ব্যাংকিং ও এফডিআর

ব্যাংকগুলো একের পর এক যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২,০০০ কোটি টাকার ফ্রোজেন ফুড তহবিলে

৮ নভেম্বর, ২০২৬4 মিনিটের পড়া
ব্যাংকগুলো একের পর এক যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২,০০০ কোটি টাকার ফ্রোজেন ফুড তহবিলে

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২,০০০ কোটি টাকার ফ্রোজেন ফুড রপ্তানি তহবিলে নভেম্বরের শুরু থেকে এক সপ্তাহের মধ্যেই চারটি ব্যাংক যুক্ত হয়েছে। চিংড়ি, মাছ ও অন্যান্য হিমায়িত খাদ্যপণ্যের উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের জন্য এই তহবিল থেকে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুবিধাজনক সুদে ঋণ দেওয়া হবে। মার্কেন্টাইল ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক এবং কমিউনিটি ব্যাংক ইতিমধ্যে চুক্তিতে সই করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় নতুন ক্রেতা খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছেন রপ্তানিকারকরা, এমন সময়েই এই উদ্যোগ এল।

হিমায়িত খাদ্যপণ্য রপ্তানিকারকদের জন্য সস্তা ঋণ দেওয়ার লক্ষ্যে এক সপ্তাহের মধ্যেই চতুর্থ একটি ব্যাংককে যুক্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পশ্চিমের বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় সংকটে থাকা এই খাতকে সহায়তা দিতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগ। সর্বশেষ মার্কেন্টাইল ব্যাংক ২,০০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পে যুক্ত হয়ে ঢাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে চুক্তিতে সই করেছে, এর আগে এনআরবিসি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক ও কমিউনিটি ব্যাংকও একই ধরনের চুক্তি করেছে।

  • বাংলাদেশ ব্যাংকের ২,০০০ কোটি টাকার তহবিলে এখন অন্তত চারটি ব্যাংক যুক্ত আছে, মার্কেন্টাইল, এনআরবিসি, আইএফআইসি ও কমিউনিটি ব্যাংক, সবগুলোই ১ নভেম্বরের পর থেকে চুক্তি করেছে।
  • এই প্রকল্পের অধীনে ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ, যা সাধারণ বাণিজ্যিক ঋণের চেয়ে অনেক কম।
  • কাঁচামাল কেনা, কোল্ড স্টোরেজ, প্রসেসিং প্ল্যান্ট আধুনিকায়ন এবং বন্ধ বা আংশিক চালু কারখানা পুনরায় চালু করার কাজে এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে।
  • যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো প্রধান ক্রেতা বাজারে চিংড়ি ও মাছ রপ্তানিকারকরা চাহিদা কমে যাওয়ার কথা জানানোর পরই এই উদ্যোগ এসেছে।

সংকটে থাকা একটি খাতের জন্য তহবিল

মূলত চাষের চিংড়ি, ইলিশ ও অন্যান্য মাছের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের হিমায়িত খাদ্য খাত গত দুই বছরে তার দুই প্রধান বাজারে ধীরগতি দেখেছে। এই বছরের বিভিন্ন প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে চাহিদা কমে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে, যার ফলে কিছু রপ্তানিকারক দক্ষিণ আফ্রিকার মতো নতুন বাজারের দিকে ঝুঁকছেন। যে প্রসেসিং প্ল্যান্টগুলো একসময় প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় চলত, সেগুলো এখন উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে, এবং কিছু ছোট কারখানা দীর্ঘ সময়ের জন্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

২,০০০ কোটি টাকার এই তহবিল আসলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি চেষ্টা, যাতে এই সক্ষমতা হারিয়ে না যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি ঋণ না দিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে কাজ করছে, যারা চুক্তিতে সই করার পর রপ্তানিকারক, প্রসেসর এবং এই খাতের উদ্যোক্তাদের কাছে অর্থ বিতরণ করবে।

চার ব্যাংক, চার চুক্তি, এক মাস

আইএফআইসি ব্যাংক সবার আগে এগিয়ে এসে ১ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠানে চুক্তিতে সই করে। দুই দিন পর এনআরবিসি ব্যাংকও একই কাজ করে। এই সপ্তাহান্তে জানানো মার্কেন্টাইল ব্যাংকের চুক্তিটি এই তালিকার সর্বশেষ সংযোজন, যার আগে কমিউনিটি ব্যাংকও যুক্ত হয়েছিল। প্রতিটি সইয়ের ধরন প্রায় একই রকম ছিল, বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিভাগের পরিচালক একেএম সাইদুজ্জামান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে সই করেছেন, আর নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

ব্যাংকচুক্তি সইপ্রতিবেদন প্রকাশ
আইএফআইসি ব্যাংক১ নভেম্বর, ২০২৬২ নভেম্বর, ২০২৬
এনআরবিসি ব্যাংকনভেম্বরের শুরুর দিকে৩ নভেম্বর, ২০২৬
মার্কেন্টাইল ব্যাংকনভেম্বরের শুরুর দিকে৮ নভেম্বর, ২০২৬
কমিউনিটি ব্যাংকনভেম্বরের শুরুর দিকেনভেম্বর, ২০২৬

অর্থ কোন কাজে ব্যবহার হবে

এখন পর্যন্ত জানানো শর্তগুলো থেকে বোঝা যায়, এটি একটি বেশ বিস্তৃত প্রকল্প। হিমায়িত চিংড়ি, মাছ, অন্যান্য মৎস্যজাত পণ্য এবং সাধারণভাবে হিমায়িত খাদ্য উৎপাদন, প্রসেসিং এবং রপ্তানির সঙ্গে জড়িত উদ্যোক্তারা এই ঋণের জন্য যোগ্য। কাঁচামাল কেনা, বাণিজ্যিক চাষ, প্রসেসিং স্থাপনা ও যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন, কোল্ড স্টোরেজ তৈরি বা উন্নয়ন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, বন্ধ বা কম সক্ষমতায় চলা কারখানা পুনরায় চালু করার কাজে এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে। সর্বোচ্চ ৭ শতাংশের এই সুদের হার ছোট ও মাঝারি আকারের অনেক রপ্তানিকারক সাধারণত চলতি মূলধনের জন্য যে হারে ঋণ পান, তার চেয়ে কয়েক পয়েন্ট কম।

রপ্তানিকারক, চাষি এবং ঋণগ্রহীতাদের জন্য এর মানে কী

যে রপ্তানিকারকের গুদামে অবিক্রিত মাল পড়ে আছে বা যার কোল্ড স্টোরেজ অর্ধেক সক্ষমতায় চলছে, তার জন্য ৭ শতাংশ হারের চলতি মূলধন ঋণ বাজার দরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে সস্তা, এবং এটিই হয়তো ঠিক করে দেবে রপ্তানির ধীরগতির একটি প্রান্তিকে কর্মীদের বেতন দিয়ে রাখা যাবে কিনা, নাকি প্রসেসিং লাইন বন্ধ করে দিতে হবে। সরবরাহ চেইনের উপরের দিকে থাকা চিংড়ি ও মাছ চাষিদের জন্য, বাণিজ্যিক চাষে অর্থায়নের এই সুযোগ যদি প্রসেসররা সময়মতো টাকা দিতে পারে তাহলে খামারের দাম নিয়ে চাপ কিছুটা কমাতে পারে। যারা জানতে চান কম সুদের হার তাদের বিদ্যমান ঋণের মাসিক কিস্তিতে কেমন পরিবর্তন আনবে, তারা সাইটের ইএমআই ক্যালকুলেটর দিয়ে হিসাব করে দেখতে পারেন।

এই প্রকল্প মূল সমস্যাটি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের চাহিদা কমে যাওয়া, সমাধান করে না, কিন্তু এটি প্রসেসরদের নতুন ক্রেতা খোঁজার জন্য কিছুটা সময় দেয়, যাতে তারা শুধু নগদ অর্থের অভাবে সম্পদ বিক্রি করতে বা কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য না হয়।

নির্দেশিত ঋণ কর্মসূচিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মিশ্র রেকর্ড

বাংলাদেশ ব্যাংক এর আগেও এই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে, ফলাফল মিশ্র। সংকটে থাকা কারখানাগুলোকে পুনরায় চালু করতে গঠিত ২০,০০০ কোটি টাকার কারখানা পুনরুজ্জীবন তহবিলের প্রায় এক মাস পরও মাত্র প্রায় ৫০ কোটি টাকা বিতরণ হয়েছিল, এত ধীরগতি যে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সম্প্রতি এই তহবিল থেকে ব্যাংকগুলো কীভাবে অর্থ নিতে পারবে সেই ক্রম পরিবর্তন করতে হয়েছে, যাতে প্রক্রিয়া দ্রুত হয়। এই ইতিহাস এখানে সতর্ক থাকার একটি কারণ। কাগজে-কলমে সুবিধাজনক সুদের হার থাকলেই অর্থ দ্রুত ঋণগ্রহীতাদের কাছে পৌঁছাবে তার নিশ্চয়তা নেই, যদি ব্যাংকগুলো আবেদন প্রক্রিয়ায় ধীরগতি দেখায়, রপ্তানিকারকরা কাগজপত্রের ঝামেলাকে বোঝা মনে করেন, বা জামানতের শর্ত এমন হয় যে তহবিলটি মূলত যাদের জন্য সবচেয়ে বেশি সাহায্য করার কথা, সেই ছোট প্রসেসররাই বাদ পড়ে যান।

এরপর কী হবে

বাংলাদেশ ব্যাংক এখনও বলেনি এই প্রকল্পে শেষ পর্যন্ত কতগুলো ব্যাংক যুক্ত করতে চায়, বা আরও ব্যাংক যুক্ত হলে ২,০০০ কোটি টাকা কত দ্রুত বিতরণ করা হবে। গত এক সপ্তাহের গতি দেখে, প্রায় প্রতি দুই থেকে তিন দিনে একটি নতুন ব্যাংক যুক্ত হচ্ছে, মনে হয় আরও ব্যাংক এই তালিকায় যুক্ত হবে। আসল পরীক্ষা হবে এই তহবিলের কতটা অংশ ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরের ছোট প্রসেসরদের কাছে পৌঁছায়, নাকি এটি মূলত বড় ও আগে থেকেই ভালো মূলধনে থাকা রপ্তানিকারকদের হাতে চলে যায়, যাদের ব্যাংক ঋণ পাওয়ার সুযোগ এমনিতেই সবচেয়ে সহজ।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

মাত্র ৭ শতাংশ ব্যবহার হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক তার ২০,০০০ কোটি টাকার কারখানা পুনরুজ্জীবন স্কিমে অর্থায়নের ক্রম উল্টে দিল

বাংলাদেশ ব্যাংক তার ২০,০০০ কোটি টাকার কারখানা পুনরুজ্জীবন স্কিমের নিয়ম নতুন করে লিখেছে, পাঁচ মাস পর যখন দেখা গেছে এর মাত্র ৭ শতাংশ অর্থ ঋণগ্রহীতাদের কাছে পৌঁছেছে। এখন ব্যাংকগুলোকে আগে নিজস্ব তহবিল থেকে ঋণ দিতে হবে এবং পরে ফেরত চাইতে হবে, যা মূল নকশার বিপরীত, সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন নাম, বোর্ড পর্যায়ের অনুমোদনের শর্ত এবং প্রতারণাবিরোধী ঘোষণা। এই পরিবর্তনগুলো বলে দেয়, নগদ প্রবাহ সংকটে বন্ধ হওয়া কারখানা আবার চালু করার প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের এখনও কতটা পথ বাকি।

ইসলামী ব্যাংক রেকর্ড লোকসানের পর মূলধন পাঁচ গুণ বাড়িয়ে টাকা ১০,০০০ কোটিতে নেওয়ার পরিকল্পনা

ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড টাকা ২,০০০ কোটি থেকে টাকা ১০,০০০ কোটিতে অনুমোদিত মূলধন পাঁচ গুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে টাকা ১,৯৭০ কোটি লোকসান প্রকাশের একদিন পরেই, যা ব্যাংকটির সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে বাজে প্রান্তিক ফল। নতুন শেয়ার ইস্যু করার আগে এখনও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন এবং একটি অসাধারণ সাধারণ সভায় শেয়ারহোল্ডারদের সম্মতি লাগবে। ঘোষণার দিন শেয়ারের দাম কমে টাকা ২১.২০ এ নেমেছে, সপ্তাহের শুরুতে টাকা ২০ এর নিচে নামা দরপতনের ধারা আরও বাড়িয়ে। ব্যাংক বলছে বড় লিগ্যাসি ঋণে সংযুক্ত পক্ষের অর্থ আত্মসাতের কারণে হওয়া লোকসানের পর ব্যালেন্স শিট পুনর্গঠনের বৃহত্তর চেষ্টার অংশ এই উচ্চতর মূলধন সীমা।

সিটি গ্রুপের ভোজ্যতেল আর চিনি কারখানা চালু রাখতে ৩,০০০ কোটি টাকার সিন্ডিকেট ঋণের নেতৃত্বে সিটি ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংক তার নিজের একটি খেলাপি নিয়ম শিথিল করেছে, যাতে আটটি ব্যাংক ইতিমধ্যে খেলাপি ঘোষিত সিটি গ্রুপের পাঁচটি ইউনিটকে ৩,০০০ কোটি টাকার নতুন কার্যকরী মূলধন ঋণ দিতে পারে। সিটি ব্যাংক কঠোর শর্তসহ এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছে, যাতে ২০২৭ সালের রমজানের আগে ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল আর আটার সরবরাহ অব্যাহত থাকে। দুই সপ্তাহের মধ্যে এটি গ্রুপটির দ্বিতীয় বড় অর্থায়ন সহায়তা।