অর্থনীতি ও নীতি

বাংলাদেশের উন্নয়ন ব্যয় নামল ১৭ বছরের সর্বনিম্নে, এ বছরের এডিপির মাত্র ৩.৮৯ শতাংশ খরচ হয়েছে

২৬ অক্টোবর, ২০২৬3 মিনিটের পড়া
বাংলাদেশের উন্নয়ন ব্যয় নামল ১৭ বছরের সর্বনিম্নে, এ বছরের এডিপির মাত্র ৩.৮৯ শতাংশ খরচ হয়েছে

বাংলাদেশ চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মাত্র ৩.৮৯ শতাংশ খরচ করেছে, যা ১৭ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ধীরগতির শুরু। স্বাস্থ্য, নির্মাণ ও পরিবহন প্রকল্প সবচেয়ে পিছিয়ে, আর অর্থনীতিবিদরা বলছেন গতি না বাড়লে প্রবৃদ্ধি ও বেসরকারি বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

চলতি ২০২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সরকারি সংস্থাগুলো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দের মাত্র ৩.৮৯ শতাংশ খরচ করতে পেরেছে, যা গত ১৭ বছরের মধ্যে কোনো অর্থবছরের সবচেয়ে ধীরগতির শুরু। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) ২৫ অক্টোবর প্রকাশিত এই তথ্য বলছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সরকার রাস্তা, হাসপাতাল, বিদ্যুৎকেন্দ্র আর অন্যান্য প্রকল্পের জন্য প্রতি ১০০ টাকা বরাদ্দ দিলেও বাস্তবে মাটিতে পৌঁছেছে ৪ টাকার কমও।

  • জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো পুরো বছরের এডিপি থেকে খরচ করেছে ১২,০১৭ কোটি টাকা, বরাদ্দের ৩.৮৯ শতাংশ।
  • এটি গত ১৭ বছরের মধ্যে প্রথম প্রান্তিকের সবচেয়ে কম বাস্তবায়ন হার, গত বছরের ৫.০৯ শতাংশ, ২০২৫ অর্থবছরের ৪.৭৫ শতাংশ আর ২০২৪ অর্থবছরের ৭.৫ শতাংশের চেয়েও কম।
  • মেডিকেল এডুকেশন অ্যান্ড ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার বিভাগ তার বরাদ্দের মাত্র ১.৮৬ শতাংশ খরচ করেছে, আর স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ খরচ করেছে ১.৭৮ শতাংশ।
  • অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই ধীরগতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে নির্মাণ, সিমেন্ট আর পরিবহন খাতের সঙ্গে জড়িত ব্যবসা।

প্রথম প্রান্তিক সাধারণত এগিয়ে থাকে, থমকে যায় না

বাংলাদেশের অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এমনিতেই খরচ কম হয়, কারণ চুক্তি সই, টেন্ডার আর সাইট প্রস্তুতিতে সময় লাগে। তবু আইএমইডির তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরের অস্থিরতার আগে জুলাই-সেপ্টেম্বরের বাস্তবায়ন হার সাধারণত ৭ শতাংশের ওপরে থাকত। ২০২৩ অর্থবছরে এই হার ছিল ৮.৫৫ শতাংশ, ২০২৪ অর্থবছরে ৭.৫ শতাংশ। তারপর থেকে প্রতি বছর এই হার আরও নিচে নেমেছে, আর এই বছর নেমেছে সবচেয়ে বেশি।

টাকা কেন নড়ছে না

একটা প্রকল্পের টাকা মাটিতে পৌঁছাতে অনেকগুলো মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন, ক্রয় প্রক্রিয়া আর অর্থ ছাড়ের ধাপ পার হতে হয়। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বলছেন, সাম্প্রতিক এই সংখ্যাগুলো একটা নির্দিষ্ট সরকারের চেয়ে বড় সমস্যার দিকেই আঙুল তুলছে।

"বাস্তবায়ন সক্ষমতায় যে উন্নতি হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি," বলেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান।

রহমান বলছেন, এখনকার গতি এমনকি ২০২৪ সালের আগস্টের পরের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের চেয়েও ধীর, যে সময়টায় মন্ত্রণালয়ের বিশৃঙ্খলা আর প্রশাসনিক পুনর্গঠনকে ২০২৫ আর ২০২৬ অর্থবছরের মন্থরতার জন্য দায়ী করা হতো। নতুন নির্বাচিত সরকার তার প্রথম পূর্ণ প্রান্তিকেই এই ধারা ঘুরাতে পারেনি, এতে বোঝা যায় সমস্যাটা শীর্ষ পর্যায়ে নয়, বরং প্রকল্প অফিস আর ক্রয় ইউনিটের মতো জায়গায়, যেখান থেকে আসলে টাকা ছাড় হয়।

কোন খাত পিছিয়ে

স্বাস্থ্য খাত এই প্রান্তিকের সবচেয়ে দুর্বল খরচকারীদের একটি। মেডিকেল এডুকেশন অ্যান্ড ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার বিভাগ তার বরাদ্দের মাত্র ১.৮৬ শতাংশ ছাড় করতে পেরেছে, আর স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ ১.৭৮ শতাংশ, যা আইএমইডির হিসাবে সবচেয়ে কম বাস্তবায়ন হারের মধ্যে পড়ে। সরকারি বিনিয়োগ সরাসরি প্রভাব ফেলে সরকারি চুক্তির সঙ্গে জড়িত বেসরকারি খাতেও। নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, সিমেন্ট কোম্পানি আর পরিবহন ব্যবসা প্রকল্পের কাজ চালিয়ে নিতে নিয়মিত অর্থ ছাড়ের ওপর নির্ভর করে, আর বিদ্যুৎ ও পরিবহন প্রকল্পে দেরি হলে পরবর্তী পর্যায়ের ব্যবসাগুলোর খরচ বেড়ে যায়।

অর্থনীতিবিদরা যা বলছেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক মোহাম্মদ দীন ইসলাম বলছেন, এই ধীর শুরুর প্রভাব নির্মাণ খাতের বাইরেও ছড়াবে। সরকারি ব্যয় কম হলে অর্থনীতিতে সামগ্রিক চাহিদা কমে যায়, এমন এক সময়ে যখন প্রবৃদ্ধির জন্য সহায়তা দরকার, আর প্রকল্পে দেরি হলে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরাও পিছিয়ে যান, কারণ তারা প্রায়ই নিজের পুঁজি ঢালার আগে সরকারি অবকাঠামো প্রস্তুত হতে দেখতে চান।

"বাস্তবায়নে দুর্বলতা বেসরকারি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করতে পারে, আর প্রকল্পে দেরি হলে খরচ বাড়ে, সুফল কমে," বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক মোহাম্মদ দীন ইসলাম।

ইসলাম নতুন সরকারকে এই ধারা দ্রুত ঘুরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, কারণ তার মতে প্রকল্প যত দিন অসমাপ্ত থাকে, খরচ তত বাড়তে থাকে। থমকে থাকা চুক্তিতে দাম বৃদ্ধি, বিদেশি অর্থায়নে চলা প্রকল্পের মেয়াদ বাড়া আর অসমাপ্ত অবকাঠামোর কারণে উৎপাদনশীলতা হারানো, সব মিলিয়ে পুরো অর্থবছরে এই ক্ষতি জমতে থাকে।

বার চার্টে ২০২৩ থেকে ২০২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের এডিপি খরচের হার দেখানো হয়েছে, যা ৮.৫৫ শতাংশ থেকে নেমে ৩.৮৯ শতাংশে এসেছে
চার্ট: বিডি ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ, তথ্যসূত্র বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)।

আপনার জন্য এর মানে কী

এডিপির ধীর শুরু এই সপ্তাহেই কারও ব্যাংক হিসাবে প্রভাব ফেলবে না, কিন্তু মাসের পর মাস ধরে এর প্রভাব অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। আপনি যদি সরকারি চুক্তির সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যবসা চালান, নির্মাণ বা পরিবহন খাতে কাজ করেন, বা আপনার এলাকায় বিদ্যুৎ ও পরিবহন উন্নয়নের অপেক্ষায় থাকেন, তাহলে দুর্বল প্রথম প্রান্তিক একটা আগাম সংকেত, যে অর্থ ছাড় আর তার পেছনের সাবকন্ট্রাক্ট ও পেমেন্ট বছরের পরের দিকে জমে যেতে পারে, বা পরের বছরে গিয়ে পড়তে পারে। সঞ্চয়কারী আর বিনিয়োগকারীদের জন্য ধীর সরকারি ব্যয় বলছে, নির্মাণ-সংশ্লিষ্ট খাতে একলাফে বড় বাজি না রেখে বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগ রাখা ভালো। প্রবৃদ্ধির ছবি স্পষ্ট হওয়ার আগে অতিরিক্ত টাকা কোথায় রাখবেন, সেটা বুঝতে সাইটের এফডিআর রেট তুলনা টুল দেখে নিতে পারেন।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

এশিয়ার ভেস্তে যাওয়া এলএনজি প্রকল্প নিয়ে আইইইএফএর নতুন প্রতিবেদন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ভর্তুকির জন্য কী বার্তা দিচ্ছে

আইইইএফএর নতুন এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২১ সাল থেকে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডে প্রস্তাবিত এলএনজি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আমদানি টার্মিনালের অর্ধেকের বেশি, মোট ৬৭.৮ বিলিয়ন ডলার মূল্যের, বাতিল বা থমকে গেছে। আমদানি করা প্রতি ঘনমিটার গ্যাসে বাংলাদেশ এখন ৬০ টাকার বেশি ভর্তুকি দেয়, প্রতিবেদন বলছে এশিয়ার স্পট এলএনজি দাম তিনগুণ হওয়া এবং এলএনজি কেন্দ্রের জীবনকালীন বিদ্যুৎ খরচ ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার কারণে এই চাপ আরও বাড়তে পারে। আইইইএফএর বাংলাদেশ বিশ্লেষক আরও এলএনজি বিনিয়োগের বদলে দেশীয় গ্যাস, দক্ষতা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝোঁকার আহ্বান জানিয়েছেন।

এক দশকে প্রায় তিনগুণ, বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ পৌঁছাল ১১৪ বিলিয়ন ডলারের কাছে

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ঋণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ প্রায় ১১৩.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা এক দশক আগের ৩৮ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় তিনগুণ। রপ্তানি আয়ের ১৬ শতাংশই এখন ঋণ পরিশোধে চলে যাচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, রপ্তানি যদি মূলত পোশাকের উপর নির্ভরশীল থাকে, তাহলে এই হার দ্রুত আরও খারাপ হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের তুলনা অনুযায়ী, রপ্তানির সাপেক্ষে বাংলাদেশের ঋণের চাপ এখন ভারতের দ্বিগুণেরও বেশি। শ্রীলঙ্কার মতো ঋণ সংকট এড়াতে অর্থনীতিবিদরা আরও ঋণের বদলে ভালো শর্তের ঋণ, বৃহত্তর রপ্তানি ভিত্তি এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছেন।

বাপেক্স নোয়াখালীতে আবার গ্যাস পেল, ৫,৮০৯ কোটি টাকার মজুদ যা বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট কিছুটা কমাতে পারে

২ নভেম্বর নোয়াখালীর সুন্দলপুর সাউথ-১ কূপে বাপেক্স গ্যাস নিশ্চিত করেছে, এক মাসের মধ্যে একই ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সন্ধান, যার মজুদ আনুমানিক ৯৭.৬৯ বিলিয়ন ঘনফুট। বাংলাদেশের মোট গ্যাসের প্রয়োজনের তুলনায় এই সন্ধান অতি ক্ষুদ্র, কিন্তু এটা এমন সময়ে এলো যখন দেশীয় সরবরাহ কমতেই থাকছে আর ২০১৮ সাল থেকে দেশের এলএনজি আমদানির বিল ২.৭৭ ট্রিলিয়ন টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই ধরনের ছোট সন্ধান কেন এখনো গুরুত্বপূর্ণ তা জেনে নিন।