সিকদার গ্রুপের অর্থ উদ্ধারে যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠানের ১২৫ মিলিয়ন ডলার ফি নিয়ে আপত্তি ব্যাংকগুলোর
সিকদার গ্রুপকে ঋণ দেওয়া সাতটি ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংক ২৫ অক্টোবর বৈঠকে বসেছিল যুক্তরাজ্যভিত্তিক আর১ কনসোর্টিয়ামের একটি প্রস্তাব নিয়ে, যা প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের কথা বলছে। প্রতিষ্ঠানটি এই কাজের জন্য ১২৫ মিলিয়ন ডলার নির্দিষ্ট ফি চেয়েছে, কিন্তু ব্যাংকগুলো এর বিরোধিতা করছে এবং চায় শুধু যা উদ্ধার হবে তার থেকেই অর্থ দিতে। অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান বলেছেন উদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠানের কমিশন ভিত্তিতে কাজ করা উচিত। জানা গেছে, প্রস্তাব বাতিল হওয়ার আগে ব্যাংকগুলোর হাতে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় আছে শর্তে সম্মত হওয়ার জন্য।
২৫ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংক সিকদার গ্রুপকে ঋণ দেওয়া সাতটি ব্যাংকের সঙ্গে বসে একটা উদ্ধার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেছে, যা দ্রুত একটা ফি নিয়ে বিতর্কে রূপ নিয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সম্পদ উদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠান আর১ কনসোর্টিয়াম প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের সম্পদ উদ্ধারের জন্য ১২৫ মিলিয়ন ডলার ফি চেয়েছে, সিকদার পরিবার দেশের বাইরে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার সরিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ, যার মধ্যে এই ৫০০ মিলিয়ন ডলারের হিসাব এখন পর্যন্ত পাওয়া গেছে। ব্যাংকগুলো প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়োগ দেওয়ার বিরুদ্ধে নয়, তাদের আপত্তি পারিশ্রমিক পরিশোধের পদ্ধতি নিয়ে, একটা নির্দিষ্ট ১২৫ মিলিয়ন ডলার খরচ, যা অর্থ আসলে ফিরে আসুক বা না আসুক ব্যাংকগুলোকেই বহন করতে হবে।
- আর১ কনসোর্টিয়াম সিকদার গ্রুপের দেশের বাইরে পাচার হওয়া প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ট্রেস করা প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার উদ্ধারের জন্য ১২৫ মিলিয়ন ডলার ফি চেয়েছে।
- ২৫ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংক সিকদার গ্রুপকে ঋণ দেওয়া সাতটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠকে এই প্রস্তাব প্রকাশ করেছে।
- ব্যাংকগুলো অগ্রিম ফি দিতে রাজি নয় এবং চায় আর১ শুধু যা উদ্ধার করবে তার থেকেই পারিশ্রমিক নিক, অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান কমিশন ভিত্তিক মডেলের পক্ষে কথা বলেছেন।
- বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা সতর্ক করেছেন, আর১-এর এখনকার প্রস্তাবে ব্যাংকগুলো পুরো ১২৫ মিলিয়ন ডলার খরচ করেও কিছুই উদ্ধার করতে না পারার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ব্যাংকগুলো কেন আপত্তি করছে
এই বিতর্কের মূল বিষয় হলো, উদ্ধার না হলে ক্ষতির ঝুঁকি কে বহন করবে। ২৫ অক্টোবরের বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেছেন, "ব্যাংকগুলো ১২৫ মিলিয়ন ডলার খরচ করেও কোনো সম্পদ উদ্ধার করতে না পারার ঝুঁকি আছে," কারণ আর১-এর চাওয়া ফি কতটা উদ্ধার হলো তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত নয়। সিকদার গ্রুপকে ঋণ দিয়ে এখনো ক্ষতির মধ্যে থাকা সাতটি ব্যাংকের জন্য, কোনো নিশ্চয়তা ছাড়া একটা বড় নির্দিষ্ট অঙ্কের ফি দেওয়া তাদের বোর্ডের কাছে মেনে নেওয়া কঠিন, যাদের মধ্যে অনেকের অনুমোদন এখনো বাকি চুক্তি সইয়ের আগে।
অগ্রণীর চেয়ারম্যান যা চাইছেন
অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বুখতিয়ার আহমেদ, যার ব্যাংক সিকদার গ্রুপের ঝুঁকিতে থাকা সাতটি ঋণদাতার একটি, বলেছেন উদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠানকে আলাদাভাবে পারিশ্রমিক দেওয়া উচিত। তিনি বলেছেন, "উদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠান উদ্ধারের ওপর কমিশন নিতে পারে," এমন একটা অবস্থান যা আর১-এর নির্দিষ্ট ফির প্রস্তাবের চেয়ে নো রিকভারি, নো ফি ধরনের ব্যবস্থার প্রতি ব্যাংকগুলোর পছন্দকে প্রতিফলিত করে। এমন ব্যবস্থা হলে ব্যর্থ উদ্ধার প্রচেষ্টার আর্থিক ঝুঁকি গিয়ে পড়বে আর১-এর ওপরেই, সিকদার গ্রুপের অপরিশোধিত ঋণ এখনো বহন করা ব্যাংকগুলোর ওপর নয়।
অর্থ কোথায় গেছে বলে অভিযোগ
বিষয়টি জানা ব্যাংকিং কর্মকর্তাদের মতে, তদন্তের আওতায় থাকা অর্থ কেম্যান আইল্যান্ডস, থাইল্যান্ড, দুবাই ও যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে সরানো হয়েছে বলে অভিযোগ। ব্যাংকগুলো ৪ ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তি সই না করলে আর১-এর প্রস্তাব বাতিল হয়ে যাবে বলে জানা গেছে, যা বোর্ডগুলো প্রস্তাবিত শর্তাবলী মেনে নেবে কিনা তা নিয়ে ভাবার সময়েও ফি কাঠামো দ্রুত সমাধান করার চাপ তৈরি করছে।
অন্য ব্যাংকগুলোতেও একই ধরনের একটা প্যাটার্ন
সিকদার গ্রুপ সেই ছয়টি বাংলাদেশি শিল্প গ্রুপের একটি যাদের ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স ঠিক এই রকম সিভিল রিকভারি ব্যবস্থার জন্য বাছাই করেছিল, এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো, আরামিট, ওরিয়ন ও নাসার মতো অনেক বড় গ্রুপের সঙ্গে। সিকদারের নিজের ঋণ এক্সপোজার, প্রায় ১০,২৩৩ কোটি টাকা, এস আলমের ২.২৫ লাখ কোটি টাকার তুলনায় অনেক কম, কিন্তু সমান্তরাল এস আলম উদ্ধার উদ্যোগে জড়িত ব্যাংকাররা বলছেন অন্যত্র একই রকম একটা প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে চলছে। ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক খান বলেছেন তার ব্যাংক "ইতিমধ্যে এস আলম গ্রুপের বিদেশি সম্পদ খুঁজে বের করতে বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সই করেছে।" জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমান বলেছেন তার ব্যাংক "বোর্ড অনুমোদনের অধীনে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে," আর আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মাহমুদ হোসেন বলেছেন তার ব্যাংকের বর্তমান চুক্তিগুলো "তথ্যের জন্য," আসল উদ্ধারের নির্দেশ দেয় এমন বাণিজ্যিক চুক্তি এখনো বাকি। ছয়টি গ্রুপের জন্য পরিকল্পিত ৫৯টি চুক্তির মধ্যে এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৩৬টি অ-প্রকাশ চুক্তি সই হয়েছে।
অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বুখতিয়ার আহমেদ আর১ কনসোর্টিয়ামকে কীভাবে পারিশ্রমিক দেওয়া উচিত তা নিয়ে বলেছেন, "উদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠান উদ্ধারের ওপর কমিশন নিতে পারে।"
কঠিন অংশটা এখনো সামনে
ফি নিয়ে বিতর্ক মিটে গেলেও, উদ্ধার প্রক্রিয়া নিজেই দ্রুত হবে না। কেম্যান আইল্যান্ডস, থাইল্যান্ড, দুবাই ও যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে সরানো অর্থ খুঁজে বের করার মানে হলো একাধিক আইনি দল, একাধিক আদালত ব্যবস্থা, এবং কিছু ক্ষেত্রে বিদেশি নিয়ন্ত্রকদের সহযোগিতা সমন্বয় করা, যাদের একটা বাংলাদেশি ব্যাংকের দাবিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কোনো বিশেষ বাধ্যবাধকতা নেই। বাণিজ্যিক শর্তাবলী ঠিক হয়ে গেলেও এই ধরনের আন্তর্জাতিক সম্পদ উদ্ধার মোকদ্দমা সাধারণত বছরের পর বছর সময় নেয়, আর এই ক্ষেত্রে শর্তাবলীই এখনো ঠিক হয়নি।
আপনার জন্য এর মানে কী
এই বিতর্ক জনতা, অগ্রণী বা এতে জড়িত অন্য ঋণগ্রহীতাদের দৈনন্দিন ব্যাংকিংয়ে কিছু বদলাবে না, আর বাস্তবে যে অর্থ শেষ পর্যন্ত উদ্ধার হবে তা এই ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিটকে শক্তিশালী করবে শুধু বছরের পর বছর লাগতে পারে এমন একটা প্রক্রিয়ার পরে। আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতাদের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই মামলাটা বলে দেয় বাংলাদেশ কীভাবে রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত শিল্প গ্রুপগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঋণের স্তূপ সামলানোর চেষ্টা করছে, এমন একটা সমস্যা যা বছরের পর বছর ব্যাংকের ব্যালেন্স শিটে চাপ ফেলে এসেছে এবং ঋণের সুদের হার ও এফডিআরের রিটার্ন স্বাভাবিক হতে দেয়নি দ্রুত। এই বৃহত্তর খেলাপি ঋণ পরিষ্কার করার চেষ্টা আমানতের সুদের হারে কতটা প্রভাব ফেলছে তা সঞ্চয়কারীরা দেখে নিতে পারেন এফডিআর রেট তুলনা টুল দিয়ে।
তথ্যসূত্র
এরপর পড়ুন
অক্টোবরে এনবিআরের ভ্যাট আদায় ২৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে ঘুরে দাঁড়াল, চেয়ারম্যানের বাজি বকেয়া চালানের জট ছাড়ানোয়
বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বলছে, অক্টোবরে ভ্যাট আদায় আগের বছরের তুলনায় ২৩ শতাংশ বেড়েছে, যা ত্রৈমাসিক রিটার্ন ব্যবস্থায় সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার পর ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি থেকে একটি বড় ঘুরে দাঁড়ানো। চেয়ারম্যান আহসান হাবিব আশা করছেন, বকেয়া চালান সিস্টেমে তোলা হলে এই হার ৩০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছাবে। অক্টোবরে আয়কর ও শুল্ক আদায়ও ভালো বেড়েছে, যদিও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সামগ্রিক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অনেকটাই অপূর্ণ থেকে গেছে।
গার্মেন্ট অস্থিরতায় অর্থায়নের অভিযোগে ১০০র বেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করল এনবিআর, ১২৫ কোম্পানি তল্লাশির আওতায়
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ব্যাংকগুলোকে ১০০ জনের বেশি ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট জব্দ করার নির্দেশ দিয়েছে এবং প্রায় ১২৫টি কোম্পানির লেনদেনের ইতিহাস পরীক্ষা করছে, রাজনৈতিক সংযোগ থাকা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে গার্মেন্ট অস্থিরতার অর্থায়নের অভিযোগ তুলে। নাম প্রকাশিতদের মধ্যে আছেন বেক্সিমকো গ্রুপের সালমান এফ রহমান, এনভয় গ্রুপের আবদুস সালাম মুরশেদী এবং বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এসএম মান্নান কচি, যাদের বেশিরভাগই ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সঙ্গে যুক্ত। প্রায় ৩৭০টি কারখানা মজুরি বিক্ষোভের মধ্যে উৎপাদন বন্ধ করার পর এই পদক্ষেপ এল। প্রকাশ্যে কোনো আইন উল্লেখ করা হয়নি এবং নাম প্রকাশিত কোনো পক্ষ এখনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি।
ভ্যাট রিটার্নের উল্টো সিদ্ধান্তের চাপে এনবিআরের প্রথম প্রান্তিকের আদায় লক্ষ্য থেকে ৪২ হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আদায় করেছে ৯২,৫১৭ কোটি টাকা, যা ১,৩৪,৩৯৬ কোটি টাকার লক্ষ্য থেকে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা কম। সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্নের সুযোগ দেওয়ায় অনেক ব্যবসা রিটার্ন জমা না দিয়েই রেখেছিল, পরে নীতি পরিবর্তন করা হয়, আর অর্থনীতিবিদরা বলছেন এই ঘাটতি সরকারকে ব্যাংক থেকে আরও বেশি ঋণ নিতে বাধ্য করতে পারে। আসল পরীক্ষা হবে আগামী কয়েক সপ্তাহে প্রকাশিতব্য অক্টোবরের তথ্যে।