বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে এক হারের ১৫ শতাংশ ভ্যাটের পরিকল্পনা করছে, কী থাকছে আর কী উঠে যাচ্ছে দেখে নিন
বাংলাদেশ আইএমএফকে জানিয়েছে তারা ২০৩০ সালের মধ্যে একটা মাত্র ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার চায়, দুই দফায় বহু ছাড় তুলে দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, স্বাস্থ্য আর শিক্ষাকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করে। গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে আলোচনা থেকে এই পরিকল্পনা এসেছে, আর সরকার এবার আসলেই তা বাস্তবায়ন করবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। নভেম্বরে আইএমএফের মিশন ঢাকায় এলে বোঝা যাবে পরিকল্পনাটা রাজনীতির মুখে কতটা টিকে থাকে।
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে জানিয়েছে যে তারা ২০৩০ সালের মধ্যে ভ্যাটের জটিল হার কমিয়ে একটা মাত্র ১৫ শতাংশ হারে নিয়ে আসতে চায়। এর জন্য ছাড় দিতে হবে বহু বছর ধরে ব্যবসায়ীরা যে সুবিধা আর ছাড়ের হার পেয়ে আসছে তার বড় অংশ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে আইএমএফের টেকনিক্যাল টিমের সঙ্গে একটা সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে আলোচনা করেছে, দুই পক্ষই এখন বোঝার চেষ্টা করছে নতুন ঋণ কর্মসূচিতে ঢাকার কাছে আসলে কী চাওয়া হবে।
- এনবিআর চায় ২০৩০ সালের মধ্যে একটা মাত্র ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার, তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা আর পরিবহন ছাড় পাবে।
- বৈদ্যুতিক পণ্য ও হোম অ্যাপ্লায়েন্সের মতো খাতের ছাড় সবার আগে উঠে যাবে, ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে।
- মেট্রোরেলের ভাড়া, রেস্তোরাঁর বিল, স্যানিটারি পণ্য আর আরও কিছু খাতের ছাড় থাকবে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত।
- এই পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মত তা যাচাই করতে নভেম্বরে আইএমএফের একটা মিশন ঢাকায় আসার কথা।
এনবিআর আসলে কী প্রস্তাব করেছে
বাংলাদেশে এখন পাঁচশোর বেশি পণ্য ও সেবায় ভ্যাটে ছাড় আছে, কোনোটায় মূল হারের বদলে ২ থেকে ১০ শতাংশ হারে ভ্যাট বসে, কোনোটা পুরোপুরি ভ্যাট মুক্ত। এই তালিকায় কম্পিউটার যন্ত্রাংশ আর বৈদ্যুতিক পণ্য থেকে শুরু করে মেট্রোরেলের টিকিট, রেস্তোরাঁর খাবার, নন ব্র্যান্ডেড পোশাক, স্যানিটারি ন্যাপকিন আর ডায়াপার সবই আছে। আইএমএফের কাছে এনবিআরের প্রস্তাব হলো, এই ছাড়গুলো নতুন করে না বাড়িয়ে দুই দফায় ধীরে ধীরে উঠিয়ে দেওয়া। বৈদ্যুতিক পণ্য, হোম অ্যাপ্লায়েন্স, কম্পিউটার যন্ত্রাংশ, সমুদ্রগামী জাহাজ পরিবহন, মেট্রোরেল, স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, রেস্তোরাঁ, নন ব্র্যান্ডেড পোশাক, স্যানিটারি ন্যাপকিন আর ডায়াপারের ছাড় তাদের বর্তমান মেয়াদ শেষে আর বাড়ানো হবে না, কোনোটার মেয়াদ শেষ হবে ২০২৮ সালে, বাকিগুলোর ২০৩০ সালে। দেশে তৈরি লিফটে এখন যে ১০ শতাংশ ছাড় আছে তাও উঠে যাবে ২০৩০ সালে। ছোট আর মাঝারি ব্যবসায়ীরা যে প্যাকেজ ভ্যাট দেন, মানে প্রকৃত বিক্রির হিসাব না করে একটা নির্দিষ্ট ফ্লাট রেট, সেটাও পুরো দেশে তুলে দিয়ে মূল হারে নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে।
কৃষি পণ্য ও গুরুত্বপূর্ণ কৃষি উপকরণ, চাল, ডাল, ভোজ্য তেল, লবণ, মরিচের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার, গণপরিবহন, প্রাথমিক শিক্ষা আর জরুরি চিকিৎসা উপকরণ এই পরিকল্পনায় সুরক্ষিত থাকার কথা। গ্যাস আর বিদ্যুতে ছাড় থাকবে কি না তা এখনো ঠিক হয়নি, এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন।
আইএমএফ কেন এতে এত গুরুত্ব দিচ্ছে
বাংলাদেশের ভ্যাট ব্যবস্থায় অনেক টাকা হাতছাড়া হয়ে যায়। এনবিআরের নিজের হিসাবেই ২০২৩ অর্থবছরে ছাড় আর রেহাইয়ের কারণে ভ্যাট থেকে বাদ পড়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা জিডিপির ৩.৩ শতাংশ, সেই বছর যত ভ্যাট আদায় হয়েছে তার চেয়েও বেশি। সেই বছর মোট ভ্যাট আদায় হয়েছিল ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদ জাহিদ হুসেনের হিসাবে পুরো করব্যবস্থায় মোট কর ছাড়ের পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৬.৮ শতাংশ, আর বাস্তবে কর আদায় হয় মাত্র ৬.৪ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশ যতটা কর আদায় করতে পারে, মোটামুটি তার সমান পরিমাণ ছাড় দিয়ে দিচ্ছে।
এই ফারাকটাই আইএমএফের ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির কেন্দ্রে আছে, যা ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে অনুমোদন পেয়েছিল। সেই কর্মসূচির শর্তে ঢাকা রাজস্ব, ব্যাংকিং আর জ্বালানি খাতে একগুচ্ছ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যার অনেকগুলোতে পিছিয়ে গেছে। শোনা যায় আইএমএফ চায় সব ভ্যাট ছাড় তুলে দেওয়া হোক। সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, স্বাস্থ্য আর শিক্ষায় ছাড় রাখার ব্যাপারে অনড় থেকেছে, আর ২০৩০ সালের মধ্যে এক হার করার এই পরিকল্পনা হলো দুই পক্ষের মাঝামাঝি একটা জায়গা খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা।
"আমরা প্রস্তাব দিয়েছি ধীরে ধীরে ভ্যাট ছাড় তুলে নিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে একটা মাত্র হার চালু করার, কিছু ব্যতিক্রম রেখে," আলোচনায় যুক্ত থাকা এক ভ্যাট কর্মকর্তা বলেন।
সন্দেহটা একেবারে স্পষ্ট
জাহিদ হুসেন সরাসরি বলছেন কেন এই পরিকল্পনা বিক্রি করা কঠিন হবে। "আইএমএফ কী নিশ্চয়তা পাচ্ছে যে সরকার এবার তার প্রতিশ্রুতি পালন করবে," তিনি প্রশ্ন তোলেন, বাংলাদেশের সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরে পিছিয়ে আসার অভ্যাসের দিকে ইঙ্গিত করে। সময়ের হিসাবেও তার আপত্তি আছে, আইএমএফের বর্তমান কর্মসূচি ২০৩০ সালের অনেক আগেই শেষ হয়ে যাবে, তাই তহবিল চাইবে তার নিজের মেয়াদের মধ্যেই দৃশ্যমান আর পরিমাপযোগ্য পদক্ষেপ, ঋণ শেষ হওয়ার পরে ফল পাওয়া যাবে এমন প্রতিশ্রুতি নয়। তিনি এনবিআরকে এটাও বলছেন যে এই পরিকল্পনা থেকে আসলে কত রাজস্ব আসবে তার একটা সংখ্যা দিতে হবে, যা এখনো প্রকাশ্যে বলা হয়নি।
ঢাকার কেউ এটাও ভুলে যায়নি যে এর আগেও একবার এমন চেষ্টা হয়েছিল। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ এক হারের ভ্যাটের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল, তখন ব্যবসায়ীদের চাপে সরকার তা থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রশাসক ফজলুল হক বলছেন এবার এক হারের ভ্যাট সম্ভব, তবে তার জন্য হারটাই কমাতে হবে। "এক হারের ভ্যাট সম্ভব, কিন্তু সমস্যাটা হলো ভ্যাটের হার নিয়েই," তিনি বলেন, অনেকটা সৌজন্যের সঙ্গেই সতর্ক করে দিচ্ছেন যে ১৫ শতাংশ হারটা ব্যবসায়ীদের জন্য দ্বিতীয়বার নীরবে মেনে নেওয়া কঠিন হতে পারে।
আসলে কী বদলাচ্ছে, কখন
| খাত | বর্তমান অবস্থা | কী বদলাচ্ছে | সময়সীমা |
|---|---|---|---|
| বৈদ্যুতিক পণ্য, হোম অ্যাপ্লায়েন্স, কম্পিউটার যন্ত্রাংশ | কমানো হার, ৭.৫ থেকে ১০ শতাংশ | ছাড় আর বাড়ানো হবে না | জুন ২০২৮ |
| মেট্রোরেল, রেস্তোরাঁ, স্যানিটারি পণ্য, নন ব্র্যান্ডেড পোশাক | কমানো হার, ৭.৫ থেকে ১০ শতাংশ | ছাড় আর বাড়ানো হবে না | জুন ২০৩০ |
| দেশে তৈরি লিফট | ১০ শতাংশ ছাড় | ছাড় উঠে যাবে | ২০৩০ |
| ছোট ও মাঝারি ব্যবসার ভ্যাট | নির্দিষ্ট প্যাকেজ হার | মূল হারে প্রতিস্থাপিত | ২০৩০ সালের মধ্যে |
| চাল, ডাল, ভোজ্য তেল, লবণ, মরিচ, স্বাস্থ্যসেবা, প্রাথমিক শিক্ষা, গণপরিবহন | ভ্যাট মুক্ত | ভ্যাট মুক্তই থাকবে | বদলের পরিকল্পনা নেই |
| গ্যাস ও বিদ্যুৎ | কমানো হার | পর্যালোচনায় আছে | অনিশ্চিত |
আপনার জন্য এর মানে কী
আপনি যদি সামনের কয়েক বছরের বাজেট নিয়ে ভাবেন, সত্যি কথা হলো অল্প কিছু পণ্যই এখন থেকে কম ভ্যাটের সুবিধা পেতে থাকবে, আর চাপটা শুরু হবে ২০২৮ সালে ইলেকট্রনিক্স আর অ্যাপ্লায়েন্স থেকে, তারপর ২০৩০ সালে আরও বিস্তৃত হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কাগজে কলমে সুরক্ষিত থাকছে, যা নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা খাবারের পেছনে আয়ের বড় অংশ খরচ করে। আপনি যদি এখন প্যাকেজ ভ্যাটে থাকা একজন ছোট ব্যবসায়ী হন, তাহলে এখন থেকেই মূল হারের ভ্যাটে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে, কারণ পুরো ভ্যাট ব্যবস্থায় সাধারণত হিসাবরক্ষণ আর চালানের নিয়ম আরও জটিল হয়ে যায়। ছোট দোকান বা সেবা ব্যবসা চালালে ইনকাম ট্যাক্স ক্যালকুলেটর দিয়ে একবার দেখে নিতে পারেন নিয়ম বদলের সঙ্গে আপনার সার্বিক কর পরিস্থিতি কেমন দাঁড়াবে। এখনো কিছুই পাকাপাকি হয়নি। নভেম্বরে আইএমএফের মিশন ঢাকায় এলে তারপর যা হবে, তা থেকেই বোঝা যাবে ২০১৫ সালের মতো এই পরিকল্পনাও রাজনীতির মুখে পড়ে ভেঙে যায়, নাকি টিকে থাকে।
তথ্যসূত্র
এরপর পড়ুন
এনবিআরের ১১ দিনের কার্গো খালাসের গবেষণাকে একপেশে বলে প্রত্যাখ্যান করল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এই সপ্তাহে একটা প্রতিবাদলিপি দিয়েছে, যেখানে এনবিআরের এক গবেষণাকে একপেশে আর বিভ্রান্তিকর বলা হয়েছে, যে গবেষণায় বলা হয়েছিল আমদানি পণ্য খালাস হতে প্রায় ১১ দিন লাগে। সিপিএ বলছে, এই সময়ের মধ্যে বন্দরের কার্যক্রমের অংশ মাত্র ১৪ শতাংশ আর কাস্টমসের অংশ আরও ৮ শতাংশ, বেশিরভাগ দেরি হয় সম্পূর্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা অন্য পরিদর্শক সংস্থার কারণে। এই বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ কারণ বাড়তি দিনগুলোর একটা বাস্তব মূল্য আছে, প্রতি কনটেইনারে আনুমানিক বাড়তি ৪৮ ডলার, যে সংখ্যা নিয়ে কোনো পক্ষেরই আপত্তি নেই, দায় নিয়ে যতই তর্ক হোক।
ত্রৈমাসিক ভ্যাট ব্যবস্থা থেকে সরে এসে মাসিক রিটার্নে ফিরছে বাংলাদেশ
চার মাস আগে চালু হওয়া ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন ব্যবস্থা বাতিল করে মাসিক রিটার্নে ফিরে যাচ্ছে বাংলাদেশ, নতুন ব্যবস্থার প্রথম দুই মাসে ভ্যাট আদায় প্রায় ২১ শতাংশ কমে যাওয়ার পর। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বলছে ব্যবসাগুলো প্রতি প্রান্তিকের শেষ পর্যন্ত টাকা জমা না দিয়ে অপেক্ষা করছিল, যার ফলে কোষাগার সময়মতো টাকা পাচ্ছিল না। জুলাই সেপ্টেম্বরের বাকি থাকা রিটার্ন জমার জন্য সুদ বা জরিমানা ছাড়াই এখন সময় আছে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত।
এপ্রিল মার্চ অর্থবছরে যাওয়ার পরিকল্পনা জমা দিতে মন্ত্রণালয়গুলোকে ২৫ অক্টোবরের সময়সীমা দিল সরকার
বাংলাদেশের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও তার অধীনস্থ দপ্তরকে বলেছে, ২৫ অক্টোবরের মধ্যে একটা সময়বাঁধা পরিকল্পনা জমা দিতে, যেখানে জুলাই থেকে জুন অর্থবছর ধরে তৈরি করা আইন, বিধি আর ব্যবস্থাগুলো নতুন করে লেখার পথ বের করতে হবে। ২০২৮-২৯ সাল থেকে অর্থবছর এপ্রিল থেকে মার্চে নেওয়ার আগস্টের সিদ্ধান্তের পর এটাই সরকারের প্রথম বড় পরীক্ষা। একই সপ্তাহে আরেকটা ছোট সময়সীমাও বদলেছে, কর কর্তৃপক্ষ ভ্যাট রিটার্ন জমার তারিখও পিছিয়ে ২৫ অক্টোবর করেছে।