ব্র্যাক ব্যাংক বিক্রি করছে বাংলাদেশের প্রথম গ্রিন বন্ড, ১,০০০ কোটি টাকার জিরো কুপন ইস্যু
ব্র্যাক ব্যাংক প্রকাশ করেছে ১,০০০ কোটি টাকার একটি জিরো কুপন গ্রিন বন্ডের শর্তাবলি, যা দেশের প্রথম আন্তর্জাতিকভাবে সনদপ্রাপ্ত গ্রিন লেবেলের ব্যাংক বন্ড। তিন বছর মেয়াদি এই বন্ডের লক্ষ্য রিটার্ন ৭.৫ শতাংশ, আর এর অর্থ যাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রকল্পে।
ব্র্যাক ব্যাংক বাংলাদেশের প্রথম সনদপ্রাপ্ত গ্রিন বন্ড বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছে, ১,০০০ কোটি টাকার এই জিরো কুপন বন্ডের অর্থ ব্যাংকটি সোলার বিদ্যুৎ, জ্বালানি সাশ্রয়ী কারখানা আর অন্যান্য পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে ব্যয় করবে বলে জানিয়েছে। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী তারেক রিফাত উল্লাহ খান ২৫ অক্টোবর ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে এর শেষ শর্তাবলি প্রকাশ করেন, বোর্ড এই অর্থ তোলার অনুমোদন দেওয়ার পাঁচ মাস পর।
- বন্ডটির আকার সর্বোচ্চ ১,০০০ কোটি টাকা, মেয়াদ তিন বছর, সিনিয়র, জামানতবিহীন, রূপান্তরযোগ্য নয়, পূর্ণ মেয়াদে পুরোপুরি পরিশোধযোগ্য।
- এটি জিরো কুপন বন্ড, মানে বিনিয়োগকারীরা ছাড়ে কিনবেন আর মেয়াদ শেষে পুরো মুখমূল্য পাবেন, লক্ষ্য রিটার্ন ৭.৫ শতাংশ।
- এটি আইসিএমএর গ্রিন বন্ড নীতি অনুসরণ করে এবং এস অ্যান্ড পি গ্লোবাল রেটিংসের সেকেন্ড পার্টি মতামত নিয়েছে, যা বাংলাদেশি কোনো ব্যাংক বন্ডের জন্য প্রথম।
- অর্থ ব্যয় হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্রিন ভবন আর শিল্পের জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রকল্পে।
বোর্ডের অনুমোদন থেকে বিক্রির টেবিলে
ব্র্যাক ব্যাংকের বোর্ড ২১ মে প্রাথমিকভাবে এই গ্রিন বন্ডের অনুমোদন দেয়, লক্ষ্য ছিল প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে গ্রিন ফাইন্যান্সিং খাতের জন্য সর্বোচ্চ ১,০০০ কোটি টাকা তোলা। পাঁচ মাস পর ব্যাংকটি সেই অনুমোদনকে একটা পূর্ণ গঠনে রূপ দিয়েছে, নির্দিষ্ট মেয়াদ, লক্ষ্য রিটার্ন আর সনদায়ন প্রক্রিয়া সহ, যা আগের ঘোষণায় ছিল না। বন্ডটি বেসরকারিভাবে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান আর ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি হবে, আর যোগ্য কোম্পানির প্রভিডেন্ট ও গ্র্যাচুইটি ফান্ডও নিজ নিজ বিনিয়োগ নিয়মের আওতায় অংশ নিতে পারবে।
জিরো কুপন বন্ড আসলে কীভাবে টাকা দেয়
নিয়মিত সুদ দেওয়া সাধারণ বন্ডের থেকে ভিন্ন, ব্র্যাক ব্যাংকের প্রতিটি বন্ডের মুখমূল্য ১০ লাখ টাকা, যা ছাড়ে বিক্রি হবে। লক্ষ্য রিটার্ন ৭.৫ শতাংশ ধরলে, ১০ লাখ টাকার একটা বন্ড ইস্যুর সময় প্রায় ৮.০৫ লাখ টাকায় বিক্রি হবে, আর কেনার দাম আর মুখমূল্যের এই ফারাকটাই তিন বছরের সুদের জায়গা নিচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা পথে কুপন পেমেন্টের বদলে মেয়াদ শেষে একবারেই পুরো টাকা পান, যা তাদের জন্য সুবিধাজনক যারা সুদ বারবার পুনর্বিনিয়োগ না করে একটা নির্দিষ্ট রিটার্ন চান।
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
|---|---|
| ইস্যুর আকার | সর্বোচ্চ ১,০০০ কোটি টাকা |
| মেয়াদ | তিন বছর |
| গঠন | সিনিয়র, জামানতবিহীন, রূপান্তরযোগ্য নয়, জিরো কুপন, পূর্ণ পরিশোধযোগ্য |
| লক্ষ্য রিটার্ন | ৭.৫ শতাংশ |
| প্রতি বন্ডের মুখমূল্য | ১০ লাখ টাকা (ইস্যুতে প্রায় ৮.০৫ লাখ টাকা) |
| যোগ্য ক্রেতা | কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি, যোগ্য প্রভিডেন্ট ও গ্র্যাচুইটি ফান্ড |
| অর্থের ব্যবহার | নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্রিন ভবন, শিল্পের জ্বালানি সাশ্রয় |
| সনদায়ন | আইসিএমএ গ্রিন বন্ড নীতি, এস অ্যান্ড পি গ্লোবাল রেটিংসের সেকেন্ড পার্টি মতামত |
ব্র্যাক ব্যাংক কেন গ্রিন ঋণে বাজি ধরছে
ব্র্যাক ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওর ৬০ শতাংশের বেশি এখন টেকসই ফাইন্যান্সে, আর এটি টানা পাঁচ বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ টেকসই ব্যাংকের তালিকায় আছে। ব্লুমবার্গের ইএসজি রেটিংয়ে এটি বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে শীর্ষে, আর ২০২৫ সালের অক্টোবরে টায়ার টু মূলধন বাড়াতে দেশের প্রথম সোশ্যাল বন্ড বিক্রি করেছিল। ব্যাংকটি আর্থিকভাবে একটি রেকর্ড বছর কাটাচ্ছে, ২০২৫ সালের সমন্বিত মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২,২৫০.৯৪ কোটি টাকা, আগের বছরের চেয়ে ৫৭ শতাংশ বেশি, যা দিয়ে এটি প্রথম বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে ২,০০০ কোটি টাকার মুনাফা ছুঁয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকেও এই ধারা বজায় ছিল, মুনাফা বছরে বছরে ৪৪ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৬৯৫.৬৮ কোটি টাকা।
"এই গ্রিন বন্ড ব্র্যাক ব্যাংকের টেকসই ফাইন্যান্স যাত্রার একটা গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক," বলেন ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী তারেক রিফাত উল্লাহ খান।
খান বাড়তি জ্বালানি খরচের কথাও উল্লেখ করেন, যার কারণে কারখানাগুলোর স্বল্পমেয়াদি ঋণের বদলে দীর্ঘমেয়াদি, সাশ্রয়ী অর্থায়ন দরকার নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের জন্য, কারণ জ্বালানির দাম বাড়লে স্বল্পমেয়াদি ঋণ আরও খরচসাপেক্ষ হয়ে ওঠে। ব্যাংকটি বছরে বছরে অডিট করে নিশ্চিত করবে এই বন্ডের টাকা আসলেই তার নামে উল্লেখ করা গ্রিন প্রকল্পে যাচ্ছে কিনা, যা এমন বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করার জন্য, যারা পরিবেশবান্ধব নাম দিয়ে টাকা তোলা কিন্তু বাস্তবে তার সঙ্গে মিল না থাকা বন্ড নিয়ে সতর্ক থাকেন।
আপনার জন্য এর মানে কী
সাধারণ সঞ্চয়কারীদের জন্য ৭.৫ শতাংশ লক্ষ্য রিটার্নের একটা ব্যাংক বন্ড ঝুঁকির মাত্রায় ফিক্সড ডিপোজিট আর শেয়ারবাজারের মাঝামাঝি জায়গায় থাকে, কারণ এর পেছনে সরকারের গ্যারান্টি নেই, আছে ব্যাংকের ঋণ ঝুঁকি, আর তিন বছরের জন্য টাকা আটকে থাকে, মাঝে কোনো কুপন পেমেন্ট ছাড়াই। কর্পোরেট ট্রেজারার আর প্রভিডেন্ট ফান্ড ব্যবস্থাপকদের জন্য এটি একটা নতুন ফিক্সড ইনকাম সুযোগ, যার সঙ্গে আছে পরিবেশগত একটা লেবেল, যা তাদের নিজেদের রিপোর্টিংয়ের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তিন বছরের সঞ্চয় আটকে দেওয়ার আগে একটা সাধারণ এফডিআরের সঙ্গে এর তুলনা করতে চাইলে সাইটের এফডিআর ও ডিপিএস ক্যালকুলেটর দিয়ে বর্তমান আমানতের হার দেখে নেওয়া যায়, আর নিজের ব্যবসায় জ্বালানি সাশ্রয়ী উন্নয়ন এই ধরনের গ্রিন অর্থায়নের যোগ্য কিনা জানতে চাইলে সরাসরি নিজের সম্পর্কিত ব্যাংকে জিজ্ঞাসা করাই ভালো, কারণ যোগ্যতার শর্ত প্রকল্প ভিত্তিতে ঠিক হয়।
তথ্যসূত্র
এরপর পড়ুন
নয় মাসের আয় মৌসুমে ব্যাংক এশিয়ার মুনাফা ৩৪ শতাংশ লাফ দিল, সিটি ব্যাংকের স্থির ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি
ব্যাংক এশিয়ার জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর নিট মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭২ কোটি টাকায়, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নয় মাসের আয় মৌসুমে সিটি ব্যাংকের তুলনামূলক স্থির ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে ৮৬৭.৩৮ কোটি টাকা ছাড়িয়ে। ব্যাংক এশিয়ার প্রবৃদ্ধির পেছনে ছিল গ্রাহক আমানতে ১৯ শতাংশ লাফ আর খেলাপি ঋণের উন্নত হার, আবার সিটি ব্যাংকের বড় মুনাফার ভিত্তি কম শতাংশ প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও প্রকৃত টাকার অঙ্কে বেশি যোগ করেছে। এই তুলনা এ বছর ব্যাংকগুলোর মুনাফা আসলে কী চালাচ্ছে তার একটি জানালা খুলে দেয়।
ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ২০২০ সালের পর প্রথমবার ২০ টাকার নিচে, লোকসান বাড়ছে
রবিবার ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের শেয়ার নেমে এসেছে ১৯.৫০ টাকায়, যা ২০২০ সালের পর সবচেয়ে কম, ব্যাংকটি নয় মাসে প্রায় ৩,২৮৬ কোটি টাকা লোকসানের তথ্য প্রকাশ করার পর। শ্রেণীকৃত ঋণ এখন ব্যাংকের মোট ঋণ বিতরণের ৫১ শতাংশ, আর নিয়ন্ত্রকদের চাহিদার তুলনায় ব্যাংক মাত্র সামান্য অংশই প্রভিশন রেখেছে। এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ শেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংক বোর্ড ভেঙে দেওয়ার দুই বছরের বেশি সময় পরও এই দরপতন দেখাচ্ছে পরিষ্কারের কাজ এখনো কতটা বাকি।
পোশাক শ্রমিক অসন্তোষ আর আয়ের দুশ্চিন্তায় পাঁচ মাসের সর্বনিম্নে ঢাকার শেয়ারবাজার
সোমবার ঢাকার শেয়ারবাজার পাঁচ মাসের সর্বনিম্নে নেমে গেছে, ডিএসইএক্স ৫২ পয়েন্ট কমে ৫,৩৩৩ এ বন্ধ হয়েছে, তামাক, ব্যাংকিং আর টেলিকম ব্লু-চিপ শেয়ারে বিক্রির চাপে। ব্রোকারেজ হাউজগুলো এই পতনের পেছনে আয়ের অনিশ্চয়তা, পোশাক খাতের মজুরি আন্দোলন আর মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন-পরবর্তী বৈশ্বিক অস্থিরতাকে দায়ী করছে। টেক্সটাইলই একমাত্র খাত যা বেড়েছে, যদিও একই শিল্পের কারখানাগুলো দেশের অন্য প্রান্তে বন্ধ হচ্ছিল।