বাপেক্স নোয়াখালীতে আবার গ্যাস পেল, ৫,৮০৯ কোটি টাকার মজুদ যা বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট কিছুটা কমাতে পারে
২ নভেম্বর নোয়াখালীর সুন্দলপুর সাউথ-১ কূপে বাপেক্স গ্যাস নিশ্চিত করেছে, এক মাসের মধ্যে একই ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সন্ধান, যার মজুদ আনুমানিক ৯৭.৬৯ বিলিয়ন ঘনফুট। বাংলাদেশের মোট গ্যাসের প্রয়োজনের তুলনায় এই সন্ধান অতি ক্ষুদ্র, কিন্তু এটা এমন সময়ে এলো যখন দেশীয় সরবরাহ কমতেই থাকছে আর ২০১৮ সাল থেকে দেশের এলএনজি আমদানির বিল ২.৭৭ ট্রিলিয়ন টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই ধরনের ছোট সন্ধান কেন এখনো গুরুত্বপূর্ণ তা জেনে নিন।
রাষ্ট্রীয় অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠান বাপেক্স সোমবার নোয়াখালীতে একটা নতুন গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান নিশ্চিত করেছে, মাসের পর মাস খনন কাজের পর সুন্দলপুর সাউথ-১ কূপে আগুন জ্বালিয়ে গ্যাসের উপস্থিতি প্রমাণ করা হয়। একই গ্যাসক্ষেত্রে এক মাসের মধ্যে এটা দ্বিতীয় সন্ধান, আর কর্মকর্তারা আশা করছেন এটা শেষ পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে দিনে প্রায় ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে। বাংলাদেশের মোট দৈনিক গ্যাসের প্রয়োজনের তুলনায় এই সংখ্যা ছোট, কিন্তু ২০১৮ সাল থেকে দেশীয় সরবরাহের ফাঁক পূরণ করতে এলএনজি আমদানিতে প্রায় ২.৭৭ ট্রিলিয়ন টাকা খরচ করা একটা দেশের জন্য, প্রতিটা নতুন কূপের গুরুত্ব তার আকারের চেয়ে অনেক বেশি।
মূল বিষয়গুলো এক নজরে
- বাপেক্স ২ নভেম্বর নোয়াখালীর সুন্দলপুর সাউথ-১ কূপে গ্যাস নিশ্চিত করেছে, যার মজুদ দুটো গ্যাস স্তরে মিলিয়ে আনুমানিক ৯৭.৬৯ বিলিয়ন ঘনফুট, বর্তমান ভোক্তা মূল্যে যার আনুমানিক মূল্য ৫,৮০৯ কোটি টাকা।
- এক মাসের মধ্যে এটা সুন্দলপুর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় গ্যাস সন্ধান, এর আগে ৬ অক্টোবর সুন্দলপুর-৪ কূপে গ্যাস পাওয়া যায়, যার আনুমানিক উৎপাদন দিনে প্রায় ৭ মিলিয়ন ঘনফুট।
- জাতীয় গ্রিডে দেশীয় গ্যাস সরবরাহ ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ৯৬৫ বিলিয়ন ঘনফুট থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৬২৮ বিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে, যদিও মোট চাহিদা প্রায় একই রয়ে গেছে।
- বাংলাদেশ ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানিতে প্রায় ২.৭৭ ট্রিলিয়ন টাকা খরচ করেছে, আর আমদানি করা গ্যাস সাশ্রয়ী রাখতে ৪৮,০০০ কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হয়েছে।
আসলে কী পাওয়া গেল
বাপেক্স কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রামপুর ইউনিয়নে সুন্দলপুর সাউথ-১ কূপের খনন শুরু করে ৮ জুলাই, তাদের বিজয়-১০ রিগ ব্যবহার করে, আর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের করানো আগের একটা ত্রিমাত্রিক সাইসমিক জরিপের ভিত্তিতে প্রায় ৩,২৮৯ মিটার গভীরতায় পৌঁছায়। ২ নভেম্বর খনন দল কূপের মুখে গ্যাস জ্বালিয়ে এর উপস্থিতি নিশ্চিত করে। প্রকল্পের খনন ইনচার্জ রাকিবুল হাসান বলেন, অতিরিক্ত তাপের কারণে আগুন নিভিয়ে দিতে হয়েছিল আর ফায়ার সার্ভিসের উপস্থিতিতে আবার তা জ্বালানো হবে। প্রাথমিক হিসাবে মজুদ দুটো গ্যাস স্তরে মিলিয়ে ৯৭.৬৯ বিলিয়ন ঘনফুট, বর্তমান ভোক্তা মূল্যে যার মূল্য প্রায় ৫,৮০৯ কোটি টাকা, কর্মকর্তারা আশা করছেন শেষ পর্যন্ত দিনে প্রায় ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট প্রবাহ পাওয়া যাবে আর প্রায় ২০ বছর ধরে উৎপাদন সম্ভব হবে, আগামী দুই সপ্তাহে একটা ড্রিল স্টেম টেস্ট দিয়ে আসল প্রবাহের হার নিশ্চিত করা আর তেলের উপস্থিতি নাকচ করার অপেক্ষায়।
| কূপ | সন্ধানের তারিখ | আনুমানিক উৎপাদন | মজুদের পরিমাণ |
|---|---|---|---|
| সুন্দলপুর-৪ | ৬ অক্টোবর, ২০২৬ | দিনে প্রায় ৭ মিলিয়ন ঘনফুট | আলাদাভাবে প্রকাশিত নয় |
| সুন্দলপুর সাউথ-১ | ২ নভেম্বর, ২০২৬ | দিনে প্রায় ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট (ডিএসটি পর্যন্ত অপেক্ষা) | ৯৭.৬৯ বিলিয়ন ঘনফুট (প্রায় ৫,৮০৯ কোটি টাকা) |
১৫ মিলিয়ন ঘনফুটের কূপ কেন এখনো গুরুত্বপূর্ণ
এককভাবে দিনে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট বাংলাদেশের জাতীয় গ্যাস প্রবাহের তুলনায় সামান্যই, যা সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী দিনে প্রায় ২,৪৪০ মিলিয়ন ঘনফুট, রিগ্যাসিফায়েড এলএনজি আর দেশীয় ক্ষেত্রের মধ্যে ভাগ হয়ে। নতুন দেশীয় সন্ধানকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে মূল প্রবণতার দিক। জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা দেশীয় গ্যাস ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ৯৬৫ বিলিয়ন ঘনফুট থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৬২৮ বিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে, সাত বছরে ৩৩৭ বিলিয়ন ঘনফুট কমে, যদিও এই সময়ে মোট সরবরাহে এলএনজির অংশ ১১ শতাংশ থেকে প্রায় ৩৬ শতাংশে উঠেছে। অনুসন্ধান এই পতনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি, ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশজুড়ে মাত্র ৩৮টা নতুন কূপ খনন হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র প্রায় ১০টা আসল অনুসন্ধান কূপ, বাকিগুলো মূল্যায়ন বা মেরামত কাজের কূপ, যা ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০টা নতুন কূপের ২০২২ সালের লক্ষ্যের চেয়ে অনেক কম। ১৫০টা কূপের নতুন লক্ষ্য এখন ২০৩২ সাল পর্যন্ত সময় নিতে পারে।
এই ফাঁক এলএনজি দিয়ে পূরণ করা হয়েছে, আর তা সস্তা হয়নি। বাংলাদেশ ২০১৮ সালে আমদানি শুরু করার পর থেকে এলএনজি আমদানিতে আনুমানিক ২.৭৭ ট্রিলিয়ন টাকা খরচ করেছে, আর ভোক্তা ও শিল্পের জন্য আমদানি করা জ্বালানি সাশ্রয়ী রাখতে এই সময়ে ৪৮,০০০ কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হয়েছে। আমদানির পরিমাণ তার পরেও বাড়তেই থাকছে, কাতারএনার্জি, ওকিউ ট্রেডিং আর এক্সেলারেট এনার্জির সঙ্গে নতুন সরবরাহ চুক্তি কার্যকর হওয়ায় শুধু ২০২৬ সালেই দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারীদের কার্গো আগের বছরের ৫৬ থেকে ৮৬-তে, অর্থাৎ ৫৩ শতাংশের বেশি বাড়ার কথা। সুন্দলপুরের মতো ক্ষেত্র থেকে বাপেক্স যত ঘনফুট যোগ করতে পারবে, তা কার্যত বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজারে অনেক বেশি দামে কিনতে হবে না এমন ঘনফুট।
"খনন শেষ হওয়ার পর কূপে আগুন জ্বালিয়ে আমরা গ্যাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছি," বলেন সুন্দলপুর সাউথ-১ প্রকল্পের বাপেক্সের খনন ইনচার্জ রাকিবুল হাসান।
আপনার জন্য এর মানে কী
পরিবারের জন্য, দেশীয় গ্যাসের ছোট ছোট সন্ধানের একটা ধারাবাহিক প্রবাহ এককভাবে নিকট ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ বা রান্নার গ্যাসের বিল কমিয়ে দিবে না, কারণ জড়িত পরিমাণ মোট জাতীয় চাহিদার তুলনায় অতি ক্ষুদ্র, আর যেকোনো নতুন সরবরাহ গ্রিডে পৌঁছানোর আগে মাসের পর মাস পরীক্ষা আর পাইপলাইন সংযোগ প্রয়োজন। বেশি গুরুত্বপূর্ণ সংকেতটা দীর্ঘমেয়াদি, বাংলাদেশ দেশীয়ভাবে যে প্রতি বিলিয়ন ঘনফুট উৎপাদন করে, তা এমন এক বিলিয়ন ঘনফুট যা এলএনজির দামে আমদানি করতে হয় না, যা শেষ পর্যন্ত সরকারের বাজেটের মাধ্যমে বহন করা ভর্তুকির বিলে, আর পরোক্ষভাবে কর ও জ্বালানি মূল্যে প্রভাব ফেলে। ব্যবসার জন্য, বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্যাস বরাদ্দ কমানো আর লোডশেডিংয়ের সঙ্গে মোকাবিলা করা জ্বালানি-নিবিড় উৎপাদকদের জন্য, ছোট পরিমাণেও হলেও দেশীয় অনুসন্ধানে অব্যাহত সাফল্য হলো সেই কয়েকটা হাতিয়ারের একটা যা পুরোপুরি অস্থির আন্তর্জাতিক এলএনজি স্পট মূল্যের ওপর নির্ভর না করে সরবরাহের চাপ কমাতে পারে।
মূল কথা
সুন্দলপুর সাউথ-১ এর সন্ধান একাই বাংলাদেশের জ্বালানি ভারসাম্য বদলে দিবে না, আর এর মজুদ আসল প্রবাহের হার নিশ্চিত হওয়ার আগে একটা ড্রিল স্টেম টেস্ট পার হতে হবে। কিন্তু একই মাসে একই ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সন্ধান হিসেবে, দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়া, লক্ষ্যের চেয়ে কম খনন আর লাখ কোটি টাকায় পৌঁছানো এলএনজি আমদানির বিলের প্রেক্ষাপটে, এটা একটা ছোট মনে করিয়ে দেওয়া যে বাংলাদেশের গ্যাসের গল্প এখনো মাটির নিচে লেখা হচ্ছে, শুধু আমদানি চুক্তিতে নয়।
তথ্যসূত্র
এরপর পড়ুন
এশিয়ার ভেস্তে যাওয়া এলএনজি প্রকল্প নিয়ে আইইইএফএর নতুন প্রতিবেদন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ভর্তুকির জন্য কী বার্তা দিচ্ছে
আইইইএফএর নতুন এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২১ সাল থেকে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডে প্রস্তাবিত এলএনজি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আমদানি টার্মিনালের অর্ধেকের বেশি, মোট ৬৭.৮ বিলিয়ন ডলার মূল্যের, বাতিল বা থমকে গেছে। আমদানি করা প্রতি ঘনমিটার গ্যাসে বাংলাদেশ এখন ৬০ টাকার বেশি ভর্তুকি দেয়, প্রতিবেদন বলছে এশিয়ার স্পট এলএনজি দাম তিনগুণ হওয়া এবং এলএনজি কেন্দ্রের জীবনকালীন বিদ্যুৎ খরচ ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার কারণে এই চাপ আরও বাড়তে পারে। আইইইএফএর বাংলাদেশ বিশ্লেষক আরও এলএনজি বিনিয়োগের বদলে দেশীয় গ্যাস, দক্ষতা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝোঁকার আহ্বান জানিয়েছেন।
এক দশকে প্রায় তিনগুণ, বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ পৌঁছাল ১১৪ বিলিয়ন ডলারের কাছে
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ঋণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ প্রায় ১১৩.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা এক দশক আগের ৩৮ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় তিনগুণ। রপ্তানি আয়ের ১৬ শতাংশই এখন ঋণ পরিশোধে চলে যাচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, রপ্তানি যদি মূলত পোশাকের উপর নির্ভরশীল থাকে, তাহলে এই হার দ্রুত আরও খারাপ হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের তুলনা অনুযায়ী, রপ্তানির সাপেক্ষে বাংলাদেশের ঋণের চাপ এখন ভারতের দ্বিগুণেরও বেশি। শ্রীলঙ্কার মতো ঋণ সংকট এড়াতে অর্থনীতিবিদরা আরও ঋণের বদলে ভালো শর্তের ঋণ, বৃহত্তর রপ্তানি ভিত্তি এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছেন।
বাংলাদেশের তিন বছরের এলডিসি রেহাই এসেছে ছয়টি কাজের তালিকা নিয়ে, শুরুতেই নগদ প্রণোদনা
জাতিসংঘ বাংলাদেশকে এলডিসি বাণিজ্য সুবিধা হারানোর আগে আরও তিন বছর সময় দিয়েছে, কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন এই বাড়তি সময় শেষ ও শর্তসাপেক্ষ। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি থেকে রপ্তানি নগদ প্রণোদনা তুলে নেওয়া পর্যন্ত ছয়টি কাজের তালিকায় এখন জুড়ে গেছে ২০২৯ সালের কঠোর সময়সীমা।