পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগ

গ্রামীণফোনের নয় মাসের মুনাফা ৪ শতাংশ কমে ২,১৭১ কোটি টাকা, আয়ের চাপ এখনো আছে

২৭ অক্টোবর, ২০২৬4 মিনিটের পড়া
গ্রামীণফোনের নয় মাসের মুনাফা ৪ শতাংশ কমে ২,১৭১ কোটি টাকা, আয়ের চাপ এখনো আছে

গ্রামীণফোনের তৃতীয় প্রান্তিকের মুনাফা প্রায় অপরিবর্তিত থেকে হয়েছে ৭৫০ কোটি টাকা, আগের বছরের ৭৫১ কোটি টাকা থেকে সামান্যই কম, ২০২৬ সালের আগের দুই প্রান্তিকে আরও তীক্ষ্ণ পতনের পর। নয় মাসের মুনাফা ৪ শতাংশ কমে হয়েছে ২,১৭১ কোটি টাকা, ব্যবস্থাপনা এর পেছনে মূল্যস্ফীতি, ৭০০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রামে বড় বিনিয়োগ ও আগের বছরের কঠিন তুলনার ভিত্তিকে দায়ী করেছে। সংখ্যাগুলো স্থিতিশীল হয়ে আসায় মনে হচ্ছে দুই বছরের আয় পতন তলানিতে পৌঁছাচ্ছে, যদিও স্পষ্ট পুনরুদ্ধার এখনো দেখা যায়নি।

গ্রামীণফোনের মুনাফা এই প্রান্তিকে প্রায় একই জায়গায় থেমে আছে, আর যে কোম্পানি গত দুই বছর ধরে আয় কমতে দেখছিল, তাদের জন্য প্রায় একই জায়গায় থাকাটাই একটু স্বস্তির খবর। ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন বলছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে টেলিকম অপারেটরটির নিট মুনাফা হয়েছে ৭৫০ কোটি টাকা, আগের বছরের ৭৫১ কোটি টাকা থেকে মাত্র ১ কোটি টাকা কম, এত বড় একটা ব্যবসার হিসাবে এটা প্রায় ধরাই যায় না এমন একটা পার্থক্য। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর, এই নয় মাসের মুনাফা হয়েছে ২,১৭১ কোটি টাকা, আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪ শতাংশ কম, আর শেয়ারপ্রতি আয় কমে হয়েছে ১৬.০৮ টাকা, আগের ১৬.৭৭ টাকা থেকে।

  • গ্রামীণফোনের ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের নিট মুনাফা ৭৫০ কোটি টাকা, আগের বছরের ৭৫১ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় অপরিবর্তিত।
  • ২০২৬ সালের নয় মাসের মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ৪ শতাংশ কমে হয়েছে ২,১৭১ কোটি টাকা, শেয়ারপ্রতি আয় কমে ১৬.০৮ টাকা।
  • এই স্থিতিশীল প্রান্তিকের আগে পরপর দুই প্রান্তিকে আরও তীক্ষ্ণ পতন হয়েছিল, প্রথম প্রান্তিকে প্রায় ৬৬১ কোটি টাকা মুনাফা আর দ্বিতীয় প্রান্তিকে ১৪ শতাংশ পতন।
  • জুন শেষে কোম্পানির গ্রাহক সংখ্যা ছিল ৮৬.৩ মিলিয়ন, যার মধ্যে ৫২.৭ মিলিয়ন ছিলেন সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারী।
গ্রামীণফোনের ২০২৬ সালের প্রান্তিক ভিত্তিক নিট মুনাফার বার চার্ট, প্রথম প্রান্তিকে ৬৬১ কোটি টাকা, দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৭৬০ কোটি টাকা এবং তৃতীয় প্রান্তিকে ৭৫০ কোটি টাকা
চার্ট: বিডি ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ, দ্য ডেইলি স্টার ও গ্রামীণফোনের প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে।

দুই কঠিন বছরের পর এখন কিছুটা স্থিতিশীল

কেন ১ কোটি টাকার একটা ছোট পতনকেও ভালো খবর বলা হচ্ছে তা বুঝতে গ্রামীণফোন কোথা থেকে এসেছে সেটা দেখা জরুরি। ২০২৫ সালের পুরো বছরের মুনাফা কমে হয়েছিল ২,৯৬০ কোটি টাকা, আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন, যার জন্য কোম্পানি স্পেকট্রাম খরচ, নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ব্যয়, টাকার অবমূল্যায়ন ও বেশি করের বোঝাকে দায়ী করেছিল। সেই চাপ ২০২৬ সালেও চলেছে, দ্বিতীয় প্রান্তিকের আয় আগের বছরের তুলনায় ৩ শতাংশ কমে হয়েছিল ৩,৯৮০ কোটি টাকা, আর মুনাফা প্রায় ১৪ শতাংশ কমে হয়েছিল ৭৬০ কোটি টাকা, শেয়ারপ্রতি আয় কমে ৫.৬২ টাকা, আগের ৬.৫১ টাকা থেকে। গ্রামীণফোনের চিফ ফিনান্সিয়াল অফিসার অটো রিসব্যাক এই পতনের একটা অংশের পেছনে একটা তুলনামূলক ভিত্তির প্রভাব দেখিয়েছেন, ২০২৫ সালের একই প্রান্তিকে দুটি ঈদ কাছাকাছি সময়ে পড়ায় সাময়িকভাবে ব্যবহার ও আয় বেড়ে গিয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে তৃতীয় প্রান্তিকের ফল যা মূলত আগের বছরের সঙ্গে মিলে গেছে, তা স্থবিরতা নয়, বরং একটা কঠিন তুলনার সময়ের সঙ্গে আয়ের ভিত্তি অবশেষে সমান হয়ে যাওয়ার মতো দেখাচ্ছে।

চাপটা আসছে কোথা থেকে

গ্রামীণফোনের ব্যবস্থাপনা বারবার একই কয়েকটা কারণের দিকে আঙুল তুলেছে। প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি মূল্যস্ফীতি মোবাইল ডেটা ও এয়ারটাইম রিচার্জ সহ পরিবারের খরচে চাপ ফেলেছে। কোম্পানি তার ৭০০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম সম্প্রসারণেও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে যাচ্ছে, যা বছরের মাঝামাঝি নাগাদ ১,০০০টির বেশি সাইটে পৌঁছেছিল, এমন একটা বিনিয়োগ যা বাড়তি আয়ে রূপ নেওয়ার আগেই খরচ বাড়িয়ে দেয়। প্রধান নির্বাহী ইয়াসির আজমান এই পরিস্থিতির জবাবকে পিছিয়ে আসা নয়, বরং শৃঙ্খলা হিসেবে তুলে ধরেছেন, মোট খরচ মাত্র ১.৮ শতাংশ বাড়লেও ইবিআইটিডিএ মার্জিন প্রায় ৫৮ শতাংশে ধরে রাখা গেছে, যাকে তিনি বলেছেন বাড়তি মূলধন বিনিয়োগের পরেও "ধারাবাহিক ব্যয় শৃঙ্খলা ও কার্যকর পরিচালনার" প্রমাণ। রিসব্যাক আবার গ্রাহক বৃদ্ধি ও বাড়তে থাকা ডেটা ব্যবহারকে মূল ব্যবসা সুস্থ থাকার লক্ষণ হিসেবে দেখিয়েছেন, বলেছেন আয়ের এই মন্থর গতির মধ্যেও গ্রামীণফোন ঋণমুক্ত আর শক্তিশালী নগদ প্রবাহ নিয়েই থেকেছে।

গ্রামীণফোনের সিএফও অটো রিসব্যাক বলেছেন, গ্রাহক বৃদ্ধি ও বাড়তি ডেটা ব্যবহার ভালো মৌলিক অবস্থার লক্ষণ, আর কোম্পানি এই সময়ে "ঋণমুক্ত ও শক্তিশালী নগদ প্রবাহ নিয়ে" থেকেছে।

স্থিতিশীল প্রান্তিক লভ্যাংশের জন্য কী বোঝায়

গ্রামীণফোন ঐতিহাসিকভাবে তার মুনাফার প্রায় পুরোটাই লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণ করে এসেছে, আর ডিএসইর সবচেয়ে বড় টেলিকম শেয়ারটি যারা নজরে রাখছেন তারা এই ফলাফলকে মূলত পরের লভ্যাংশের সংকেত হিসেবেই দেখবেন। কোম্পানি ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের পর অন্তর্বর্তী নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল ১০৫ শতাংশ, যা সেই সময়ের পুরো মুনাফার সমান, আর ২০২৫ সালের পুরো বছরের লভ্যাংশ এসেছিল ২১৫ শতাংশে, ২০২৪ সালের ৩৩০ শতাংশ থেকে বড় পতন। নয় মাসের মুনাফা মাত্র ৪ শতাংশ কমা, যেখানে প্রথমার্ধে পতন হয়েছিল ৬ শতাংশ, এটা বলে দেয় ক্ষয়ের গতি উল্টে যাচ্ছে না বরং ধীর হয়ে আসছে, যা এমন একটা শেয়ারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যার আকর্ষণ সবসময়ই প্রবৃদ্ধির চেয়ে নির্ভরযোগ্য নগদ লভ্যাংশের ওপর নির্ভর করেছে।

আপনার জন্য এর মানে কী

গ্রামীণফোনের গ্রাহকদের জন্য এই ফলাফল স্বল্প মেয়াদে বিশেষ কিছু বদলায় না, দাম নির্ধারণ ও নেটওয়ার্ক বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত এক প্রান্তিকের আয়ের হিসাব না দেখেই নিজের মতো এগোয়। যারা ডিএসই ব্রোকারেজ অ্যাকাউন্ট, মিউচুয়াল ফান্ড বা অবসর তহবিলের মাধ্যমে গ্রামীণফোনের শেয়ার ধরে রেখেছেন, তাদের জন্য বেশি কাজের সংকেত হলো, গত দুই বছরের তীক্ষ্ণ আয় পতন তলানিতে পৌঁছাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, যদিও সংখ্যায় এখনো পুরো পুনরুদ্ধার দেখা যাচ্ছে না। টেলিকম খাত এই কঠিন সময় পার করার সময় সঞ্চয় অন্য কোথায় রাখা যায় তা তুলনা করতে চাইলে বিনিয়োগকারীরা বর্তমান স্থায়ী আমানতের বিকল্পগুলো দেখে নিতে পারেন এফডিআর রেট তুলনা টুল দিয়ে।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

নয় মাসের আয় মৌসুমে ব্যাংক এশিয়ার মুনাফা ৩৪ শতাংশ লাফ দিল, সিটি ব্যাংকের স্থির ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি

ব্যাংক এশিয়ার জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর নিট মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭২ কোটি টাকায়, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নয় মাসের আয় মৌসুমে সিটি ব্যাংকের তুলনামূলক স্থির ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে ৮৬৭.৩৮ কোটি টাকা ছাড়িয়ে। ব্যাংক এশিয়ার প্রবৃদ্ধির পেছনে ছিল গ্রাহক আমানতে ১৯ শতাংশ লাফ আর খেলাপি ঋণের উন্নত হার, আবার সিটি ব্যাংকের বড় মুনাফার ভিত্তি কম শতাংশ প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও প্রকৃত টাকার অঙ্কে বেশি যোগ করেছে। এই তুলনা এ বছর ব্যাংকগুলোর মুনাফা আসলে কী চালাচ্ছে তার একটি জানালা খুলে দেয়।

ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ২০২০ সালের পর প্রথমবার ২০ টাকার নিচে, লোকসান বাড়ছে

রবিবার ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের শেয়ার নেমে এসেছে ১৯.৫০ টাকায়, যা ২০২০ সালের পর সবচেয়ে কম, ব্যাংকটি নয় মাসে প্রায় ৩,২৮৬ কোটি টাকা লোকসানের তথ্য প্রকাশ করার পর। শ্রেণীকৃত ঋণ এখন ব্যাংকের মোট ঋণ বিতরণের ৫১ শতাংশ, আর নিয়ন্ত্রকদের চাহিদার তুলনায় ব্যাংক মাত্র সামান্য অংশই প্রভিশন রেখেছে। এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ শেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংক বোর্ড ভেঙে দেওয়ার দুই বছরের বেশি সময় পরও এই দরপতন দেখাচ্ছে পরিষ্কারের কাজ এখনো কতটা বাকি।

পোশাক শ্রমিক অসন্তোষ আর আয়ের দুশ্চিন্তায় পাঁচ মাসের সর্বনিম্নে ঢাকার শেয়ারবাজার

সোমবার ঢাকার শেয়ারবাজার পাঁচ মাসের সর্বনিম্নে নেমে গেছে, ডিএসইএক্স ৫২ পয়েন্ট কমে ৫,৩৩৩ এ বন্ধ হয়েছে, তামাক, ব্যাংকিং আর টেলিকম ব্লু-চিপ শেয়ারে বিক্রির চাপে। ব্রোকারেজ হাউজগুলো এই পতনের পেছনে আয়ের অনিশ্চয়তা, পোশাক খাতের মজুরি আন্দোলন আর মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন-পরবর্তী বৈশ্বিক অস্থিরতাকে দায়ী করছে। টেক্সটাইলই একমাত্র খাত যা বেড়েছে, যদিও একই শিল্পের কারখানাগুলো দেশের অন্য প্রান্তে বন্ধ হচ্ছিল।