অর্থনীতি ও নীতি

ওয়াল স্ট্রিটে বাংলাদেশের প্রথম ডলার বন্ড বিক্রি করতে আসলে কত খরচ পড়বে

১৮ অক্টোবর, ২০২৬4 মিনিটের পড়া
ওয়াল স্ট্রিটে বাংলাদেশের প্রথম ডলার বন্ড বিক্রি করতে আসলে কত খরচ পড়বে

বাংলাদেশ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথমবারের মতো সার্বভৌম বন্ড বিক্রি করে ১ বিলিয়ন ডলার তোলার পরিকল্পনা করছে, যার প্রধান ব্যবস্থাপক হিসেবে থাকছে জেপি মরগান। নতুন বিশ্লেষণ বলছে, এই বন্ডের সুদের হার বছরে প্রায় ৮ শতাংশ হতে পারে, যা বিশ্বব্যাংকের সবচেয়ে সস্তা ঋণের প্রায় ২ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি, এবং কেন এই ফারাক তৈরি হচ্ছে তা বিশদে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো সার্বভৌম ডলার বন্ড বিক্রির মাধ্যমে ডিসেম্বরের মধ্যে ১ বিলিয়ন ডলার তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার প্রধান ইস্যু ম্যানেজার, গ্লোবাল কো অর্ডিনেটর এবং বুকরানার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে জেপি মরগান। এখনো বন্ডের দাম নির্ধারণ হয়নি, কিন্তু এই সপ্তাহে প্রকাশিত একটি নতুন বিশ্লেষণে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে, দেশটির আনুমানিক কত সুদ গুনতে হতে পারে, এবং সংখ্যাটা স্বস্তিদায়ক নয়, বছরে প্রায় ৮ শতাংশ, যা বাংলাদেশের সবচেয়ে সস্তা বহুপাক্ষিক ঋণের চেয়ে তিন গুণেরও বেশি।

  • প্রথম সার্বভৌম বন্ড থেকে বাংলাদেশ ডিসেম্বরের মধ্যে ১ বিলিয়ন ডলার তোলার লক্ষ্য নিয়েছে।
  • বিশ্লেষকদের হিসাবে কুপন সুদহার হতে পারে বছরে প্রায় ৮ শতাংশ, কম বেশি আধা শতাংশ পয়েন্ট।
  • তুলনায় বিশ্বব্যাংকের সবচেয়ে সস্তা রিয়াতি ঋণের সুদহার প্রায় ২.১৩ শতাংশ।
  • এই ফারাক আসছে ৫ শতাংশ মার্কিন ট্রেজারি ভিত্তিহারের ওপর প্রায় ৩ শতাংশ পয়েন্ট ঝুঁকি প্রিমিয়াম থেকে।

এক বিলিয়ন ডলারের অভিষেক, এখনো দাম নির্ধারণ হয়নি

পরিকল্পনাটি জুলাই থেকে শুরু হয়েছিল, যখন একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল এই ধারণা পরীক্ষা করতে, এবং সেপ্টেম্বরে অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগতভাবে এতে সম্মতি দেওয়ার পর গতি পায়। জেপি মরগান দেখবে আইনি পরামর্শ, অফারিং সার্কুলার, বিনিয়োগকারীদের রোডশো এবং ইস্যুর সময়। পাশাপাশি হংকং ভিত্তিক ব্রিজওয়ার্কস ইন্টারন্যাশনাল এক বছরের জন্য বন্ড এবং বৃহত্তর পুঁজিবাজার সংস্কার নিয়ে পরামর্শ দেবে। ডলার ভিত্তিক ইউরোবন্ডকেই সম্ভাব্য সবচেয়ে এগিয়ে থাকা বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে, যদিও ইয়েন ভিত্তিক সামুরাই বন্ড এবং ইউয়ান ভিত্তিক পান্ডা বন্ডও বিবেচনায় আছে। ব্ল্যাকরক এবং পিমকোসহ প্রায় ১৫টি বিশ্ব বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানা গেছে, যাকে অর্থ উপদেষ্টা তানভীর শাহরিয়ার রিমন অত্যন্ত বেশি আগ্রহ বলে উল্লেখ করেছেন।

সম্ভাব্য ৮ শতাংশ সুদহারের হিসাব

সিঙ্গাপুরের পুটনাম ক্যাপিটাল অ্যাডভাইজরির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এরশাদ হোসেনের এই সপ্তাহের বিশ্লেষণ, যা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত হয়েছে, সম্ভাব্য খরচকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। ভিত্তিহার, যা পাঁচ বছরের মার্কিন ট্রেজারি সুদের সাথে যুক্ত, তা প্রায় ৫ শতাংশ এবং এটি বাজারের প্রতিটি ঋণগ্রহীতার জন্য প্রযোজ্য, ধনী হোক বা গরিব। এর ওপর যুক্ত হয় ঝুঁকি প্রিমিয়াম, যা বাংলাদেশের জন্য নির্দিষ্টভাবে প্রায় ৩ শতাংশ পয়েন্ট বলে হোসেন অনুমান করেছেন।

"সক্রিয় আইএমএফ কর্মসূচি না থাকলে এই প্রিমিয়াম সম্ভবত ওপরের সীমার দিকেই থাকবে," বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বিনিয়োগ গ্রেডের নিচে থাকা বি প্লাস বা বি টু রেটিং এবং এই বছর রেটিং সংস্থাগুলোর আরও নিচে নামার সতর্কতার দিকে ইঙ্গিত করে।

তিনটি কারণ এই প্রিমিয়ামকে ঊর্ধ্বমুখী রাখছে। প্রথমত, বাংলাদেশ আগে কখনো এমন বন্ড বিক্রি করেনি, ফলে বিনিয়োগকারীদের কাছে তুলনা করার কোনো ইতিহাস নেই এবং তারা সাধারণত এই অজানা ঝুঁকির জন্য বাড়তি প্রতিদান দাবি করে। দ্বিতীয়ত, দেশটির ক্রেডিট রেটিং বিনিয়োগ গ্রেডের নিচে। তৃতীয়ত, দেশীয় কিছু লাল সংকেত, মূলত ব্যাংক খাতে এখনো জমে থাকা বিপুল খেলাপি ঋণ, বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে তোলে। আইএমএফ কর্মসূচি নিয়ে চলমান আলোচনা শেষ করে দেওয়াটাও অনেক বিনিয়োগকারীর চোখে একটি দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর অনুমোদনের সিল তুলে নেওয়ার মতো, যা সুদহার কমানোর বদলে বাড়িয়ে দেয়।

অর্থায়নের উৎসআনুমানিক বার্ষিক খরচ
বিশ্বব্যাংকের রিয়াতি ঋণপ্রায় ২.১৩ শতাংশ
আনুমানিক প্রথম সার্বভৌম বন্ডপ্রায় ৮ শতাংশ

উন্নয়ন ঋণের সাথে তুলনা কেন গুরুত্বপূর্ণ

১ বিলিয়ন ডলারের বন্ডে এই দুই সংখ্যার ফারাক দাঁড়ায় বিশ্বব্যাংকের সবচেয়ে সস্তা ঋণের তুলনায় বছরে বাড়তি প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলার সুদ খরচ। বন্ড পরিশোধের পদ্ধতিও আলাদা, এটি সাধারণত মেয়াদ শেষে একবারে পরিশোধ করতে হয়, উন্নয়ন ঋণের ধীর পরিশোধ সূচির মতো নয়, যার মানে সরকারকে একসময় পুরো অর্থ একবারে পুনঃঅর্থায়ন বা পরিশোধের একটি পরিকল্পনা করতে হবে, ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার সুযোগ থাকবে না।

এটি বন্ড ইস্যু না করার পক্ষে যুক্তি নয়, হোসেনের বিশ্লেষণে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, বরং ছোট আকারে শুরু করার পক্ষে একটি যুক্তি। পরামর্শ হলো পূর্ণ ১ বিলিয়ন ডলারের বদলে ৫০০ থেকে ৭৫০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে শুরু করা, এই অর্থ দৈনন্দিন সরকারি ব্যয়ের বদলে বেশি খরচের পুরনো ঋণ পরিশোধ বা রিজার্ভ গড়তে ব্যবহার করা, এবং বন্ডকে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নের প্রতিস্থাপক নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে দেখা। বিশ্লেষণে ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার ঋণ খেলাপির উদাহরণ টানা হয়েছে, যা বাজার ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার পর ঘটেছিল, একটি সতর্কবার্তা হিসেবে।

কী হলে বন্ড সস্তা হতে পারত

আইএমএফ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা থেকে সরে আসার পর বাংলাদেশকে বন্ড বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করার অন্য উপায় খুঁজতে হচ্ছে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, একটি প্রকাশিত, বিশ্বাসযোগ্য মধ্যমেয়াদি ঋণ পরিকল্পনা এবং স্বচ্ছ অর্থনৈতিক তথ্য কিছু বিনিয়োগকারীর চোখে আইএমএফের অনুমোদনের বিকল্প হতে পারে, যদিও সবার জন্য নয়। এতে আরেকটি বিকল্প পথের কথাও বলা হয়েছে, সস্তা ইয়েন ভিত্তিক সামুরাই বন্ড বা ইউয়ান ভিত্তিক পান্ডা বন্ডের জন্য সার্বভৌম গ্যারান্টি চাওয়া, যদিও এসব ক্ষেত্রে মুদ্রা হেজিংয়ের খরচ কার্যকর খরচকে ৫.৫ থেকে ৬.৫ শতাংশে ঠেলে দিতে পারে, যা সরাসরি ডলার বন্ডের চেয়ে কম কিন্তু রিয়াতি ঋণের চেয়ে তবুও অনেক বেশি।

আপনার জন্য এর মানে কী

একজন সাধারণ সঞ্চয়কারী সরাসরি এই সার্বভৌম বন্ড কিনতে পারবেন না, এগুলো সাধারণত বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ন্যূনতম অনেক বড় অঙ্কে বিক্রি হয়, যা সাধারণ খুচরা বিনিয়োগকারীর নাগালের বাইরে। কিন্তু এর দাম পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ যদি একটি বড় বন্ডে ৮ শতাংশ ডলার কুপন চূড়ান্ত করে, তাহলে এটি একটি নতুন মানদণ্ড হয়ে দাঁড়াতে পারে যার ভিত্তিতে ব্যাংক, বড় করপোরেট এবং কিছু ব্যাংক বহির্ভূত ঋণদাতা নিজেদের আন্তর্জাতিক ঋণের দাম নির্ধারণ করতে পারে, যা সময়ের সাথে দেশীয় ঋণের খরচেও প্রভাব ফেলতে পারে। যারা ফিক্সড ডিপোজিট বা ডিপিএস এর মতো টাকায় সঞ্চয় রাখেন তাদের জন্যও এটি একটি লক্ষণীয় সংকেত, কারণ সরকারের নিজের ঋণের খরচ, দেশে এবং বিদেশে, দেশীয় সুদহার কোন মধ্যবিন্দুর চারপাশে স্থির হবে তা নির্ধারণে সহায়তা করে।

এরপর কী

সরকার এখনো দাম নির্ধারণের নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করেনি। কর্মকর্তারা ডিসেম্বরের লক্ষ্যের কথা বলেছেন, কিন্তু সুদহার, চূড়ান্ত আকার এবং এমনকি ইস্যুর মুদ্রা এখনও খোলা প্রশ্ন, যা অনেকটাই নির্ভর করবে বিনিয়োগকারী রোডশো কেমন হয় এবং জেপি মরগান যখন চুক্তি চালু করতে প্রস্তুত হবে তখন মার্কিন ট্রেজারির সুদহার কোথায় থাকে তার ওপর।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

মাথাপিছু আয়ে আবার ভারতের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ, FY29 তে ভারতের এগিয়ে যাওয়ার আশা আইএমএফের

আইএমএফের সর্বশেষ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক তথ্য বলছে, FY26 এর মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ আবার ভারতের চেয়ে এগিয়ে গেছে, ২,৮৮৬ ডলার বনাম ভারতের ২,৭৫০ ডলার। সংস্থাটি এখন মনে করছে ভারত FY29 তে আবার এগিয়ে যাবে, আগের আইএমএফ পূর্বাভাসের চেয়ে দুই বছর পরে। এই র‍্যাঙ্কিং জীবনযাত্রার মান নিয়ে বেশি কিছু বলে না, কিন্তু এটা দেখায় দুই অর্থনীতির আয়ের তুলনা কতটা কাছাকাছি এবং অস্থির হয়ে উঠেছে।

ব্যয়বহুল এলএনজি টার্মিনাল পরিকল্পনা বাতিল করে চীন ও স্পট কার্গোর ওপর ভর করছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা কুতুবজোমে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে, যার খরচ হতো ২০ বছরে ১৩,১৬১ কোটি টাকা পর্যন্ত, তার বদলে স্পট আর জি টু জি বাজার থেকে নয়টি এলএনজি কার্গো কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কয়েক দিন পরে ব্যাংককে চীনের এক্সিম ব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দল বিদ্যুৎ মন্ত্রীকে বলেছে, তারা পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্প্রসারণ আর ঢাকার চারপাশের গ্রিড উন্নয়নে অর্থায়ন দ্রুত করতে চায়। এই দুটো পদক্ষেপ মিলে দেখায় সরকার কীভাবে সামনের জ্বালানি খরচ আর দীর্ঘমেয়াদে ব্যবস্থাটা ঠিক করার অর্থায়নের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজছে।

বাংলাদেশ আবার আইএমএফের দ্বারে, ২০২৯ সাল পর্যন্ত নতুন ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণের আবেদন

সাড়ে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ কর্মসূচি থেকে নির্ধারিত সময়ের আট মাস আগেই সরে আসার পাঁচ মাস পর বাংলাদেশ ফিরে গেছে ব্যাংককের আলোচনার টেবিলে, এবার চাইছে নতুন করে সাড়ে চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের ঋণ। রাজস্ব জিডিপির অনুপাত নেমে এসেছে মাত্র সাত শতাংশে, আর ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ পৌঁছে গেছে মোট ঋণের প্রায় এক তৃতীয়াংশে, এমন সময়েই এসেছে এই নতুন আবেদন। অর্থ উপদেষ্টা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলছেন, আলোচনা বছরের শেষ নাগাদ শেষ হওয়ার কথা, আর ঋণ ছাড় হবে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ত্রৈমাসিক কিস্তিতে।