাতে পোশাক রপ্তানি কমানোর দরকার নেই, দরকার যথেষ্ট নতুন খাত ও যথেষ্ট নতুন ক্রেতা যুক্ত করা, যাতে যুক্তরাজ্যের দোকান ও গুদামে বাংলাদেশের মোট উপস্থিতি মোটামুটি দ্বিগুণ হয়ে যায়।
এই ফারাক মেটানো সহজ নয়, এবং কর্মশালার বক্তারা খোলাখুলি বলেছেন শুল্ক আর মূল বাধা নয়। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদ রপ্তানিকারকদের মান, আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন, পণ্যের উৎস যাচাইযোগ্যতা ও ব্র্যান্ডিংয়ে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন, এগুলোকেই এখন যুক্তরাজ্যের দোকানে ঢোকার আসল চাবিকাঠি বলে অভিহিত করেছেন, কারণ বেশিরভাগ পণ্যের জন্য অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার এমনিতেই আছে।
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার পর কী বদলাবে, কী বদলাবে না
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের বের হয়ে যাওয়া বছরের পর বছর বাণিজ্য নীতি নিয়ে আলোচনায় একটা অনিশ্চয়তা হিসেবে ছিল, এবং এই কর্মশালায় যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে কিছুটা আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাজ্যের ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিম বা ডিসিটিএসের অধীনে, যা ৬৫টি স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশকে কভার করে, বাংলাদেশ তালিকা থেকে বের হওয়ার পরেও তার ৯৮ শতাংশ রপ্তানির জন্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে, পোশাকসহ। রপ্তানিকারকরা তাদের সরবরাহ চেইনের জন্য ৯৫টি যোগ্য দেশ থেকে কাঁচামাল আনতে পারবেন এবং তারপরও তৈরি পণ্য যুক্তরাজ্যে শুল্কমুক্তভাবে পাঠাতে পারবেন, যদি তারা স্কিমের উৎস নিয়মাবলী মেনে চলেন।
"স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার পরও বাজার প্রবেশাধিকার অব্যাহত থাকলে ব্যবসায়ীরা পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তা পান," বলেন বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার জেমস গোল্ডম্যান।
ব্রিটিশ হাইকমিশনের আঞ্চলিক ট্রেড ফর ডেভেলপমেন্ট উপদেষ্টা এলি পার্কার রপ্তানিকারকদের জন্য একটি কারিগরি সেশন পরিচালনা করেন, যেখানে তিনি ডিসিটিএসের সুবিধা আসলে কীভাবে নিতে হয় তা বুঝিয়ে দেন, বাজার প্রবেশের নিয়ম, অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক দাবি করার ব্যবহারিক পদ্ধতি এবং রপ্তানিকারকরা প্রায়ই যে কাগজপত্রে ভুল করেন সেসব নিয়ে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো বলেছে তারা যোগ্যতা ও উৎস নিয়মাবলী নিয়ে একটি বিস্তৃত ডিসিটিএস গাইডবুক প্রকাশ করার পরিকল্পনা করছে, সাথে আগামী মাসগুলোতে ঢাকা ও চট্টগ্রামে আরও কর্মশালা।
রপ্তানিকারকদের এখনও কী ঠিক করা বাকি
দ্য ডেইলি স্টার এ বছর একটি পৃথক প্রতিবেদনে একই কথা রপ্তানিকারকদের পক্ষ থেকে তুলে ধরেছিল, শিল্প সংগঠনগুলো নতুন কোনো শুল্ক চুক্তির বদলে ডিসিটিএসের বিস্তৃত ও সহজ ব্যবহারের দাবি জানাচ্ছিল, কারণ অগ্রাধিকারমূলক হার পাওয়ার যোগ্য অনেক প্রতিষ্ঠানই এখনও তা ঠিকভাবে ব্যবহার করে না, বা করেই না, যুক্তরাজ্যের কোনো বাণিজ্য বাধার কারণে নয়, বরং কাগজপত্র ও মান সংক্রান্ত ঘাটতির কারণে।
মূল বক্তব্যের পর একটি প্যানেলে কাস্টমস কর্মকর্তা এবং জুতা-চামড়া, সামুদ্রিক খাদ্য, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ ও প্যাকেজিং খাতের প্রতিনিধিরা একসঙ্গে বসেন, সমস্যার ব্যবহারিক দিক নিয়ে কাজ করেন, পরীক্ষার শর্ত, সার্টিফিকেশনের সময়সীমা এবং যুক্তরাজ্যের কাস্টমস পরীক্ষায় টিকে থাকার মতো পণ্যের উৎস নথিভুক্ত করার পদ্ধতি নিয়ে। ডিসিসিআইয়ের সহসভাপতি মোঃ সালেম সুলাইমান ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর কয়েকজন কর্মকর্তা এই আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন।
| পরিমাপ | সংখ্যা |
|---|---|
| যুক্তরাজ্যের আমদানি বাজারে বাংলাদেশের বর্তমান অংশ | ০.৪৯ শতাংশ |
| লক্ষ্য মাত্রার বাজার অংশ | ১ শতাংশ |
| লক্ষ্য অংশে পৌঁছালে অনুমিত রপ্তানি মূল্য | বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার |
| বর্তমান যুক্তরাজ্য রপ্তানিতে পোশাক বহির্ভূত পণ্যের অংশ | প্রায় ৬ শতাংশ |
| স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার পরও ডিসিটিএসের অধীনে শুল্কমুক্ত থাকা রপ্তানির অংশ | ৯৮ শতাংশ |
আপনার জন্য এর মানে কী
একজন পোশাক কারখানা মালিকের জন্য এটা একটা মনে করিয়ে দেওয়ার বিষয় যে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার পর যুক্তরাজ্যের বাজার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না, যে সুবিধাগুলো বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছিল তার বেশিরভাগই ডিসিটিএসের মাধ্যমে টিকে থাকছে, তাই পরিকল্পনার প্রশ্নটা প্রবেশাধিকার হারানো নিয়ে কম, বরং আপনার কারখানার কাছে যুক্তরাজ্যের খুচরা বিক্রেতারা যে সার্টিফিকেশন চাইতে থাকবে তা আছে কিনা তা নিয়ে বেশি। পোশাক বাদে অন্য খাতের একজন উদ্যোক্তা বা ছোট রপ্তানিকারকের জন্য, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, চামড়াজাত পণ্য, আসবাবপত্র বা কৃষি পণ্যে, এটা একটা বিরল সুযোগ যখন একটা সরকারি সংস্থা স্পষ্টভাবে কোন খাতে বাড়ার সুযোগ আছে তা বলে দিচ্ছে, এবং বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি ব্যবহার করে না এমন একটা শুল্ক সুবিধা কীভাবে কাজে লাগানো যায় তার জন্য বিনামূল্যে সহায়তা দিচ্ছে।
এই বাণিজ্য সম্পর্কের অংশ হিসেবে যদি আপনার ব্যবসা যুক্তরাজ্য থেকে পণ্য আমদানি করে বা পাউন্ডে সরবরাহকারীদের টাকা দেয়, কোনো দর চূড়ান্ত করার আগে সাইটের কারেন্সি কনভার্টার দিয়ে বর্তমান বিনিময় হার যাচাই করে নেওয়া ভালো, কারণ টাকা দুর্বল বা শক্তিশালী হলে তা শুল্কের মতোই একটা চুক্তির আসল খরচ বদলে দিতে পারে।
তথ্যসূত্র
এরপর পড়ুন
উত্তরায় শ্রমিক বিক্ষোভের পর নতুন মজুরি বোর্ড গঠনে উদ্যোগী সরকার, দাবি মাসে ৩০,০০০ টাকা
উত্তরায় শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের একদিন পর বাংলাদেশের শ্রম মন্ত্রণালয় কারখানা মালিক ও শ্রমিকদের কাছ থেকে নতুন মজুরি বোর্ডের জন্য প্রতিনিধির নাম চাইছে, বিক্ষোভের দাবি ছিল মাসিক মজুরি ৩০,০০০ টাকা করা। বর্তমান ন্যূনতম মজুরি ১২,৫০০ টাকা ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নির্ধারিত হয়েছিল, এবং শ্রমিক নেতারা বলছেন আইন অনুযায়ী পর্যালোচনা এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। কারখানা মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে পরের মজুরি বোর্ড ঠিক কবে আসবে তা নিয়ে মতভেদ আছে, যা নতুন মজুরি ২০২৭ বা ২০২৮ সাল পর্যন্ত বিলম্বিত করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানির দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় উঠল ৫৩ মাসের সর্বোচ্চে
সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ৮.১০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের আমদানি ঋণপত্র বা এলসি খুলেছেন, যা গত ৫৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত বছরের তুলনায় এই বৃদ্ধি ২২.৩৭ শতাংশ, তবে ব্যাংকাররা বলছেন এই উল্লম্ফনের মূল কারণ আমদানির পরিমাণ বাড়া নয়, বরং জ্বালানি, সার ও কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়াই এই উচ্চ আমদানি ব্যয়ের একটা প্রধান কারণ।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রপ্তানি বেড়ে ১৩.১ বিলিয়ন ডলার, এগিয়ে ওষুধ ও পাট
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ৬.৩৪ শতাংশ, দাঁড়িয়েছে ১৩.০৯৪ বিলিয়ন ডলারে, যেখানে একা সেপ্টেম্বরেই বেড়েছে ৮.৫৪ শতাংশ, জুলাইয়ের একটা অপ্রত্যাশিত পতনের পরও। তৈরি পোশাক এখনো এই প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি, ১০.৫৭৮ বিলিয়ন ডলার, তবে ওষুধ, পাটজাত পণ্য আর লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ছোট ভিত্তি থেকে আরও জোরে বেড়েছে, আর তুরস্কে রপ্তানি দ্বিগুণের বেশি হয়ে গেছে। এই ঘুরে দাঁড়ানো এসেছে এমন এক জুলাইয়ের পর, যখন বিজিএমইএর তথ্যে পোশাক রপ্তানি আসলে ১.৯২ শতাংশ কমে গিয়েছিল, কারণ আগের বছরের জুলাই ছিল অস্বাভাবিক রকম উঁচু একটা ভিত্তি, যা দেখিয়ে দেয় মাসে মাসে এই ঘুরে দাঁড়ানো কতটা অসমান ছিল।